আকাশ_তীরে_আপন_সুর
সদ্য বিবাহিত স্বামীর কোলে একটি তিন বছরের
বাচ্চা ছেলে। সেই বাচ্চা বঁধুরূপে প্রণয়াকে দেখে অনবরত কাঁদছে এবং প্রণয়ার স্বামীকে বলছে,
--"এই মা ভালো না বাবা। আমাকে মেরেছে এই মা।"
প্রণয়া অবাক হয়ে বাচ্চাটির দিকে চেয়ে ঘনঘন মাথা নাড়াল। সে যে মারেনি এই বাচ্চাকে। ছুঁয়েও দেখেনি এখন অবধি। প্রণয়া কৈফিয়ত দিতে বলল, "বিশ্বাস করুন, আমি ওর গায়ে হাত অবধি দেইনি। মারা তো দূরে থাক।"
কিন্তু প্রণয়ার স্বামী তা মানতে নারাজ। সে চেঁচিয়ে ধমক দিয়ে উঠল প্রণয়াকে। প্রণয়া তার স্বামীর হাত ধরে বোঝাতে চাইলে স্বামী তাকে ধাক্কা দিল। প্রণয়া নিজেকে সামলাতে না পেরে দেয়ালের সাথে কপালে আঘাত পেল। সঙ্গে সঙ্গে তার ঘুম ভেঙে যায়। হকচকিয়ে উঠে বসে প্রণয়া। চারপাশে নজর বুলিয়ে বুঝল এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল।
প্রণয়া নিজের ওপরই চরম বিরক্ত হলো। মুখ-ভঙ্গি এরকম যেন সকাল সকাল তেঁতো কিছু মুখে তুলেছে। পরপর বিরক্ত হলো মায়ের ওপরও। মা এসব কী আজারে সিরিয়াল দেখে? এদের ভিত্তিহীন সিরিয়ালের গল্প প্রণয়ার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে! মায়ের সাথে গতকাল একটু বসেছিল টিভির কাছে, ফলস্বরূপ এই সকালেই এমন তিক্ত স্বপ্ন। প্রণয়া কপাল কুচকে মিনমিন করে বলল, "ধুর!"
.
সবুজ, শ্যামলা সৌন্দর্যে ভরপুর শ্রীমঙ্গল। বাতাসে ভেসে বেড়ায় চা পাতার নেশালো ঘ্রাণ। এক ঝাঁক পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে বিশাল আকাশ জুড়ে। গাছ-গাছালির পাতা, ডালের ফাঁক ফোকর দিয়ে চা বাগানে প্রবেশ করেছে নরম, আবেশী রোদ। প্রণয়া চায়ে চুমুক দিতে দিতে চা বাগানের সৌন্দর্যে নজর বুলাচ্ছে। এই সৌন্দর্য প্রণয়ার জন্যে নতুন কিছু নয়।
উপর থেকে ড্রোনের শুট নিলে দেখা যাবে সমগ্র সবুজের মাঝে এক টুকরো বাড়ি। সেই বাড়িটার নাম চা বিলাস। সেই চা বিলাস বাড়িটা প্রণয়াদের৷ চা বাগানের মাঝামাঝিতে তাদের বাড়িটা। প্রায় একুশ শতাংশ জমি মিলিয়ে উঠান আর বাড়িটা। কাঠের দো'তলা বাড়ি এবং তার চারপাশে খোলা উঠান। উঠোনের আশপাশ জুড়ে আবার কাঠের বেড়া। এই বাড়িটা প্রণয়ার দাদার ভীষণ শখের গড়া। তিনি প্রতিনিয়ত চিন্তা করতেন কী করলে বাড়িটার সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পাবে? জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি বাড়ির প্রতি অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন। তাইতো স্ত্রী মূর্ছা যাওয়া সত্ত্বেও এই বাড়িতে দুজন কাজের লোক নিয়ে একাই থাকতে শুরু করে দিলেন।
স্থানীয় বাচ্চাদের কাছে এই চা বিলাস ভূতুড়ে বাড়ি লাগলেও পর্যটকদের কাছে এই বাড়ি চোখ ধাঁধানো সুন্দর। চা বিলাসের দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে পাতাবাহার ঝুলে পড়েছে নিচের হলদে বাতি অবধি। কত মানুষ যে এ বাড়ির সামনে এসে ছবি তুলে গেছে। তাদের এ বাড়ি আসা নিয়ে আলাদা ভিজিটের প্রয়োজন হয় না। পর্যটক'রা নিজেদের মতো করে এসে ঘুরে চলে যায়। আর প্রণয়া শুধু তাদের নীরবে দেখে যায়।
প্রণয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরে চলে যায়। কলেজের পোশাক পড়ে বেরিয়ে আসতেই দেখল প্রণয়ার মা অর্থাৎ মিসেস ফাহিমা নাস্তা তৈরি করে ফেলেছে। ঘড়ির কাঁটা এখন ছয়টার ঘরে। ছয়টা বেজে পঁয়ত্রিশ। প্রণয়া খাবার টেবিলে বসলেও খাবারে হাত দিল না। মূলত প্রণয়া তার বাবা অর্থাৎ নুহাশ সাহেবের অপেক্ষায় বসে রইলো। নুহাশ সাহেব প্রতিদিন ফজরের পরপর বেরিয়ে যায় তার কুড়ি বিঘা চায়ের বাগানে চোখ বুলাতে। আশেপাশে মসজিদ নেই বললেই চলে। তাই ফজরের নামাজটা নুহাশ সাহেবের ঘরেই পড়তে হয়।
প্রণয়াকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। নুহাশ সাহেব মিনিট তিনের মধ্যেই এলেন। তবে তার স্বাভাবিক মুখে অস্বাভাবিক রাগ জ্বলজ্বল করছে। যা মা-মেয়ে দুজনেই লক্ষ্য করলো। নুহাশ সাহেব খাবার টেবিলে বসেই কঠিন গলায় স্ত্রীর উদ্দেশে বললেন,
--"প্লাবনকে কালকের মধ্যে বাসায় দেখতে চাই রোকসানা। স্কুল-স্টুল কী যাবে না? এত মানুষের বাসায় বেড়ানো কিসের?"
শেষ দুটি বাক্য নুহাশ সাহেব গলার স্বর বাড়িয়েই বললেন। প্রায় ধমকই বলা চলে। প্লাবন প্রণয়ার ছোটো ভাই। সবে ক্লাস ফোরে পড়ছে। প্লাবন সহজে বাড়ি থাকতে চায় না। মামাদের বাড়ি বেড়াতে ভীষণ পছন্দ করে। তাইতো প্রণয়ার বড়ো মামা আসলেই আবদার করে প্লাবনকে তার সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রণয়া আজও বুঝে না, মামা বাড়িতে এত কী মজা পায় সে?
প্রণয়া, ফাহিমা দুজনেই এই পরিস্থিতিতে চুপ থাকল। ফাহিমা আশ্বাসের সুরে স্বামীকে বলল,
--"আচ্ছা প্রণয়ার বাবা। আপনি শান্ত হন। আমি আজই কল করে বলব ভাইকে। কাল সকালের মধ্যেই প্লাবনকে বাড়ি দিয়ে যাবে।"
নুহাশ সাহেব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললেন। যা প্রণয়ার চোখ এড়াল না। সকালে নিজের ঘর থেকে বাবার ফুরফুরে গলাই তো শুনেছিল। ঘন্টাখানেকের মধ্যে কী এমন হলো যে বাবা এতটা তেঁতে আছে? চা বাগানে কিছু হলো নাকি?
প্রণয়া সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটা করল না নুহাশ সাহেবকে। রয়েসয়ে কিছুটা সময় নিয়েই জিজ্ঞেস করল,
--"কী হয়েছে বাবা? বাগানে বা কারখানায় কী কোনো সমস্যা হয়েছে?"
নুহাশ সাহেব কিছুটা নিভে এলো। তবুও গলায় তেজ মিশিয়ে উচ্চস্বরে বলল,
--"শু* বাচ্চা ইমরানে হিসাবে ভালো রকম গণ্ডগোল বাঁধিয়ে রাখছে। কর্মচারীরাও বলল, কত টাকা নাকি মেরে দিছে। এর নামে যদি আমি মামলা না ঠুকছি!"
ইমরান নুহাশ সাহেবের ম্যানেজার ছিল। যে কী না নুহাশ সাহেবের এত বড়ো চা ব্যবসার হিসাব-নিকাশ রাখত। সেই লোক যদি বিশ্বাসঘাতক হয় তাহলে রাগ তো হবেই। প্রণয়া বলল,
--"বের করে দিছ না?"
--"তা আর বলতে? ও এখন জুতারও যোগ্য না। যে মানুষ বিশ্বাস ভঙ্গ করে আর যাই হোক, মানুষের কাতারে পড়ে না।"
--"তো এখন কী করবা? নতুন ম্যানেজার কাকে বানাবা? বিশ্বাসযোগ্য কেউ আছে?"
এই পর্যায়ে নুহাশ সাহেব নিশ্চুপ রইলেন। তারপর নাস্তায় আর কোনো কথা হলো না। খাওয়া শেষে নুহাশ সাহেব মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন কলেজের উদ্দেশ্যে। এদিকের কিছু রাখাইন মেয়ে এবং স্থানীয় এক দুইজন কলেজ যায়, নুহাশ সাহেব ওদের সাথে প্রণয়াকে অটোতে উঠিয়ে দেন। রাস্তা থেকে কলেজ যেতে প্রায় পঞ্চাশ মিনিট-ই লাগে। যার কারণে বেশ আগে আগেই বের হতে হয় প্রণয়াকে। ক্লাস শুরু হয় আবার নয়টা, সাড়ে নয়টা থেকে।
প্রণয়া অটোতে বসে সারি সারি সবুজ চা বাগানে নজর স্থির রাখল। প্রণয়ার চোখে যেন জ্বলজ্বল করছে এক টুকরো সবুজ রং। প্রণয়ার পুরো নাম প্রণয়া শেখ। এবার অনার্সে ভর্তি হয়েছে। গায়ের রং আহামরি ফরসা না হলেও কিছুটা পরিষ্কার। এছাড়া তার মুখের মায়া, টানা ছোটো চোখ, কোমড় অবধি আঁকা-বাঁকা চুল সবটাই একজন সুন্দরীর পরিচয় বহন করে। তবে তার গায়ের রঙের চাইতে মুখের মায়া বোধ হয় সকলকে বেশি আকৃষ্ট করে। প্রণয়া স্বভাবতই শান্ত স্বভাবের। খুব মেপে মেপে কথা বলার মানুষ। নিরিবিলি, শান্তিপ্রিয় মানুষও সে।
প্রণয়ার জন্ম হয় সিলেট শহরে। নুহাশ সাহেবের ছোটো থেকেই শখ ছিল শহরে থাকার। এজন্যে ফাহিমাকে নিয়ে প্রথমে শহরেই থাকত। শহরেই মোটামুটি বেতনের একটা চাকরিও করত। অথচ প্রণয়ার দাদার অঢেল সম্পদ, চায়ের বড়ো ব্যবসা। এসবকে তুচ্ছ করে নুহাশ সাহেব তার শখ মিটিয়েছেন।
প্রণয়ার বয়স যখন চৌদ্দ-পনেরো তখনই প্রণয়ার দাদা অসুখে ভুগে হঠাৎ মারা গেলেন। দাদা গত হওয়ার পরপর নুহাশ সাহেব আচমকা বদলে গেলেন। শহুরে চাকরি ছেড়ে পরিবার নিয়ে সোজা চলে গেলেন বাবার ভিটেতে। প্রণয়ার বাবা দাদার একমাত্র ছেলে হওয়ায় সব সম্পত্তি তার নামেই হয়ে গেল। তাই নুহাশ সাহেব তার বাবার ব্যবসাকে আবার আঁকড়ে ধরলেন। মারা যাওয়ার আগে নুহাশ তার অসুস্থ বাবার হাত ধরে কথা দিয়েছিলেন এই চা সাম্রাজ্য তিনি সামাল দিবেন।
নুহাশ সাহেব ব্যবসায় হাত দিলেও তাকে অনুতপ্ত বোধ বেশ কুড়ে কুড়ে খায়। বাবার শেষ সময়ে পাশে থাকতে পারেননি। মাকে হারিয়ে ফেলার পরেই নুহাশ সাহেব শ্রীমঙ্গল ছেড়েছিলেন। তার শখ, চাওয়ার তীব্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে একা বাবা কী করে এখানে থাকবেন মাথতেও আসেনি। ভেবেছিলেন বিশ্বস্ত দুজনের সঙ্গে আছেন, আর চিন্তা কিসের? মাসে দুই একবার বাবার সাথে দেখা করে আসলেই হবে। তাই করতেন।
প্রণয়ার দাদা নুহাশকে প্রতিবার ব্যাকুল চিত্তে বলতেন,
--"নাতি-নাতনি গুলাকে নিয়ে এখানেই থেকে যা নুহাস। একা একা ভালো লাগে না।"
এখন সেই মানুষটা আর নেই। তবে থেকে গেছে এক বুক আফসোস এবং অনুতপ্ত বোধ।
বিকালে প্রণয়া ঝুল বারান্দায় পাটি বিছিয়ে শুয়ে রইলো। মাথার নিচে এক হাত দিয়ে পলকহীন চোখে ভাসা ভাসা মেঘের আকাশ দেখতে লাগল। এদিকে নেটওয়ার্ক তেমন নেই বললেই চলে, যার ফলস্বরূপ প্রণয়ার সেরকম মোবাইলের প্রতি আসক্তি নেই। নুহাশ সাহেব চার মাস আগে একটা স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল মেয়েকে। কিন্তু সেটা বেশিরভাগ সময়ে অবহেলাতেই পড়ে থাকে। প্রণয়ার সময়গুলো এভাবেই শুয়ে বসে একাকী কাটে। হয় ঝুল বারান্দায়, নয়তো উঠান ঘুরে। বিকাল সময়টা একটু বেশি-ই অবসর কাটে। এই সময়ে বাড়িতেও তেমন কাজ-টাজ থাকে না।
পরেরদিন সকাল এগারোটার মাঝেই বড়ো মামা প্লাবনকে নিয়ে এলেন। প্রণয়া সেদিন কলেজ যায়নি। বাড়ি থেকে কলেজ যেহেতু দূরের পথ এজন্য কলেজে খুব কম যাওয়া - আসা করে সে। সপ্তাহে দুই বা তিন দিন যায়।
প্লাবন তো ফিরেই গল্প জুড়ে বসল। সেখানে গিয়ে কী করেছে, কী খেয়েছে, কোথায় ঘুরেছে ইত্যাদি। প্রণয়া এক্ষেত্রে নীরব স্রোতার ভূমিকা পালন করল। সন্ধ্যার পরপর নুহাশ সাহেব ফিরলেন। ফিরেই জানালেন,
--"নতুন ম্যানেজারের খোঁজ পেয়ে গেছি!"
নতুন ম্যানেজার হিসাবে কাকে নির্বাচন করল, তার পরিচয় কী এসব সম্পর্কে বিশেষ কিছু বললেন না নুহাশ সাহেব। তবে নুহাশ সাহেবকে বেশ নির্ভার এবং শান্ত লাগছিল। মোটকথা, নুহাশ সাহেবের কপালে যেই চিন্তার ভাজ পড়েছিল সেই ভাজটা আজ দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক হলেও প্রণয়া আগ্রহ দেখালো না।
.
ঠিক দুই দিন পর খুব সকালে নুহাশ সাহেব বললেন তাদের খালি দুটি ঘর পরিষ্কার করে দিতে। খালি দুই ঘর পেছনের দিকে ছিল। এমনিতে দোতলা মিলিয়ে মোট পাঁচটা ঘর প্রণয়াদের। চাইলে বাড়িয়ে আরও দুই তিনটা ঘর তোলা সম্ভব উত্তর দিকটায়।
নুহাশ সাহেবের হঠাৎ ঘর পরিষ্কার করার কথায় ফাহিমা অবাক হয়। তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করল,
--"দুটো ঘর হঠাৎ খালি করতে বললেন যে? কে আসবে?"
--"বাড়ির সদস্য-ই আসবে। আমি দুজন কাজের লোক পাঠাব। ওরাও তোমাদের সাহায্য করে যাবে।"
বলেই নুহাশ সাহেব বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সময় মতো দুজন মহিলাও আসে সাহায্য করতে। প্রণয়া বাবার কথায় বেশ অবাক হয়েছে। বাবাকে প্রশ্ন করল না মা করেছে ভেবে। তবে নুহাশ সাহেব তো বিশেষ কিছুই বললেন না। কে আসবে বাড়িতে?
দুপুরের মধ্যে ঘর পরিষ্কার হয়ে যায়। এক ঘরে পুরাতন একটা খাট আছে। সেই পুরাতন খাটে ফাহিমা নতুন চাদর বিছিয়ে দেয়। নুহাশ সাহেব যেহেতু ঘর পরিষ্কার করতে বলেছেন সেহেতু মেহমান কেউ আসবেনই। আরেক রুম প্রায় ফাঁকা। একটা তোষক আর একটা ল্যাপ ছাড়া তেমন কোনো আসবাবপত্র নেই।
তবে বিপত্তি ঘটল প্রণয়ার বেলায়। সে হঠাৎ-ই জ্বর এবং মাথা ব্যথায় কাবু হয়ে গেল। তাইতো বিকাল থেকে বিছানাতেই পড়ে রইল। সন্ধ্যার পরপর নিস্তব্ধ বাড়িটায় হঠাৎ নতুন মানুষের গলা শোনা গেল। প্রণয়ার ঘরটা দোতলায় হওয়ায় সেরকম স্পষ্ট কিছু শুনল না। শুধু নুহাশ সাহেবের গলাই শোনা গেল। তবে কী বাবার অতিথি চলে এসেছে? সে রাতে বাবার অতিথিদের আর নিজ চোখে দেখা হলো না প্রণয়ার। ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল খুব দ্রুতই।
পরেরদিন সকাল আটটা বাজে প্রণয়ার ঘুম ভেঙে যায়। ফরজের নামাজ মিস হয়ে যাওয়ায় প্রণয়া কিছুটা আহত হলো। বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে অনুভব করল সারা গা জুড়ে নিদারুণ ব্যথা। তবুও প্রণয়া নিচে গিয়ে হাত মুখ ধুঁয়ে নেয়। বাড়িতে নুহাশ সাহেব নেই। প্রণয়ার একবার পেছন দিকে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল যে কে এসেছে? কোনো পুরুষ মানুষ থাকতে পারে এই শঙ্কায় এলোমেলো প্রণয়া আর সেদিকে আগায় না। সে বাড়ির ভেতরে মায়ের কাছে চলে যায়। ফাহিমা মেয়েকে দেখে বলল,
--"জ্বর কমেছে? দেখি আয় তো কাছে, কপাল ছুঁয়ে দেখি।"
ফাহিমা প্রণয়ার কপালে হাত দিয়ে বুঝল জ্বর নেই তেমন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে। প্রণয়া বলল,
--"গতকাল সন্ধ্যায় কে আসল আম্মা?"
মুহূর্তেই ফাহিমার অধরে হাসি খেলে যায়। হাসি বজায় রেখে বলল,
--"নীলু আপা আসছে। নির্মলও আসছে। নির্মল এখন তোর বাবার নতুন ম্যানেজার।"
নামগুলো প্রণয়া প্রথম শুনেছে। অথচ ফাহিমা এমন ভাবে বলল যেন প্রণয়ার কতদিনের চেনা-জানা তারা। প্রণয়া ভ্রু কুচকে বলল,
--"ওনারা কারা আম্মা?"
ফাহিমা বোধ হয় ভুল বুঝতে পারে। জিভে কামড় দিয়ে বলল,
--"ওহ! তুই তো ওদের চিনিস না। নীলুফা আমার গ্রামের মানুষ। আত্নীয়তার সম্পর্ক আমাদের মাঝে না থাকলেও আত্মিক সম্পর্ক আছে। ওরাই আসছে সুনামগঞ্জ থেকে। সেই ছোট্ট নির্মল এখন যে কত বড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও একটা দুঃসংবাদ, নির্মলের বাবা আর নেই।"
শেষ কথাটা বেশ দুঃখী স্বরেই বলল ফাহিমা। প্রণয়া আর কিছুই বলল না। চুপচাপ শুনে গেছে। ফাহিমা দুপুরের খাবারটা প্রণয়ার হাত দিয়েই পাঠাল নির্মলদের ঘরে। প্রণয়া এই কাজে বেশ বিরক্ত হয়েছিল। তবে সে ঘরে গিয়ে দেখতে পেল জীর্ণশীর্ণ এক ভদ্রমহিলা সবে যোহরের নামাজ পড়ে জায়নামাজ ছেড়ে উঠছেন। উনি-ই বুঝি নীলুফা আন্টি?
নীলুফা বাহিরের দিকে নজর যেতেই প্রণয়াকে দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে শুকনো মুখে ফুটে ওঠে তার সুন্দর হাসি। তিনি ব্যস্ত গলায় বললেন,
--"তুমি বুঝি প্রণয়া? আসো আসো ভেতরে আসো!"
প্রণয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সালাম দিল নীলুফাকে। নীলুফা সালামের উত্তর দিয়ে প্রণয়াকে ভেতরে এনে বসিয়ে দিলেন। প্রণয়া ঢেকে রাখা বাটির খাবার নীলুফার দিকে বাড়িয়ে বলল,
--"মা পাঠিয়েছে!"
নীলুফা হাসি-মুখেই সে খাবার নিলেন। সঙ্গে বললেন,
--"এসবের কী প্রয়োজন ছিল?"
প্রণয়া কিছু বলল না। জোরপূর্বক শুধু হাসল। আলাপ-আলোচনায় প্রণয়া অপটু। তাই বেশিক্ষণ বসল না। কাজের ছুতোয় চলে আসল বাড়ি। বাড়ি এসে দেখল নুহাশ সাহেব এসেছেন। নুহাশ সাহেব মেয়েকে সামনে পেয়ে নির্মলের নামে প্রশংসার ঝুলি নিয়ে বসলেন। নির্মল নাকি প্রথম দিনেই বেশিরভাগ হিসাব ধরে ফেলে। কোথায় কী ত্রুটি আছে সেটাও মিলিয়েছে মোটামুটি। প্রথমদিন-ই নির্মলের কাজের প্রতি এত স্পৃহা দেখে নুহাশ সাহেব ভীষণ সন্তুষ্ট। শুধু অসহায় প্রণয়া সেসব নীরবে গিলে নিল।
প্লাবন স্কুল থেকে ফিরে খেলতে গিয়েছিল। খেলা থেকে ফিরে সেও গলায় উচ্ছাস ঢেলে বলল,
--"নির্মল ভাইয়া কত ভালো জানো আপু! আমাকে বাসায় পৌঁছেও দিল আবার দেখো চিপসও কিনে দিল। নির্মল ভাইয়াকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে!"
প্রণয়া এই পর্যায়ে এসে বিরক্ত হলো। একটা মানুষ এসেছে সবে। তাকে যাচাই-বাছাই না করেই তাকে নিয়ে এত লাফালাফির কারণ বুঝল না সে। প্লাবনের এত এত প্রশংসা শুনে ভাবল, নির্মল নামের লোকটা তো এত আহামরি কেউ নয়। তবে সবাই কেন সেই নির্দিষ্ট মানুষটার প্রশংসায় ব্যস্ত? কী এমন পানি পড়া খাইয়েছে এই লোক? কে এই নির্মল? প্রণয়া তাকে নিজ চোখে দেখতে চায়!
চলবে~~
#আকাশ_তীরে_আপন_সুর
|সূচনা পর্ব|
লাবিবা ওয়াহিদ
বিঃদ্রঃ প্লটটা হুট করে মাথায় আসল। তাই ভাবলাম লেখা যাবে। তবুও অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে এই লেখাটা শেষ করেছি। জানি না কেমন লাগবে আপনাদের কাছে। প্লিজ সকলে সাড়া দিবেন। গল্পটা ছোটো হবে। সর্বোচ্চ দশ থেকে বারো পর্বের মধ্যেই শেষ হবে। আপনাদের কেমন লেগেছে জানানোর অনুরোধ রইলো। গঠনমূলক মন্তব্যের প্রত্যাশায় রইলাম। আপনাদের মন্তব্য না পেলে আমি হতাশ হই চরম।
'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০২|
লাবিবা ওয়াহিদ
নির্মলের বাবা মারা যায় বেশিদিন হয়নি। প্রায় মাস তিনেক হবে হয়তো। নির্মলের একটি ছোটো বোন আছে। নাম তার নোভা। নোভা হঠাৎ-ই অন্যকারো হাত ধরে পালিয়ে গেল। পালিয়ে যাওয়ার পরপরই সুস্থ, সবল নির্মলের বাবা সম্মানহানির কারণে স্ট্রোক করলেন। স্ট্রোক করার পর শয্যাশায়ী ছিলেন প্রায় মাসখানেকের মতো।
নির্মলের বাবার বাজারে যেই দুটো দোকান ছিল তার একটা বিক্রি করে দিতে হয়েছিল, নির্মলের বাবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে। এরপর থেকে নির্মল-ই কোনো রকমে টেনে-টুনে সংসার চালাত। কিন্তু সেই বাবাও বেশিদিন টিকেনি।
মেয়ে এবং স্বামীর শোকে নীলুফাও অনেকটা ভেঙে পড়েন। লোকের বিষাক্ত, তিক্ত কথাবার্তাও তিনি সইতে পারছিলেন না। বাবা মারা যাওয়ার পর নির্মলও যেন কেমন হয়ে গেল। রোজ রোজ মাকে প্রতিবেশিদের তিক্ত প্রশ্নের অতলেও রাখতে পারছিল না। মোটকথা, সুনামগঞ্জ এবং প্রিয় মাতৃভূমি তাকে দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। এজন্য হঠাৎ-ই যোগাযোগ করল নুহাশ সাহেবের সাথে।
নুহাশ সাহেবের সঙ্গে নির্মলের বাবার বেশ ভালো বন্ধুত্ব ছিল। আবার এটাও বলা যায়, নির্মলের বাবাই নুহাশ সাহেবের ঘটকালি করেছিল ফাহিমার বিষয়ে। তাইতো বিপদের দিনে নুহাশ সাহেবকেই মনে পড়ল। নির্মল নুহাশ সাহেবকে কল করে বলেছিল,
--"আমার একটা চাকরির দরকার চাচা। আপনার হাতে কোনো চাকরি আছে?"
সেই মুহূর্তে নুহাশ সাহেবের কাছে সেরকম চাকরির খোঁজ ছিল না। পাহাড়ি এলাকার চা বাগানে থাকে নুহাশ সাহেব। সে তো আর নির্মলের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি দিতে পারবে না। তাই সেই মুহূর্তে অবশ্য দুঃখী মনেই নির্মলকে ফিরিয়ে দিতে হয়েছিল। নির্মলও কোনো রকম অভিযোগ করেনি। হাসি মুখে কল কেটেছে।
নুহাশ সাহেব সেদিন যেমন হতাশও হয়েছেন তেমনই নির্মলের সাবলীল, সুন্দর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছেন। তাইতো যখন নতুন ম্যানেজারের কথা ওঠল তখনই মাথায় নাড়া দিল নির্মলের ব্যাপার। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই যোগাযোগ করেন নির্মলের সাথে।
নুহাশ সাহেব অবশ্য এই ভেবে ভয় পেয়েছিলেন নির্মল অন্যত্র চাকরি পেলো নাকি? নির্মলের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবশ্য সেই ভয়, দ্বিধা কেটে গেছে। তার এই ভেবে আফসোস হচ্ছিল এতদিন যাবৎ বেকার ছেলেটাকে কোনো ভাবে সাহায্য করতে পারেনি। অর্থ সাহায্য করে নির্মলকে কখনোই নিচু দেখাতে চাননি নুহাশ সাহেব।
সন্ধ্যার পর নীলুফা ফাহিমার সঙ্গে বসে বিভিন্ন আলাপে ব্যস্ত। ফাহিমা যেমন নীলুফাকে পেয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এই বিশাল চা বাগানের মাঝে ফাহিমার গল্প করার মতো বিশেষ কেউ নেই। মেয়েটাও সেভাবে গল্প করে না, সারাদিন কেমন মুখ ভার করে রাখে যেন কতদিনের বিরহে ভুগছে। এ নিয়ে ফাহিমাও কম কথা শোনায় না প্রণয়াকে। কিন্তু তবুও প্রণয়ার মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়নি। তাই ফাহিমা হাল ছেড়ে দিয়েছেন। আর এমনিতেও মায়েদের মেয়ের সামনে জিভের নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়। তার বয়সী কথাবার্তা চাইলেও সব সময় মেয়ের সাথে বলা যায় না।
প্রণয়া সিঁড়িতে বসে আছে হাতে পাঠ্যবই নিয়ে। সিঁড়ির লাইটটা জ্বালানো নেই, প্রণয়াই বন্ধ করে দিয়েছে। সিঁড়িটা বাড়িতে ঢুকতেই ডানপাশে। কাঠের সিঁড়িতে আবার লম্বা করে কাঠের রেলিং। প্রণয়া মূলত নীলুফার প্রতি আগ্রহী। তাই দূরে বসেই মা এবং আন্টির আলাপ নীরবে শুনছে। বৈঠকঘরের আলো এতটাও তীক্ষ্ণ নয়, তাই সেই আলো সিঁড়ি অবধি পৌঁছাতে পারেনি।
প্রণয়া শুনল নীলুফাদের বাজে পরিস্থিতি। একে একে নোভার পালিয়ে যাওয়া, নির্মলের বাবার মৃ%ত্যু, নির্মলের কষ্ট করে সংসার চালনা সবকিছুই। প্রণয়া শুনে অবশ্য কিছুটা আহত হলো। না জানি কীভাবে কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে এখানে এসেছে।
নীলুফার শুকনো, ভাঙা মুখের মায়া টেনেছে প্রণয়াকে। মানুষটাকে সরল-ই লেগেছে প্রণয়ার। তবে সে এখনো মহান নির্মলকে চোখের দেখা দেখতে পারেনি। দুপুরে নাকি খেতে এসেছিল। প্রণয়া তখন কোথায় ছিল কে জানে?
--"এই আপু! তুমি এখানে চোরের মতো বসে আছ কেন?"
প্লাবনের আচমকা বলা কথায় প্রণয়া ঘাবড়ে গিয়ে পিছে ফিরে তাকায়। প্লাবনের গলার স্বর প্রয়োজনের চাইতে বেশি ছিল। ফলে ফাহিমা, নীলুফার কানেও সেই গলা পৌঁছায়। প্রণয়া তা বুঝতে পেরে রাগ দেখালো প্লাবনকে। ধমক দিয়ে বলল,
--"এভাবে ভূতের মতো পিছে এসে দাঁড়িয়েছিস ভালো কথা, মুখ এত চলে কেন তোর? আমাকে তোর কোন দিক দিয়ে চোর লাগে?"
প্লাবন মুখ চেপে হাসে বোনকে খেলাতে পেরে। ফাহিমা তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গলা উঁচিয়ে বলল,
--"এই, তোদের না পড়তে বসতে বললাম? তোরা এখানে কী করিস?"
প্রণয়া আবছা আলোয় পুণরায় প্লাবনকে গরম মেজাজ দেখিয়ে নেমে এলো। সভ্য, মাথায় কাপড় দেওয়া প্রণয়াকে দেখে নীলুফার মুখে হাসি ফুটল। প্রণয়া তার দিকে চেয়ে বিনয়ের সাথে হেসে বলল,
--"চা বানিয়ে দেই তোমাদের?"
ফাহিমার মুখটা শুকিয়ে গেল মেয়ের কথা শুনে। ইশ! কথায় কথায় নীলুফার সামনে নাস্তা দিতেই ভুলে গেছে। এজন্য মেয়েকে বাঁধা দিল না। প্রণয়া নীরবে চলে গেল রান্নাঘরে। পেছন থেকে ফাহিমার গলা শুনতে পেল,
--"প্রণয়ার হাতে চা বানানোর জাদু আছে। প্রতিদিন একবার হলেও ওর হাতের চা খেতে হয় আমার।"
.
রাত এখন বেশ গভীর। পুরো চা বাগানের অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। গভীর রাতে তো আরও গা ছমছমে পরিবেশ। তার ওপর ইলেক্ট্রিসিটি নেই। প্রণয়া গায়ে চাদর জড়িয়ে দরজার বাইরে বসে আছে। তাদের সদর দরজার সামনে ছাউনি দেওয়া। ছাউনির নিচে বেতের জোড়া সোফা এবং মাঝে একটি টি-টেবিল। প্রণয়া অবশ্য সেখানে বসেনি। সে সোজা মেঝেতেই বসল দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে।
গভীর রাতের গা ছমছমে এই পরিবেশে কারোই মূলত সাহস থাকার কথা নয়। তবুও প্রণয়া এই ভয় ভয় অনুভূতিতে সাময়িকের জন্য নিজের থেকে ছিন্ন করে এই দুঃসাহসিক কাজটা করল। সঙ্গে অবশ্য মোম আর একটি ম্যাছ রেখেছে। হাতে একটা লোহার চুড়িও পরেছে শুনেছে আগুন এবং লোহা সাথে থাকলে নাকি খারাপ নজর সহজে লাগে না। এছাড়া বের হওয়ার আগে আয়াতুল কুরসিও পড়তে ভুলেনি সে।
প্রণয়া ঠায় বসে রইলো সে স্থানে। আকাশে চাঁদ নেই, আশেপাশে আলোর চিহ্নও নেই। কারেন্ট আসলে ছাউনির নিচের হলদে বাতিটা জ্বলে উঠবে, যা সারা রাত বিরতিহীন জ্বলে। প্রণয়া কারেন্ট আসার অপেক্ষায় বসে রইলো। অপেক্ষা নীরব হলেও মস্তিষ্ক থেমে নেই। মস্তিষ্কে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরছে অসংখ্য ভাবনার মেলা। বেশি নাড়া দিচ্ছে নির্মলের ভাবনা। আজ পুরো দিনেও একবারের জন্যেও দেখেনি নির্মলকে। এখন নিশ্চয়ই মা ছেলে ঘুম। এই গভীর রাতে ঘুমাবে সেটাই স্বাভাবিক। বরং রাত জাগা পাখির মতো প্রণয়ার জেগে থাকাটা অস্বাভাবিক।
প্রণয়া মনোযোগ দিয়ে অবশ্য কোথাও চাইতে পারছে না। যখনই কোথাও একটু নজর স্থির করতে চাইছে তখনই ভয় নাড়া দিয়ে উঠছে বুকে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চা বাগানের মাঝে এভাবে বসে থাকা কোনো মেয়ের পক্ষে সম্ভব? সময় যত যেতে লাগল প্রণয়ার সাহসও ততটাই নিভে আসতে লাগল। তবুও প্রণয়া একই ভাবে বসে রইলো।
হঠাৎ শুকনো পাতায় কারো হাঁটার শব্দ পেল। মুহূর্তে-ই প্রণয়া থমকে যায়। সামনে চাইতেই দেখল অদূরে আলোর মৃদু উৎস। সেটা দেখে প্রণয়া ভয়ে জমে গেল। নড়াচড়ার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলল। মৃদু আলোটা ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল। যত আলোটা এগোচ্ছে তত প্রণয়া অনুভব করছে তার কপালে ঘাম জমেছে।
ওদের কাঠের সাদা-মাটা গেটটার কাছে আলোটা আসতে আসতে হঠাৎ নিভে গেল। আলো নিভলেও অদৃশ্য তাণ্ডব থামল না। কাঠের দরজার এক নিজস্ব শব্দে সেই দরজা খুললও আবার লাগালও। সঙ্গে শোনাল সেই একই পায়ের শব্দ। প্রণয়ার তখন গলা শুকিয়ে কাঠ কাঠ। ভয়ে কথা বলার শক্তিও খুইয়ে বসেছে সে। কাউকে ডাকার সাহস অবধি পাচ্ছে না। যে-ই পায়ের শব্দটা প্রণয়ার কাছাকাছি এলো ওমনি ধপাস করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনে প্রণয়ার প্রাণ-ভোমরা একদম যায় যায় অবস্থা।
ঠিক তখনই কারেন্ট এলো। কিছু স্থান জুড়ে হলদে আলো বিস্তৃত হলো। প্রণয়া দেখতে পেল কালো পোশাকধারী এক লোক উঠানে বসে রয়েছে। আলোর সঙ্গে সঙ্গে প্রণয়া যেন তার বাকশক্তি ফিরে পেল। মুহূর্তে-ই নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ক্রমাগত চেঁচিয়ে বলল,
--"চোর, চোর, চোর!!"
#আকাশ_তীরে_আপন_সুর
চলবে~~
বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম প্রিয় পাঠকমহল।
সুন্দরীতমা প্রি-অর্ডার করেছেন তো?❤️'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৩|
লাবিবা ওয়াহিদ
প্রণয়ার চোখ-মুখে একরাশ লাজের বিচরণ। মুখ ছোটো করে নুহাশ সাহেবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। নুহাশ সাহেব ফোলা চোখে মেয়ের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নির্মলের কাছে আবারও দুঃখিত বলল। নির্মল একপলক প্রণয়ার পানে তো আরেক পলক নুহাশ সাহেবের দিকে তাকাচ্ছে। নির্মল এবার অধর নাড়িয়ে বলল,
--"প্লিজ চাচা, বারবার সরি বলে আমাকে লজ্জিত করবেন না। উনি ছোটো মানুষ, ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক।"
প্রণয়া কোণা চোখে নির্মলের দিকে তাকাল। প্রণয়ার নির্মলকে বলতে ইচ্ছা করল, "আমি মোটেও ছোটো মানুষ নই।"
কিন্তু বাবার সামনে বলার সাহস পেল না।
তখন প্রণয়ার চিৎকার শুনে নুহাশ সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়, সঙ্গে ফাহিমারও। মেয়ের এমন চিৎকারে দুজনই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দ্রুত পায়ে সব লাইট জ্বালিয়ে বাইরে আসতেই দেখল উঠোনে নির্মল দাঁড়িয়ে আছে আর প্রণয়া বসা ছেড়ে উঠে ভেতরে আসতে নিচ্ছিল। নুহাশ সাহেবকে দেখে প্রণয়া যেম প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। তর্জনী তুলে বাহিরে ইশারা করে বারবার বলছিল,
--"বাইরে কালো পোশাকধারী চোর এসেছে বাবা।"
নির্মল তখন ডেকে বলল,
--"আমি চোর নই চাচা। আমি নির্মল!"
নির্মলের নাম শুনে প্রণয়া দমে যায়। পিছে ঘুরে হলদে আলোয় চট করে দেখে নেয় নির্মলকে। পরমুহূর্তেই নির্মলকে চোর ভেবে কী ধরণের বোকামী করেছে ভাবতেই প্রণয়ার মুখ ছোটো হয়ে যায়। নুহাশ সাহেব প্রণয়াকে বেশ বকল এত রাতে বাইরে বসে থাকার জন্য। কে বলেছিল এই গভীর রাতে বাইরে এসে বসতে? ঘটল তো এখন অঘটন? নির্মলের সামনে বাবার বকা খেয়ে প্রণয়া আরও লজ্জায় কাবু হয়ে পড়ে। তাইতো নির্মল কয়েকবার বারণ করল নুহাশ সাহেবকে। নুহাশ সাহেব ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
--"তুমি এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে নির্মল?"
--"কারেন্ট চলে যাওয়ার পর ঘুম আসছিল না চাচা। এছাড়াও রাতের বেলা চা বাগান ঘোরার আলাদা শখ ছিল অনেকদিনের। এজন্যে কিছুক্ষণের জন্যে ঘুরে চলে আসি!"
বলেই নির্মল থামে। একপলক প্রণয়ার দিকে চেয়ে আবার বলল,
--"বাড়ির কাঠের গেটটা অবধি আসতেই ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গেল। তাই অন্ধকারে হাতড়ে কিছু দূর এগিয়ে আসতেই কারেন্টের তার প্যাঁচিয়ে পড়ে গেলাম।"
নুহাশ সাহেব উঠোনের মাঝে তারের গোছা দেখে বেশ রাগ করল। আপনমনে বললেন,
--"এগুলো না আমি মজিবকে পাশে সরিয়ে রাখতে বলেছিলাম? এই গাধার জ্ঞান হবে কবে?"
পরক্ষণেই নুহাশ সাহেব আবার বললেন,
--"ঠিক আছে নির্মল, তুমি তবে ঘরে যাও। রাত-বিরেতে অনেক বিরক্ত করে ফেলেছি।"
নির্মল আলতো হেসে বলল,
--"না, না আঙ্কেল। সেরকম কিছু না!"
নুহাশ সাহেব এবার প্রণয়ার দিকে চেয়ে তাকে ভেতরে যেতে বলল। সকলে মিলে ভেতরে প্রবেশ করলেও প্রণয়া আবার ফিরে এলো। নির্মলকে পিছুডাক দিল সে।
--"এই যে শুনুন!"
মেয়েলি ডাকে নির্মল থমকে পিছে ফিরে দাঁড়ায়। হলদে বাতির আলোটা প্রণয়ার মুখশ্রীতে এসে পড়েছে। প্রণয়া তার কপালে পড়া চুল কানে গুঁজতেই নির্মল বলল,
--"জি?"
--"রাতের বেলা ঘুরতে বের হন ভালো কথা, তবে কালো পোশাক পড়ে বের হবেন না। কালো পোশাক দিনে যেমন সুন্দর রাতে তেমনই ভয়ংকর!"
নির্মল কিছুটা শব্দের সাথে হাসল। প্রণয়া আবছা আলোয় প্রথমবারের মতো আপাদমস্তক নির্মলকে লক্ষ করল। নির্মলের শ্যামলা মুখের নকশা, মুখ জুড়ে থাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি, বাতাসে মৃদু দুলে ওঠা চুল সবই দেখল। এও ভাবল, নির্মল তার থেকে হাইটে কত বড়ো হতে পারে? কাছাকাছি দাঁড়ালে হয়তো ধারণা নিতে পারবে। তবে এটুকু বোঝা যাচ্ছে নির্মল বেশ লম্বা। মোটকথা হচ্ছে, নির্মল এক দেখায় একজন সুপুরুষ।
নির্মল হাসি থামিয়ে বলল,
--"ঠিক আছে, আপনার কথা মাথায় থাকবে৷ এখন গিয়ে ঘুমান। আমি আসছি!"
বলেই নির্মল যেতে নিলে প্রণয়া আবার থামিয়ে দিলে বলল,
--"আরেকটা কথা!"
নির্মল জিজ্ঞাসু চোখে চাইলে প্রণয়া আবার বলল,
--"আমি ছোটো নই!"
নির্মল অধর বাঁকিয়ে হেসে বলল,
--"এটাও মনে রাখার চেষ্টা করব।"
নির্মল চলে গেল। কিন্তু প্রণয়া ঠায় একই স্থানে দাঁড়িয়ে রইল আনমনে। হঠাৎ পেছন থেকে ফাহিমা প্রণয়ার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন,
--"এই, ভূতে ধরেছে নাকি? এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা ঘরে। আমি দরজা লাগিয়ে শুতে যাব!"
প্রণয়া চমকে মায়ের দিকে চেয়ে আবার উঠোনে তাকাল। যেই স্থানে নির্মল দাঁড়িয়ে কথা বলেছে সেই স্থানেই তার চোখ জোড়া থমকে।
--"চলো আম্মা।"
প্রণয়া রুমে এসে কাঁথা গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখে ঘুম ধরা দেওয়ার অপেক্ষায় আছে সে। ততক্ষণে নিশ্চুপে তাকিয়ে রইল সিলিং-এর দিকে। কেমন ঘটঘট শব্দের সাথে সিলিং ফ্যানটা চলছে। আচমকা প্রণয়া বুকের বা পাশটায় হাত দিল। দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে যেন সেথায়। কিন্তু কেন? এই কেন-র কোনো উত্তর মিলল না প্রণয়ার। চোখে ভাসছে আবছা নির্মলকে। প্রণয়া নিজের প্রতি বিরক্ত হয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে চোখ বুজল।
পরেরদিন ঘুম থেকে উঠে প্রণয়া সর্বপ্রথম রান্নাঘরে গেল। ফাহিমা ততক্ষণে দ্রুত হাতে নাস্তা তৈরি করছে। প্রণয়া রুটির দিকে তাকাতেই দেখল রুটির সংখ্যা নিত্যদিনের চাইতে কিছুটা বেশি। তা দেখে প্রণয়া ভ্রু কুচকে বলল,
--"কেউ আসবে নাকি?"
প্রণয়ার কথা শুনে ফাহিমা শক্ত চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে বললেন, "তুই গতকাল যা কীর্তি করেছিস তাতে কারো না এসে উপায় আছে?"
ফাহিমা থেমে আবার বললেন,
--"তোর বাবা নির্মলকে এবং ভাবীকে নাস্তার দাওয়াত দিয়েছে। ওরাই আসবে।"
এ কথা শুনে প্রণয়া হঠাৎ বলল, "তাহলে আমাকে নাস্তা আগে আগেই দিয়ে দাও। আমি খেয়ে উঠে যাই।"
প্রণয়ার প্রস্তাবে ফাহিমা নাকোচ করল না। শুধু বলল, "নিজের প্রয়োজন মতো পরোটা আর তরকারি নিয়ে বোস টেবিলে।"
প্রণয়ার খাওয়া যখন মাঝপথে তখনই হঠাৎ প্রবেশ করল নুহাশ সাহেব এবং নির্মল। তাদের দেখে প্রণয়ার খাওয়া থেমে যায়। চটজলদি ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে নেয়। ততক্ষণে নুহাশ সাহেব এবং নির্মল কথা বলতে বলতে খাবার টেবিলে এসে বসেছে। নির্মল প্রথম ইতঃস্তত হয়েছিল প্রণয়ার সাথে টেবিলে বসতে। নুহাশ সাহেব সেসব ইতঃস্ততার ধার ধারলেন না অবশ্য।
প্রণয়া প্লেট নিয়ে উঠে যেতে নিচ্ছিল, তখন নুহাশ সাহেব তাকে থামিয়ে বললেন, "খাওয়ার মাঝপথে উঠতে নেই। শেষ করো খাবার।"
অগত্যা, প্রণয়া না চাইতেও বসে পড়ল। ফাহিমাও দ্রুত হাতে নুহাশ সাহেবদের খাবার নিয়ে আসলেন। ফাহিমা নীলুফাকে না দেখে নির্মলকে তার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে নির্মল বলল, "মা একটু পরে আসবে চাচী। কী যেন গোছাচ্ছে।"
প্রণয়া খেতে শুরু করলেও মাথা উঠিয়ে, স্বাভাবিক ভাবে খাচ্ছে না। চোরের মতো করে রুটির অংশ মুখে পুরছে সে। যেন নির্মল প্রণয়ার খাওয়ার দিকেই চেয়ে থাকবে। তবে এরকম কিছুই হলো না। প্রণয়া যতবারই নির্মলের দিকে আড়চোখে তাকিয়েছে ততবারই নির্মলকে হয় একমনে খেতে দেখেছে নয়তো তার বাবার দিকে তাকাতে দেখেছে। এতে প্রণয়া কিছুটা স্বস্তি পায়।
আজ নির্মলের চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। যা প্রণয়া দেখে ভাবছিল, "এত কম বয়সে চোখের সমস্যা বাঁধিয়ে ফেলেছে নাকি?"
নুহাশ সাহেব হঠাৎ নির্মলকে প্রশ্ন করলেন,
--"আমি ডাকার আগে কোনো চাকরিতে ঢুকেছিলে নাকি?"
--"হ্যাঁ আঙ্কেল। একটা বেসরকারি স্কুলে চাকরি পেয়েছিলাম!"
--"তাহলে তো ভালোই ছিল। খামাখা আমার ডাকে চলে আসলে। সেখানেই তো একটা ব্যবস্থা হতে পারত।"
নির্মল উত্তরে কিছু না বললেও চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পরমুহূর্তে শুকনো হেসে বলল,
--"চাইলে ভালো ব্যবস্থা সম্ভব ছিল, কিন্তু আমি চাইছিলাম না মাকে কেউ কটু কথা বলুক। আমি এমন একটি জায়গা খুঁজছিলাম যেখানে কেউ আমার ছোটোবোনের অন্যায়ের জন্য আমার মাকে কথা শোনাবে। জানেন তো চাচা, মানুষদের তিক্ত কথা ধারালো অস্ত্রের মতো অপরজনকে আঘাত করে।"
এই পর্যায়ে নু্হাশ সাহেব নীরব হয়ে গেলেন৷ ফাহিমা রান্নাঘর থেকে সব শুনলেন। খুব মায়া হচ্ছে তাঁর নির্মলের প্রতি। নুহাশ সাহেব প্রসঙ্গ বদলে বললেন,
--"যাক, তুমি যেহেতু স্কুল টিচার ছিলে চাইলে প্লাবনকে পড়াতে পারবে। আমার ছেলে এতটা চঞ্চল হয়েছে যে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।"
নির্মল হাসল। বলল, "নিয়ন্ত্রণেই আছে চাচা, আপনি বোধহয় ওকে নিয়ে বেশি চিন্তিত।"
প্রণয়ার ততক্ষণে খাওয়া শেষ। সে প্লেট নিয়ে উঠে যায়। আড়চোখে একবারের জন্য নির্মলকে পরখ করতে ভুলেনি।
এখন বিকাল। বিকালের কমলা আলো প্রণয়ার মুখে এসে পড়েছে। সে এই আবেশী রোদ নীরবে গায়ে মাখিয়ে ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে। নজর স্থির অবশ্য উঠোনে। উঠোনে কিছু পর্যটক এসেছে। তাদের সাথেই মজিব দাঁড়িয়ে।
বাড়িতে নুহাশ সাহেব না থাকলেও মজিব সারাদিন বাড়িতেই থাকে। বাড়ির পরিচর্যা, বাইরে থেকে কে আসছে কেন আসছে সেসব নজরে রাখা। যতই হোক চা বাগানের মাঝে দুজন মেয়ে মানুষ একা বাড়িতে থাকছে, এই বিষয়টা নুহাশ সাহেব মানতে পারতেন না। এজন্য একদিন কোথা থেকে মজিবকে ধরে আনল। মজিবের বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি। তার গ্রামও বেশ দূরে। মাসে দুদিন ছুটি পায় পরিবারকে চোখের দেখায় দেখে আসার জন্য। স্বভাবসুলভ মজিব কিছুটা সরল। কিছু সরল মানুষকে "বোকা" বলা হয়। মজিব সেই বোকা শ্রেণির সরল। কাজে ভুল করাও তার অন্যতম স্বভাবের মধ্যে পড়ে। নুহাশ সাহেব তার কাজে খুশি হয়েছেন এমনটা খুব কম চোখে পড়েছে। তবে সবকিছুর মাঝে তার একটি বিশেষ গুণ রয়েছে। তিনি দারুণ তর্ক করতে জানেন। কেউ যদি কখনো তার সাথে লাগতে আসে, তিনি সিলেটি ভাষায় সেই মানুষটাকে একদম ধুঁয়ে দেয়। তর্ক করতে পারা মানুষ কীভাবে বোকা হতে পারে প্রণয়ার বুঝে আসে না। তবুও এই বোকা-সোকা মজিব আঙ্কেল যখন দুদিনের জন্য গ্রামে যায়, তখন পুরো চা বিলাস কেমন শূন্য শূন্য লাগে। যেন গুরুত্বপূর্ণ একজনের অস্তিত্ব নেই।
এই মুহূর্তে মজিব নিজেই পর্যটকদের বাড়ি সম্পর্কে টুকটাক বলছেন, তারা যখন ছবি তুলছে মজিব একপাশে দাঁড়িয়ে দেখছেন। পর্যটক আসলেও তাদের বাড়ির ভেতর প্রবেশ নিষেধ। নয়তো কতজন যে ব্যাকুল চোখে ঝুল বারান্দায় চেয়েছিল তার হিসেব নেই। আজও একই ঘটনা ঘটল। একজন পর্যটক ঝুল বারান্দা দেখে বেশ কয়েকবার অনুরোধ করল উপরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মজিবের গলা দিয়ে "না, অনুমতি নেই!" ব্যতীত আর কোনো শব্দই আসছে না। প্রণয়া অবশ্য সরে গিয়েছিল তাদের উপরে তাকানোর আগেই।
সন্ধ্যার সময় প্রণয়া আবারও একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। পর্যটক'রা ততক্ষণে চলে গিয়েছে। প্রণয়া একমনে সবুজ চা বাগানে চোখ বুলালো। সন্ধ্যা হওয়ার আগ মুহূর্তে এই বাগান কতটা স্নিগ্ধ লাগছে। যতই দেখুক না কেন প্রাণ জুড়াতে চায় না। কাঠের গেট খোলার শব্দ শুনে প্রণয়া চট করে নিচে তাকাল। প্রণয়া দেখল নির্মল হাতে কিছু খাতা-পত্র নিয়ে চা বিলাসে প্রবেশ করছে। প্রণয়া নিজের অজান্তেই চেয়ে রইলো এক মনে। নির্মলের আশেপাশে খেয়াল নেই। সে নিজ খেয়ালে হিসাব-নিকাশের বিস্তর ব্যস্ত। খাতায় চোখ বুলাতে বুলাতেই বাম পাশের পথ দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে চলে গেল। তাকে ঘরে ফিরতে দেখে প্রণয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ আগেই না দেখল নীলুফাকে তাদের ঘরে আসতে? অবশ্য প্রণয়ার ভাবনার মাঝেই নির্মল আবার বেরিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার হাত জোড়ায় কোনো খাতা-পত্র ছিল না। তবে প্রণয়ার মনে এক প্রশ্ন হানা দিল। "বাবার পছন্দের পাত্র এই সন্ধ্যাবেলায় কোথায় যাচ্ছে?"
#আকাশ_তীরে_আপন_সুর
চলবে~~
বিঃদ্রঃ আমি অত্যন্ত দুঃখিত। কটা দিন বইয়ের কাজে ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম, লেখার সুযোগই হয়নি একপ্রকার বলতে গেলে। গল্পটা ছোটো হলেও এটা আমার পছন্দের প্লট। আশা রাখছি আমার পছন্দ আপনাদেরও পুলোকিত করবে। যেহেতু পছন্দের প্লট, সেহেতু অনুপ্রেরণার জন্য কিন্তু আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য চাই কিন্তু। নয়তো মনমরা হয়ে যাব। ভালোবাসা নিবেন, আপনাদের গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় আছি।'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৪|
লাবিবা ওয়াহিদ
কিছুদিন পেরোতেই প্লাবন আবার বায়না ধরল সে মামার বাড়ি যাবে। এ বিষয় নুহাশ সাহেবের কানে যেতেই তিনি কিছুটা রাগ করলেন। বারবার বেড়াতে যাওয়ার আবদার করলে পড়াশোনা উচ্ছন্নে যাবে। প্রণয়া কখনো এই ধরণের আবদার করেনি, সে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী ছিল সবসময়। ভালো রেজাল্টও করত। কিন্তু ছোটো ছেলে যে কার মতো হয়েছে কে জানে?
নুহাশ সাহেব প্লাবনকে ঘরে বাঁধতেই মূলত নির্মলকে তার প্রাইভেট টিচার হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিল। প্রণয়া অবশ্য জানে প্লাবন প্রাইভেট কিংবা বাসায় টিচার রাখা একদম পছন্দ করে না। সে বরাবরই এই ব্যাপারটায় নাক সিটকায়৷ এছাড়া এখানে চা বাগানের মাঝের কোনো বাড়িতে প্রাইভেট টিচার রাখা সম্ভব নয়। এজন্য কখনো নুহাশ সাহেব সে চিন্তা করেননি। কিন্তু এবার নির্মল কাছেই থাকায় সেই সুযোগ পেল।
অবশ্য প্রণয়ার চিন্তায় জল ঢেলে প্লাবন হাসিমুখে পড়তে রাজি হয়ে গেল। যা দেখে প্রণয়া হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে। সামান্য ক'টা চিপস, বিস্কুট খাইয়েছে বলে নির্মলকে টিচার হিসেবে মেনে নিলো সে? কেমনে সম্ভব?
প্লাবন প্রণয়াকে আরও চমকে দিয়ে নিজের এলোমেলো বই-খাতা গুছাতে শুরু করে দেয়। আগামীকাল থেকে নির্মল তাকে পড়াতে আসবে। আর আজ রাতে সে গোছানোতে হাত দিয়েছে, যেই দৃশ্য প্লাবনের বেলায় বিরল। প্লাবন হঠাৎ ভাবনায় ডুবে যাওয়া প্রণয়াকে টেনে বাস্তবে ফেরালো। প্রণয়া পলক ফেলে প্লাবনের দিকে চাইতেই প্লাবন বলল,
--"আপু, আমার ইংরেজি খাতাটা পাচ্ছি না। খুঁজে দাও না।"
প্রণয়া অস্ফুট স্বরে বলল,
--"বই-খাতার সাথেই আছে। ভালো করে খুঁজ!"
প্রণয়ার কথা শুনে প্লাবন আবার খুঁজল। পেয়েও গেল কিছু সময়ের মধ্যে। প্রণয়া হঠাৎ বলল,
--"এই, তুই কী সন্ধ্যার সময় বা রাতে বের হয়েছিস?"
প্রণয়ার কথায় প্লাবন তার কাজ থামিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায়।
--"কী বলছ তুমি আপু?"
--"নির্ঘাত তোর ঘাড়ে জিন চেপেছে প্লাবন, নয়তো তুই এসব অস্বাভাবিক কাজ করছিস কীভাবে? মাকে বলব হুজুর ডাকাতে?"
প্লাবন জোরে নিঃশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল,
--"তোমরাও না আপু, পড়তে বসলেও সমস্যা না বসলেও সমস্যা। তোমাদের এত সমস্যা কেন আমার পড়ালেখা নিয়ে?"
উত্তর নেই প্রণয়ার কাছে। ফাঁকিবাজ ছেলে হঠাৎ পড়াশোনায় ধ্যান দিচ্ছে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগাটাই স্বাভাবিক। আর এই ফাঁকিবাজটা নাকি নির্মলের সংস্পর্শে এসে এরকম পড়ছে? অবিশ্বাস্য! প্রণয়ার শুরু থেকেই মনে হতো নির্মল জাদুটোনা জানে। নয়তো যে-ই তার সংস্পর্শে যাচ্ছে সেই কেন ওই মানুষটার ভক্ত হয়ে যাবে?
প্রণয়ার বরাবরের মতোই জিন, ভূতের গল্প পছন্দ। প্রায়ই ফোনে ভূত এফএম রেডিয়োতে ছেড়ে রাখে। এবং কানে হেডফোন গুঁজে নীরবে সে সকল গায়ে কাঁটা দেওয়া কাহিনী শুনে। ভয়ে তটস্থ হলেও প্রণয়ার এগুলোই ভালো লাগে। অবসরে যখন একা বসে আকাশ দেখে, তখন চট করে কোনো এক নির্দিষ্ট জিনের কাহিনী তার মাথায় ঘুরপাক খায়৷ আর প্রণয়া শুরু থেকে শেষ অবধি সেই কাহিনীতে বিচরণ করে, আপন মনেই সেই কাহিনীর চরিত্রদের আগে পরে অবস্থান নিয়ে বলত। যেমন- এই চরিত্রের এটা করা উচিত হয়নি, ওভাবে চাইলেও এসব ঘটতে পারত ইত্যাদি। তাই তার কথায় জিন কিংবা জাদুটোনা শব্দগুলো প্রায়ই শোনা যায়। প্রণয়ার যেন নেশা এসব শোনা। তার অবস্থা এমন যে, সে সারা রাত না ঘুমিয়ে থাকতে পারবে তবুও এগুলো শোনা ছাড়তে পারবে না। সে যতই ভয় পাক না কেন, শক্ত হয়ে শুনবেই।
*******
আবছা আলোয় কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। প্রণয়া সবে ব্রাশ করে বেরিয়েছে উঠোনে। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। তার প্রায় রোজকার-ই অভ্যাস উঠোনে দাঁড়িয়ে একনজরে চা বাগান দেখা। কুয়াশা এবং চায়ের খুঁনসুটিগুলো ইদানীং বেশ টানছে তাকে।
অবশ্য প্রতিদিন এই চা বাগান দেখতে দেখতে বিরক্ত কিংবা একঘেয়ে হওয়ার কথা। প্রণয়ার একঘেয়েমি আসেও, তবে সেটা ক্ষণস্থায়ী। কয়েক দিনেই সেই একঘেয়েমি দূর হয়ে যায়। চা বাগান যেন প্রায়ই তাদের নিজেদের রূপ বদলায়। যা সাধারণ নজরে না এলেও প্রণয়া ঠিক বুঝতে পারে তাদের পরিবর্তন। হয়তো চায়ের বিশাল সম্রাজ্যও জানে, প্রণয়া নামের এক ফুল যে কি না তাদের সঙ্গে বসবাস করছে এবং সে চায়ের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে!
এই চা বাগানের সঙ্গে প্রণয়ার যেন অদৃশ্য নিবিড় সম্পর্ক হয়ে গিয়েছে। মানুষের সাথেও বুঝি উদ্ভিদদের এই অদৃশ্য সম্পর্ক সম্ভব? কেন নয়, নির্দিষ্ট মানুষটার মায়া এবং যত্নের মাধ্যমেই তো একটি উদ্ভিত বেড়ে ওঠে এবং তার সর্বাচ্চ ফলনটা তার মালিককে দেয়। তবে এখানে একা প্রণয়ার সাথে শুধু একটি গাছ নয়, অসংখ্য বিস্তৃত চা বাগান যেন প্রণয়ার বন্ধু হয়ে উঠেছে। প্রণয়া চায়ে চুমুক দিয়ে আপনমনে বলল,
--"চা বিলাস।"
--"শুভ সকাল।"
আচমকা পুরুষালি কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছাতেই প্রণয়া চমকে পিছে ফিরে তাকাল। নির্মল দাঁড়িয়ে আছে তার থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে। প্রণয়া চোখের দেখায় পরখ করে নিল নির্মলকে। একটা টাউজার এবং শার্ট পরেছে সে। আজ আবারও সেই কালো শার্ট। শার্টের হাতা কনুই অবধি গুটানো। বুকের দিকে একটা বোতাম খোলা। প্রণয়ার বলতে ইচ্ছে করল, "আপনার শীত করছে না?"
কিন্তু প্রণয়া মুখে সেরকম কিছু বলল না। নির্মলের কথার পিঠে মৃদু গলায় বলল, "শুভ সকাল।"
--"চাচা বাসায়?"
প্রণয়া ঘাড় নাড়িয়ে বোঝাল, 'না।'
নির্মলও যেন সহসা বুঝে নিল প্রণয়াকে। সে চট করে টাউজারের পকেট থেকে ফোন বের করে বলল,
--"আচ্ছা, ঠিক আছে।"
প্রণয়ার একবার নির্মলকে বলতে ইচ্ছে করল বাসায় যেতে। কিন্তু নির্মল অধর প্রসারিত করে প্রণয়াকে বলল,
--"আসছি।"
বলেই সে বিদায় নিয়ে চলে গেল। প্রণয়া একমনে চেয়ে রইলো নির্মলের যাওয়ার পানে। হঠাৎ পলক ফেলে প্রণয়া নিজের দিকে তাকাল। তার গায়ে একটি শাল। আর সেখানে নির্মল এভাবে খোলামেলা পোশাকে বেরিয়ে গেল?
পাহাড়ে প্রায়ই শীত থাকে। নির্মল কী তা জানে না, নাকি ইচ্ছাকৃত শীতের পোশাক এড়িয়ে গেল? প্রণয়া হঠাৎ-ই উপলব্ধি করল এই নির্মল নামের স্বল্প চেনা মানুষটাকে নিয়ে প্রণয়া একমনে ভেবে যাচ্ছে। চটজলদি প্রণয়া নির্মলের ভাবনা বাদ দিল।
খাবার টেবিলে স্ব-পরিবারে নাশতা করতে বসেছে প্রণয়া। আজ সে কলেজ যাবে। তাই একদম তৈরি হয়েই বসেছে। প্লাবনও একদম তৈরি স্কুলের জন্য। প্লাবন অবশ্য আজ স্কুল যেতে চায়নি, গাঁইগুঁই করছিল। কিন্তু ফাহিমার ধমকে প্লাবন মুখ ভার করে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এখনো মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে মন খারাপ করে আছে।
নুহাশ সাহেব খাওয়ার মাঝে নিজেই বললেন,
--"নির্মল গেল শহরের দিকে, মায়ের জন্য নতুন শীতের কাপড় আনার জন্য। সে বুঝতে পারেনি পাহাড়ি অঞ্চলে এরকম শীতল আবহাওয়া। এছাড়া আমারও বলতে মনে ছিল না।"
প্রণয়া চুপ করে শুনল বাবার কথা। ফাহিমা বলল, "ছেলেটা আসলেই লক্ষী। নীলু আপা ভাগ্য করে এমন সন্তান পাইছে।"
প্লাবন এবার মায়ের কথায় ফোড়ন কেটে বলল,
--"আমিও তো লক্ষী। শুধু তোমরা আমার লক্ষী ভাবটা চোখে দেখো না।"
মাগরিবের আযানের পরপরই নির্মল আসল প্লাবনকে পড়াতে। নির্মল তাকে পড়াতে বসল প্লাবনের পড়ার ঘরেই। প্রণয়া তখনো ঝুল বারান্দায় ছিল। উঠোনের আবছা আলোয় নির্মলকে বাড়িতে আসতে দেখেছে সে।
সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে সে নিচে চলে আসল। নিচে আসতেই ফাহিমা তাকে কাজে জড়িয়ে দিয়ে বলল,
--"আমি একটু তোর নীলু চাচীর কাছে যাচ্ছি। তুই কষ্ট করে নির্মলকে চা এবং নাশতা দিয়ে আসিস। না জানি নীলু আপা একা একা কী করছেন।"
ফাহিমার মুখ জুড়ে চিন্তার রেশ। প্রণয়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু সেই সুযোগ হলো না। তার আগেই ফাহিমা গায়ে শাল জড়িয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। প্রণয়া থমকে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানেই কিছুক্ষণ। হঠাৎ উপর থেকে শোনা গেল প্লাবনের হাসির শব্দ। সে কিছু একটা বলছে এবং হাসছে। নির্মলের গলা অবশ্য শোনা যাচ্ছে না।
প্রণয়া ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। চা বানিয়ে দিয়ে গেছে ফাহিমা। অতটা ঠান্ডা হয়নি। তাই কাপে চা ঢেলে সাথে আরেক প্লেটে বিস্কুট নিয়ে উপরে চলে গেল।
পড়ার ঘরের মুখে আসতেই দেখল প্লাবন মুখস্থ পড়া বলার চেষ্টা করছে নির্মলকে। হাত নাড়িয়ে, বৃদ্ধাঙ্গুল মুঠোতে চেপে, কনিষ্ঠ আঙুলে চোখের কোণ খুঁচিয়ে নানান ভঙ্গিতে মুখস্থ বলছে। বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবার আটকিয়েছে তার।
প্রণয়া দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করল। মনোযোগ দিয়ে দেখল ভাই এবং নির্মলকে। নির্মলের সমস্ত মনোযোগ যেন প্লাবনের উপর। আর প্রণয়ার বোধহয় নির্মলের উপর। নির্মলের বাম পাশটা দেখা যাচ্ছে। প্লাবনের মুখস্থ বলা শেষে নির্মল তাকে কিছুটা ভুল ধরিয়ে দিতেই নির্মল পরপর দু'বার হাঁচি দিয়ে উঠল। তখনই হুঁশ ফিরল প্রণয়ার। চোখের পলক ফেলে সে হাতে থাকা চায়ের দিকে তাকাল। চায়ের নিস্তব্ধতাই যেন প্রমাণ দিচ্ছে চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু নির্মল যেভাবে হাঁচি দিয়েছে তাতে করে তাকে ঠান্ডা চা খাওয়ানো যাবে না। তার চাইতেও বড়ো বিষয় সম্মানেরও একটা ব্যাপার আছে। প্রণয়া এই প্রথম নির্মলকে চা সার্ভ করবে, আর প্রথমবারেই ঠান্ডা হলে নাক থাকবে? প্রণয়া চট করে ট্রে-টা দরজার পাশে মেঝেতে রেখে ঠান্ডা চা এক চুমুকে শেষ করে ফেলল। অরঃপর চায়ের কাপ নিয়ে ছুটল নতুন করে চা আনতে। নতুন করে চা এনে ট্রে হাতে প্রণয়া ঘরে প্রবেশ করল।
ঘরে কারো উপস্থিতি টের পেতেই নির্মল, প্লাবন দরজার দিকে তাকাল। প্রণয়া চট করে অনুভব করল তার মাথায় জড়ানো ওড়নাটা মাথায় নেই। ছোটাছুটির দরুণ সেটা ঘাড়ে গিয়ে ঠেকেছে। ট্রে-তেও হাত বন্দি, আবার চাইলেও উলটো পথে ঘর ছেড়ে বের হতে পারবে না। বের হওয়াটা দৃষ্টিকটু। উপায়হীন প্রণয়া চোখ তুলে নির্মলের পানে তাকাতেই চোখা-চোখি হয়ে গেল।
প্রণয়ার ভেতরটা আকস্মিক ধুকপুক করতে লাগল। কেমন যেন অস্থির, শক্ত ভাবও তাকে ঘিরে ধরল। নির্মল চোখ সরিয়ে নিলেও প্রণয়ার অস্বস্তি ভাব কাটল না। সে টেবিলে নাশতা রেখে মিনমিন করে নির্মলের উদ্দেশে বলল,
--"আপনার জন্য নাশতা!"
নির্মল মাথা উঁচিয়ে প্রণয়ার দিকে তাকাল। প্রণয়া ট্রে টেবিলে রেখে এক ফাঁকে ওড়নাটা মাথায় জড়িয়ে নিয়েছিল। নির্মল হাসি বজায় রেখে বলল,
--"এসবের কী প্রয়োজন ছিল?"
--"প্রয়োজনের কথা বলে লজ্জা দিবেন না। আপনি মাস্টার সাহেব, মাস্টারদের যত্ন করতে হয়।"
প্রণয়া আর কিছু বলল না। নির্মলকেও কিছু বলার সুযোগ না গিয়ে চটপট পায়ে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নির্মল প্লাবনকে পড়ানো শেষ করে প্রণয়াদের বাড়ি থেকে বের হতেই চৌকাঠ থেকে সুরেলা কণ্ঠের ডাক কানে এলো। নির্মল পিছে ফিরে তাকাতেই তিনটি হলদে বাতির ঝকঝকে আলোয় নারীমূর্তি দেখতে পেল, সেটা প্রণয়া। প্রণয়া কণ্ঠে কিছুটা জড়তা মিশিয়ে বলল,
--"আপনার ঘরে প্যারাসিটামল আছে?"
নির্মলের ভ্রু কুচকে গেল। প্রণয়া স্পষ্ট দেখতে পেল নির্মলের নাক, গাল জুড়ে হালকা লালচে ভাব ছড়াচ্ছে। সঙ্গে নির্মলও ক্ষণে ক্ষণে নাক টানছে। নির্মল চিন্তিত গলায় বলল,
--"কেন বলুন তো?"
--"থাকলে খেয়ে নিবেন। দেখলাম তখন নাকের সর্দি মুছেছেন। প্যারাসিটামল হলে হয়তো জ্বরটা আসবে না।"
নির্মল অবাক হলো ভীষণ। প্রণয়াও নিজের কাণ্ডে অবাক। কী হলো ব্যাপারটা? সে নির্মলকে কী কিছু বলল যা তার বলা উচিত ছিল না? নির্মল কিছু মুহূর্তের জন্যে থমকালেও মুচকি হেসে বলল,
--"ধন্যবাদ আমাকে নিয়ে ভাবার জন্য। আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি প্যারাসিটামল একটা খেয়ে নিব। আজ আসছি, শুভ রাত্রি।"
নির্মল চলে গেলেও প্রণয়া থমকে রইলো। এই প্রথম সে নির্মলের মুখে আপনি সম্বোধন খেয়াল করল। মুহূর্তেই অনুভব করল তার ভেতরটা ক্রমাগত আনন্দ মিছিল করে বেড়াচ্ছে। সুখে সুখ মিলেমিশে যাচ্ছে। প্রণয়া নির্মলের থেকে অনেকটা ছোটো হলেও নির্মল তাকে আপনি সম্বোধন করছে। যেকোনো নারীই চায় পুরুষ তাকে সম্মান করুক। কিন্তু সেই সম্মানটা এত উপচে পড়ে সরাসরি প্রণয়ার বুকে গিয়ে বিঁধবে কে জানত? আচ্ছা, নির্মল কী কথার জাদু জানে?
--"আপনি কী কথার জাদু জানেন নির্মল সাহেব?"
#আকাশ_তীরে_আপন_সুর
চলবে~~
বিঃদ্রঃ আসসালামু আলাইকুম। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ নজরে দেখবেন।
গ্রুপঃ অনুভূতিকথন ~ লাবিবা ওয়াহিদ'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৫|
লাবিবা ওয়াহিদ
সেদিনের পর থেকে ফাহিমা যেন অঘষিত এক দায়িত্ব দিয়ে দিল প্রণয়াকে। সেটা হচ্ছে, নির্মল আসলেই তাকে নাশতা দিয়ে আসবে প্রণয়া। হলোও তাই। প্রণয়া দাঁতে দাঁত চেপে মায়ের আদেশ মেনে নিল, আর ফাহিমা তখন টিভির শব্দ কমিয়ে নিজের মতো করে সিরিয়াল দেখতে বসেন।
প্রণয়া অবশ্য একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে। সে প্রায় যে-বারই নাস্তা নিয়ে গিয়েছে প্লাবন সেবারই মুখস্থ পড়া দিচ্ছে। যার ফলস্বরূপ প্রণয়া তার পড়ায় ব্যঘাত না ঘটিয়ে অপেক্ষা করত তার পড়া শেষ করার। অপেক্ষা করতে গিয়ে সে নির্মলের দিকে আনমনে চেয়ে থাকে৷ প্লাবনের পড়া শেষ হতে হতে চা ঠান্ডা হয়ে যায়, আর প্রণয়া প্রতিবারের মতো ছুটে গিয়ে ঠান্ডা চা গরম করে আনে। এতে প্রণয়া বিরক্ত হয়। এজন্য দুইদিন সে চায়ের বদলে ট্যাঙের সরবত দিয়েছে। আর চা নিয়ে গেছে নির্মল আসার পরপরই। তবে প্রণয়া একটা বিষয় লক্ষ্য করেছে। তার চোখ জোড়া বারবার নির্মলের দিকে চলে যায়। চোখ জোড়াও বুঝি আজকাল কথা না শোনার পণ করেছে? প্রণয়া খিঁচে চোখ বুজে চোখ জোড়াকে শাসায়,
"এত অবাধ্য কেন তোরা?"
চোখ জোড়া তবুও অবাধ্যপণা ছাড়েনি। এজন্য নির্মল আসলেই প্রণয়া নিজের ঘরে গিয়ে বসে থাকত। তাতেও কাজ হত না। তখন বুকের ভেতরটা কেমন জৈষ্ঠ্যের তপ্ত দুপুরের ন্যায় খাঁ খাঁ করতে লাগে। বুকজুড়ে হাহাকার, ব্যাকুলতা আর চোখ জোড়ার অঢেল তৃষ্ণা। এই লক্ষণগুলো আজকাল ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলছে প্রণয়াকে। অনুভূতিগুলো প্রণয়ার জন্যে সম্পূর্ণ নতুন এবং অদ্ভুত। এজন্য সে অনুভূতিগুলোর ঘাড় ধরে তাদের নাম জানতে পারছে না।
আশেপাশে এমন কেউ-ও নেই যার সাথে ভেতরে চেপে রাখা কথাগুলো প্রকাশ করতে পারবে। কারো সাথে বললে হয়তো এর সমাধান হতো? অস্থিরচিত্তে ঘুরে বেড়ানো প্রণয়ার হঠাৎ শুক্রবারে দাওয়াত পড়ল নির্মলদের বাসায়। অবশ্য প্রণয়া একা নয়, তার পুরো পরিবারের। নুহাশ সাহেবও সেই দাওয়াত হাসিমুখে গ্রহণ করলেন।
আজ জুম্মার দিন, তাইতো নুহাশ সাহেব সকাল সকাল মজিবকে পাঠালেন তাদের স্থানীয় বাজারে, ভালো দেখে ফল-মূল এবং মিষ্টি দই আনার জন্য। নুহাশ সাহেব সবসময়ই দু'হাত উজাড় করে উপহার দিতে পছন্দ করেন। কারো বাসায় দাওয়াত পড়লে তো কোনো কথাই নেই। হাত ভরে উপহার নিয়ে তবেই দাওয়াতে যান। ব্যাপারটা অনেকের কাছে যেমন দৃষ্টিকটু, তেমনই অবাকের।
অবশ্য একদিক দিয়ে চা বিলাসের সদস্যরা ভাগ্যবান কিংবা ভাগ্যবতী। আশেপাশে পিঠ-পিছে সমালোচনা করার মতো কোনো প্রতিবেশি নেই। দূর দূরান্ত অবধি বাড়ি-ঘরও দেখা যায় না। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজে রাঙানো চা বাগান। আবার অন্য দিক দিয়ে নুহাশ সাহেবের একটাই আফসোস, প্রতিবেশি কিংবা সেরকম আত্নীয় আশেপাশে না থাকায় তিনি দু'হাত ভরে বাজার করতে পারেন না। এবার অবশ্য ভাগ্য সহায় হলো তাঁর। নিজের মতো আপ্যায়ন করার মতো নীলুফাকে এবং নির্মলকে পেয়েছেন।
দুপুরের দিকে গোসল সেরে ভেজা চুল পিঠময় ছড়িয়ে প্রণয়া বসে ছিল ঝুল বারান্দায়। মূলত রোদ পোহানোর উদ্দেশ্যেই সে বারান্দায় এসে বসেছে। একটু আগেই গামছা দিয়ে চুলের পানি ছাড়িয়েছে। এখন ভেজা চুল নরম বাতাসে মৃদু উড়ছে। কিন্তু এসবে প্রণয়ার ধ্যান নেই। সে এক নজরে চেয়ে আছে অদূরে। এক জোড়া পাখি অদূরে চায়ের পাতার মাঝে খুনশুঁটিতে মেতেছে। দৃশ্যটা চমৎকার লাগল তার চোখে। পরপরই মস্তিষ্কে হানা দিল নির্মলের চশমা পরা কিংবা চশমা ছাড়া স্নিগ্ধ মুখ। যার ফলস্বরূপ প্রণয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। সেই ভাঁজে বিচরণ করছে বিরক্তি।
এখন জুম্মার সময়। বাড়িতে মা, মেয়ে ব্যতীত আর কেউ নেই। বাকিরা সবাই নামাজের জন্য মসজিদে গিয়েছে। নিচ থেকে ভেসে আসছে ফাহিমার ডাক। ফাহিমা উঁচু গলায় প্রণয়াকে বারবার তৈরি হতে বলছেন। প্রণয়া তৈরি না হলেও মায়ের ডাকে নিচে গিয়ে সোফায় বসে থাকল। তা দেখে ফাহিমা বিরক্ত হয়ে রান্নাঘরে চলে গেলেন। সময় কেটে যেতে লাগল। এর মাঝে হাজির হলো নুহাশ সাহেব এবং প্লাবন। তাদের পেছন পেছন এসেছে মজিব। নুহাশ সাহেব এসেই তাড়া দিয়ে বললেন,
--"দ্রুত চলো। আপা হয়তো অপেক্ষা করছেন।"
ফাহিমা মেয়ের নামে নালিশ করতে চেয়েও করলেন না। প্রণয়াও সেই সুযোগ না দিয়ে বলল,
--"তোমরা আগে আগে যাও। আমি পিছেই আছি।"
ফাহিমা প্রণয়ার হাতে তালা দিয়ে বললেন,
--"প্লাবন। বোনের সাথে আসবে।"
প্লাবনের কপাল কুচকে গেল মায়ের কথা শুনে। নুহাশ সাহেবও সম্মতি জানিয়ে বললেন,
--"হ্যাঁ, তাই ভালো। মেয়েকে তো একা রেখে যেতে পারি না। ফাহিমা, মজিব চলো। আমরা বরং আগেই যাই। পথে আবার নির্মলকেও দেখলাম না৷ আগে আগে চলে আসল নাকি?"
নুহাশ সাহেব প্লাবনকে প্রণয়ার কাছে রেখে বাকিদের সাথে নিয়ে চলে গেলেন। মজিবের মুখে আজ তৃপ্তির হাসি। ভালো-মন্দ খাবারের ডাক পড়লে কোন মানুষ অখুশি থাকবে?
প্লাবন প্রণয়ার সামনে এসে দাঁড়াল। নিজের পেটের দিকে তর্জনী দেখিয়ে বলল,
--"আমার পেটটা কতটা গুড়গুড় শব্দ করছে তা কী জানো আপু? ভেজা কাপড়ের মতো মুঁচড়াচ্ছে খুদায় আর তুমি এখানে এখনো বসে আছ? কেন? বসে থাকার ইচ্ছে হলে একাই বসে থাকতে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে কেন বসতে হবে? তোমার পেট না থাকলেও আমার আছে।"
প্লাবনের এলোমেলো কথায় চোখ রাঙায় প্রণয়া। কিন্তু প্লাবনের খুদার দম বেশি। প্রণয়ার চোখ রাঙানোতেও কাজ হলো না। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই প্রণয়া ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
--"বাইরে যা। আমি আসছি!"
প্লাবন খুশিতে গদগদ হয়ে দ্রুত চলে গেল বাইরে। কিছু সময় পরপর আবার ডাকছে প্রণয়াকে।
--"ও আপু, হয়েছে তোমার? আর কতক্ষণ? যাবা নাকি আমি একা চলে যাব?"
প্রণয়া মূলত বসেছিল চুল শুকানোর জন্য কারণ ভেজা চুল বাঁধা সম্ভব না। আবার চুল না বাঁধলেও ওড়নার নিচে দিয়ে চুল বেরিয়ে থাকবে যা প্রণয়ার ভীষণ অপছন্দের। এখন প্লাবনের তাড়াতে প্রণয়ার এই অপছন্দের কাজটাই করতে হচ্ছে। যথাসম্ভব চেষ্টা করল ভেজা চুল ওড়নার আড়ালে রেখে বেরিয়ে গেল। প্রণয়ার সদর দরজায় তালা লাগানোর সময় প্লাবন নিজেই চলে গেল। এখান থেকে এখানে মাত্র এক মিনিটের পথ, এটুকু নিশ্চয়ই প্রণয়ার সঙ্গে আসতে হবে না। প্রণয়া তালার দিকে চেয়েই বলল,
--"প্লাবন, নড়বি না কিন্তু। একসাথে যাব।"
কিন্তু পেছন থেকে কোনো সাড়া এলো না। আসবে কী করে যদি না সাড়া দেওয়ার কেউ না থাকে? প্রণয়া তালা লাগিয়ে পিছে ফিরতেই দেখল প্লাবন নেই। প্রণয়ার কিছুটা রাগ হলেও সে নিজেকে সামলে নেয়। সিঁড়ির এক ধাপ পার হতেই নির্মলকে দেখল সবে সে চা বিলাসে প্রবেশ করছে। হাতে তার কিছু ফলের প্যাকেট।
প্রণয়াকে দেখামাত্রই নির্মল স্মিত হাসল। নির্মল সাদা পাঞ্জাবি এবং কালো এক টুপি পড়েছে। কেন জানি না নির্মলকে চোখের সামনে দেখেই প্রণয়ার বুকের বা পাশটা অস্বাভাবিক ঢিপঢিপ শব্দ তুলছে। এতে সে অপ্রস্তুতবোধ করল। নির্মল এগিয়ে আসতে আসতে বলল,
--"এখন যাচ্ছেন নাকি? তবে একা কেন?"
প্রণয়া এবার নড়াচড়ার শক্তি পেল। সে নির্মলদের বাসার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
--"আমি একটু পরেই বের হলাম।"
প্রণয়া জানত নির্মল ফিরেনি। কিন্তু নির্মলের ফেরাটা যে প্রণয়ার বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হবে কে জানত? নির্মল বলল,
--"আচ্ছা ঠিক আছে। এখন আমার সঙ্গে আসুন।"
দুজন পাশাপাশি, পায়ে পায়ে ধাপ মিলিয়ে হাঁটছে। প্রণয়া এতে কেন যেন স্বস্তি, অস্বস্তির মিশ্র অনুভূতিতে জড়িয়ে গেল। নির্মলকে নিয়ে এক নিষিদ্ধ অনুভূতিও অনুভব করল সে।
প্রণয়া হঠাৎ প্রশ্ন করতে চাইল, "আপনি কেন আমায় 'আপনি' সম্বোধন করেন? প্রথমদিন ছোটো নই বলায়?"
কিন্তু আফসোস প্রণয়া উচ্চারণ অবধিও করতে পারল না সেসব। তবুও অন্যকিছু জিজ্ঞেস করল,
--"ফিরতে দেরী হলো যে?"
--"মসজিদ থেকে বেরিয়ে একটু বাজারে গিয়েছিলাম। এজন্যই ফিরতে একটু দেরী হলো। তবে আপনাকে দরজার মুখে দেখে মনে হলো না আহামরি দেরী করেছি।"
শেষ কথাটা বলে নির্মল শব্দহীন হাসল। আর প্রণয়ার কান তখন অকারণে গরম হয়ে রয়। অথচ প্রণয়ার কান জোড়া ভেজা চুলে লেপ্টে ছিল। যার ফলস্বরূপ সে চুপসে গেল। নির্মল একপলক তাকাল প্রণয়ার দিকে। প্রণয়ার ভেজা চুল মুখের দু'ধারে অল্প বিস্তর বেরিয়ে আছে। মুখ জুড়েও তার স্নিগ্ধতার রেশ। নির্মল চোখ ফিরিয়ে নিল। চলে এসেছে তারা।
~ চলবে
বিঃদ্রঃ আসসালামু আলাইকুম। গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ নজরে দেখবেন।#আকাশ_তীরে_আপন_সুর
|পর্ব ০৬|
লাবিবা ওয়াহিদ
দাওয়াতের দিনটা বেশ ভালো কাটছে নুহাশ সাহেবের। নীলুফার হাতের রান্নার পুরানো স্বাদ বহুদিন পর পেল। পোলাও, ঝাল ঝাল মুরগি ভুনা, সাতকড়া দিয়ে গরুর মাংস, এক পদের মাছ, চা, শুঁটকি, শিদল ভর্তা.. সব মিলিয়ে দুর্দান্ত আয়োজন। নুহাশ সাহেব বেশ ভোজন রসিক মানুষ৷ তিনি আঙুল চেটে খেলেন। খাওয়ার সময় রসিক স্বরে স্ত্রীকে বলছেন নীলুফার থেকে এটা ওটা শিখে নিতে৷ ফাহিমাও তাতে অভিমানী স্বরে উত্তর দিচ্ছে। ফাহিমার অভিমানী গলা শুনলে সবাই হেসে উঠছে।
এই হাসি-মজার মধ্যে শুধু দম আটকে যাওয়া পরিস্থিতি প্রণয়ার। নির্মলকে কোণা চোখে, আড়চোখে প্রায়ই লক্ষ করেছে। নির্মল যখনই প্রণয়ার কাছেপিঠে থাকছে, প্রণয়ার চেপে রাখা ভালো লাগার অনুভূতি সর্বাঙ্গ জড়িয়ে যাচ্ছে। সেই অনুভূতি নিয়ন্ত্রণহীন হলো নির্মল যখন নিজ উদ্যোগে তার পাতে পোলাও দিতে চেয়ে বলল,
--"পোলাও আরও দিব? ঝোল লাগবে?"
প্রণয়া তখন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল, "না, নিব না কিছু।"
নির্মল তাও এক চামচ পোলাও দিল, সঙ্গে ঝোল মাংস। প্রণয়ার মনে হলো নির্মল যেন ভালোবেসেই প্রণয়াকে এগুলো দিল। তার নিজ থেকে ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্যি প্রণয়ার নেই। বরং নির্মল সেই যত্ন, ভালোবাসা দিয়ে প্রণয়াকে নির্মল ঋনি করে দিলো নিজের অজান্তেই।
সেদিন দাওয়াতের পর্ব শেষ হলো আছরের আযানের সময়। নুহাশ সাহেব নির্মলের কাঁধ চাপড়ে ওদের বিদায় জানিয়ে নিজের বাড়িতে চলে আসেন। প্রণয়া তো বাড়ি ফিরেই নিজের রুমে চলে যায়। তার আগে হাত-মুখ ধুয়ে সোজা ঘুমিয়ে যায়। ঘুম ভাঙে তার খসখসে শব্দ শুনে। ভ্রু কুচকে পিটপিট করে চোখ মেলতেই দেখল প্লাবন চেয়ারে বসে আপেল কামড়ে খাচ্ছে। ঘরের লাইট জ্বালানো, আর নজর প্রণয়ার পানেই। প্রণয়া শোয়া ছেড়ে উঠে বসল। চোখ কচলাতে কচলাতে নিচু গলায় বলল,
--"লাইট জ্বালিয়ে কী করছিস এখানে?"
প্লাবন আপেল চিবুতে চিবুতে বলল,
--"মা বলল তোমাকে ডেকে তুলতে। কিন্তু তোমাকে দেখে ডাকতে ইচ্ছা হলো না, তাই বসে আছি।"
প্রণয়া আড়মোড়া ভেঙে প্লাবনের দিকে তাকাল। আগের মতোই গলা নামিয়ে বলল, "উদ্ধার করে দিছেন।"
প্লাবন দাঁত কেলালো।
কেটে যায় বেশ কিছুদিন। এর মাঝে প্রণয়ার সাথে অকল্পনীয় এক ব্যাপার ঘটে। সেদিন কলেজের জন্য প্রণয়া তৈরি হয়ে নাস্তা করতে বসেছিল। নুহাশ সাহেব খেতে খেতে হঠাৎ নীরবতা ভাঙলেন। বললেন,
--"আজ প্রণয়া নির্মলের সাথে কলেজ যাবে। আমার কিছু কাজ থাকায় তোমাকে এগিয়ে দিতে পারব না।"
এরকম একটা কথা শুনে প্রণয়ার গলা দিয়ে খাবার নামতে চাইলো না যেন। বহু কষ্টে খাবারটা গিলে বলল,
--"আমি তো প্রতিবারই একা যাই বাবা। তুমি যেতে না পারলে তো সমস্যা নেই। আর.."
প্রণয়ার কথার মাঝে ফোড়ন কাটলেন নুহাশ সাহেব। ভারী গলায় বললেন,
--"আমার কথাই শেষ। আগেরটা আগের হিসেব। এখন আমি না গেলেও তুমি নির্মলের সঙ্গেই যাওয়া আসা করবে। আজ কলেজ ছুটি হবে কখন, আমাকে জানিয়ে দিয়ো। আমি নির্মলকে পাঠিয়ে দিব।"
প্রণয়া বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। তটস্থ হয়ে ভাবতে লাগল সমস্ত ব্যাপারটা। এক মুহূর্তের জন্য ইচ্ছে করল আজ কলেজ যাবে না। কিন্তু তৈরি হওয়ার পর কলেজ না গেলে ব্যাপারটা কেমন দেখাবে না? উলটো নির্মলকেই উলোট পালোট সন্দেহ করতে পারে। মনের দোটানায় ফেঁসে একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাজি হলো প্রণয়া।
নাস্তা সেরে বেরিয়ে আসতেই দেখল উঠোনের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে নির্মল। এক হাতে কাঠের বেড়ার একাংশ চেপে সে চেয়ে আছে চায়ের সাম্রাজ্যে। পিঠমুখী নির্মলকে দেখে প্রণয়া নিজের ভেতরে প্রজাপতির ডানা ঝাপটানোর শব্দ পাচ্ছে যেন। সিঁড়ির দুই ধাপ পার করে কিছুটা এগিয়ে প্রণয়া হালকা গলা খাঁকারি দিল, নিজের উপস্থিতি জানান দিতে। নির্মল পিছ ফিরে তাকাল। নেভি ব্লু শার্টে নির্মলকে দেখে প্রণয়া নজর সরিয়ে ফেলল। প্রণয়া মিনমিন করে বলল,
--"বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে গিয়ে বসতে পারতেন। শুধু শুধু অপেক্ষা করালাম।"
নির্মল আলতো হেসে বলল,
--"তেমন কিছু না, আমি এখানেই ঠিক ছিলাম।"
নির্মল থামল। প্রণয়া কোণা চোখে আরেকবার দেখল নির্মলকে। নির্মল প্রণয়ার দিকে তাকাতেই প্রণয়া দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। নির্মল বুঝতেই পারল না প্রণয়া চেয়েছিল তার পানে। নির্মল বলল,
--"চলুন যাওয়া যাক।"
চা বাগানের আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে অবশেষে দুজন সরু, ইটের রাস্তায় এসে পৌঁছালো। ক্ষণিক সময় পরপর শা শা শব্দে কিংবা হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে কিছু অটো রিকশা বা অন্যান্য গাড়ি। প্রণয়া মেইন রাস্তায় আসতেই দেখল তাদের জন্য একটি অটো দাঁড়িয়ে আছে। তবে এটা দুই সিটের অটো রিকশা। নিশ্চয়ই নুহাশ সাহেব ঠিক করেছেন। প্রণয়া ত্রস্ত পায়ে অটোতে উঠে বসতেই দেখল নির্মল চালকের পাশে বসতে চাচ্ছে। তা দেখে প্রণয়া থামালো। মৃদু গলায় বলল,
--"পিছে সিট আছে। আমার পাশে বসতে পারেন।"
নিজের কথায় নিজেই চমকালো প্রণয়া। সে কী বলে ফেলল নির্মলকে? মুহূর্তেই গলা শুকিয়ে এলো তার। নির্মল হাসল। বলল,
--"আপনি-ই বসুন পিছে। আমি ঠিক আছি, প্রণয়া।"
নির্মলের গলায় নিজের নাম শুনে প্রণয়া মোমের মতো গলতে শুরু করল। তবুও নির্মলকে যেহেতু একবার বলেই ফেলেছে, জোর করা প্রয়োজন। প্রণয়া আবারও বলল,
--"প্লিজ। সামনে ভাঙা রাস্তা আছে, আপনার সমস্যা হবে। আসুন।"
নির্মল স্থির নজর রাখল প্রণয়ার পানে। যদিও প্রণয়া অন্যদিকে ফিরে বলেছে, তবুও ঢের অনুভব করতে পারল সেই দৃষ্টি। নির্মল মিনিট এক সময় নিয়ে প্রণয়ার পাশে গিয়ে বসল। সঙ্গে সঙ্গে দম যেন গলায় আটকে গেল৷ বুকে যেন কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। নির্মল উঠে বসতেই অটো চলতে লাগল আর প্রণয়া শক্তি হয়ে বসে রইলো। ফিরেও তাকাল না নির্মলের দিকে। নির্মলও চুপ। বেশ কিছুটা পথ পেরোতেই নির্মল জিজ্ঞেস করল,
--"আমি বসায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো প্রণয়া?"
একরাশ ভালো লাগা, অস্বস্তিতে মোহিত হয়ে প্রণয়া বলল,
--"আমি ঠিক আছি, আপনি ব্যস্ত হবেন না।"
প্রণয়ার কথা ফলে যায়। বেশ অনেকটা পথ এগিয়ে পেরোতেই ভাঙা রাস্তার সম্মুখীন হলো। সে কী ভয়াবহ ঝাকুনি। এই পর্যায়ে দুজনই বেশ সতর্ক থেকেছে। তবে সবসময় সতর্কতা বজায় থাকলেও কিছু অসতর্কতার কাণ্ড ঘটে যায় অচিরেই। এই যেমন নির্মলের বাহুর সঙ্গে প্রণয়ার বাহু স্পর্শ করেছে কয়েকবার। এই অসহ্য অনুভূতি প্রণয়া কাকে বোঝাবে? সে নিজেকে বোঝাতেই যে অক্ষম।
স্বপ্নের মতো কেটে যায় পুরো দিন। ফেরার সময় প্রণয়া একজন রাখাইন মেয়ের সাথে আসছিল। মেয়েটার সাথে তার গাঢ় বন্ধুত্ব নেই, তবে ক্লাসমেট। তবে প্রণয়া জানে, এই মেয়েটা প্রেম করে। প্রায়ই একটি ছেলের সাথে ভার্সিটির আশেপাশে দেখা যায় তাকে। যেহেতু সে প্রেম করে, সেহেতু ইনিয়ে বিনিয়েও প্রণয়া নিজের কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে পারবে চিন্তা করল। এজন্য প্রণয়া সেই মেয়েটা অর্থাৎ পিয়াসাকে জিজ্ঞেস করল,
--"আচ্ছা, যদি কোনো ছেলেকে দেখলে নিজের মধ্যে অস্বাভাবিক অনুভূতি নাড়া দেয় তাকে কী ধরা হয়?"
পিয়াসা হাসল। প্রণয়ার দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে মিটিমিটি হেসে বলল,
--"শুধু একজনের জন্য এরকম অনুভূতি আসলে তাকে ভালোবাসা বলে। কেন, কাউকে মনে ধরেছে নাকি?"
প্রণয়া থমকায়, চোখ কপালে তুলে ঘনঘন মাথা নেড়ে তুখোড় অস্বীকার করে বলল,
--"একদম না। কীসব যে বলছ না তুমি!"
পিয়াসা তবুও হাসতে লাগল। প্রণয়া এতে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। শেষমেষ কি না সে প্রেমে পড়ল, ভালোবেসে ফেলল নির্মলকে? কিন্তু কয়েকদিনের দেখা-সাক্ষাৎ এ এটা কী করে সম্ভব? পিয়াসা শুধু শুধুই ভয় দেখাচ্ছে তাকে।
নির্মল বলেছিল ছুটি হয়ে গেলে একা একা না ফিরতে। নির্মলই এসে তাকে নিয়ে যাবে। যদি সময়মতো পৌঁছাতে নাও পারে তবে অপেক্ষা করতে বলেছে। প্রণয়া নির্মলের কথার নড়চড় হয়নি। সে বাধ্য মেয়ের মতো ভার্সিটির গেটের বাইরে একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে নির্মলের। আশেপাশে পথে নজর বুলিয়ে নির্মলকে খুঁজছে। প্রেমে পড়লে নাকি অপেক্ষাও মধুর হয়। সেই মধুর অপেক্ষা যেন প্রণয়া উপলব্ধি করলেও সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। বিরক্তিতে তার কপাল কুঁচকে যায়। পিয়াসাও না, প্রণয়ার কানে একদম বিষপোকা ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। এই বিষপোকার আরেক নাম প্রেম পোকা৷ এই মুহূর্তে বিষকেই তার মধুর লাগতে শুরু করেছে, কী বাজে অবস্থা!
ভার্সিটির সামনের রাস্তা অনেকটা বাজারের মতো। এখানে মুদি দোকান, পোশাকের, বিভিন্ন অলংকারের, খাবারের এবং খাতা-পত্রের দোকানে ঠাসা। মূলত ভার্সিটি বলেই এখানটা বেশ জাকজমক। অবশ্য দুই একটা টঙের দোকানও আছে। সেখানে প্রায় সব বয়সী পুরুষদের দেখা যায়। কেউ চায়ের কাপে আড্ডার আসর বসায় আবার পাহাড়ি বখাটে ছেলেরা মেয়ে দেখতে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়।
প্রণয়ার সামনে হঠাৎ এক ত্রিশের উর্ধ্বে বয়সী লোক এসে দাঁড়ায়। পানের প্রভাবে দাঁত লাল করে ফেলেছে একদম। সেই দাঁত বের করে হেসে বলল,
--"প্রথম দেখাতেই মনটা কাইড়া নিছিলা, এহন সামনা-সামনি দেইখা মাথা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠছে। আছ কিমুন ময়না?"
প্রণয়ার গা ঘিনঘিন করে উঠল এই লোকের অসৎ চাহনি দেখে। অসৎ চিন্তা-ভাবনার সাথে বাজে মন্তব্যও। প্রণয়ার ভয়ে মুখ ছোটো হয়ে গেল। কোনোরকমে পা চালিয়ে লোকটার দৃষ্টি সীমানার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করল। লোকটা প্রণয়ার পিছু নেয়নি, একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁত কপাট বের করে প্রণয়ার যাওয়ার পানেই চেয়ে আছে সেই লোক।
প্রণয়া কিছুটা পথ এগিয়ে গেল। আশেপাশে নির্মলকে খুঁজতে খুঁজতে হাঁটতে লাগল। এই পথ ধরেই নির্মল আসবে। তাই নির্মল আসলে তাকে অবশ্যই সে দেখতে পাবে। হলোও তাই। মিনিট দুয়েকের মাঝে নির্মল অটো নিয়েই আসছিল। পথে প্রণয়াকে দেখে সে অটো নিয়েই থামল। অটো থেকে নেমে প্রণয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল,
--"এ কী প্রণয়া? আপনাকে না বললাম কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করতে? হেঁটে আসলেন কেন এই অবধি?"
প্রণয়া শুকনো হাসি দিল। নির্মলের চোখ জোড়া প্রণয়ার সুরক্ষা জানান দিচ্ছে। পুরুষে, পুরুষে কতটা ভিন্নতা। কেউ নারীকে দেখে কামনার চোখে আর কেউ নারীকে দেখে সম্মানের চোখে। নির্মলের চোখে উজাড় করা সুরক্ষা, ভরসা দেখে প্রণয়া কিছুক্ষণ আগের ঘটনা ভুলে গেল। সত্য চেপে মিনমিন করে বলল,
--"শরীর ভালো লাগছিল না। তাই কিছু পথ এগিয়ে এসেছি।"
নির্মল আর কথা বাড়ায় না। গলা খাদে নামিয়ে প্রণয়াকে রিকশায় উঠতে বলল। প্রণয়াও কথা না বড়িয়ে উঠে বসে। এবার নির্মল পাঁচ সিটের অটো এনেছে। তাই দুজনে প্রায় মুখোমুখি-ই বসে বাড়ির পথে রওনা হলো।
চলবে—
বিঃদ্রঃ আসসালামু আলাইকুম। সিলেটি ভাষা জানি না বলা যায়, তাই আঞ্চলিক ভাবটা আনতে পারিনি। তার জন্য দুঃখিত। পর্বটি কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন আমায়। আপনাদের সুন্দর মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকব।'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৭|
লাবিবা ওয়াহিদ
সেদিনের ঘটনা প্রণয়াকে বেশ নাড়িয়ে তুলেছিল। এজন্য সে প্রায় সপ্তাহখানেক কলেজ যায়নি। কেউ অবশ্য কিছু জিজ্ঞেস করেনি, প্রণয়াও কারো সাথে মুখ ফুটে এরকম একটা ঘটনা বলতে পারছিল না। কোথাও দ্বিধা কিংবা জড়তা কাজ করত বলে।
প্রণয়ার স্বপ্নগুলোও আজকাল দু ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। কখনো ওই লোকের কুৎসিত রূপ স্বপ্নে ধরা দিচ্ছে আবার কখনো রাজকুমার স্বরূপ নির্মল এক সুন্দর, অমায়িক প্রেমিক রূপে স্বপ্নে ধরা দিচ্ছে। নির্মল আসে আলো হয়ে, আর সেই কুৎসিত লোকটা আসে আঁধারের নিকৃষ্টতম রূপ হয়ে। মাঝেমধ্যে দুস্বপ্ন দেখে আতঙ্কে প্রণয়ার ঘুম ভেঙে যায়।
প্রেমে পড়ার উপলক্ষ্যে দিনগুলোকে খুশির সাথে পালন করার কথা ছিল তার, কিন্তু সুখের সঙ্গে সেই নেতিবাচক ঘটনা তাকে বারংবার অন্যমনস্ক করে তুলছে।
বিকালে প্রণয়া গায়ে শাল জড়িয়ে উঠোন জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আজকে দুপুরের পর থেকেই আকাশ কিছুটা মেঘলা। রোদের রেশ নেই, আকাশও কেমন মলিন হয়ে আছে যেন। বিশাল চা বাগানের সঙ্গে যেন প্রণয়ার নীরব আলাপন চলছে। হাতে এক কাপ চা। তবে চুমুকের কারণে চায়ের কাপে চা অর্ধেক গিয়ে ঠেকেছে। মজিব সদর দরজার মুখে থাকা ছাউনির নিচে পেতে রাখা বেতে চেয়ারে আয়েশ করে বসে আছে।
নিরবিলি চা বিলাসের বাইরেই শুকনো পাতার শব্দ হলো। যেন কেউ চা বিলাসের দিকেই আসছে। মজিব ততক্ষণে ভেতরে চলে যায় ফাহিমার ডাক পড়ায়। প্রণয়া কান খাড়া করে সেই শব্দ শুনতে পেতেই পিছে ফিরে তাকাল। নির্মল আসছে। আজ তার হাতে কিছু হিসাবের খাতা আর চোখে চিকন ফ্রেমের চশমা। দিন কিছুটা মেঘলা হওয়ার দরুণ বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে আশপাশ জুড়ে। কোমল সেই হাওয়া গা ছুঁয়ে দিলেই কেমন ভালো লাগায় জড়িয়ে যায় প্রণয়া। নির্মলকে এই সুন্দর সময়ে চোখের দেখা দেখতে পেয়ে তার ভালো লাগার মাত্রা হুঁ হুঁ করে বেড়ে গেল।
নির্মল কাঠের ছোটো দরজাটা পেরিয়ে আসতেই উঠোনের ডানপাশে তাকাল। কিছুটা দূরেই প্রণয়া দাঁড়িয়ে তার দিকেই দিকে। প্রণয়া ধরা খেয়েছে দেখে আর নজর ফেরালো না। নির্মলও এগিয়ে গেল প্রণয়ার দিকে। নির্মলের এগিয়ে আসা দেখে প্রণয়ার পা জোড়া সেখানেই অসাড় হয়ে এলো। নির্মল প্রণয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,
--"সবুজ সামাজ্যের সঙ্গে আলাপ চলছে নাকি?"
প্রণয়া অল্প করে হাসল। বলল,
--"তা চলছে টুকটাক।"
--"কলেজ যাচ্ছেন কবে?"
প্রণয়া গলা খাদে নামিয়ে বলল,
--"আগামীকাল যাব।"
নির্মল আলতো হাসল। দূর-দূরান্তের চা বাগানে নজর বুলিয়ে বলল,
--"ঠিক আছে, তাহলে আমাকে জানিয়ে দিবেন নাহয়।"
--"আবার সেদিনের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন না তো?" প্রণয়া মুখ ফসকেই বলে ফেলল এই কথাটা।
নির্মল সৌজন্যের সাথে হেসে বলল,
--"আপনি অনুমতি দিলে বেতের সোফাতে বসেই অপেক্ষা করব।"
প্রণয়ার বলতে ইচ্ছে করল, "আপনার অপেক্ষার আগেই দেখবেন আমি আপনার অপেক্ষায় বসে আছি জাদুকর সাহেব। এ তো সামান্য গন্তব্যে একসাথে যাওয়ার অপেক্ষা, প্রেমের অপেক্ষা যে আমার তরফ থেকেই শুরু। আপনি চাইলে আপনার সমস্ত অপেক্ষা আমি নিজের নামে করে নিব, শুধু আপনি আমার সান্নিধ্যে থাকলেই চলবে।"
সেই টুকটাক কথাই চলল দুজনের মাঝে। নির্মল বাড়ি চলে যেতেই ভেতর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলো মজিব। মজিবকে এতটা উঁশখুঁশ করতে দেখে প্রণয়া ডাকল মজিবকে।
--"মজিব চাচা, এভাবে ছুটছেন কেন?"
মজিব বললেন,
--"প্লাবন বাবা যে খেলতে গেছে এখনো আসার খবর নাই। সন্ধ্যাও তো হয়ে আসতেছে। স্যার আসবে না পড়াতে? এজন্যে তোমার মা আদেশ করসেন, প্লাবনকে যেখানেই পাব সেখান থেকেই যেন ধরে আনি।"
প্রণয়া এ কথা শুনে চায়ে চুমুক দিল। চা শেষ করে বলল,
--"তাহলে আস্তে-ধীরেই যান চাচা। প্লাবন নতুন টিচার পেয়ে এখন আর ফাঁকি দেয় না। কিছু দূর এগোতেই দেখবেন প্লাবন এলোমেলো পায়ে দুলে দুলে আসছে।"
-------------------
প্রণয়া নিজের কথা রেখেছে। নির্মল আসার আগেই প্রণয়া তৈরি হয়ে তার অপেক্ষায় বসে ছিল। নির্মল লম্বা লম্বা পায়ে বাড়ির সামনে আসতেই দেখল প্রণয়া ছাউনির নিচে বেতের সোফায় বসে আছে। প্রণয়া চেয়েই ছিল নির্মলদের ঘরে যাওয়ার পথটার দিকে। তাই সে চট করে উঠে বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। নির্মল প্রণয়ার দিকে চেয়ে বলল,
--"আমার কী আজ দেরী হয়ে গেল?"
--"মোটেই না। আমি তো সবেই এসে বসলাম।"
--"ওহ, তাহলে চলুন নাহয়।"
যখন দুজন চা বাগানের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে যাচ্ছিল তখন প্রণয়া হঠাৎ নীরবতা ভেঙে মৃদু গলায় বলল,
--"আপনার কাছে এই চায়ের সাম্রাজ্য কেমন লাগে?
নির্মল চট করে তাকাল প্রণয়ার দিকে। প্রণয়া এতে নজর ঘুরিয়ে ফেলল। নির্মল পরমুহূর্তেই চা বাগানে চোখ বুলিয়ে বলল,
--"এই সৌন্দর্য চোখ জোড়া মুগ্ধ এবং মনজুড়ে অনুভব করতে পারে, এছাড়া ভাষায় কীভাবে এই সৌন্দর্যের অনুভব বর্ণনা করব তা আমার জানা নেই।"
প্রণয়া মুগ্ধ হয়ে শুনল নির্মলের কথা৷ কী দারুণ করে কথা বলে। কথা, কাজ দুটিতেই কেমন বশ করে ফেলে। না জানি আগে কত মেয়ে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে? এই প্রশ্নটা করার খুব ইচ্ছে করলেও ইচ্ছেকে প্রধান্য দিতে পারল না প্রণয়া। হঠাৎ এই অস্বাভাবিক প্রশ্নে না জানি জাদুকর সাহেব প্রণয়াকে নিয়ে কীরকম ধারণা মনে পুষে ফেলে। তাই প্রণয়া রিস্ক নিল না।
আজও ইটের সরু রাস্তায় অটো দাঁড় করানো দেখল তারা। নুহাশ সাহেব আগেই মজিবকে দিয়ে অটো ঠিক করিয়ে রেখেছে। আজ মজিব অবশ্য অটোর পাশেই দাঁড়িয়ে। ওদের দুজনকে দেখে মজিব হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
--"তোমরা চলে আসছ? আজকে অটো পাইতে একটু দেরী হয়ে গেছিল আমার। তোমরা যাও, ভাড়া দিয়ে দিছি। আমিও আসি!"
বলেই মজিব চলে গেলেন। প্রণয়া পিছে উঠতে নিতেই দেখল আজও দুই সিটের অটো। প্রণয়া মুচকি হেসে উঠে বসল। নির্মল একটু ঘাড় কাত করে দেখে নিল অটোর ভেতর। নির্মল তাই বলল,
--"আচ্ছা, আমি তবে চালকের সাথেই বসছি।"
--"একদম না। সামনের ঝাকুঁনি বেশ কঠিন। আমি নিজেই তো আতঙ্কে থাকি, পিছে এসেই বসুন।"
নির্মল আগের দিনের মতোই কিছুটা জড়তা নিয়ে প্রণয়ার পাশে বসল৷ প্রণয়া নির্মলের সান্নিধ্য চাইছে এমন নয়৷ সেই রাস্তাটা আসলেই বাজে ধরণের ভাঙা৷ ভাঙা রাস্তায় তীব্র ঝাঁকুনি দুই একজন অটো থেকে পড়ে গিয়েছে এরকম রেকর্ডও আছে সেই পথটায়। এ নিয়েই প্রণয়ার মনে সঙ্কা। আমরা যাদের ভালোবাসি তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন, চিন্তা থাকবেই। তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রণয়ার এই দুশ্চিন্তার জন্যেই সহজে নির্মলকে সামনে বসতে দিতে চাচ্ছে না।
ভার্সিটি পৌঁছাতেই প্রণয়া অটো থেকে নেমে আশেপাশে সতর্ক নজর ফেলল। নির্মল অটোতে বসেই প্রণয়াকে ডাকল।
--"আজ কখন ক্লাস শেষ হবে?"
প্রণয়া সময় বলল। নির্মল বলল,
--"আচ্ছা, আমি তাহলে তখনই আসব নাহয়।"
প্রণয়া গলা খাদে নামিয়ে বলল,
--"কী দরকার কষ্ট করে আসার?"
--"কষ্ট কিসের? আমার জন্য তো ভালোই হচ্ছে, পথঘাট চিনতে পারছি। এখন ভেতরে যান, দেরী হচ্ছে।"
প্রণয়া ভার্সিটিতে প্রবেশ করে পিছু ফিরে তাকাল। নির্মল তখনো ঠায় একই স্থানে বসে। নির্মলকে তার যাওয়ার পানে চেয়ে থাকতে দেখে প্রণয়ার মনের আকাশে রংধনু দেখা দিল। সে প্রচন্ড আনন্দের সাথে ভেতরে চলে গেল। কে বলেছে ভালোবাসলে বড়ো প্রাপ্তির প্রয়োজন হয়? ভালোবাসার অমূল্য সুখগুলো যে ছোটো ছোটো যত্ন, মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ভালোবাসার লুকানো সুখগুলো উক্ত মানুষকে ছুঁয়ে দিলে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ 'সে'।
সন্ধ্যার পরপর যখন নির্মল এলো প্লাবনকে পড়াতে, তখন প্রথমবারের মতো নির্মলের জন্যে নিজ হাতে চা বানাতে হাত লাগায় প্রণয়া। নির্মলকে ঘিরে তার বুকে লালিত অনুভূতি যেদিন থেকে নিজের কাছে প্রকাশ পায়, সেদিন থেকেই নিজের সাধাররণ আচরণে আমুল পরিবর্তন খেয়াল করে সে। প্রেমের হাওয়ায় যেন এক নিমিষেই আবারও সে কিশোরীতে পরিণত হয়েছে৷ কিশোরী অবস্থাতেও এরকম পাগলাটে ভাবনায় অস্থির ছিল না প্রণয়া। ইদানীং কী হলো, কে জানে?
ফাহিমা রান্নাঘরে আসতেই দেখলেন মেয়ে চায়ের জন্য চুলোয় পাতিল বসিয়েছে। তা দেখে ফাহিমা ভ্রু কুচকে বললেন,
--"আমি তো চা বানিয়ে রেখেছি, নতুন করে বানাচ্ছিস কার জন্য?"
প্রণয়া নির্লিপ্ত গলায় বলল,
--"কিছুটা চা হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে। বাকি যতটুকু ছিল, আমি খেয়ে ফেলেছি।"
ফাহিমা হতাশ নজরে তাকাল মেয়ের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
--"দেখে-শুনে কাজ করতে পারিস না? এত অকর্মা কেন?"
--"চা বানাচ্ছি তো, আস্তে বলো। নয়তো উপরে শব্দ চলে যাবে।" মিনমিন করে বলল প্রণয়া।
--"তাই উচিত, শুনুক সবাই। তুই কতটা বেপরোয়া, অকর্মা সেটা সবাই শুনুক। আমার কতগুলো চা নষ্ট করলি তুই!"
--"চায়ের মাঝেই বাস করছ, চা পাতা লাগলে দুই একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আসবা। ঝগড়া করছ কেন?"
ফাহিমা রাগের বশে কথার খেই হারালেন। বিড়বিড় করে দ্রুত চলে গেলেন রান্নাঘর ছেড়ে। প্রণয়া ততক্ষণে চায়ে মনোযোগ দিল। প্রণয়া কিছু পারুক বা না পারুক, তার চা বানানোর হাত দারুণ। একবার তার হাতের চা খেলে সেই চায়ের স্বাদ একদম মুখে মিশে যাবে, কিছুতেই ভোলার মতো নয় সেই স্বাদ। যথারীতি নাশতা নির্মলকে দিয়ে আসল সে।
--------------
ঘন্টাখানেক লাগিয়ে প্রণয়া বাইরে সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বসে বসে রাতের আকাশ দেখছে। আকাশে এক টুকরো চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আজকের আকাশ বেশ পরিষ্কার। গুড়ি গুড়ি কিছু তারাও দেখা যাচ্ছে। একমনে যখন চাঁদের রূপের রহস্য খুঁজে বেড়াচ্ছিল তখন হঠাৎ পেছন থেকে প্রিয় পুরুষের ভারী কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
--"প্রণয়া!"
প্রণয়া চমকে পিছে ফিরে তাকায়। মাথা উঁচিয়ে চাইতেই দেখল নির্মল দাঁড়িয়ে। প্রণয়া চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
--"জি?"
নির্মল বলল,
--"চা টা কী আপনি বানিয়েছেন?"
চায়ের কথা শুনে প্রণয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। মিনমিন করে বলল,
--"হ্যাঁ।"
প্রণয়া অস্বস্তিতে পড়ে যায়। না জানি আনমনে কোনো ভুল করল কি না চায়ে। শখের মানুষের জন্য নিজ উদ্যোগে কিছু করতে গেলে তার পছন্দ হবে কিনা এই ভেবে নানান দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে হয়, যা এই মুহূর্তে প্রণয়ার ক্ষেত্রে হচ্ছে। সে মুখ ছোটো করে জামার কিছুটা অংশ খামচে ধরেছে।
প্রণয়ার ভাবনার উলটোটাই হলো। নির্মল স্মিত হেসে প্রশংসার সুরে প্রণয়াকে বলল,
--"দারুণ চা বানান আপনি। চা বানানো একটা আর্ট, আপনি সেই আর্টে চমৎকার দক্ষ। আমার তো আপনাকে ফুল রেটিং দিতে ইচ্ছে করছে।"
প্রণয়ার চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। চোখ নামিয়ে অধর প্রসারিত করে প্রণয়া বলল,
--"ধন্যবাদ।"
--"আরেক কাপ চায়ের বায়না করে গেলাম। যখন খুশি খাওয়াতে পারেন। চায়ের রাজ্যে এসে চা কে 'না' করে দেওয়া ঘোর অপরাধ। আজ আসছি, কেমন?"
প্রণয়া আলতো মাথা নাড়ায়। নির্মল যেতে নিয়ে আবার থেমে যায়।
--"কাল যাবেন কলেজ?"
--"না।"
--"ঠিক আছে। তবে এই ঠান্ডায় বাইরে থাকবেন না, সিজন চেঞ্জ হচ্ছে। জ্বর-টরের কবলে পড়তে পারেন, ভেতরে চলে যান।"
নির্মল চলে যেতেই প্রণয়ার অধর জুড়ে থাকা হাসি আরও প্রসারিত হলো। সে আকাশের পানে চেয়ে আপনমনে গুনগুনিয়ে গান গাইল। নির্মলের ছোটো ছোটো যত্ন কিংবা প্রশংসা, প্রণয়াকে দিনকে দিন আরও দুর্বল করে দিচ্ছে তার প্রতি। কেমন সুখ সুখ অনুভূতিতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলছে সে। নির্মলের কথামতোন প্রণয়া বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। বাধ্য মেয়ের মতো ভেতরে চলে গেল।
চলবে—
নোটঃ গল্পটা আমি রেগুলার লিখতেই পারছি না। কী যে একটা অবস্থা। কেমন লেগেছে জানাবেন পাঠকমহল। আপনাদের মন্তব্য কিন্তু তেমন পাচ্ছি না, মন খারাপ হয়।'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৮|
লাবিবা ওয়াহিদ
নীলুফার সময়গুলো কাটে প্রায় একা একাই। শুয়ে, বসে, হাঁটা-চলা করে, ফাহিমার সাথে এভাবেই। বাসার সামনে হাঁটার জন্য জায়গা আছে। এখানে পায়চারী করলেই মন ফুরফুরে হয়ে যায়। তবুও এই একাকিত্বে স্বামী, সন্তানকে খুব মনে পড়ে। না চাইতেও আনমনে স্মৃতিচারণ করতে শুরু করে দেয় অতীত জীবনের। সোনালি দিনগুলো ভাবতে গিয়ে আপনমনেই হেসে উঠেন তিনি। নিজের সেই বাড়ি, সংসার সব তার মাথায় নাড়া দিয়ে ওঠে। সারাজীবন এক জায়গায় কাটিয়ে জায়গা বদলে তিনি খুব একটা খুশি হয়েছেন তেমনটাও নয়। অধিকাংশ নারীরাই চায় তার শেষ জীবনটা ভালোবাসার মানুষটার স্মৃতি নিয়ে তার বাড়িতে কাটাতে। তেমন চাওয়াটা নীলুফারও ছিল কিন্তু ভাগ্য তাঁর সহায় ছিল না।
নীলুফার চুলোয় রান্না বসিয়ে আনমনেই ভাবছিলেন সেসব। হঠাৎ পেছন থেকে মেয়েলি গলা শুনে পেছন ফিরে তাকাল। প্রণয়া দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরের দরজায়। তাকে দেখে নীলুফার মুখের হাসি চওড়া হলো।
--"আরে, প্রণয়া মা। এসো এসো।"
প্রণয়া ত্রস্ত পায়ে ভেতরে আসল। চুলোর কাছে-পিঠেই আরেকটা মোড়া ছিল। সেটা নিজের পাশে রেখে প্রণয়াকে বসতে ইশারা করলেন। প্রণয়াও হেসে বসে পড়ল। সময়টা এখন দুপুর।
প্রণয়া বসতে বসতে বলল,
--"প্রায় একাই থাকেন এখানে, তাই ভাবলাম আপনাকে একটু সময় দেওয়া যায়।"
নীলুফা হাসল। কড়াইয়ে খুন্তি নেড়ে বললেন,
--"ভালো করেছ। আসবে, তুমি আসলে খুব ভালো লাগবে আমার। কী খাবে বলো? দুপুরে আমাদের সাথে ভাত খাবে কেমন?"
প্রণয়া চোখ বড়ো করে বলল,
--"আরে না, না আন্টি। আমি খেয়েই এসেছি। আর কিছু খাব না।"
--"এ আবার কেমন কথা? এসেছ, আর বলছ খাবে না?"
নীলুফা জোরাজুরি করতে লাগল। আর প্রণয়া বেকায়দায় পড়ে যায়৷ তবুও নীলুফাকে কিছু একটা বুঝ দিয়ে রাজি করায়।
প্রণয়া মিনমিন গলায় বলল,
--"নির্মল ভাইয়া কী দুপুরে বাসায় আসে?"
"ভাইয়া" সম্বোধন করা প্রণয়ার জন্য কিছুটা কষ্টসাধ্য। কিন্তু তবুও, নির্মল তার থেকে বয়সে অনেকটা বড়ো। চাইলেও তাকে নাম ধরে ডাকাটা ভালো দেখাবে না। এজন্য বুকে পাথর চেপেই এই শব্দটা উচ্চারণ করতে হয়েছে তাকে।
নীলুফা বললেন,
--"হ্যাঁ, তবে মাঝেমধ্যে আসতে পারে না। নুহাশ ভাইয়ের সাথেই থেকে যায়।"
প্রণয়া উত্তরে "ওহ" বলল। সে আরও কিছুক্ষণ সময় কাটালো নীলুফার সাথে। নীলুফা মানুষটার সাথে বেশ সহজেই মিশে গেছে প্রণয়া। প্রণয়া মোটেও মিশুক নয়। একা থাকার দরুন প্রথম প্রথম কারো সাথেই সে মিশতে পারে না। তার কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। নীলুফারা এসেছে প্রায় মাস দুয়েক হয়ে গিয়েছে। তাই মেশাটা কঠিনও ছিল না।
বিকালে প্রণয়া যখন উঠোনে পায়চারী করছিল তখনই নির্মল আসে। প্রণয়া ঘাড় বাঁকিয়ে নির্মলের দিকে তাকালো। আজ নির্মল দুপুরে খেতে আসেনি। এটা সে নজরে রেখেছিল বলেই বুঝতে পেরেছে। নির্মল স্মিত হেসে বলল,
--"সবসময় কী আকাশ এবং চায়ের সঙ্গেই আলাপন করেন? আর কোনো এক্টিভিটিস নেই?"
প্রণয়া অবাক হলো নির্মলের কথায়। একই সাথে মনে করারও চেষ্টা করল, আর কোনো এক্টিভিটিস তার আছে কিনা? কিন্তু এই মুহূর্তে বলার মতো কিছুই খুঁজে পেল না। তাই মুখ ছোটো করে প্রণয়া বলল,
--"না।"
নির্মল শুনলো নীরবে। তাদের কথার মাঝেই কিছু পর্যটক এলো। মজিব আশেপাশে নেই। কাজে কোথাও গিয়েছে হয়তো। এবারে প্রায় সাত থেকে আটজন ভার্সিটির ছেলে-মেয়ে এসেছে এখানে ছবি তুলতে, চা বিলাস একটু ঘুরে বেড়াতে। পর্যটকরা বাড়ি দেখে প্রতিবারের মতোই প্রশংসা করলো এবং ছবি তুলল। তবে এবার ঘটনা ভিন্ন হলো।
একজন মেয়ে আসল নির্মলের সাথে ছবি তোলার পারমিশন চাইতে। তা দেখে প্রণয়ার মনে হলো কেউ যেন যত্নের সাথে তার গা জুড়ে সুঁচ বিঁধিয়ে দিচ্ছে। প্রণয়া নাক-মুখ ঘুচে গম্ভীর হয়ে মেয়েটাকে দেখে চলেছে। মেয়েটা দেখতে সুন্দর-ই বলা যায়। পরেছে রঙিন কূর্তি এবং ডেনিম জিন্স। রিবন্ডিং করা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে আছে, আবার চুলে গুঁজে রেখেছে রঙিন সানগ্লাস।
এরকম একটা মেয়ে নির্মলের সান্নিধ্যে এসেছে কোন সাহসে প্রণয়া সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। অবশ্য নির্মল হাসি-মুখেই ছবি তুলতে বারণ করে দিলো। মেয়েটাকে এতে নিরাশ হতে দেখা যায়, আর প্রণয়াকে খুশি। মেয়েটার বন্ধুমহল থেকে একটা ছেলে চা বিলাস সম্পর্কে জানতে চাইলো। নির্মল যতটুকু জানে তা স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করল। এভাবে কিছুটা ভাব হয়ে যায় তাদের সাথে নির্মলের। প্রণয়া মুখ বাঁকিয়ে মিনমিন করে বলল,
--"আবারও কথার জাদু প্রয়োগ করছে মানুষের উপর।"
নির্মল এবার তাকাল প্রণয়ার দিকে। প্রণয়ার অস্পষ্ট কথা শুনতে পায়নি বলেই তাকিয়েছে। প্রণয়াও কিছুটা চমকে ওঠে নির্মলের তাকানো দেখে, ভুলবশত কিছু শুনে ফেলেনি তো? নির্মল বলল,
--"কিছু বললেন?"
প্রণয়া ঘনঘন মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ কিছু বলেনি।
নির্মল ওদের সাথে কথায় ব্যস্ত থাকা অবস্থায় কীভাবে প্রণয়াকেও খেয়াল করল ভাবতেই প্রণয়ার অবাক লাগছে। নির্মলের পাশের মেয়েকে যেন এতক্ষণে খেয়াল করল সবাই। প্রণয়া পেছন দিক ফিরে নিজেকে প্রায় আপাদমস্তক শাল দিয়ে আবৃত করে রেখেছে। তাই বোঝার সাধ্য নেই যে সে অল্প বয়সী মেয়ে। প্রণয়াকে লক্ষ্য করে একজন ছেলে নির্মলের উদ্দেশে বলল,
--"ভাই কী এখানে দাঁড়িয়ে প্রেম করছিলেন নাকি? মনে হচ্ছে ভুল সময়ে এসে পড়লাম।"
এ কথা শুনে তাদের মধ্যে একজন মেয়ে মুগ্ধ গলায় বলল,
--"হায়, চা বিলাসে প্রেম। ব্যাপারটা কত সুন্দর।"
নির্মল হেসে তাদের ভুল ভাঙাতে বলল,
--"তেমন কিছু নয়। আমাদের মধ্যে প্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই।"
প্রণয়া ওদের কথা শুনে ভালো লাগায় এক মুহূর্তের জন্যে আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল। পরমুহূর্তেই আবার নির্মলের কথা শুনে ধপ করে জমিনে এসে পড়ল। মুখটা মলিন করে চা বাগানের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো। শুধু শুধুই স্বপ্নে ভাসছিল সে। তবুও, কিছু স্বপ্ন স্বস্তির, ভালো লাগার। ভালো লাগার স্বপ্নে কে না ভাসতে চাইবে?
ওরা বেশিক্ষণ দাঁড়ায়নি। যাওয়ার আগে সেই ছবি তুলতে চাওয়া মেয়েটা নির্মলের কাছে ফেসবুক আইডি বা মোবাইল নম্বর চেয়ে বসলো। প্রণয়া তখন নাক কুঁচকে তাকায় নির্লজ্জ মেয়েটার দিকে। কী পরিমাণের নির্লজ্জ হলে অল্প সময়ের পরিচিত ছেলের থেকে এভাবে নাম্বার চায়?
বিরক্তি ধরে রাখতে না পেয়ে প্রণয়া এতক্ষণে মুখ খুলল,
--"আমরা সাধা-সিধে পাহাড়ি মানুষজন। আমাদের এখানে কোনো মেয়ের, ছেলেদের থেকে নাম্বার চাওয়াটা ভালো চোখে দেখে না। তাই আপনার এই নাম্বার চাওয়াটাও আমি ভালো চোখে দেখছি না। চা বিলাস ঘুরেছেন, ছবি তুলেছেন, এবার আসতে পারেন!"
ছেলে-মেয়েগুলো একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করল। নির্মলও নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো প্রণয়ার দিকে। প্রণয়া প্রত্যেকের নজর অবজ্ঞা করে অন্যদিকে ফিরে তাকালো। সেই মেয়েটা কিছুটা লজ্জিত হলো বোধ হয়। নির্মলকে "দুঃখিত" প্রকাশ করে বন্ধুমহল মিলে চা বিলাস প্রস্থান করলো। নির্মল তাদের থেকে নজর ঘুরিয়ে প্রণয়ার দিকে তাকালো।
ফিচেল হেসে বলল,
--"প্লাবন বলেছিল আপনার মধ্যে চাপা রাগ এবং বিরক্তি ছাড়া অন্য কোনো রূপ সে দেখেনি। প্রথমে বিশ্বাস করতে চাইতাম না, আজ নিজ চোখে দেখে বিশ্বাস হলো।"
--"কেন? বিরক্ত প্রকাশ করা পাপ নাকি?"
--"একদম না। নিজের ভালো-মন্দ অনুভূতিদের চেপে না রেখে প্রকাশ করা ভালো। নয়তো বুকের মধ্যে খসড়া কথার পাহাড় জমে যায়। তখন দমবন্ধকর, জটিল অবস্থা তৈরি হয়।"
প্রণয়ার বিরক্তি কেটে গেল। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
--"মেয়েটা অহেতুক বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেছিল, আমার এই ধরণের গায়ে পড়া মেয়ে পছন্দ নয়।"
--"যার প্রকৃতির সাথে মধুর সম্পর্ক, তার কাছে এই ব্যাপারগুলো ভালো লাগবে না, স্বাভাবিক।"
প্রণয়া আহত অনুভব করলো নির্মলের কথায়। এর মানে কী প্রণয়া ওভাবে না বললে নির্মল সত্যি সত্যি তাকে নাম্বার দিয়ে দিত? বুক পোড়া অনুভূতির সাথে অভিমানী গলায় বলল,
--"আমি কী আপনাদের মধ্যে কাঁটা হয়ে গেলাম নাকি? আমি কিছু না বললে বুঝি নাম্বার দিয়ে দিতেন?"
প্রণয়ার কথায় নির্মল হেসে ফেলল। হাসি কোনো রকমে থামিয়ে বলল,
--"আমি এটা বুঝাইনি, প্রণয়া। সত্যি বলব?"
--"বলুন।"
--"আমারও এই ধাচের মেয়ে একদম পছন্দ নয়। থাকুন, আমি বাসায় যাই। একটু পর তো দেখা হচ্ছেই।"
প্রণয়া যেন প্রাণ ফিরে পেল। নির্মল চলে গেলেও অজস্র ভালো লাগায় প্রণয়া বুদ হয়ে রইলো। মোহ যেন কাটছেই না তার।
-----------------------
কিছুদিন পর নির্মল হুট করে এক বাদামী প্যাকেট ধরিয়ে দেয় প্রণয়ার হাতে। প্রণয়া প্যাকেট ধরেই বুঝল দারুণ ভারী সেটা। কৌতুহলী গলায় বলল,
--"কী আছে এতে?"
নির্মল মুচকি হেসে বলল,
--"কিছু উপন্যাসের বই। যার প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা আছে সে অনায়াসেই বইয়ের পাতায় মিশে যেতে পারবে।"
প্রণয়া লাজুক হেসে চটজলদি প্যাকেট খুলতে শুরু করে দেয়, উপন্যাসের বই তাও কি না নির্মলের দেওয়া উপহার? প্রণয়া শত আনন্দের ভীড়ে নির্মলকে ধন্যবাদ দিতে ভুলে যায়। নির্মল আবার বলল,
--"অবসর সময়গুলো বই পড়ে কাটাবেন নাহয়, একঘেয়েমি লাগবে না।"
নির্মল চলে আসতে নিলে প্রণয়া তাকে পিছুডাক দিলো। নির্মল পিছে ফিরে তাকাতেই প্রণয়া হেসে বলল,
--"ধন্যবাদ।"
নির্মল উত্তরে মুচকি হেসে চলে গেল। প্রণয়া বইয়ে চোখ বুলিয়ে আপনমনে বলল,
--"ধন্যবাদ, জাদুকর সাহেব। আপনাকে দেওয়া জাদুকর সাহেব নামটা ভুল দেইনি, আপনি আসলেই আমার মন ভালো করে দেওয়ার প্রেম জাদুকর।"
চলবে—
বিঃদ্রঃ আপনারা চাইলে আজ আরেকটি পর্ব আসবে। পড়তে চান তো? তার জন্য কিন্তু গঠনমূলক মন্তব্য করতে হবে।
ভুলত্রুটি ক্ষমাসুলভ নজরে দেখবেন।'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ০৯|
লাবিবা ওয়াহিদ
সেদিনের পর থেকে প্রণয়ার দিনগুলো বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকেই কাটছে। বই একেক করে শেষ করার পর তার বইয়ের প্রতি আরও নেশা কাজ করে। বই পড়া রীতিমতো প্রণয়ার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রিয় মানুষের দেওয়া প্রিয় অভ্যাস হারাতে দেয় কী করে? তাইতো নুহাশ সাহেবের কাছে গিয়েও বলল তার আরও বই চাই।
নুহাশ সাহেব মেয়ের চাওয়ায় ভীষণ খুশি হলেন যেমন, তেমনই নির্মলের প্রতি তার সন্তুষ্টি আরও যেন বেড়ে যায়। শুনেছেন নির্মলই নাকি উপন্যাসের বই তাঁর মেয়েকে উপহার দিয়েছিল। নুহাশ সাহেব এতে হেসে জানান বইয়ের লিষ্ট দিতে, উনি আনিয়ে দিবেন।
সে কথা শুনে প্রণয়ার মুখ-চোখে আনন্দাভাব ফুটে ওঠে। সেই আনন্দ নুহাশ সাহেব চোখ জুড়িয়ে দেখেন। মেয়ে যে সারাদিন একা শুয়ে বসে কাটান সেটা নুহাশ সাহেব খুব করে বুঝেন। এ নিয়ে বেশ চিন্তিতও ছিলেন তিনি। আদরের মেয়েটা একাকিত্বে না জানি ভুল পথে চলে যায়। যদিও তিনি প্রণয়াকে চিনেন, তবুও। বাবা-মায়ের সন্তানকে ঘিরে দুশ্চিন্তা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর এই মুহূর্তে নির্মলই তাকে স্বস্তিটা দিলো।
প্রণয়া চিন্তা করছিল, সে বইয়ের যুগে নতুন। তার জানা নেই, কোন বই ভালো? পড়লে স্বস্তি দিবে? সে তো এসবের কিছুই জানে না। তাই ভাবলো এবারও নির্মলের পছন্দে বই কিনবে।
বিকালে প্রণয়া ঝুল বারান্দায় পাটি বিছিয়ে শুয়ে আছে। দুই হাতে মেলে ধরে আছে একটি বই। গোটা গোটা বাংলা অক্ষর পড়ার ফাঁকে আনমনে আকাশের পানে চাইছে। এই মুহূর্তে সে যেই বইটা পড়ছে তার একতরফা প্রেমের কাহিনীটা প্রায় প্রণয়ার মতোই। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে গল্পের নারী চরিত্রটা তার ভালোবাসাকে পায়নি। প্রকাশই করতে পারেনি, তার আগেই ভালোবাসার মানুষটা অন্য একজনের ভাগ্যে লিখে গেছে। এটা পড়ার পর প্রণয়ার ভেতরটা বারংবার কেমন মুঁচড়ে উঠছিল, ক্ষণে ক্ষণে নাক টানতে শুরু করে দেয়। অজান্তেই চোখের কোণে অশ্রু জমে যায়। তার মনে হচ্ছে যেন মেয়েটার জায়গায় সে আর ছেলেটা নির্মল।
এই প্রথম বুকভরা হাহাকার, না পাওয়ার ভয় প্রণয়া অনুভব করলো। এতদিন যাবৎ শুধু ভালোবাসাটাই বুঝেছে, কিন্তু আগামী ভবিষ্যৎ যে কতটা কঠিন হতে চলেছে সেটা প্রণয়া ভাবতে চাইছে না। ছোটো ছোটো সুখগুলো হারিয়ে ফেলার কথা ভাবলেও তার দম বন্ধ হয়ে আসে। আচ্ছা, নির্মলের দিক থেকে সাড়া আসলে কী খুব ক্ষতি হতো?
সেদিন অত্যন্ত মন খারাপের কারণে নির্মলের সামনে অবধি গেল না সে। রুমের লাইট বন্ধ করে অন্ধকারে চুপ করে শুয়ে রইলো। বাইরে থেকে যখন প্লাবনের সঙ্গে নির্মলের কণ্ঠস্বর ভেসে আসত প্রণয়ার মন চাইত ছুটে বাইরে যেতে৷ একপলকের জন্য নির্মলকে দেখা জরুরি। কিন্তু আজকের এই জরুরি অনুভূতিকে সে দাঁতে দাঁত চেপে দমিয়ে রাখল।
পরেরদিন নিত্যদিনের মতো করেই নাস্তার টেবিলে বসেছে সবাই। প্লাবনের চোখ তখনো ঘুমে ভার। ফাহিমা জোর করে উঠিয়েছে। প্লাবন এতে চরম বিরক্ত। আজ তার স্কুলে যাওয়ার একদমই নিয়্যত নেই। আজ একটা পরীক্ষা আছে স্কুলে, ক্লাস টেস্ট। ক্লাস টেস্টের নাম শুনলেই যেন তার গায়ে জ্বর আসে। তাই সে যেকোনো ভাবেই মাকে ইনিয়ে বিনিয়ে রাজি করাতে চেয়েছিল। কিন্তু তার মা সুঁচের ন্যায় সোজা। তাকে টলানো সহজ নয়। তবুও আজ সে হাল ছাড়বে না ভেবে নেয়।
নুহাশ সাহেব খেতে খেতে উষ্কখুষ্ক প্লাবনকে পরখ করে নিলেন। ভেবে-চিন্তে বললেন,
--"কী ব্যাপার প্লাবন? স্কুলের পোশাক পরোনি কেন?"
প্লাবনের কিছু বলার আগেই ফাহিমা বললেন,
--"ছাড়েন ওকে। এই ছেলের সবসময় যত বাহানা!"
নুহাশ সাহেব চুপ থাকলেন। প্লাবন বলল,
--"বাবা শোনো, আমি কিন্তু এখন মামার বাসায় যেতে চাই না। রোজ নির্মল ভাইয়ার কাছে পড়ছি। তাহলে আমি একদিন স্কুলে না গেলে কী হয়? রোজ রোজ এত পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে স্কুল যেতে ভালো লাগে না বাবা। আজকে যাব না, মাকে বলো না!"
নুহাশ সাহেব ছেলের দিকে তাকালেন। প্লাবন এক বুক আশা দিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে। নুহাশ সাহেব খাবার চিবুতে চিবুতে বললেন,
--"আচ্ছা, আজ যাওয়া লাগবে না। ফাহিমা, ওকে আর জোর করিও না আজ। এছাড়া নির্মলও দুদিন পড়াতে আসবে না।"
নির্মলের কথা শুনে প্রণয়ার গলায় খাবার আটকে গেল। কোনোরকমে গ্লাসভর্তি পানি খেয়ে নিল সে। ফাহিমা অবাক কণ্ঠে বললেন,
--"কেন আসবে না?"
প্রণয়াও একই ভাবে কৌতুহলী। নুহাশ সাহেব বললেন,
--"বাজারের কাছাকাছি একটা জমি আছে না একটা? ওটা তো অনেকদিনই খালি পড়েছিল। বিক্রি করব করব করে আর করা হয়ে উঠছিল না। ওটা নির্মল নিবে বলল।"
ফাহিমার অবাকের সুর পালটালো না। বললেন,
--"তাহলে সুনামগঞ্জ গেছে কেন?"
--"দোকান একটা আর একটা জমি বিক্রি করবে, সেসব ঝামেলা আর কাগজপত্র গোছাতেই গিয়েছে। সেখান থেকে সব ঝামেলা মিটিয়েই এখানে জমি কেনার কাগজপত্রে হাত দিবে।"
ফাহিমা বললেন,
--"হোক তাহলে সব ধীরে-সুস্থে। ছেলেটা অল্প বয়সে অনেক দুঃখ সয়েছে। এছাড়াও নির্মল এখন বিয়ের উপযোগী। পাত্রীপক্ষ তো আর ওকে খালি পকেটে মেয়ে দিবে না তাই না? হয়তো সব ভেবেই নীলুফা আপা নির্মলকে সব বলেছেন। সেদিনও আপা বলল নির্মলকে বিয়ে দিতে চান, কিন্তু ঝামেলার প্যাচে পড়ে কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।"
প্রণয়ার গলা দিয়ে খাবার নামলো না একদম। একে তো নির্মল নেই, কেমন শূন্য শূন্য লাগছে, এমন অবস্থায় মায়ের এই ধরণের কথাবার্তা। প্রণয়া যেন স্বস্তিতে নিঃশ্বাসও ফেলতে পারছে না। কান্না দলা পাকিয়ে গলায় এসে জমেছে। এই প্রথম প্রণয়া উপলব্ধি করল তার এবং নির্মলের অবস্থানের ব্যাপক ফারাক। যাকে সমাজ উঁচু-নিচু নাম দিয়েছে।
প্রণয়া শক্ত হয়ে চেয়ে রইলো খাবারের প্লেটে। একটা রুটির অর্ধেক খেয়েছে মাত্র, তবুও পেট খুদায় জ্বলছে না। নুহাশ সাহেব এবার প্রণয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,
--"তোমার বই কেনার কী খবর? টাকা তো নিলে না!"
প্রণয়া কথা বলার শক্তি পেল না। মুখ খুললেই যেন কেঁদে ফেলবে ভাব। ঘনঘন পলক ফেলে কান্নার দমক থামিয়ে প্রণয়া বলল,
--"নির্মল ভাইয়া আসুক, আগে। তার থেকে লিষ্ট নিয়ে তোমাকে জানাব।"
--"আচ্ছা, মা। জানিয়ে দিয়ো।"
প্লাবন সারাদিন টিভিতে কার্টুন দেখে, বাইরে বাইরে ঘুরে বেরিয়ে কাটালো। আর প্রণয়া ঘর ছেড়েই বেরুলো না তেমন। দুপুরে চোখ-মুখ ধুঁয়ে নিচে যেতেই দেখলো নীলুফাকে ফাহিমা নিয়ে এসেছেন। নির্মল নেই, এজন্য তিনি আজ রাতটা নীলুফাকে তাদের সাথেই রাখবেন জানালেন। শুধু আজকের রাত নয়, নির্মল না ফেরা অবধি ফাহিমা নীলুফাকে এ বাড়ি থেকে নড়তেই দিবেন না বলে জানালেন।
নীলুফাকে দেখে প্রণয়ার বুকের ভারী ভাব আবারও বেড়ে গেল। আচ্ছা, ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্টটা এত তীব্রতর কেন? ভালোবাসা না পেলে কেন ভেতরটা গুমরে ওঠে? প্রণয়া কেন নিজেকে সামলাতে পারছে না? ক্ষণিকের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শক্ত করলো সে।
-------------------
কয়েকদিন কেটে গিয়েছে। নির্মল এখনো ফিরেনি। দোকান, জমি বিক্রি করতে গেলে প্রায়ই ঝামেলার কবলে পড়তে হয়। নির্মলও সেসব খুঁটিনাটি ঝামেলায় জড়িয়ে গেছে। সেগুলো একা হাতে সামাল দেওয়াই তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে গিয়েছে। এজন্য নুহাশ সাহেবের অনুরোধে প্রণয়ার মামাও তাকে সাহায্য করছেন।
প্রণয়া ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে খালি অটর অপেক্ষা করছে। তার পাশে রয়েছে পিয়াসা। পিয়াসা এবং সে একসঙ্গেই বাড়ি ফিরবে। প্রণয়ার উদাসীন মুখ চোখ এড়ায় না পিয়াসার। এজন্য জিজ্ঞেস করল,
--"প্রণয়া, তুমি কী ঠিক আছ?"
প্রণয়া চমকে তাকায় পিয়াসার দিকে। পরমুহূর্তেই হেসে বলল,
--"ঠিক না থাকার কী আছে?"
পিয়াসা তবুও বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। প্রণয়া তাড়া দিল অটোর জন্য। সে ভার্সিটির সামনে থাকতে চাচ্ছে না। কিন্তু পিয়াসা অপেক্ষা করতে বলল। এর মাঝেই হঠাৎ প্রণয়ার সামনে এসে দাঁড়ালো সেই কুৎসিত মানসিকতার লোক। তাকে দেখে প্রণয়া অনেকটা ঘাবড়ে যায়। এর মাঝে বেশ কয়েকদিন এই লোক প্রণয়ার পথ আগলে দাঁড়িয়েছে, তাকে বাজে কথা বলেছে।
লোকটা এদিক সেদিক না চেয়েই চোখ ভরা কাম নিয়ে বলল,
--"নাহ রে ময়না, তোরে বিয়া না কইরে থাকা যাচছে না। তোরে আমার লাগবই।"
পিয়াসাও চমকালো এই লোকের কথা শুনে। লোকটার চোখ জুড়ে থাকা লালসা তারও চোখ এড়ালো না। সে প্রণয়াকে টেনে এগোতে এগোতে বলল,
--"কিছুদূর হেঁটেই যাই নাহয়।"
প্রণয়া স্বভাবতই সেরকম বান্ধবী বানাতে পারেনি। উপরে উপরে সবার সাথে মোটামুটি ভাব। কিন্তু এই মুহূর্তে পিয়াসা যেভাবে তাকে সুরক্ষিত করল ভাবতেই প্রণয়া অনেকটা নরম হলো পিয়াসার প্রতি। পিয়াসা সাহসী, এসব লোককে সে ভালো মতোনই শায়েস্তা করতে পারে। এজন্য টুকটাক প্রণয়া তার উপর গলে ছিল। আজকের মতো পরিস্থিতিতে পিয়াসা যেভাবে তার ঢাল হলো, তাতে প্রণয়া পিয়াসাকে বন্ধু ভাবা শুরু করে দিল অনেকটাই। ওদিকে পিয়াসা ধরে নিল প্রণয়ার মন খারাপের কারণ এই বাজে লোকটা। নিশ্চয়ই বেশ কিছুদিন যাবৎ তাকে উত্ত্যক্ত করছিল?
অটো প্রণয়ার গলিতে থামতেই পিয়াসাও তার সাথে নেমে গেল। এই ব্যাপারে নুহাশ সাহেবকে জানানো জরুরি। প্রণয়াও আটকালো না। নিজে বলতে না পারুক, আরেকজন তো বলছে। এ-ই বা কম কিসের?
-----------------------
প্রণয়া দুদিন যাবৎ ভার্সিটি যায়নি। বলা বাহুল্য নুহাশ সাহেবই যেতে দেননি। সেদিন পিয়াসার মুখে সব শুনে সে হতভম্ভ হয়ে পড়েছিল। লোকটার নাম আনোয়ার। বউ পি*য়ে তালাক দেওয়ার গুঞ্জন পুরো দমে ছড়িয়ে আছে। সেই থেকে আনোয়ারকে সবাই বাঁকা চোখেই দেখে৷ এছাড়াও আনোয়ারের মধ্যে দোষের অভাব নেই। গাঞ্জা টানে, জুয়া খেলে, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করেছে এরকম বহু রেকর্ড আছে তার। নুহাশ সাহেব এতদিন চায়ের টং কিংবা বাজারে ভাসা ভাসা শুনেছিল এই লোকের কথা। সঙ্গে কিছুদিন যাবৎ এও শুনেছেন আনোয়ারের শক্ত নজর পড়েছে প্রণয়ার উপর। নুহাশ সাহেব ব্যাপারটা আমলে নেননি। এখন পিয়াসার মুখে যা শুনলো তাতে এই ব্যাপার আমলে না নিয়েও থাকা যাচ্ছে না।
নুহাশ সাহেব এবং ফাহিমা সমান তালে চিন্তিত মেয়েকে নিয়ে। মেয়েকে সবসময় চোখে চোখে রাখছেন তারা। এমনকি প্রণয়াকে বাড়ির সামনের উঠোনেও যেতে দিচ্ছেন না। মজিব সবসময় কড়া নজরদারির সাথে বাইরের বেতের সোফায় বসে থাকেন। হাতে থাকে নুহাশ সাহেবের বাবার এক রাইফেল। এটার খুব যত্ন নিতেন নুহাশ সাহেবের বাবা। বাবার পর নুহাশ সাহেব এটার রক্ষণা-বেক্ষণ করেন। তাইতো আজ অবধিও এটা নতুনের মতো চকচক করছে।
এতকিছুর মধ্যে বিরক্ত শুধু প্রণয়া। সামান্য তিল যে তাল অবধি গড়াবে কে জানত? এখন যেন ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে। ঘরে যত বন্দী থাকছে নির্মলের ভাবনাও তাকে আরও গাঢ় করে আষ্ঠেপৃষ্ঠে রাখছে। কয় দফা যে কেঁদেছে সেটা শুধু সেই বলতে পারবে। ওদিকে নির্মলও আসছে না। কেন আসছে না? প্রণয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে যেমন।
ফাহিমা মেয়ের চিন্তায় প্রায় অসুস্থ হয়ে গিয়েছেন। তার উপর নুহাশ সাহেবকেও কেমন চিন্তিত দেখছেন। স্বামীর মুখে শুনেছেন আনোয়ারের সাথে উনার পথে দেখা হয়েছে। দেখা হতেই নাকি আনোয়ার নুহাশ সাহেবকে তার মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব দেন। এতে নুহাশ সাহেবের গা ঘিনঘিন করে উঠেছিল। নুহাশ সাহেব সাফ গলায় বারণ করলেও আনোয়ার তাকে ঠান্ডা মাথায় মেয়েকে নিয়ে হুমকি দিয়ে চলে যায়। এমতাবস্থায় নুহাশ সাহেবও মেয়ের সুরক্ষা নিয়ে দারুণ চিন্তিত। সে চাইলেই মামলা দিয়ে আনোয়ারকে জেলের ভাত খাওয়াতে পারবেন বহুদিন, কিন্তু আশেপাশে অনেক আনোয়ার ঘুরা-ফেরা করছে। নুহাশ সাহেব কয় আনোয়ার থেকে বাঁচাবেন মেয়েকে?
ফাহিমা একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাঁর বড়ো ভাই অর্থাৎ প্রণয়ার মামাকে বিস্তারিত জানান। নুহাশ সাহেবের আত্নীয় বলতে তেমন কেউ নেই যে তিনি এই বিপদে পরামর্শ নিবেন। জটিল সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তা বুঝতে পেরেই ফাহিমা বড়ো ভাইকে অনুরোধ করলেন যেন নুহাশ সাহেবের সাথে কথা বলে একটা সিদ্ধান্তে আসে। এভাবে ভয়ে ভয়ে তো আর দিন কাটানো যাচ্ছে না।
বোনের কথা চিন্তা করেই মামা আসলেন শ্রীমঙ্গল পরেরদিন। মুখোমুখি নুহাশ সাহেবের সাথে বসে আলোচনা করলেন এ বিষয়ে। নুহাশ সাহেব বিস্তারিত জানাতেই মামা বললেন,
--"আমার কাছে একটা সমাধান আছে নুহাশ।"
নুহাশ সাহেব যেন আশার আলো দেখতে পান। অস্থিরচিত্তে বললেন,
--"কী ভাইজান?"
মামা থেমে বললেন,
--"প্রণয়াকে বিয়ে করিয়ে দাও। বয়স অনুযায়ী মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত। তাই এই বিপদে বিয়ের চাইতে ভালো সমাধান আর নেই। বিয়েটা দিয়েই ওই জা*য়ারের নামে সোজা মামলা করে দিবা। তুমি চাইলে আমি চেনা-জানার মধ্যে ছেলে দেখতে শুরু করে দেই। কী বলো?"
চলবে—
বিঃদ্রঃ কী হলো, ঘটনা দেখছি ঘুরে গেল। এখন কী হবে? গঠনমূলক মন্তব্যের অপেক্ষায় রইলাম পাঠকমহল।'আকাশ তীরে আপন সুর'
|পর্ব ১০(শেষাংশ)|
লাবিবা ওয়াহিদ
নির্মল ফিরলো পরেরদিন। নুহাশ সাহেব এদিকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন প্রণয়ার বিয়ে দিবেন। এ কথা শোনার পর থেকে প্রণয়ার খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। সারাক্ষণ সে কান্নাই করে যাচ্ছে। সে বিয়ে করবে না, ফাহিমাকে বারবার বলেছে বাবাকে বোঝাতে। কিন্তু ফাহিমা মেয়েকে এই পর্যায়ে বিয়ের ব্যাপারে বোঝাতে লাগলেন। তাঁর নিজেরও মনে হয় না নুহাশ সাহেব ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বরং মেয়েকে বাঁচাতে এর চাইতে ভালো উপায় হতেই পারে না।
কান্নারত প্রণয়া উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। মজিব হাতে রাইফেল নিয়ে প্রণয়াকে কঠিন নজরদারিতে রেখেছে। নির্মল প্রণয়াকে দেখে এগিয়ে আসে। প্রণয়া নির্মলকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেলো। সে আড়ালে চোখ-মুখ ভালো করে মুছে নেয়। নির্মল প্রণয়াকে দেখে বলল,
--"আজ ভার্সিটি যাননি?"
প্রণয়া নাক টেনে নেতিবাচক মাথা নাড়ায়। প্রণয়াকে চুপসে যেতে দেখে নির্মল অবাক হলো। কিছু কী হয়েছে? নির্মল প্রশ্ন মনে দমিয়ে রাখল না। অস্থিরচিত্তে প্রশ্ন করলো,
--"কী হয়েছে প্রণয়া? সব ঠিক আছে তো?"
প্রণয়া এবার মাথা তুলে তাকায়। তার ফোলা চেহারা দেখে নির্মল ঘাবড়ে যায়। প্রণয়া নাক টেনে গলায় সামান্য ভয়-ডর ছাড়াই বলল,
--"আপনি যদি কখনো জানেন আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি, সেটা আপনি কীভাবে নিবেন নির্মল সাহেব?"
নির্মলকে নির্বাক হওয়ার জন্য বুঝি এই কথাগুলোই যথেষ্ট ছিল। নির্মল একই স্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে প্রণয়ার দিকে। নির্মল অস্ফুট স্বরে বলল,
--"এটা কী করে সম্ভব?"
--"মন-ভালোবাসার ওপর কোনো মানুষের হাত থাকে না।"
--"ভালোবাসা হওয়ার আগেই সেটা নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্যি মানুষের আছে।"
প্রণয়া হাসল এ কথা শুনে।
--"এর মানে আমাকে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন?"
--"তুমি যা বলছ তা শুনে এড়িয়ে যাওয়াটাই যে স্বাভাবিক, প্রণয়া।"
নির্মল নিজের অজান্তেই "তুমি" সম্বোধনে চলে এসেছে। যা শুনে প্রণয়া আবারও হাসলো।
--"আমি তো ভুল কিছু বলিনি। আমাকে ভালোবাসলে কী হয়? আমি কী এতই খারাপ?"
--"তুমি আমার ধরা-ছোয়ার বাইরের একজন। যাকে নিয়ে কখনো কিছু ভাবিইনি তাকে কীভাবে ভালোবাসা সম্ভব?"
--"কেন সম্ভব হতে পারে না?"
নির্মল চুপসে যায় কিছুক্ষণের জন্য। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
--"তোমাকে ভালোবাসা মানে নুহাশ চাচার বিশ্বাস ভাঙা। যে আমার বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে তার বিশ্বাস ভঙ্গ আমি কী করে করি?"
প্রণয়ার অধর থেকে হাসি সরলো না। সে হঠাৎ বলল,
--"আমার বিয়ে হতে যাচ্ছে নির্মল সাহেব। আর আপনাকে জ্বালাতন করব না।"
নির্মল চোখ তুলে তাকালো প্রণয়ার দিকে। প্রণয়ার বলা কথাগুলো কেন যেন বুকের বা পাশটায় দমকা ধাক্কা দিল। প্রণয়া চলে যেতে নিলেও থেমে যায়। পিছে ফিরে বলল,
--"আপনি মিথ্যা বলতে কাঁচা নির্মল সাহেব। আপনার চোখ জোড়া আপনার গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে। আপনার চোখের সামনেই আমি আরেকজনের বউ হবো, চ্যালেঞ্জ করে গেলাম।"
প্রণয়া হনহন করে চলে গেল ভেতরে। আর নির্মল সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। আহত চোখে চেয়ে রইলো প্রণয়ার যাওয়ার পানে। তার এত বুক ফাটছে কেন? সেও কী তবে নিজের অজান্তে আবেগে পা দিয়ে ফেলল? দিলেই বা কী? প্রণয়া এবং তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। স্ট্যাটাস, টাকা-পয়সা সব দিক থেকেই। প্রণয়ার মতো আদরের দুলালীকে সে কোন মুখে নিজের ভাঙা ঘরের জন্য চাইবে? সেই মুখ নির্মলের না কখনো ছিল, আর না এখন আছে।
নির্মল এক সপ্তাহের মাঝেই নুহাশ সাহেবের বাজারের কাছাকাছি যেই জমিটা ছিল সেটার সব কাগজ-পত্র ঠিক রেখে বায়না করার পরপর কিনে নেয়। ওই জমিটাও চা বাগানের মাঝামাঝিতে। জমিতে একটা ভাঙাচোরা ঘর আছে। সেটাকে ভেঙে সুন্দর মতন টিনের দুই রুম হয়ে যাবে। নির্মল পরিকল্পনা মাফিক সব গুছিয়ে ফেলে। টাকা এখনো হাতে ভালো রকমই আছে। সেটা দিয়ে টিনসেট ঘর তোলা অসম্ভব হবে না। তাই চিন্তা করল তিন-চার মাস পরেই সে এখানে বাড়ির কাজটা ধরে ফেলবে।
জমির জন্য দৌড়-ঝাপের মাঝে প্রণয়াকে সে একদিনও দেখেনি। প্রণয়া যেন তার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। একে তো প্রণয়া ওরকম এক বিদঘুটে চ্যালেঞ্জ করে গেছে তার উপর সেদিন থেকেই নজর সীমানায় বাইরে রয়েছে। নির্মল যেন ভেতরে ভেতরে কেমন অস্থিরতায় ভুগছে।
নুহাশ সাহেব অনেকদিন যাবৎ একটা চিন্তা-ভাবনায় আছেন। সেটা এখনো কারো কাছে প্রকাশ করেননি, আবার করারও সৎ সুযোগ তিনি পাচ্ছেন না। এই সিদ্ধান্তটা তার নিজেরই। প্রণয়ার বিয়ে সম্পর্কে। এজন্য সে একদিন দাওয়াত করল নির্মল এবং নীলুফাকে তাদের বাড়ি। সেই দাওয়াতে এতদিন গা ঢেকে থাকা প্রণয়ার না চাইতেও নির্মলের সামনে আসতে হয়। প্রণয়াকে দেখে নির্মল যেন স্বস্তি পায়।
প্রণয়া আড়াল থেকে প্রতিদিনই নির্মলকে দেখেছে, যা নির্মল ধরতে পারেনি। প্রণয়া অনেকটা ইচ্ছাকৃতই এই কাজগুলো করেছে যাতে নির্মল তার ভেতরকার অনুভূতি বোঝার সময় পায়। একা প্রণয়া আর কত পাগলামি করবে? এবার নাহয় নির্মল বুঝুক, প্রণয়ে বিরহের ব্যথা।
সবাই একই সাথে খাবার খেতে বসল। প্রণয়া নিজ থেকে নির্মলের পাতে খাবার দেয়। নির্মল প্রণয়ার দিকে তাকাতেই প্রণয়া যেন চোখের ভাষায় বোঝালো,
--"একদিন এভাবে ভালোবাসায় ঋনি করে দিয়েছিলেন। আজ আমি ঋন মিটিয়ে দিলাম, শোধবোধ।"
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব সারতেই নুহাশ সাহেব নির্মল এবং নীলুফাকে নিয়ে বাইরে বসলেন। স্বভাবসুলভ দাঁত খুঁচিয়ে নুহাশ সাহেব গলা খাঁকারি দিলেন। পরপর নীলুফারের উদ্দেশে বললেন,
--"ভাবী, আপনি অনুমতি দিলে একটা কথা বলতাম।"
--"এভাবে বলে লজ্জা দিবেন না ভাইজান। কী বলতে চান বলুন, অনুমতির কী আছে?"
ফাহিমা প্রণয়াকে নিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন। প্রণয়া চলে যেতে চেয়েছিল কয়েকবার, কিন্তু ফাহিমা তাকে জোর করে থামিয়ে রেখেছেন। ফাহিমা হয়তো আন্দাজ করতে পারছেন নুহাশ সাহেব কী বলতে চাইছেন। এজন্য ফাহিমা প্রণয়াকেও সঙ্গে ধরে রেখেছেন।
নুহাশ সাহেব কিছুটা ইতঃস্তত হয়ে বললেন,
--"দেখেন, আপা। আমি নির্মলকে কখনো নিজের ছেলের চাইতে কম ভাবিনি। তাই এই বিপদে হয়তো নির্মলই আমায় সমাধান দিতে পারবে।"
--"কিসের সমাধান ভাই? বুঝলাম না।"
--"জানি আমি নিয়মের বাইরে চলে যাচ্ছি, তবুও বলছি.. আপনার আপত্তি না থাকলে নির্মলের সাথে আমি প্রণয়ার বিয়ে দিতে চাচ্ছি।"
এ কথা শুনে নির্মল, নীলুফা উভয়েই বিস্মিত। প্রণয়াও তার জায়গায় স্থির হয়ে যায় বাবার মুখে এমন এক কথা শুনে। সে কী স্বপ্ন দেখছে? নীলুফা অস্ফুট স্বরে বললেন,
--"কিন্তু ভাই.."
--"আমি আপনাদের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত নই ভাবী। এমন নির্মল লাখে একটা। নির্মলকে যতবারই দেখি ওর বাবার প্রতিচ্ছবি দেখতে পেতাম। এছাড়াও সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল একজন ছেলে। একজন বাবা তার মেয়ের ভালোর জন্য সব করতে পারে। আপনাদের মতো করে ভালো আমার মেয়েকে কেউ রাখতে পারবে না। ভালোবাসার মতো সুখ অন্যের কাছে পাইনি আমি, যতটা আপনাদের দেখে পাই। আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিবেন না ভাবী। আমার একমাত্র মেয়েকে নির্মলের হাতে তুলে দিয়ে নির্ভার হতে চাই।"
নীলুফা বললেন,
--"প্রণয়া মা আমার ঘরে নির্মলের বউ হয়ে আসবে এটা আমার জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার ভাইজান। আমার এতে আপত্তি নেই, তবে বিয়ে যেহেতু ছেলে-মেয়ের, তাদের মত আছে কি না সেটা জেনে নিন। প্রণয়া কী আমার ছোটো ভিটেতে থাকতে পারবে?"
ফাহিমা এই পর্যায়ে বেরিয়ে এলেন। হাসি-মুখে বললেন,
--"সেসব নিয়ে চিন্তা করবেন না আপা। আমার মেয়েটা বরাবরই ভালোবাসার কাঙাল। কেউ তাকে একটু ভালোবাসা দিলে সে সব পরিস্থিতিতে তাদের ঢাল হয়ে যায়। নির্মল বাবা, তুমি রাজি তো?"
নির্মল এতে বেশি কিছু বলল না। শুধু বলল,
--"জি চাচী। আপনাদের সিদ্ধান্ত আমার ভালোর জন্যই।"
নুহাশ সাহেব স্ব-গলায় "আলহামদুলিল্লাহ" বলে উঠলেন। প্রণয়া বহুদিন পর ভেতরে প্রশান্তি অনুভব করল। খুব খুশি সে, খুব। আল্লাহ'র নিকট বুকভরে শুকুরিয়া জ্ঞাপন করল।
বিয়ে এক সপ্তাহ পর। ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা সম্পন্ন হবে, কোনোরকম আয়োজন ছাড়াই। নির্মল বলেছে প্রণয়াকে সে এক কাপড়েই ঘরে তুলতে চায়। প্রণয়ার নিজেই অমূল্য রত্ন, যাকে নুহাশ সাহেব তার হাতে তুলে দিচ্ছেন। এর চাইতে বেশি কিছু নির্মলের চাওয়া নেই। একটি সুতাও সে প্রণয়ার সঙ্গে নিতে রাজি নয়। দেনমোহরের ব্যাপারেও নির্মল জানায়,
--"আমি আমার সামর্থ্য অনুসারে দেনমোহর নির্ধারণ করতে চাই চাচা।"
নুহাশ সাহেব রাজি হলেন। নির্মল যেন মুগ্ধতায় আটকে ফেলেছে তাঁকে। কী বিচক্ষণ বুদ্ধির প্রমাণ দিচ্ছে সে। প্রণয়া আসলেই বিয়েতে অমত করেনি। সে নীরবে শুধু সবটা মেনে নিয়েছে।
বিয়ের আগে নুহাশ সাহেব আনোয়ারের পাট চুকিয়ে নিলেন। কঠিন মামলা দিয়েছেন আনোয়ারকে। এছাড়া ওসি নুহাশ সাহেবের পরিচিত। তাই তাকে ভালো ভাবেই বললেন যাতে করে আনোয়ার সহজে জেল থেকে ছাড়া না পায়।
বিয়ের আগেরদিন ঘরোয়া ভাবে কয়েকজন মিলে প্রণয়ার গায়ে হলুদ ছুঁইয়ে দেয়। পিয়াসাও এসেছে প্রণয়ার হলুদে। পিয়াসা মিষ্টি হেসে বলল,
--"যাক, অবশেষে নির্মল দাদার বউ হতে চলেছ তুমি!"
প্রণয়া হাসলো। হেসে বলল,
--"ভাগ্যিস তুমি সেদিন এসে জাদুকর সাহেবকে সব বলে দিতে বললে। না মানলে রাগও দেখাতে বললে। জায়গামতো লেগে গিয়েছে তোমার বুদ্ধি। আর মাঝখান দিয়ে বাবাও সবটা গুছিয়ে দিলেন।"
--"ভাগ্য তোমাদের একসঙ্গে জুড়ে ছিল বলেই এমনটা হয়েছে প্রণয়া। সেসব কথা ছাড়ো, তোমায় হলুদ মাখাই আসো!"
বিয়েটা খুব সুন্দর, সাদা-মাটা ভাবে হয়ে যায়। প্লাবন তো সেই খুশি নির্মলকে দুলাভাই হিসেবে পেয়ে। সে একাই সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে,
--"নির্মল ভাইয়া আমার দুলাভাই, আমাকে রোজ চিপস খাওয়াবে। আমার সাথে খেলবে, ঘুরতে নিয়ে যাবে, কী মজা!"
----------------------
নির্মলের ঘরে বউ সেজে বসে আছে প্রণয়া। বিয়ে উপলক্ষ্যে নির্মল বেশ কিছু ফার্ণিচার কিনে ঘর ভরে ফেলেছে। যাতে করে বউ এসে খালি ঘর না দেখে। প্রণয়া হেসে ফেলে নির্মলের এই কাজে। প্রণয়া একমনে চেয়ে রইলো হাত জুড়ে থাকা মেহেদীর দিকে। এই মেহেদী একমাত্র নির্মলের নামে।
এমন সময়ই নির্মল ঘরে প্রবেশ করে। প্রণয়া নড়েচড়ে বসল। নির্মল নিঃশব্দে গিয়ে প্রণয়ার পাশে বসল। স্ত্রী রূপে প্রণয়ার দিকে মুগ্ধ চোখে চেয়ে আওড়াল,
--"চ্যালেঞ্জ দিয়ে কী লাভ হলো? বউ তো শেষমেষ আমারই হলে। চ্যালেঞ্জ করে হেরে গেলে।"
প্রণয়া লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে রইলো। মুখ ফুটে কিছু বলতে চেয়েও বলল না। নির্মল একটা স্বর্ণের আংটি বের করল। প্রণয়ার হাত ছুঁয়ে নিজের হাতে আগলে সেটা তার অনামিকায় পরিয়ে দিল। প্রণয়া নির্মলের স্পর্শ পেল এই প্রথম। প্রথম স্পর্শে সে কিছুটা শিউরে উঠল। প্রণয়ার কেঁপে ওঠা নির্মল টের পেয়ে আলতো হেসে বলল,
--"আমার সামান্য হাত ধরায় এমন লজ্জা, ভালোবাসি বলতে গিয়ে লজ্জা করেনি?"
প্রণয়া মাথা নিচু করে গলা খাদে নামিয়ে বলল,
--"আমি তো তাও বলেছি, আপনি তো বলেননি।"
--"বলতে হবে?"
প্রণয়া জবাব দিল না। এর মাঝে হুট করে কারেন্ট চলে গেল। ঘর এবার ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। প্রণয়া চমকে এদিক ওদিক তাকাতেই গালে উষ্ণ স্পর্শ পেল। পরপর কপালেও সেই একই স্পর্শ। প্রণয়া নিঃশ্বাস বন্ধ করে শক্ত হয়ে বসে রইলো। নড়াচড়ার শক্তিটুকু সে হারিয়ে ফেলেছে যেন। কানের কাছে উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়তেই প্রণয়ার পিলে চমকে ওঠে। থরথর করে কম্পিত প্রণয়া সরে যেতে চাইলে নির্মল তাকে টেনে একই জায়গায় বসিয়ে দেয়। নির্মল ঘোরের মধ্যে আওড়াল,
--"ভালোবাসি তোমাকে, বউ। জানা নেই কীভাবে, কবে তোমাতে হৃদয় হারিয়ে বসলাম। তবে আমার সবটা জুড়ে শুধু তুমি-ই আছ, থাকবে। তোমাকে ঘিরে আমার সুন্দর জীবনের সূচনা হলো। আগলে রেখো আমাকে।"
বেশ কিছুটা সময় কেটে যায় তাদের ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। তখনো কারেন্টের দেখা নেই। প্রণয়া এবার মুখ খুলল,
--"শুনুন?"
--"শুনছি, প্রণয়া।"
--"পাটি আছে?"
--"আছে, কেন?"
--"লাগবে।"
--"এখনই?"
--"হুঁ।"
প্রণয়া পাটি নিয়ে বাইরের উঠোনে এলো। এখন গভীর রাত। বাইরে বেশ ঠান্ডা হাওয়া বইছে। প্রণয়া উঠোনে পাটিটা বিছিয়ে দিল। নির্মল ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। সে এখনো ধরতে পারছে না, প্রণয়া ঠিক কী করতে চাইছে? প্রশ্নও করেনি সে, প্রণয়াকে নিজ ইচ্ছেতে ছেড়ে দেয়। প্রণয়া পাটিতে বসে বলল,
--"আসুন।"
নির্মল পাটিতে গিয়ে বসল। প্রণয়া আকাশের পানে চেয়ে পাটিতে সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। নির্মলও তাকে অনুসরণ করল। প্রণয়া দেখছে আকাশ আর নির্মল দেখছে প্রণয়াকে। তা বুঝতে পেরে প্রণয়া বলল,
--"চাঁদের দিকে তাকান। মস্ত বড়ো চাঁদ উঠেছে আকাশে, কত কাছাকাছি লাগছে।"
নির্মল ভ্রু কুচকে বলল,
--"তাই তো দেখছি।"
--"আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে তো বলিনি, বলেছি আকাশের চাঁদ দেখতে।"
--"আকাশের চাঁদ তো অনেক দেখেছি, এবার আমার ঘরের চাঁদকে দেখতে দাও।"
এ কথায় প্রণয়া লজ্জা পেল। প্রসঙ্গ বদলে বলল,
--"আমাদের দেখা কিন্তু এই আলো-আঁধারিতেই হয়েছিল, মনে আছে?"
--"হুঁ, প্রথম দেখাতেই আমাকে চোর বানিয়ে দিয়েছিলে। ভুলব কেমন করে?"
নির্মলের কথায় প্রণয়া হেসে ফেলল।
--"চোর তো আপনি অবশ্যই। প্রণয়াকে তার নিজের থেকে চুরি করেছেন।"
--"কিছু চুরি যদি ভালো থাকার কারণ হয় তাহলে আমি চোর-ই ভালো। তোমায় চুরি করেছি বলেই তো আজ তুমি আমার পাশে।"
--"আপনি কী জানেন, আপনি প্রণয়ার 'জাদুকর সাহেব'?"
নির্মল গভীর নজরে তাকাল প্রণয়ার দিকে। প্রণয়া সেই নজরে নজর মেলাতে পারল না। আকাশ পানে নজর ঘুরালো। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হতেই প্রণয়া আনমনে বলল,
--"আপনি গান জানেন?"
--"হুঁ, শুনতে চাও?"
প্রণয়া মাথা নাড়ায়। নির্মল এক হাতে প্রণয়াকে আগলে নিয়ে আকাশের তীরে চেয়ে আপন সুরে গান ধরলো,
"জীবন এত সুখের হলো
আমার পাশে, তুমি আছ তাই
এক জীবনে, এর চেয়ে বেশি
আমার যে আর চাওয়ার কিছু নাই।
তোমার আমার ভালোবাসা শেষ হওয়ার নয়
শুধু তোমায় কাছে চায় এ-ই হৃদয়।
ওগো তোমায় নিয়ে আমি পাড়ি দিয়ে
যেতে চাই সুখের-ই দেশে হারিয়ে।"
—সমাপ্ত।
বিঃদ্রঃ অবশেষে প্রিয় গল্পটা শেষ হয়ে গেল। গল্পটা ছোটো ছিল আগেই জানিয়েছিলাম, বিস্তর ভাবিনি ওদের নিয়ে। তবুও এতদিন যাবৎ যারা ধৈর্য ধরে পড়েছেন তাদের জন্য অসম্ভব ভালোবাসা। গল্পটা পছন্দ হলে আশা রাখছি গল্পটাকে আপনারা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিবেন, প্রচার করবেন। আর শেষবারের মতো প্রণয়া-নির্মলকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য পড়ে মন জুড়াতে চাই। পাঠকমহল কী আমার এই আবদার রাখবেন?
.jpeg)
0 মন্তব্যসমূহ