তারে_বলে_দিও
নিজের ফুপাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ের কথা শুনে গলা শুকিয়ে এলো আদ্রিকার। সবেমাত্র সে ভার্সিটি থেকে এসেছে। গায়ের জামা ঘামে ভিজে জবজব করছে। তার নিজেরই গা গুলিয়ে আসছে। তবুও প্রান্তিক ভাইয়ের একজোড়া চোখ তাকে খুঁটিয়ে দেখছে।
আদ্রিকা অস্বস্তিতে জমে যায়। আদ্রিকার ফুপাকে সে ফুআব্বা ডাকে। তিনি আর্মির রিটায়ার্ড অফিসার। ছোটবেলায় আদ্রিকাকে বেশ স্নেহ করতেন। প্রাশয়ই মজা করে আদ্রিকার মাকে বেয়াইন ডাকতেন। সেই ঠাট্টা-মজার সম্পর্কটাকে বাস্তবে রুপ দেয়ার কোনো ইচ্ছেই আদ্রিকার নেই। আদ্রিকার মা ইশারায় আদ্রিকাকে সোফায় বসতে বললেন। আদ্রিকা ঠান্ডা গলায় বললো,
"আমি একটু ভেতরে যাচ্ছি। "
আদ্রিকার ফুপা জাহেদ শেখ প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলেন,
"মামনি তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো। আমরা বসছি।"
অনুমতি পেয়ে আদ্রিকা রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে। প্রান্তিক ভাই কম হলেও তার চেয়ে আট-নয় বছরের বড়। তাছাড়া লোকটাকে তার কখনোই ভাই ছাড়া বেশি কিছু মনে হয়নি। কথা হয়েছে সবসময় প্রয়োজনীয়। কেমন আছ? পড়াশোনা কেমন চলে? এমন কথা। যাকে এতোদিন ভাই ভেবে এসেছে তাকে স্বামী ভাবা আদ্রিকার জন্য বেশ কষ্টকর এবং প্রায় অসম্ভব। কিছুদিন আগে সে নিজের টাইমলাইনে পোস্ট করেছিল, মানুষ কতোটা অসহায় হলে কাউকে না পেয়ে কাজিন বিয়ে করে। কথাটা তবে নিজের উপর পড়লো? বন্ধুমহলে আদ্রিকা মুখ দেখাবে কি করে? ভাবনার অন্তরালে আদ্রিকার মা নায়লা বেগম দরজা ধাক্কাতে শুরু করলেন। বাসায় মেহমান না থাকলে তিনি হয়তো দরজা ভেঙেই ফেলতেন। আদ্রিকা বিরক্তির সুরে বলল,
"আসছি আম্মু, দরজা ধাক্কানো বন্ধ করো।"
নায়লা চেঁচিয়ে বললেন,
"শাড়ি পড়ে বের হবি।"
আদ্রিকার রাগে ফেটে পড়ার অবস্থা। সে খুব একটা ভালো করে শাড়ি পড়তে পারে না। কুচি খুলে একাকার হয়ে যায় কিংবা হাঁটতে পারে না। আদ্রিকা গোসল করে নিত্যদিনের মতো ঢোলা টপস পড়ে বের হলো। বসার ঘরে পা রাখতেই নায়লা ভয়ংকর দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে চাইলেন।
আদ্রিকার বাবা আফজাল হোসেন মেয়েকে তার পাশে বসার জন্য ডাকলেন। সোফার অপর প্রান্তে জাহেদ শেখ এর দ্বিতীয় বউ বসে আছেন। প্রান্তিক যখন মেট্রিক দিচ্ছে তখন ওর মা হার্ট এট্যাক করে। হার্টে রিং বসানোর সাতদিনের মাথায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পনেরো দিনের মাথায় একমাত্র মেয়ে ফারিহার কথা ভেবে জাহেদ শেখ বিয়ে করেন। ফারিহা তখন ক্লাস টুতে পড়ে। আদ্রিকার আর ফারিহার বয়সের ডিফারেন্স একমাস। আদ্রিকার এখনো আবছা মনে পড়ে তার ফুপির কথা। ভীষণ আদর করতেন আদ্রিকাকে। ফুপির বাসায় গেলে সে ফারিহার সাথে খেলতে বসতো। খেলার মাঝে প্রান্তিক এসে দুজনকে ভয় দেখাতো। আদ্রিকা শুনেছে প্রান্তিক বেশিরভাগ সময় বাসার বাইরে রাত কাটায়। ঘরের নির্মম অত্যাচারগুলো সইতে হয় ফারিহাকে। এমন বাড়িতে বউ হয়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে এবং আগ্রহ আদ্রিকার নেই। সে সোফার কুশন খামচে ধরলো রাগে এবং অভিমানে। বাবা-মা তার জন্য আর ছেলে খুঁজে পেল না?
খানিকক্ষণ আলাপ আলোচনা শেষে জাহেদ শেখ আদ্রিকা এবং প্রান্তিককে আলাদা কথা বলতে বললেন। প্রান্তিক যেন সেই অপেক্ষায় ছিল। বলামাত্র সে উঠে দাঁড়ালো। আদ্রিকা ধীরে পা ফেলে প্রান্তিককে নিয়ে নিজের রুমে গেল। আদ্রিকা খেয়াল করলো সে প্রান্তিকের কাধ অব্ধিও পড়ছে না। বিয়ে হলে মানুষ নিশ্চয়ই তাদেরকে মিস ম্যাচ কাপল বলবে।
প্রান্তিক খাটে বসতে বসতে বলল,
"কেমন আছ?"
আদ্রিকা ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,
"বিয়ের কথা শুনে খুশিতে লাফাচ্ছি। "
প্রান্তিক স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো। সে উঠে গিয়ে দরজায় খিল দিল। আদ্রিকা গলা উঁচিয়ে বললো,
"দরজা লাগাচ্ছেন কেন?"
"ছেলে হিসেবে এই চিনলে আমায়?"
আদ্রিকা মাথা নামিয়ে ফেলল। যতোবারই ফুপির বাসায় গিয়েছে প্রান্তিক কখনোই তাকে খারাপ নজরে দেখেনি, আজ অব্ধি দুজনে হাতও মেলায়নি। প্রান্তিক পুরুষালি ভরাট গলায় বলল,
" আমি নিজেও কখনো তোমাকে আর ফারিহাকে আলাদা করিনি। আমার জন্যও বিয়েটা টাফ। আমি কিছু কথা বলবো, মন দিয়ে শুনবে।"
আদ্রিকা মনে স্বস্তি পেল প্রান্তিকের কথা শুনে। প্রান্তিক বলতে শুরু করে,
"আব্বু তোমায় এতো পছন্দ করে কেন জানো? কারণ তোমার চেহারা আমার আম্মুর মতো।"
এই পর্যায়ে প্রান্তিকের গলা ধরে এলো। সে খানিকটা অপ্রস্তুত বোধও করলো। তবে নিজেকে সামলে বললো,
"আমার বাড়ির পরিস্থিতিটা আমার বোনের জন্য মানিয়ে নেয়া কষ্টকর। ও যে কি অমানুষিক কষ্ট ভোগ করে তা আমি তোমায় বোঝাতে পারব না। আব্বুকে আমি কিছু বলতে গেলেই তিনি ভাবে আমি সৎ মাকে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু আমি আব্বুর চোখে তোমার প্রতি বিশ্বাস দেখেছি। তুমিই পারবে আমাদের ভেঙে যাওয়া সংসারটাকে সুন্দর করতে। ঐ কুটিল মহিলার আসল চেহারা আব্বুর সামনে আনতে। আমাদের বিয়েটা শুধু একটা সওদা। তুমি যেকোনো সময় চাইলে এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি নিতে পার। আমি কখনোই তোমায় বাঁধা দেব না। তোমায় এই মুহূর্তে আমায় কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে হবে না। তুমি দুদিন সময় নাও। ভালো করে ভাব। তারপর আমাকে জানাও।"
প্রান্তিক থামতেই আদ্রিকার মনে তোলপাড় শুরু হলো। ফুপির আদরের ছেলেমেয়েরা তবে ভালো নেই। ফুপি তো আদ্রিকার জন্য অনেক কিছু করেছে, সে কি তবে তার প্রতিদান দিবে না? আদ্রিকা ভাবনা চিন্তা ছাড়াই বললো,
"আমি রাজি। আপনি ফুআব্বাকে হ্যাঁ বলে দিন।"
প্রান্তিক বললো,
"তাড়াহুড়ো করছ কেন? ভেবে সিদ্ধান্ত নাও।"
"আমার মায়ের মতো ফুপির সংসার আমি রক্ষা করবো। আমার আর ভাবার দরকার নেই। "
প্রান্তিক জিজ্ঞেস করলো,
"সত্যি? "
"হু।"
প্রান্তিক ঠোঁট বাকিয়ে প্রশান্তির হাসি দিল। আদ্রিকা খুব গোপনে খেয়াল করল সে প্রান্তিকের হাসির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আগে তো কখনো এমন হয়নি! প্রান্তিক ধীর গলায় বললো,
"আম্মু মারা যাওয়ার পর আমি আজ প্রথম হাসলাম। আমি তোমার প্রতি সবসময় কৃতজ্ঞ থাকবো।"
আদ্রিকা চোখ তুলে প্রান্তিককে দেখলো। কাটা কাটা নাক, মুখ। অথচ আগে ভালো করে খেয়াল করাই হয়নি। পরক্ষণেই আদ্রিকা ভাবলো, ধুর এটা তো সাধারণ বিয়ে নয়। একটা ডিল। ডিল শেষ হলেই আদ্রিকার প্রয়োজনও শেষ।
প্রান্তিক বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বললো,
" টপটা পাল্টে এসো। পেটের কাছে ছেঁড়া জায়গা দিয়ে তোমার তিলটা দেখা যাচ্ছে। "
চলবে কি?
# তারে বলে দিও
#লেখনীতে: শ্যামকন্যা
#পর্ব:০১
পর্যাপ্ত সাড়া পেলে পরের পর্ব লিখবো। গল্পটা খানিকটা সিন্যামেটিক হবে। যারা এই ধরনের গল্প পছন্দ করেন না তারা এড়িয়ে যাবেন।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০২
কান ঝা ঝা করে উঠলো আদ্রিকার। ছেঁড়া জায়গাটা হাত দিয়ে চেপে ধরলো। প্রান্তিক ততোক্ষণে রুম থেকে পগারপার। ইশ! কি লজ্জার ব্যাপার।
বসার ঘরে খানিক হাসি- ঠাট্টা হচ্ছিল। জাহেদ শেখ এর দ্বিতীয় স্ত্রী লামিয়ার বয়স চল্লিশের কোঠায়। তিনি নিজের বোনের একমাত্র মেয়ের সাথে প্রান্তিকের বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাহলে সম্পত্তি হাসিল করা সহজ হতো। কারণ প্রান্তিকের বাবা তার অর্ধেকের বেশি সম্পত্তি প্রান্তিকের নামে করে রেখেছেন। অথচ বুড়োকে তিনি কিছুতেই মানাতে পারলেন না। এই মেয়েকে তার বিষের মতো লাগছে।
সবাই মিলে প্রান্তিক আর আদ্রিকার বিয়ের তারিখ ঠিক করে। প্রান্তিক সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চাকরি করছে। নায়লার মনে হচ্ছে তিনি এতো ভালো ছেলে কখনোই পেতেন না। যদিও আফজাল হোসেন আদ্রিকাকে হুট করে বিয়ে দিতে চায়নি। তবে মেয়ের সম্মতিতে তার হৃদয় থেকে পাথর নেমে যায়।
পরদিন সকালে আদ্রিকার নামে একটা পার্সেল আসে। সে বেশ অবাক হয়। রুমে গিয়ে পার্সেলটা খুলে দেখতে পায়, খয়েরি রঙের একটা কাথান শাড়ি। সাথে এক মুঠো চুড়ি। একপাশে অবহেলিত অবস্থায় একটা চিরকুট পড়ে আছে। আদ্রিকা বেশ যত্ন নিয়ে চিরকুটের ভাঁজ খোলে।
"আমার হৃদহরিণী,
তুমি জীবনে আসার পর থেকে আমি আরও এক সেকেন্ড বাঁচার আশা পাই। তোমার চোখের নেশা যেন মহুয়াকেও হার মানায়। তুমি কি সারাজীবন আমার নেশা কাটানোর দায়িত্ব নিবে?
ইতি
তোমার না হওয়া প্রেমিক"
আদ্রিকা চমকে উঠে। কাজটা কি প্রান্তিক ভাই এর? তবে সে কেন বিয়েতে রাজি করাতে ওসব কথা বললো। নাকি সরাসরি ভালোবাসার কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছিল। আদ্রিকা ভাবল যেদিন প্রান্তিক এর সাথে ওর দেখা হবে সেদিন এই সুন্দর শাড়িটা পড়বে। এমনিতেই বিয়ের কথা ঠিক হওয়ার পর থেকে আদ্রিকা সারাদিন প্রান্তিককে নিয়ে ভাবছে। প্রান্তিক ছাড়া আর কেই বা ওকে এসব দিবে? দিলে বিয়ের ডেট ঠিক হওয়ার পরদিনই কেন দিবে?
প্রান্তিক বাসায় ঢুকতেই শুনতে পেল লামিয়া বেগম ফারিহার সাথে উঁচু গলায় কথা বলছে। প্রান্তিকের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। সকাল থেকে নাকি ফারিহা কোনো কাজ করেনি। সেজন্য লামিয়া বেগম তাকে কথা শোনাচ্ছেন। প্রান্তিক এগিয়ে এসে বোনের হাত ধরলো। জ্বরে হাত পুড়ে যাচ্ছে। ফারিহা শুকনো গলায় বলল,
"আমার শরীরটা একটু খারাপ, আম্মু। আমি একটু পরেই সব থালা-বাসন ধুয়ে রাখবো।"
প্রান্তিক আগুন গরম চোখে লামিয়া বেগমের দিকে তাকায়। প্রান্তিককে তিনি বেশ ভয় পান। সেই মেট্রিক এর সময় থেকে আজও তাকে মা ডাকেনি প্রান্তিক। আন্টি বলে ডেকেছে। এতে ওনার কোনো আফসোসও নেই। এই বুড়ো ছেলের মা হওয়ার তার কোনো শখ নেই। প্রান্তিক ঠান্ডা গলায় বলল,
"দয়া করে আমার বোনকে একটু শান্তি দিন।"
লামিয়া বেগম মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলেন। প্রান্তিক বোনকে নিয়ে রুমে যায়। মাথায় জলপট্টি দিয়ে ওষুধ খেতে দেয়। ফারিহা নিঃশব্দে কাঁদছে। সে ভাইয়ের বাহু আঁকড়ে ধরে বলছে,
"আম্মু কেন এতো তাড়াতাড়ি চলে গেল, ভাইয়া।"
প্রান্তিক বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বলে,
"এই পৃথিবীতে আমার জন্য তুই আর তোর জন্য আমি। এটুকু সবসময় মনে রাখবি।"
ফারিহা ভাইকে জড়িয়ে রাখে। মা চলে যাওয়ার পর ভাই না থাকলে হয়তো সে কোথায় হারিয়ে যেত। বাবা তো থেকেও ওর নেই। কি নিয়ে বাঁচতো মেয়েটা। অথচ ছোট বেলায় কতো করুণ কন্ঠে নতুন মা চাই বলে কান্না করেছে। সে কি জানতো, নতুন মা কখনো মা হতে পারে না? নতুন মা রুপকথার জগৎের রাক্ষসের থেকেও ভয়ংকর। ভাবতে ভাবতেই ফারিহার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে। প্রান্তিক বোনের কপালে চুমু দিয়ে নিজের রুমে যায়।
রুমে এসে প্রান্তিক গায়ের শার্ট খুলে ফেলে। এসির টেম্পারেচার কমিয়ে বিছানায় আলগোছে মাথা রাখে। সবার সামনে শক্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে সে গুমরে মরে। প্রান্তিকের কান্নাগুলো দেখে মসজিদের মুসল্লিরা। নামাজ পড়তে গিয়ে সে ব্যাকুল হয়ে কাঁদে। পাছে বোনটা কষ্ট পায় তাই সে নিজের কষ্টটা সবসময় লুকিয়ে রাখে। প্রান্তিকের মনে হয় এভাবে বেশিদিন কষ্টগুলো চেপে রাখলে সে মারা যাবে। অবশ্য মরতে পারলেই শান্তি। আম্মুকে জিজ্ঞেস করবে,
"কেন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?"
কলের রিংটোনে প্রান্তিকের ধ্যান ভাঙে। স্ক্রিনে ফাগুন নামটা জ্বলজ্বল করছে। প্রান্তিক গলার স্বর যথেষ্ট স্বাভাবিক করে বলে,
"হ্যালো।"
"কই থাকো, মামা? সারাদিনে তোমার খোঁজ পাই না। "
প্রান্তিক হেসে বলে,
"তোর ভাবি দেখতে গিয়েছিলাম।"
ফাগুন আশাহত হয়। অভিমানের সুরে বলে,
"আমায় ছাড়াই ভাবি ঠিক করে ফেললি। নট ফেয়ার।"
"আচ্ছা, তোর সাথে দেখা করাবো।"
ফাগুন খানিকটা উচ্ছসিত হয়ে বলে,
"আমিও একজনকে খুব পছন্দ করে ফেলেছি। কাল থেকে পাগল পাগল লাগছে।"
"বলিস কি? তুই তাহলে প্রেমে পড়লি?"
ফাগুন হেসে বলে,
"তুই ভাবির প্রেমে পড়িস নি?"
"আমার মতো ছেলের ভাগ্যে আর প্রেম। তুই বল তো মেয়েটা কে?"
"ধীরে ধীরে সব জানবি।"
ফোন রাখার পর প্রান্তিক ভাবনায় পড়ে গেল। ফাগুন বেশ কয়েকবার এই বাসায় এসেছে। তবে কি সে ফারিহার কথা বলছে? প্রান্তিক প্রশস্ত হাসে। ফাগুন ছেলে হিসেবে নাম্বার ওয়ান। দেখা যাক কি হয়।
চলবে?
একশ দুই ডিগ্রি জ্বর নিয়ে লিখেছি পাঠক অপেক্ষা করছে বলে। পর্যাপ্ত সাড়া দিবেন, প্লিজ। রিচেক করা হয়নি। ভুল-ভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৩
রৌদ্রময় হাস্যোজ্জ্বল দিনে বাইরে বাতাসের শনশন আওয়াজ। প্রকৃতি তেঁতে থাকলেও জোরালো বাতাস চারপাশ ঠান্ডা করে দিচ্ছে একটু থেমে থেমে। প্রান্তিক এবং জাহেদ শেখ বসে আছে আদ্রিকাদের বাসায়। ঠিক সাতদিন পর ওদের বিয়ে। প্রান্তিক ভাবলেশহীন। জাহেদ শেখ ওদের দুজনকে শপিং করতে বললেন পছন্দমতো। সাথে মেয়ে ফারিহাকেও যেতে বললেন। আদ্রিকা বেশ দোটানায় আছে। মন বলছে প্রান্তিক ওকে ভালোবাসে, অথচ মস্তিষ্ক বলে অন্যকিছু।
আদ্রিকা সেই খয়েরী শাড়িটা পড়ে হালকা সেজে নেয়। তখনই রুমে আগমন ঘটে প্রান্তিকের। সে একদৃষ্টে খানিক চেয়ে থেকে বলে,
"এমন সং সেজে কেউ শপিংয়ে যায়? যাও, শাড়ি পাল্টে জামা পড়ে এসো।"
রাগে, অপমানে, লজ্জায় কুঁকড়ে গেল আদ্রিকা। সেই সাথে পরিস্কার হয়ে গেল প্রান্তিক ওকে চিরকুটটা দেয়নি। বেশ মনমরা হয়ে শাড়ি পাল্টাতে যায় আদ্রিকা।
শপিংমলে আসার আগে ফাগুনকে কল করে নেয় প্রান্তিক। ওরা পৌঁছাতেই আগমন ঘটে ফাগুনের। আদ্রিকা অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে। এমন সুদর্শন পুরুষের দেখা আজ অব্ধি সে পায়নি। ফাগুন হেসে বলে,
"এই কি তবে আমার ভাবি?"
প্রান্তিক মাথা নাড়ায়।
"ভালো আছেন, ভাবি?"
আদ্রিকা ছোট করে জবাব দেয়,
"ভালো।"
কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আদ্রিকার গা ঘেষে দাঁড়ায় প্রান্তিক। জিজ্ঞেস করে,
"ফাগুনকে কেমন লাগল তোমার কাছে? "
"ভীষণ ভালো লেগেছে। অপশন থাকলে ওনাকেই বিয়ে করতাম।"
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো প্রান্তিকের। যতোই ভালোবাসা না থাকুক, তবুও হবু বউয়ের মুখে এসব কথা মানা যায়? সে রুঢ় কন্ঠে বলে,
"তোমায় বিয়ের জন্য জোর করিনি আমি। ইচ্ছে থাকলে বলো লাইন লাগিয়ে দিচ্ছি। "
আদ্রিকা মুখ কুঁচকে বলে,
"ছিহ! এই আপনার মুখের ভাষা। আপনি আমার ধারণা বদলে দিচ্ছেন। "
"আমায় নিয়ে ধারণা করতে কে বলেছে তোমায়? আমায় জানতে এসো না, আমার ভেতরটা দেখলে ঝলসে যাবে তোমার কোমল মন।"
কথার পিঠে কথা বলতে পারে না আদ্রিকা। সে চুপচাপ শাড়ি পছন্দ করতে বসে। ওদিকে ফাগুন আর ফারিহা ওদেরকে স্পেস দিয়ে সটকে পড়েছে। আদ্রিকা দুটো শাড়ির মাঝে আটকে আছে অনেকটা সময়। হঠাৎ প্রান্তিক কাছে এসে কানের কাছে বলে,
"মেরুন কালারটা নাও। তোমায় মানাবে।"
আদ্রিকা ঈষৎ কেঁপে উঠলো। যারপরনাই অবাক হলো। তখনকার অপমানের কথা মনে পড়তেই মনটা বিষিয়ে গেল। সে মেরুনরঙা শাড়িটা সরিয়ে আকাশি জমিনের শাড়িটা বেছে নিল। প্রান্তিক রাগ করলেও প্রকাশ করল না। সিদ্ধান্ত নিল আর কখনোই এই মেয়েকে কিছু পছন্দ করে দেবে না।
ফারিহা এককোণে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফাগুন ওকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। প্রান্তিকের কাছে কখনোই বাড়ির ভেতরের খবর পায়নি সে। তবে ফারিহার মুখ দেখে আন্দাজ করতে পারে কতোটা ভালো আছে ফারিহা। সে বিষন্ন ফারিহাকে একটু স্বাভাবিক করতে বলে,
" চলো আমরা ঐ কফি শপটায় বসি। তোমার মুখটা শুকিয়ে আছে।"
ফারিহা বিরস কন্ঠে বলে,
"চলুন।"
একটু পরপর কফিতে চুমুক দিচ্ছে ফাগুন আর আড়চোখে ফারিহাকে দেখছে। ফারিহা এসব দেখে অভ্যস্ত। সে আগ্রহ বোধ করছে না। নিজের অনিশ্চিত জীবনে সে কারো সান্নিধ্য চায় না। তাই সে ফাগুনকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে।
ফাগুন ইচ্ছাকৃত কাশি দিয়ে ফারিহার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। ফারিহা উৎসুক হয়ে শুধায়,
"কি?"
ফাগুন মুখ ফসকে বলে ফেলে,
"তুমি।"
এরপর দুজনেই চুপ হয়ে যায়। ফারিহা উঠে প্রান্তিকের কাছে গিয়ে বলে,
"ভাইয়া, তোদের হয়ে গেলে বাসায় আয়। আমার শরীর খারাপ লাগছে। আমি বাসায় যাব।"
প্রান্তিক এগিয়ে এসে বোনের কপালে হাত দেয়। বলে,
"জ্বর নেই। শরীর বেশি খারাপ লাগছে, ফারু?"
ফারিহা ভাইয়ের দিক থেকে চোখ নামিয়ে বলে,
"মাথা ব্যাথা করছে। একটু ঘুমালে ঠিক হবে।"
প্রান্তিক বলে,
"তাহলে একা যাওয়ার দরকার নেই। ফাগুন তোকে দিয়ে আসবে।"
আরেকদফা অস্বস্তিতে পরে ফারিহা। পাছে ভাই সন্দেহ করে তাই সে রাজি হয়ে যায়।
ওদের শপিং শেষ হতে হতে বেশ রাত হয়ে যায়। তবুও টুকটাক জিনিস কেনা বাকি থাকে। ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে একটা ছেলের সাথে খুব বাজেভাবে ধাক্কা লাগে আদ্রিকার। প্রান্তিক ততোক্ষণে ছেলেটার কলার ধরে ফেলেছে। ধমকে বলে,
"মেয়ে দেখলেই গায়ের ওপর পড়তে হবে? মেরে হাড় গুড়ো করে ফেলবো।"
ছেলেটা কুৎসিত হাসি দিয়ে বলে,
"আয় না, দেখি কতো পারিস।"
আদ্রিকা প্রান্তিকের হাত টেনে নিয়ে আসে। রাগে প্রান্তিকের কপালের শিরা দপদপ করতে থাকে। বাকি রাস্তা সে আদ্রিকাকে একহাতে আগলে নিয়ে যায়। এরপর দুজনে রিকশায় উঠে। রিকশা যতোই সামনে যাচ্ছে ততোই ভাঙা রাস্তা এগিয়ে আসছে। প্রান্তিক শপিংয়ের সবগুলো ব্যাগ দু'হাতে নিয়ে বসে আছে। রিকশা মৃদু ঝাঁকুনি দিতেই আদ্রিকাকে ওর হাত ধরে বসতে বলে। আদ্রিকা কথা না শুনে খানিকটা বাঁকা হয়ে বসে। যাতে ঝাঁকুনিতে সে পড়ে না যায়। অতঃপর বেশ বড় একটা গর্ত পার হওয়ার সময় আচমকা আদ্রিকার নরম ঠোঁট প্রান্তিকের বাহু স্পর্শ করে। অনাকাঙ্ক্ষিত অঘটনে আদ্রিকা লজ্জায় নুয়ে যায়। প্রান্তিক রাশভারী গলায় বলে,
"চুমো খাওয়ার ইচ্ছে থাকলে আগেই বলতে। রাস্তাঘাটে কি শুরু করলে?"
আদ্রিকা যেন অপমানের আগুনে ঝলসে গেল। তিক্ত মুখে বললো,
"আমার ওসব শখ নেই বুঝেছেন। নেহাৎ রিকশা ধাক্কা খেল।"
প্রান্তিক আনমনে হাসে। যাক, মেয়েটা একটু স্বাভাবিক হয়েছে। তখন শাড়ি পড়ায় আদ্রিকাকে বেশ সুন্দর লাগছিল। প্রান্তিক চায়নি সে ছাড়া আদ্রিকার এমন রুপ কেউ দেখুক। তাছাড়া আদ্রিকাকে বিয়েতে রাজি করতে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৪
আদ্রিকা বেশ মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছিল। সে বাসায় এসেই খয়েরী শাড়িটা কুটিকুটি করে ছিঁড়েছে। বলাবাহুল্য প্রান্তিক এগুলো পাঠিয়েছে মনে করে সে খানিকটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। এখন যেহেতু ভাবনা বদলে গিয়েছে সেগুলো রেখে দেয়ার কোনো মানেই হয় না। নিজের কাছে নিজেকে ছোট লাগতে থাকে আদ্রিকার। ফুপাতো ভাই হয়ে প্রান্তিক কেনইবা ওকে আগে থেকে ভালোবাসতে যাবে? আদ্রিকা তো কখনো প্রান্তিককে অন্য নজরে তাকাতে দেখেনি। মেয়েরা এসব বিষয় খুব ভালো বুঝতে পারে। দশ মাইল দূরে থেকেও একটা ছেলে তাকালে মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নাড়া দেয়। আদ্রিকা ভেবে পায়না সে কিভাবে এমন বেহায়া ভাবনা ভেবে ফেলল। তার জীবনে কখনোই উথাল-পাতাল প্রেম আসবে না। কারণ অপর পক্ষের মানুষটা যে প্রান্তিক।
ওদের বিয়ের কার্ড ছাপানো হলো বেশ সুন্দর করেই। সোনালী রিম কাগজের উপর গাঢ় খয়েরী জরিতে প্রান্তিক আর আদ্রিকার নাম লেখা। খয়েরী রঙটা দেখে আদ্রিকা আফজাল হোসেনকে বলল,
"কালারটা বদলানো যায় না, আব্বু?"
আফজাল হোসেন হতাশ গলায় বলেন,
"তিনশটা কার্ড ছাপিয়ে ফেলেছি,মা। পছন্দ না হলেও মেনে নাও।"
আদ্রিকার কথাটা খুব লাগল। সে হাসি ঝুলিয়ে বলল,
"তোমাদের সব কথা তো মেনেই নিচ্ছি। "
আফজাল হোসেন মেয়ের দিকে তাকালেন। বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে নাকি জানেন না, মেয়েটার রুপ খুলে গিয়েছে। তার আদুরে মেয়েটা ঘরটা খালি করে চলে যাবে ভাবতেই রুহ কেঁপে উঠে। তিনি মেয়েকে ধরে নিজের কাছে বসান। থুতনি ধরে জিজ্ঞেস করেন,
"বিয়েটা করতে চাও না, আম্মু?"
আদ্রিকা প্রান্তিকের কথাগুলো মনে মনে আওড়ালো। ভেবে চিন্তে বলল,
"এমন কিছু না, আব্বু। দ্বিধায় ভুগছি।"
আফজাল হোসেন মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,
"মাগো, আমি তোমার জন্য খারাপ কাউকে ঠিক করিনি। যদি ওদের ফ্যামিলি নিয়ে তোমার আপত্তি থাকে তাহলে বলছি, টুকটাক ঝামেলা সব জায়গাতেই থাকে। তুমি ওসব থেকে দূরে থাকবে সবসময়। বেশি সমস্যা হলে আব্বুর কাছে চলে আসবে। তবে আমার বিশ্বাস প্রান্তিক তোমায় কষ্ট পেতে দিবে না। ও নিজে আমার হাত ধরে তোমায় চেয়ে নিয়েছে।"
আদ্রিকা মুগ্ধ হয় প্রান্তিকের অভিনয়ে। বেশ ভালোভাবে বাবাকেও পটিয়ে ফেলেছে। তবে একটা কথা আদ্রিকা কখনোই অস্বীকার করবে না। সেটা হলো ওর জীবনে ফুপির অবদান। আদ্রিকার যখন তিন বছর বয়স তখন ওর বাবার চাকরি চলে যায়। থাকার মতো জায়গাটুকুও ছিল না। সব হারিয়ে যখন ওরা প্রায় শেষ হতে বসেছিল তখন এগিয়ে আসে আদ্রিকার ফুপি। তিনি ওদেরকে নিজের বাড়িতে জায়গা দেন। সেখানে ওরা পাঁচ বছর থাকে। এর মাঝে আদ্রিকার বাবার ব্যবসা দাঁড়িয়ে যায়। ওরা আবার নিজেদের জায়গা তৈরি করে নেয়। ফুপির এতো বড় উপকার আদ্রিকার মা-বাবা সারাজীবন জপে এসেছেন। আদ্রিকার জানা নেই সে তাদের পারিবারিক ঝামেলা মিটমাট করতে পারবে কিনা তবে সে খুব করে চায় প্রান্তিক আর ফারিহাকে একটু সাহায্য করতে।
রাতে খাওয়া শেষে আদ্রিকা আয়েশ করে গান শুনছিল। পুরোনো বাংলা গানগুলো ওর ভীষণ ভালো লাগে। অশ্লীল কোনো লাইন থাকে না সেসব গানে। বরং অনেকটা আবেদন থাকে যা মনে গেঁথে থাকে। গান শোনার মাঝেই ক্রিং ক্রিং শব্দে আদ্রিকার ফোন বেজে উঠে। ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কেউ বলে উঠে,
"আমি ভীষণ একা। আপনি কি কিছু সময় আমাকে সঙ্গ দেবেন?"
আদ্রিকা শান্ত ভঙ্গিতে ফোন কেটে দেয়। পরপর আরো তিনবার কল আসে। চারবারের সময় আদ্রিকা তড়িঘড়ি করে রিসিভ করে বলে,
"এই তোর সমস্যা কি রে? বারবার ফোন দিয়ে জ্বালাচ্ছিস। অসভ্য ব্যাটা।"
প্রান্তিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"বারবার কই ফোন দিলাম? তুই তোকারি করছ কেন?"
আদ্রিকা জিভে কামড় দিল। তাড়াহুড়ায় নাম্বারটাও খেয়াল করেনি। আদ্রিকা ছোট করে জবাব দেয়,
"স্যরি। একটা লোক বারবার ডিস্টার্ব করছিল।"
"ব্লক নামে একটা অপশন আছে। সেটার ব্যবহার শিখিয়ে দেব?"
"কেন কল দিয়েছেন? "
"তোমার সাথে প্রেম করতে।"
দাঁতে দাঁত চেপে বলে প্রান্তিক।
"আপনি বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে ভীষণ অসভ্য হয়ে গিয়েছেন।"
প্রান্তিক সে কথার জবাব দিল না। বলল,
"কাল রেডি থেকো। তোমার আঙুলের মাপ নিয়ে আংটি কিনতে বলেছে বাবা।"
"আচ্ছা। "
ফারিহার কলেজের সামনে বেশ সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে ফাগুন। রোদের তাপে তার ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে আছে। একটু দূরেই মেয়েরা ওকে দেখে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। অতঃপর দেখা মিলে ফারিহার। ওর মুখটা শুকিয়ে আছে। ফাগুন ফারিহার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
"কেমন আছ? শরীর ঠিকঠাক আছে?"
ফারিহা চোখ বুজে নিজেকে সামলে নেয়। উত্তর দেয়,
"এভাবে রোজ রোজ কলেজে চলে আসবেন না। মেয়েরা আমায় বাজে কথা বলে। দয়া করে আমার সম্মানটা খোয়াবেন না।"
ফাগুন চুপসানো মুখে বলল,
"তোমায় একবার না দেখলে দিনটা ভালো যায় না। "
ফারিহা এবার একটু জোরেই বলল,
"এসব পাগলামো বাদ দিন, ফাগুন ভাই। আমার আপনাকে ভালো লাগে না।"
"এভাবে বোলো না। একটু সহজ হয়ে দেখো আমার সাথে। কথা দিচ্ছি তোমায় অভিযোগ করার সুযোগ দেব না।"
ফারিহা কাঠকাঠ গলায় জবাব দেয়,
"সব পুরুষ মানুষ এক হয়।"
বলেই গটগট পা ফেলে রিকশায় উঠে যায়।
চলবে?
ছোট হওয়ার জন্য দুঃখিত। আপনারা গল্পটা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিন। তবেই আমার লেখার সার্থকতা।#তারে বলে দিও
#লেখনীতে: শ্যামকন্যা
#পর্ব:০৫
রঙ বেরঙের লাইটের কম্বিনেশনে ঝলমল করছে আদ্রিকাদের বাড়ি। নায়লা সাজগোজের মাঝখানে মেয়েকে দু লোকমা পোলাও খাইয়ে দেন। আদ্রিকার অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা বেড়ে চলছে গুণোত্তর হারে। একটু পরে সে প্রান্তিকের বউ হবে। না চাইতেও তার নামের সাথে প্রান্তিক জুড়ে যাবে। আফজাল হোসেন ব্যস্ত পায়ে ছোটাছুটি করছেন। মেহমানদের গিজগিজে চারপাশ মুখরিত। তিনি মেহমানদের সরবত এগিয়ে দিচ্ছেন। খানিক বাদেই বর আসছে বর আসছে গুঞ্জন উঠে। সেই কথা শুনে আদ্রিকার হাত-পায়ে কাঁপুনি শুরু হয়।
বর-বউকে দুপাশে বসানো হয়েছে। মাঝখানে পাতলা পর্দা। প্রান্তিক ঝাপসাভাবে আদ্রিকাকে দেখেছে। লাল শাড়ি, লাল চুড়ি, লাল লিপস্টিক। একদম লাল টুকটুকে বউ। আদ্রিকাও প্রান্তিকের দিকে তাকায়। সাদা শেরওয়ানিতে লোকটাকে মোহনীয় লাগছে। কিছুক্ষণের মাঝেই কাজি সাহেব কবুল বলতে বলেন। আদ্রিকা বেশ খানিকটা সময় নিয়ে কবুল বলে। কবুল বলার সময় আদ্রিকার চোখের পানি আড়াল করার ব্যাপারটা প্রান্তিকের দৃষ্টিগোচর হয়। অতঃপর দুজনকে আয়নায় মুখ দেখানো হয়। প্রান্তিক নিষ্পলক চেয়ে থাকে আয়নার দিকে। শুধুমাত্র এখন থেকে তার বউ বলেই কি মেয়েটাকে এতো সুন্দর লাগছে?
বিদায়ের সময় আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। আদ্রিকার মা অচেতন হয়ে যায়। আফজাল হোসেন প্রান্তিকের হাত চেপে বলেন,
"বাবা, আমার আমানত তোমায় দিলাম। কখনো বিরক্ত মনে করলে আমারটা আমায় ফিরিয়ে দিও।"
আদ্রিকা নিজেকে সামলাতে পারে না। বাবাকে জড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন দেয়। অবশেষে প্রান্তিক আদ্রিকার বাবাকে হাত ধরে আশ্বাস দেয়। আফজাল হোসেন আদ্রিকাকে ফুলে সজ্জিত গাড়িতে বসিয়ে দেন।
ঘন্টা দুয়েকের মাঝে গাড়ি প্রান্তিকদের বাসার সামনে থামে। সবাই নতুন বউকে ধরে বাসায় প্রবেশ করায়। লামিয়া বেগমও মেহমানদের সামনে বেশ ভালোভাবে আদ্রিকার সাথে কথা বলে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব চুকে গেলে আদ্রিকাকে বাসর ঘরে পাঠানো হয়। প্রান্তিক ঘরে আসে রাত এগারোটার দিকে। এসেই ওয়াশরুমে গিয়ে টিশার্ট পড়ে রুমে আসে। আদ্রিকা বসা থেকে উঠে প্রান্তিককে সালাম করতে যায়। প্রান্তিক পা সরিয়ে নেয়। বলে,
"এসব আমার পছন্দ নয়। আর যেন কখনো না দেখি।"
আদ্রিকা মাথা নাড়ায়। প্রান্তিক আবার বলে,
"কিছু কথা আজকেই ক্লিয়ার করে দেওয়া ভালো। তুমি মানসিকভাবে প্রস্তুত তো?"
আদ্রিকা ভেবে বলে,
"বলুন, আমি প্রস্তুত। "
"তোমায় আমি মিথ্যা বলে বিয়ে করেছি, আদ্রিকা।"
কথাগুলো কর্ণগোচর হতেই আদ্রিকার বুকের কাঁপুনি বেড়ে যায়। সে ফ্লোরে বসে পড়ে। প্রান্তিক ওকে ধরতে গেলে আদ্রিকা চেঁচিয়ে বলে,
"বাকিটা বলুন। আমি সবটা শুনবো।"
"এমএসসি শেষ করার পরেও আমার কোথাও চাকরি হচ্ছিল না। সব জায়গায় টাকার জন্য হেরে যেতাম। আব্বুর সাহায্য নিতে চাইনি। এখন হয়তো জিজ্ঞেস করবে, আমি আমার ভাগটা কেন বুঝে নেইনি? তাহলে শোন। আব্বুর মৃত্যুর আগে আমি বা ফারিহা কেউই সম্পত্তির ভাগ পাব না। বোনের কষ্টগুলো নিজের চোখে দেখা সম্ভব হচ্ছিল না। ওকে আমার কাছে রাখার সামর্থ্যও ছিল না। আমি বেশিরভাগ সময় কাটাতাম বন্ধুদের মেসে। একসময় বাধ্য হয়ে আব্বুকে বললাম চাকরির জন্য সাহায্য করতে। আব্বু জানাল তোমায় বিয়ে করতে। আমিও উপায় না পেয়ে রাজি হয়ে যাই। এক বছর লাগবে আমার চাকরিটা পারমানেন্ট হতে। এরপর আমি ফারিহাকে নিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে যাব। আমি জানি আদ্রিকা, আমি খুব বেশি সার্থপর হয়ে গিয়েছি। তুমি চাইলে আমাকে চড় মারতে পার। তবুও কষ্ট করে একটা বছর আমার সাথে থাকো। তুমি যদি সারাজীবন আমার দায়িত্ব হয়ে থাকতে চাও, তাহলেও থাকতে পার। আমি তোমার অযত্ন করব না। তবে আমার কাছে স্ত্রীর অধিকার কিংবা ভালোবাসা চাইতে এসো না। সেগুলো আমি দিতে পারব না।"
আদ্রিকার চোখের পানি যেন বাঁধ মানছে না। সে প্রান্তিকের কলার ধরে বলে,
"ধোঁকা দেয়ার জন্য আমাকেই মনে ধরলো আপনার?"
"তুমি আমার জায়গায় নিজেকে বসাও আদ্রিকা। মানছি আমি ভীষণ অন্যায় করেছি। নিজের আর বোনের কথা ভেবেছি। কিন্তু এছাড়া আমি আর কিইবা করতাম। তুমি এতো উইক হয়ে যাচ্ছ কেন? আমি তোমায় কখনো অসম্মান করব না। তোমার বাবাকে আমি কথা দিয়েছি।"
তাচ্ছিল্যের সুরে হাসে আদ্রিকা। বলে,
"আপনি অভিনয়ে বেশ পাকা, প্রান্তিক। তবে মনে রাখবেন আল্লাহ ছাড় দেয় কিন্তু ছেড়ে দেয় না। একদিন আজকের করা ভুল নিয়ে আপনি আফসোস করবেন। সেইদিন এই বাড়িতে আমার শেষ দিন হবে।"
প্রান্তিক ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বলে,
"তুমি কি বুঝবে আমার কষ্ট। কখনো মা ছাড়া বড় হয়েছ? মা না থাকলে কেমন অসহায় লাগে ফিল করেছ? তোমায় সব বলাই বৃথা ছিল।"
বলেই প্রান্তিক ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সারারাত ফ্লোরে বসে কাঁদে আদ্রিকা। একসময় ভাবে সত্যিই তো প্রান্তিক নিরুপায় ছিল। তবে বিয়ের আগে কি সত্যিটা জানানো যেত না? আদ্রিকা অবশ্যই রাজি হতো। আদ্যোপান্ত ভাবতে ভাবতে আদ্রিকা সিদ্ধান্ত নিল প্রান্তিককে সে চরম শাস্তি দিবে। প্রথমত সে প্রান্তিকের কোমল হৃদয়টা বের করে সেখানে ভালোবাসার বীজ বপন করবে। এরপর এক বছর ফুরাতেই সে এই বাড়ি ত্যাগ করবে। আদ্রিকা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ফেলল।
চলবে?
প্রচন্ড মাথা ব্যাথা এবং বমি হচ্ছে আমার। ছোট পর্ব বলে কেউ রাগ করবেন না প্লিজ। রিচেক করা হয়নি।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৬
ভোরবেলা প্রচন্ড মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙলো আদ্রিকার। রাতে এসে সে বিছানায় শুয়েছে। তবে চোখের পানি বাঁধ মানেনি। একান্তে ঝরেছিল। প্রান্তিকও একসময় এসে পাশে শুয়ে পড়ে। এখনো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একটা হাত মাথার নিচে দেয়া। গালে খোচা খোচা দাঁড়ি। ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখ, চোখের উপর পুরু ভ্রূু। বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আদ্রিকা নামাজ পড়তে যায়।
জাহেদ শেখ আদ্রিকাকে দেখে নরম গলায় বলে,
"এক কাপ চা করো তো, মামনি। আর প্রান্তিক কি এখনো উঠেনি?"
"না, আব্বু। আপনি অপেক্ষা করুন আমি চা নিয়ে আসছি।"
রান্নাঘরে ঢুকে আদ্রিকা চা পাতির কৌটা খুঁজে বের করে। এক চামচ চা পাতি দিতে লাগলেই লামিয়া বেগম কর্কশ কন্ঠে বলেন,
" এতো পাতি যে দিচ্ছ, এটা কি তোমার বাপ পাঠিয়েছে? এসেছো তো খালি হাতে, কানা কড়িও নেই নাকি তোমার বাপের?"
আদ্রিকা চা ফুটাতে ফুটাতে বলল,
"আমার বাবা তার অমূল্য রত্নটাই পাঠিয়ে দিয়েছেন। তা আপনার বাবা কি দিয়েছিলেন, আন্টি?"
লামিয়া বেগমের মুখ চুপসে গেল। তিনি ভাঙা গলায় বললেন,
"নতুন বউয়ের এতো চোপা!"
"আমায় ফারিহা ভেবে ভুল করবেন না। আপনি বুনো ওল হলে আমি বাঘা তেঁতুল।"
লামিয়া বেগম তৎক্ষনাৎ চায়ের পাতিল ন্যাকড়া দিয়ে ধরে আদ্রিকার হাতের উপর ফেলে দেয়। আদ্রিকার চিৎকারে রান্নাঘরে ছুটে আসে সবাই। জাহেদ শেখ না বুঝলেও প্রান্তিক আর ফারিহা ব্যাপারটা ধরে ফেলে। প্রান্তিক আদ্রিকাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রুমে নিয়ে যায়। তারপর মলম খুঁজে আনে। আদ্রিকার হাত নিজের কাছে টেনে আনে আলতোভাবে। এরপর সন্তপর্ণে মলম লাগিয়ে দেয়। বলে,
"এবার বুঝেছো, আমার বোন এখানে কিভাবে থাকে? আর তুমি প্রথমদিনই ওনার সাথে লাগতে গেলে কেন? আমায় তো একবার জিজ্ঞেস করে নিতে পারতে। এখন ব্যথাটা কার লাগছে?"
আদ্রিকা হেসে বলে,
"আপনি তো আমায় বউ মানবেন না কোনদিন, তাহলে আমি যাই করি আপনার কি?"
"তুমি আমার দায়িত্ব। আমি তোমায় অবহেলা করতে পারি না। "
"আমার কথা ভাবা ছেড়ে দিন। আমি নিজের কথা ভাবতে পারি।"
প্রান্তিক হাল ছেড়ে চলে গেল। অপরদিকে আদ্রিকার অভিমানের পাল্লা ভারী হতে থাকল। কি হতো ওকে একটু বোঝার চেষ্টা করলে? প্রান্তিক এতো নিষ্ঠুর কেন!
দুপুরবেলা খাবার টেবিলে প্রান্তিক কিছুই খেল না। দু লোকমা মুখে দিয়ে খিদে নেই বলে উঠে গেল। আদ্রিকাও আর মুখে নিল না খাবার। সে প্লেটে খাবার সাজিয়ে ঘরে গেল। দেখলো প্রান্তিক শুয়ে আছে। বেড সাইড টেবিলে খাবারের প্লেট রেখে আদ্রিকা প্রান্তিককে ডাকল।
"খেয়ে নিন। খাবার এনেছি। "
"এতো খেয়াল রাখতে হবে না। খিদে পেলে অবশ্যই খেতাম।"
আদ্রিকা এগিয়ে এসে প্রান্তিকের হাত ধরলো তাকে তোলার জন্য। গা বেশ গরম। আদ্রিকা চমকে বলল,
"জ্বর এসেছে বলেন নি কেন?"
"আমার মাথা খেয়ো না, আদ্রিকা। এতো বছর আমি নিজেকে একাই সামলে এসেছি। "
"এসব কথা পরে শুনবো। দেখি উঠুন তো। খেয়ে ওষুধ খাবেন।"
প্রান্তিক অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে বসল। প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এক শর্তে খেতে পারি। মানবে?"
"কি শর্ত? "
"তোমাকে প্লেটের অর্ধেক খাবার খেতে হবে।"
আদ্রিকা আনমনে হাসল। লোকটা তাহলে খেয়াল করেছে আদ্রিকা খায়নি। প্রান্তিক পুনরায় প্রশ্ন করে,
"খাবে না?"
"খাব।"
প্রান্তিকের হাসি প্রশস্ত হয়। খাওয়ার পর প্রান্তিক ওষুধ খায়। তারপর শুয়ে থাকে কিছুক্ষণ। প্রান্তিক ঘুমিয়ে গেলে আদ্রিকা সাবধানে তার কাছে আসে। কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দেয়। এই একটা মুখের মাঝে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত মায়া মিশিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে শুধু। আদ্রিকা নিজেকে সামলে বেলকনিতে যায়। ওর খালাতো ভাই রিসাদ কুরিয়ার অফিসে চাকরি করে। আদ্রিকা তাকে খুব করে বলেছে আগন্তুক চিরকুটের মালিককে খুঁজে দিতে। আদ্রিকা রিসাদকে কল লাগায়। গলার স্বর নিচু করে বলে,
" ভাইয়া কোন খোঁজ পেলেন?"
"নামটা জানতে পেরেছি শুধু। "
"ওটাই বলেন।"
" অভি "
আদ্রিকা চমকায়, থমকে থাকে খানিক্ষণ। এই নাম সে ইহকালে একবারও শোনেনি। তবে লোকটা ওকে এসব কেন দেবে?
বিয়ের কয়েকদিন পার হওয়ার পর জাহেদ শেখ খাবার টেবিলে বলেন,
"প্রান্তিক, কয়েকদিনের জন্য ছুটি নিয়ে নাও।"
প্রান্তিক বিষম খায়। আদ্রিকা ওকে পানি এগিয়ে দেয়। বিস্ময় নিয়ে প্রান্তিক বলে,
"কেন, আব্বু?"
" চিটাগং যাও, তোমার দাদী তোমার বউ দেখতে চায়।"
প্রান্তিক রাজি হয় না। তার নতুন চাকরি। এখন ছুটি নিলে চাকরিটা চলেও যেতে পারে। এরপর সে কি করবে? তবুও জাহেদ শেখ এর জোরাজোরিতে সে রাজি হয়। যতো যাই বলুক, বাবা নামক মানুষটার কথা সে কখনো ফেলতে পারে না।
ভোরের দিকে প্রান্তিক আর আদ্রিকা ট্রেনে উঠে পড়ে চিটাগং যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রান্তিক আদ্রিকাকে জানালার পাশে বসতে দেয়। আদ্রিকা আজ শাড়ি পড়েছে। প্রান্তিক সিটে বসতে বসতে বলে,
"ওখানে মাথা থেকে ঘোমটা ফেলবে না। গ্রামের মানুষ তো, অনেক কথা বলে ফেলবে।"
আদ্রিকা জবাব দেয়,
"আচ্ছা।"
খানিকপর ট্রেন একটা স্টেশনে থামে। প্রান্তিক ট্রেন থেকে নেমে যায়। পাঁচ মিনিট পরেও ফিরে না এলে আদ্রিকা অসহায়ের মতো এদিক সেদিক তাকাতে থাকে। এখুনি কেঁদে ফেলবে এমন অবস্থা। তখনই প্রান্তিক হাতে খাবার নিয়ে চলে আসে। প্রান্তিক ওর এই অবস্থা দেখে মৃদু হাসে। বলে,
"পাঁচ মিনিটের আড়ালও সহ্য করতে পারলে না? সারাজীবন কিভাবে থাকবে? অপাত্রে ভালোবাসা দান করো না।"
আদ্রিকা ফুঁপিয়ে প্রান্তিকের বুকে মাথা এলিয়ে দিল। প্রান্তিক সরিয়ে দিল না। আলগোছে স্ত্রীকে ধরে রাখল খানিকক্ষণ। প্রান্তিকের বুক থেকে মাথা তুলে সারাটা রাস্তা আদ্রিকা আর তার দিকে চাইল না।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৭
গ্রামের শান্ত-নির্মল পরিবেশ যে কাউকে আকৃষ্ট করবে। সেখানে আদ্রিকা তো বরাবরই প্রকৃতিপ্রেমী। স্নিগ্ধ বাতাস এসে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে দুজনকে। ট্রেন থেকে নেমে ওরা নৌকায় উঠেছে। অনেকটা লাফ দিয়ে নৌকায় উঠতে হয়েছে আদ্রিকাকে। অনেকটা সময় অপব্যয় করে আদ্রিকা যখন লাফ দিল, তখন শক্তপোক্ত হাত ওর কোমড় প্যাঁচিয়ে ধরে ওকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। সেই সাথে আদ্রিকার ধারালো নখের আচড় লাগে প্রান্তিকের বুকের কাছটায়। প্রান্তিক তখন খেয়াল করেনি কিন্তু এখন জায়গাটা বেশ জ্বলছে। নৌকা থেকে নেমে ওরা আরো খানিকটা পথ হেঁটে প্রান্তিকের দাদার বাড়িতে পৌঁছায়। প্রান্তিককে দেখামাত্র কয়েকজন মহিলা ছুটে এসে বলে,
"জাহেদ ভাইয়ের পোলা আর পোলার বউ আইছে। আম্মারে নিয়া আয় তোরা।"
প্রান্তিক ইশারায় আদ্রিকাকে মাথার ঘোমটা টেনে নিতে বলে। কিছু সময় পর অশীতিপর এক বৃদ্ধা লাঠিতে ভর দিয়ে ছোট ছোট পা ফেলে আসেন। অন্য মেয়েরা তাকে ধরতে চাইলেও তিনি কাউকে ধরতে দেন না। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি এক লহমায় আদ্রিকার স্বভাব ধরে ফেলেন। প্রান্তিকের কানে কানে বলেন,
"আমার ভাইয়ের বউভাগ্য মাশাল্লাহ। "
প্রান্তিক মুচকি হাসে। আদ্রিকা বুঝতে পারে না হুট করে হাসার কারণ। অতঃপর বৃদ্ধা আদ্রিকার থুতনি ধরে মুখ দেখেন। আদ্রিকা বৃদ্ধাকে পা ধরে সালাম করেন। বৃদ্ধা তুষ্ট হন। তিনি পুরনো একটা বাক্স থেকে একজোড়া চুড়ি বের করেন। বলা বাহুল্য এন্টিক ডিজাইনের সোনার চুড়ি। একদম চকচক করছে। তিনি শক্ত হাতে আদ্রিকার হাতে চুড়ি দিয়ে বলেন,
"আমার জন্য আমার শাউরি রাইখা গেছিলেন। আর আমি দিলাম আমার নাতবউরে। বিনিময়ে তুই আমার ভাইরে সুখে রাখবি।"
বৃদ্ধা খানিকটা দম নিয়ে আবার বলেন,
"তোমরা পাকের ঘর পরিস্কার করো, আইজকা নতুন বউয়ের রান্ধন খামু। আমার ছোট ছেলেরে বলো মাছ আনতে। আজ আমি নিজ হাতে সব তদারকি করমু।"
আদ্রিকা ভয় পেয়ে যায়। সে খুব একটা রান্না জানে না। কাতর চোখে প্রান্তিকের দিকে তাকায়।
অল্প সময়ের মধ্যে রান্নাঘর প্রস্তুত হয়ে যায়। আদ্রিকাকে সব দেখিয়ে যে যার মতো চলে যায়। সব গুছিয়েই দেয়া আছে। শুধু রান্না করতে হবে। সবার চোখের আড়ালে প্রান্তিক রান্নাঘরে এগিয়ে আসে। আদ্রিকাকে দেখিয়ে যায় কোনটা কিভাবে দিবে। মেসে থাকার কারণে সে টুকটাক রান্না বেশ ভালোই পারে। তারপরও প্রান্তিক নিজের মোবাইলটা আদ্রিকাকে দিয়ে যায়। ইউটিউব থেকে রান্না দেখার জন্য। যতোই হোক বউয়ের সম্মান রক্ষা করা ওর কর্তব্য। আদ্রিকা মোবাইলের সাহায্য নিয়ে কোনোরকম রান্না সেরে নেয়।
দুপুরে সবাই উঠানে পাটি পেতে খেতে বসে। কইতরীন্নেসা হচ্ছেন প্রান্তিকের দাদী। তিনি সবার সাথে বিশেষ করে ছোট ছেলে শাহেদ আর তার বউ জমিলার সাথে আদ্রিকার পরিচয় করিয়ে দেন। জমিলা আদ্রিকার হাতের দিকে তাকিয়ে আফসোস করতে থাকে। তার ছেলের বউয়ের জন্য কি এমন সোনার চুড়ি আসবে? তার ছেলে রাশেদ এর স্বভাবের জন্য কইতরীন্নেসা তাকে পছন্দ করেন না। সেই সাথে তিনি রাশেদকে মানা করেছে আদ্রিকার আশেপাশে থাকতে। সেজন্য জমিলা ছেলেকে ঘরে খাবার দিয়ে এসেছেন অনেক আগেই।
কইতরীন্নেসা খাবার মুখে দিয়ে আরেক দফা খুশি হন। তিনি বড় মাছের মাথা আয়েশ করে খেতে খেতে বলেন,
"পাক খারাপ হয় নাই, ভালাই রানসোস নাত বউ। খানা দিয়াই মানুষের মন পাওন যায়।"
আদ্রিকার বুক থেকে পাথর নেমে যায়।
রাতে ঘুমানোর সময় আদ্রিকা প্রান্তিককে ধন্যবাদ জানায়। প্রান্তিক জবাবে হালকা হাসে। গ্রামে লোডশেডিং একটু বেশি হওয়ার হুট করে কারেন্ট চলে যায়। আদ্রিকা ভয়ে প্রান্তিকের গা ঘেষে দাঁড়ায়। শার্টের হাতা খামচে ধরে। প্রান্তিক অস্ফুট স্বরে বলে,
"নেক্সট টাইম খামচানোর আগে নখ কেটে নিবে।"
আদ্রিকা জবাব দেয় না। ধরে রাখে প্রান্তিককে। প্রান্তিক বোঝে নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ তার উপর অন্ধকার। সে বিছানায় বসতে বসতে বলে,
"আমি আছি, ঘুমাও তুমি।"
আদ্রিকা সায় দেয় না। সে বলে,
"কারেন্ট আসলে ঘুমাব।"
"এটা শহর না, বুঝেছো? আমি আছি তো। ঘুমাও।"
আদ্রিকা শুয়ে পড়ে। তার বুক কাঁপছে অজানা আশঙ্কায়। মনে হচ্ছে পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে খানিকটা দ্বিধা নিয়েই প্রান্তিকের বাহু চেপে ধরে। প্রান্তিক হাতটা সরায় না। ধরে রাখতে দেয়।
সকালে আদ্রিকা উঠে উঠানে হাঁটছিল। তখন দেখা মেলে পান্জাবি পরিহিত এক যুবকের। সে আদ্রিকার দিকে কেমন অন্য রকম দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর বলে,
"প্রান্তিকের বউ না তুমি?"
"জি।"
"তা গোসল করলে না যে? নাকি আমার ভাই ওসব দিতে পারে না। তুমি চাইলে আমি কিন্তু…..
বাকিটা আর শেষ করতে পারে না রাশেদ। এর আগেই তার মুখে এলোপাতাড়ি থাপ্পড় মারতে থাকে প্রান্তিক। চেচিয়ে বলে,
" তোর সাহস কি করে হয়? জানোয়ার। আমার বউকে বাজে কথা বলিস।"
আদ্রিকা প্রান্তিককে আটকাতে পারে না। অবশেষে কইতরীন্নেসা এসে প্রান্তিককে থামায়। সব শুনে তিনি রাশেদকে ঘরে আটকে রাখতে বলেন। এই নাতীর জন্য তার সম্মান গ্রামে নেই বললেই চলে। এমন মেয়ে বাদ নেই যাকে রাশেদ এমন নোংরা কথা বলেনি। জমিলা একমনে বিলাপ করতে থাকেন। এর প্রতিশোধ তিনি নেবেনই।
কিয়তক্ষণ পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনা আদ্রিকার মনে বাজেভাবে ছাপ ফেলে। সে প্রান্তিককে জানায় এখানে আর এক মুহূর্ত থাকবে না। প্রান্তিক আদ্রিকাকে বোঝানোর চেষ্টা করে। শেষে দাদী এসে আদ্রিকাকে বলেন,
"এই বুড়ীর জন্য আর একটা রাইত থাইকা যা। আমার পোলার সাথে তো আমি থাকতে পারি না। তোরা কাছে আইলে আমি সেই দুঃখ ভুইলা যাই।"
স্নেহের আবদার আদ্রিকা ফেলতে পারে না। প্রান্তিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে কইতরীন্নেসা আদ্রিকাকে বলেন,
"একটা পান বানাও দেহি নাতবউ। দুইডা কতা কই তোমার লগে।"
আদ্রিকা লম্বা ঘোমটা টেনে পান পাতা ছিঁড়ে তাতে সুপারি দেয়, চুন লাগায়। এরপর মুচড়ে দাদির হাতে দেয়। দাদী আয়েশ করে পান চিবুতে চিবুতে বলে,
"তোর গায়ের গন্ধ সুন্দর। কিছু মাইয়ার গায়ে টকটক গন্ধ থাকে। এসব মাইয়ার চরিত্র ভালা হয় না। তোরে আমি দেইখাই বুঝসি তুই কেমন মাইয়া। শোন গো ভইন, পুরুষ মানুষ হইলো মধু পাগল। এগোরে সবসময় আঁচলের তলে রাহন লাগে। যত তাড়াতাড়ি পারস আমার নাতীরে নিজের আঁচলে বানবি। বুঝ্ঝোস কতা?"
আদ্রিকা লজ্জায় মাথা দুলায়। মুখ নত করে রাখে।
বিকেলের দিকে আদ্রিকা পুকুরপাড়ে গিয়ে বসে। পুকুরঘাটের চারপাশে গাছগাছালি। বেশিরভাগ ফলের গাছ। তবে কাঁঠালগাছের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বাঁধানো সিড়ি আছে ঘাটে। তবে সিড়িগুলো বেশ খাঁড়া এবং পিচ্ছিল। একবার পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই। আদ্রিকা সাঁতারও জানে না। আফজাল হোসেন শেখানোর চূড়ান্ত করেছিলেন, তবুও শেষ পর্যন্ত আদ্রিকা শিখতে পারেনি। একসময় তিনি হাল ছেড়ে দেন। সিড়ি থেকে উঠে আদ্রিকা পাড় ঘেঁষে হাঁটতে থাকে। তখন ঘাটে আসে জমিলা। তিনি হেঁটে হেঁটে আদ্রিকাকে তাদের ভাগের গাছ দেখান। কথার ফাঁকে আদ্রিকাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেন। মুখে লেগে থাকে কুটিল হাসি।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৮
পানিতে ঝপ করে শব্দ হয়। আদ্রিকা খাবি খেতে থাকে মাছের মতো। পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আশেপাশে খেলতে থাকা গ্রামের ছেলেরা ছুটে চলে আসে। তাদের আসতে দেখে জমিলাও চিৎকার শুরু করেন। তাদের চিৎকারের শব্দে মানুষ জড়ো হয়ে যায়। কয়েকজন মহিলা আর মধ্যবয়স্ক পুরুষ মিলে আদ্রিকাকে তুলে আনেন। এরপর একজন মহিলা পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করার চেষ্টা করেন। বেশিক্ষণ পানিতে না থাকায় ততক্ষণে আদ্রিকার জ্ঞান ফিরে আসে।
প্রান্তিক গোসল করছিল। হট্টগোল শুনে সে তাড়াহুড়োয় বেরিয়ে আসে। আদ্রিকাকে এই অবস্থায় দেখে বেশ ঘাবড়ে যায়। দৌড়ে আদ্রিকার মাথা আজলা ভরে কোলে নেয়। আদুরে কন্ঠে শুধায়,
"কিভাবে পড়ে গেলে? আমায় ডাকলে না কেন? কিছু হয়ে গেলে কি হতো?"
আদ্রিকা কথা বলতে পারে না। ইশারায় জমিলাকে নির্দেশ করে। ফিসফিসিয়ে বলে,
"চাচী আমায় ফেলে দিয়েছেন।"
চোয়াল শক্ত হয়ে আসে প্রান্তিকের। সে দাদীর নিকট এগিয়ে গিয়ে বলে,
"এই বাড়িতে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করব না আমি দাদী। আমার বউ এখানে নিরাপদ নয়।"
কইতরীন্নেসা নাতীকে সামলানোর চেষ্টা করে। প্রান্তিক জমিলার দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে,
"আপনি এতো সাহস কোথায় পেলেন, চাচী। আমি পুলিশ ডাকবো।"
শাহেদ শেখ এসে জমিলাকে থাপ্পড় মারেন। তাকে বাপের বাড়ি চলে যেতে বলেন। এইভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে প্রান্তিক কারো কথা শুনতে নারাজ। সে আদ্রিকাকে নিয়ে ঢাকা চলে যেতে চায়। অতঃপর সিদ্ধান্তে অনড় থেকে প্রান্তিক অসুস্থ আদ্রিকাকে নিয়ে রওনা দেয়। প্রান্তিক ভাড়ায় একটা গাড়ি ঠিক করে। রাস্তায় যাওয়ার সময় আদ্রিকার মাথাটা সন্তপর্ণে নিজের কাঁধে রাখে। এতোটুকু যেন বিরক্ত লাগছে না তার। শুধু মনে হচ্ছে সময়টা এখানে থমকে থাকুক।
ফাগুন অফিসে বসে আছে। এয়ারকন্ডিশন দেয়া রুমের মধ্যেও সে ঘামছে। সে একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করছে। মা-বাবা আর ছোট একটা ভাই আছে তার। ছিমছাম গোছানো সংসার। ফারিহাকে পেলে সেই সংসার পূর্ণতা পেত। ফাগুন বেহায়ার মতো বারবার ফারিহাকে তার মনের অবস্থা বোঝাতে চেয়েছে। তবে সে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিবার। এইবার সে নতুন ফন্দি এঁটেছে। সে ফারিহাকে মেসেজ পাঠিয়েছে ব্রিজের কাছে আসার জন্য। ফারিহা শুরুতে আসতে চায়নি। তখন বলেছে প্রান্তিকের কথা। শেষমেশ ফারিহা রাজি হয়েছে আসতে।
সন্ধ্যা ছয়টার কমবেশি বাজে। ব্রিজের পাশে মানুষের আনাগোনা কমে এসেছে। বিকেলে বেশ ভিড় ছিল। ফাগুন ইচ্ছে করেই এই সময়টা বেছে নিয়েছে। ফারিহাকে আসতে দেখে ফাগুন তার দুহাত প্রসারিত করে। গলায় বেশ জোর নিয়ে বলে,
"আই লাভ ইউ, ফারিহা। আই লাভ ইউ এন্ড দ্য স্কাই। তুমি যদি আজ উত্তর না দাও তাহলে আমি সত্যি সত্যিই আকাশের কাছে চলে যাব। এন্ড আই মিন ইট।"
অগোছালো অনুভূতিগুলো সামলে নিল ফারিহা। সে উত্তরে বলল,
" এই আপনার জরুরি তলব। আপনি ভীষণ অসহ্য একটা লোক।"
বলেই পাশ ফিরল ফারিহা। অপরদিকে ফাগুন বলছে,
"আমি কিন্তু সত্যি সত্যি লাফ দিব। যদি তুমি আমাকে মূল্যই না দাও, আমি থাকব না তোমার কাছে।"
ফারিহা তবুও নড়ল না জায়গা থেকে। চোখ ফিরিয়ে রাখল। ততোক্ষণে ফাগুন ব্রিজের কার্ণিশ বেয়ে উপরে উঠে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। মানুষজন দুয়েক যারা আছে তারা চেঁচিয়ে বলছে,
"এই পাগল ছেলে, করছেন টা কি?"
তাদের কথায় ফারিহার টনক নড়ল। সে এগিয়ে এসে বলল,
"প্লিজ নেমে আসুন।"
"তুমি উত্তর দাও, আমি নেমে যাব। নাহয় সত্যিই আমি লাফ দেব।"
ফারিহার বুক কেঁপে উঠলো। সে আলগোছে ফাগুনের হাতটা ধরে বলল,
"আমায় এতো ভালোবাসতে পারবেন, যতোটা ভালোবাসলে দ্বিতীয় কোনো নারীকে আর জীবনে স্থান দেয়া যায় না।"
ফাগুন হেসে বলল,
"তুমি একবার যদি হ্যাঁ বলো, আমি সারাজীবন তুমি ছাড়াও কাটিয়ে দিতে পারব।"
"গুড, আমি তাহলে আসছি।"
ফারিহা এগোতেই ফাগুন ওর হাতে হ্যাঁচকা টান দেয়। কাছাকাছি চলে আসে দুজন। নিশ্বাস যেন ঘন হয়ে আসছে। ফাগুন ফিসফিসিয়ে বলে,
"এতোদিন যে আমায় বিরহ বিরহ ফিলিংস দিলে, তার শাস্তি পাবে এখন।"
"ছাড়ুন তো। ভাইয়া জানলে আপনার খবর আছে। তার উপর আব্বু জানলে তো….
" তোমার ভাইয়াকে ইশারায় বুঝিয়েছি। আর আংকেলের চিন্তা বাদ দাও। আমি আছি না!"
"হু, আপনি তো আবার পটানোতে এক্সপার্ট।"
"আমি আরো অনেক কিছুতে এক্সপার্ট। ধীরে ধীরে প্রমাণ পাবে।"
ফারিহা লজ্জায় নুয়ে যায়। সন্ধ্যার বাতাসটাও যেন আজ লজ্জারাঙা হয়ে ওদের ছুঁয়ে যাচ্ছে অবিন্যস্তভাবে।
রাতে প্রান্তিক আর আদ্রিকা বাড়িতে ফিরে আসে। জাহেদ শেখকে গ্রামের ঘটনা জানায় না কেউই। দুজনে রুমে চলে আসে। প্রান্তিক আদ্রিকাকে ফ্রেশ হতে বলে। অথচ আদ্রিকা নড়ে না। চুপচাপ শুয়ে পড়ে। প্রান্তিক এগিয়ে গিয়ে আদ্রিকার কপালে হাত রাখে। জ্বর এসেছে মেয়েটার। প্রান্তিক থার্মোমিটার এনে জ্বর মাপে। একশ দুই। সে বালতিতে করে পানি নিয়ে আসে। আধা ঘন্টা পানি ঢালে আদ্রিকার মাথায়। চোখের দৃষ্টি সংযত রাখার চেষ্টা করে আদ্রিকার হাত, মুখ, গলা মুছিয়ে দেয়। তবুও গলায় নিচের দিকের তিলটায় বারবার প্রান্তিকের দৃষ্টি আঁটকে যাচ্ছিল। শত হোক পুরুষ মানুষ। তবুও নিজেকে সামলে প্রান্তিক খাবার বানাতে যায়। নুডলস রান্না করতে যায়। প্রান্তিককে রান্নাঘরে দেখে লামিয়া মুখ বাঁকিয়ে বলেন,
"বউয়ের জন্য কতো ঢং। আর কেউ লাগে বিয়ে করেনি।"
প্রান্তিক জবাব দেয়,
"আমার বউয়ের জন্য আমার দরদ থাকবে না তো অন্যের বউয়ের জন্য থাকবে?"
লামিয়া রান্নাঘর থেকে প্রস্থান করেন কিছু গা জ্বালানো কথা বলে। প্রান্তিক মাথা না ঘামিয়ে ঝটপট নুডলস রান্না করে দেয়। পরক্ষণেই ভাবে আদ্রিকার মুখে এখন রুচি থাকবে না। তাই সে ফ্রিজ থেকে সস নামিয়ে, নুডুলসের উপর দিয়ে দেয়। এরপর বাটি সাজিয়ে রুমে চলে যায়।
পানি ঢালার কারণে জ্বর কিছুটা নেমে গিয়েছে। প্রান্তিক আদ্রিকাকে উঠিয়ে কয়েক চামচ নুডলস খাওয়ায়। দুমিনিট না যেতেই আদ্রিকা বমি করে দেয়। এরপর অসহায় মুখ করে বলে,
"আমি পরিস্কার করব। আপনি প্লিজ রাগ করবেন না।"
প্রান্তিক হেসে বলে,
"একজন অসুস্থ মানুষকে দিয়ে কাজ করাব, এতোটা বাজে আমি নই, আদ্রিকা।"
বাটিটা রেখে প্রান্তিক সব পরিস্কার করে। তোয়ালে ভিজিয়ে আদ্রিকার মুখ মুছিয়ে দেয়। তারপর ওষুধ খাওয়ায়। লাইট নিভিয়ে দিলে আদ্রিকা শুয়ে পড়ে। প্রান্তিক একেবারে গোসল করে ফেলে। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে যায় এতে। এরপর আদ্রিকার পাশে শুয়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরে আদ্রিকা বলে,
"আমায় একটু জড়িয়ে ধরতে পারেন না? খুব শীত লাগছে তো।"
প্রান্তিক হাসে। জ্বরের ঘোরে কি বলছে জানলে নিজেরই হুশ থাকতো না। আদ্রিকা আবারো আদুরে গলায় বলে,
"এই, প্রান্তিক। জড়িয়ে ধরো না!"
প্রান্তিকের এইবার গলা শুকিয়ে আসে। মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি। প্রান্তিক ভাবে এখানে থাকা যাবে না আর। সে উঠে ফারিহার রুমে যায়। ফারিহাকে ডেকে বলে,
"তোর ভাবির সাথে ঘুমা তো আজকে। আমি এই রুমে থাকবো।"
ফারিহা রাজি হয়। তবে যাওয়ার আগে বলে,
"ওকে একটা সুযোগ দিলেও পারতি।"
প্রান্তিক গম্ভীর হয়ে যায়। জবাব খেলে না তার মুখে।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_০৯
সারারাত প্রান্তিকের ঘুম হয় না। সত্যিই তো একটা সুযোগ আদ্রিকা ডিজার্ভ করে। মেয়েটা সব সহ্য করে এখনো পড়ে আছে এই তো অনেক। তবে একটা জায়গায় প্রান্তিকের বিশ্বাসের সুতো কেটে গিয়েছে। আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে প্রান্তিকের মা যে পরকীয়ায় জড়িয়ে গিয়েছিল সেই ঘটনা ফারিহা না জানলেও প্রান্তিক আর তার বাবা জানে। ভালোবেসে বিয়ে করার পরেও তো তার মা তার বাবার কথা চিন্তা করেনি। ওনার অভিযোগ ছিল জাহেদ শেখ তাকে সময় দেন না। একসময় সবটা জাহেদ শেখ এর চোখের সামনে চলে আসে। অতিরিক্ত প্রেশারে প্রান্তিকের মা হার্ট অ্যাটাক করে। সেই থেকে ভালোবাসা ব্যাপারটা থেকে প্রান্তিকের বিশ্বাস উঠে গিয়েছে। সে তার মাকে ঘৃণা করতে পারেনি। সন্তানরা আদৌতেও কখনো পারে না। তবে মেয়ে মানেই যে ছলনা এটা বেশ বুঝেছে। হতে পারে আদ্রিকা ওর মায়ের মতো নয়। তবুও কোথাও একটা দেয়াল প্রান্তিককে আঁটকে দিচ্ছে বাজেভাবে। সারারাত প্রান্তিকের ঘুম হয়না। কি হতো সবার মতো ওর একটা সুখী পরিবার থাকলে। লামিয়া কেন তার বোনটাকে মায়ের ভালোবাসাটা দিতে পারল না। ভালোবাসা নাই দিক, অত্যাচারগুলো থেকে তো রেহাই দিতে পারত। তার বাবাকেও প্রান্তিক দোষ দিতে পারে না। মানুষটা অসম্ভব ভালোবাসতো তার মাকে। এখন হয়তো দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভালোবাসেন। ছেলেদের ভালোবাসা বরাবরই দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য বেশি থাকে। হারানোর ভয়টা জেঁকে বসে মস্তিষ্কজুড়ে।
সকালে আদ্রিকার জ্বর নেমে যায়। সে উঠে ফারিহাকে পাশে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে যায়। ফারিহা জেগে উঠে আদ্রিকাকে বলে,
"ভাইয়া পাঠিয়েছিল তোমার খেয়াল রাখতে। তুমি এখন কেমন আছ, ভাবী?"
আদ্রিকার সামান্য মন খারাপ হয় প্রান্তিকের এহেন কাজে। তবুও স্বাভাবিকভাবে বলে,
"এখন ভালো লাগছে।"
"তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। আমি নাস্তার ব্যবস্থা করছি।"
নিচে এসে ফারিহা দেখেন তার মা চেচামেচি করছেন। তিনি বলছেন,
"একেক জন একেক টাইমে উঠবে আর সব সামলাতে হবে আমাকে। যেন আমি হোটেলের বাবুর্চি। "
ফারিহার চোখে পানি এসে গেল। সে আর সকালে নাস্তা খেল না।
প্রান্তিক রুমে আসলে আদ্রিকা কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। প্রান্তিক আদ্রিকার কপাল ছুঁয়ে দেখে। না, জ্বর নেই। আদ্রিকা খানিকক্ষণ ইতিউতি করে বলে,
"ভার্সিটি যেতে চাচ্ছিলাম।"
"যেতে তো মানা করিনি। তবে জ্বরটা মাত্র ভালো হলো। আচ্ছা, আমি দিয়ে আসবো। রেডি হয়ে নাও।"
আদ্রিকা রেডি হয়ে নিল। প্রান্তিক চোখ মেলে বিবাহিতা বউকে দেখে। মুখে বোধহয় হালকা পাউডার মেখেছে। ঠোঁটে ন্যুড লিপস্টিক। ইশ! এতেই মেয়েটাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। ভেতরটা বেসামাল হয়ে যাচ্ছে প্রান্তিকের। গলা শুকিয়ে আসছে। এই তৃষ্ণার্থ বুক নিয়েই হয়তো তাকে বাকি জীবনটা কাটাতে হবে।
প্রান্তিক গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে,
"ওড়নাটা ঠিক করে নাও। একটু দেখেশুনে চলবে তো!"
আদ্রিকা আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে। বুকের একপাশ দৃশ্যমান। তাড়াহুড়ায় ওড়নাটা ভালোভাবে নিতে পারেনি। লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয় আদ্রিকা। প্রান্তিক কি তাকে খারাপ মেয়ে ভাবছে? প্রথমে ছেঁড়া টপ, এরপর এলোমেলো ওড়না। ভাবনার অন্তরালে প্রান্তিক বলে,
"এতো ভাবতে হবে না। চলো বের হই।"
আদ্রিকা গেটের ভেতর দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতেই নজর আটকায় তার দিকে তাকিয়ে থাকা এক যুবকের উপর। যেন অনেকদিন ধরে আদ্রিকার জন্যই অপেক্ষা করছে। চোখে তার হাজার ব্যাকুলতা। মুখে একটু কথা বলার আকুতি। আদ্রিকা পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই অভি তার পথ আটকায়। কাতর কন্ঠে বলে,
"এতোদিন ভার্সিটি আসেন নি কেন? রোজ আপনার জন্য এখানে আসতাম।"
আদ্রিকা বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। ঠান্ডা গলায় বলে,
"আমায় শাড়ি, চিরকুট আপনি পাঠিয়েছেন?"
ঠোঁট কামড়ে হাসে অভি। বলে,
"উত্তরটা তোলা থাক। সময়মতো শুনিয়ে দেব।"
"আমার ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। পথ ছাড়ুন।"
"অভি যেই রাস্তা একবার ধরে, তাকে মৃত্যুর আগে ছাড়ে না। "
অভির গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, যা আদ্রিকার ভেতরটা নাড়িয়ে দেয়। কিয়দংশ ভাবনায় মশগুল থেকে আদ্রিকা বলে,
"আমি বিবাহিত। তাই রাস্তা ছেড়ে দেয়াই আপনার জন্য ভালো।"
হনহনিয়ে পা ফেলে ক্লাসের দিকে এগোয় আদ্রিকা। পেছনে ফেলে যায় একজোড়া বিস্মিত চোখ। পেছন থেকে সবটা লক্ষ্য করে প্রান্তিক। ঠিকই ছিল সে, সব মেয়েরা একরকম হয়। এরা শুধু ছেলেদের মন নিয়ে খেলতে জানে। অফিসের বাকিটা সময় বিষময় ঠেকে প্রান্তিকের নিকট।
বাসায় ফেরার পর আদ্রিকা সময় নিয়ে গোসল সারে। প্রান্তিক যেহেতু এই সময় বাসায় আসবে না তাই ওড়না নিয়ে যায়নি বাথরুমে। সাদা রঙের একটা কামিজ পড়ে, চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে প্যাঁচিয়ে সে বেরিয়ে আসে। ব্যালকনিতে গিয়ে চুলগুলো সামনে নিয়ে মুছতে থাকে। অথচ পেছনে বসে থাকা প্রান্তিককে খেয়ালই করে না। অফিসে ভালো লাগছিল না বলে প্রান্তিক দুপুরে খাওয়ার জন্য বাসায় চলে আসে। এসেই সম্মুখীন হয় আদ্রিকার এমন আগুন সৌন্দর্যের। মেয়েটাকে কি ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে! ভেজা কাপড়গুলো লেপ্টে আছে শরীরে। মেয়েলি সুবাস প্রান্তিককে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলছে। নিষিদ্ধ ইচ্ছা জানান দিচ্ছে বারবার। মন বলছে, ও তোর বউ। তোর অধিকার আছে। অথচ মস্তিষ্ক বলছে, তুই তো ওকে স্বার্থে কাজে লাগিয়েছিস। মন, মস্তিষ্কের মাঝে প্রান্তিক মস্তিষ্ককে জয়ী করল। পরক্ষণে তার সকালের ঘটনা মনে পড়ে গেল। ব্যালকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরালো। আদ্রিকা পাশেই ছিল। প্রান্তিককে দেখে নিমীলিত কন্ঠে শুধালো,
"আজ তাড়াতাড়ি এলেন যে?"
"আমার বাসায় আসতে তোমার পারমিশন নিতে হবে বুঝি?"
আদ্রিকা প্রান্তিকের রাগের কারণ বুঝতে পারে না। সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
"সিগারেট খাচ্ছেন কেন? আগে তো কখনো খেতে দেখিনি।"
"এই তুমি আমার ব্যাপারে নাক গলাচ্ছ কেন? তোমার ব্যাপারে তো আমি দখল দেই না। রাস্তায় তো ভালোই ছেলেদের গায়ে ঢলে পড়। নাকি বাইরে, ঘরে দুজন লাগে তোমার।"
রাগে, অপমানে আদ্রিকার চোখে পানি চলে আসে। সে জোর গলায় বলে,
"মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ, প্রান্তিক। বিয়ে করেছেন বলে যা মনে আসবে বলে দিতে পারবেন না। সবসময় যা দেখা হয় তা সত্যি হয় না। যেদিন থেকে আমাদের বিয়ে হয়েছে আমি আপনি ছাড়া অন্য কাউকে নিয়ে ভাবিনি। আপনার সব কথা মেনে নেয়ার চেষ্টা করেছি। আর আপনি কি করেছেন? শুধুমাত্র স্বার্থ উদ্ধার করতে আমায় মিথ্যা বলে বিয়ে করেছেন। আমার জায়গায় অন্য মেয়ে থাকলে আপনার মুখে থুতু মেরে চলে যেত।"
প্রান্তিক থমকে যায়। শান্ত মেয়েটা হুট করে এতো নৃশংস হয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। প্রান্তিক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
"বাইরে গিয়ে ছেলেদের গায়ে ঢলে পড়তে পারবে, আর আমি স্বামী হয়ে কিছু বললেই দোষ। আমি অন্যায় করেছি জানি। তবে সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দেয়ার ইচ্ছা আমারও ছিল।"
"আপনি আমায় ভুল বুঝলেন প্রান্তিক। আমি সব সহ্য করে নিয়েছি, কিন্তু আমার চরিত্রে আঙুল তুললে আমি সহ্য করব না। "
"তুমি আমায় বাধ্য করলে।"
"আপনি ছেলেটার সাথে কথা বলুন। তারপর আমায় যা বলবেন আমি মেনে নিব।"
প্রান্তিক রাজি হয়। সারারাত তার ঘুম হয়না। বুকের ভেতর অসহ্য চিনচিনে ব্যাথা নিয়ে পুরো রাত কাটিয়ে দেয় প্রান্তিক। অপেক্ষা শুধু সকাল হওয়ার।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১০
ভোরের দিকে প্রান্তিক নামাজ পড়তে উঠে গেল। তার দৃষ্টি গেল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিকার পানে। মেয়েটাকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে। প্রান্তিক কি খুব বেশি বাজে ব্যবহার করে ফেলল মনের অজান্তেই। নামাজ পড়ে এসে প্রান্তিক সফেদ টুপি খুলে রাখল। এগিয়ে গেল আদ্রিকার দিকে। আদ্রিকা উপস্থিতি টের পেল প্রান্তিকের। সে চোখ মেলে একবার তাকাল। শুভ্র পাঞ্জাবীতে কি স্নিগ্ধ লাগছে মানুষটাকে। অথচ এই নিষ্পাপ মুখ দেখলে বোঝাই যায় না এই মুখনিঃসৃত কথাগুলো কাউকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে। আদ্রিকা চোখের পানি আড়াল করতে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। প্রান্তিক আদ্রিকার বাহু ধরে নিজের দিকে ফেরাল। কাতর হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?"
আদ্রিকা হাত ছাড়িয়ে বলল,
"আপনি তো কমই বলেছেন। এর চেয়ে খারাপ ভাষা ব্যবহার করলেও আমি অবাক হতাম না।"
"আদ্রিকা!"
"চেঁচিয়ে ভালো পুরুষের পরিচয় দেয়া যায় না। "
"নিজের বউয়ের সাথে অন্য পুরুষকে এতোক্ষণ কথা বলতে দেখলে আমি ঠিক থাকব? তাছাড়া তুমি যখন চলে যাচ্ছিলে ছেলেটা তোমার হাত ধরেছিল।"
"এখানে আমার দোষটা কোথায় প্রান্তিক?"
"আমি জানি তোমার দোষ নেই। তবে তুমি কেন ওর সাথে একা কথা বলতে গেলে? আশেপাশে মানুষ ডাকা যেত না?"
"মানুষ ডেকে লোকটাকে অপমান করতে চাইনি।"
"ওহ, লোকটার অপমান হলে খারাপ লাগবে। আর স্বামী জাহান্নামে যাক। "
আদ্রিকা খানিক থেমে বলল,
"আপনি জেলাস? ভালোবেসে ফেলেছেন আমায়?"
"এতো তাড়াতাড়ি ভালোবাসা হয় না। মোহ হয়। ভালো না বাসলেও তোমার প্রতি রেসপেক্ট ছিল, বিশ্বাস ছিল। কালকে ওভাবে দেখে আমার মনে হলো তুমিও আম্মুর মতো….
অসম্পূর্ণ কথাটার রেশ রেখেই প্রস্থান করল প্রান্তিক। কড়া এক কাপ চা খেতে হবে তার, রাতে না ঘুমানোর ফলস্বরূপ মাথা ধরে আছে। সুযোগমতো একটা সিগারেটও ধরাবে সে।
অপরদিকে কিঞ্চিত বিস্মিত হয়ে আছে আদ্রিকা। প্রান্তিক শেষে কি বলতে চাইল?
অথচ আদ্রিকা জানলই না প্রান্তিক আগে থেকেই অভিকে চেনে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর আদ্রিকার বাসার আশেপাশে অভিকে দেখেছিল সে। বোঝাই যায় ছেলেটা আদ্রিকাকে পছন্দ করে। এতোসব জেনেও প্রান্তিকের রাগ করাটা কি স্বাভাবিক নয়? তার উপর বিয়ে করা বউয়ের হাত ধরে ফেলল ছেলেটা। কি দুঃসাহসিক! প্রান্তিকের খুব রাগ হয়। রাগের মাথায় সে আদ্রিকাকে বাজে কথা বললেও পরক্ষণেই নিজে কষ্ট পায়।
রেস্টুরেন্টের ঠান্ডা হাওয়ায় বসে অভি কফির কাপে ঠোঁট ছোঁয়ায়। মুখে লেগে আছে হাসির সূক্ষ্ম রেখা। সে পকেট থেকে একটা চেকবই বের করে। সেখানে সিগনেচার দিয়ে মাথা দুলায়। গলার স্বর নামিয়ে বলে,
" আপাতত পাঁচ লাখ দিলাম। আদ্রিকাকে ছেড়ে দাও।"
প্রান্তিক অভির কফির কাপ ফেলে দিল। রেস্টুরেন্টের মানুষ উৎসুক হয়ে তাকিয়ে দেখছে তাদের। প্রান্তিক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল। কিছুতেই রাগ কমছে না। অভির হাসিমুখ দেখে তার রাগ তরতর করে বাড়ছে। ইচ্ছে করছে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিতে। প্রান্তিক বলল,
"আপনার অনেক টাকা থাকতে পারে। তবে টাকার জন্য আমি আমার বউ ছাড়তে পারব না।"
অভি পুনরায় হাসে। বলে,
"ভালোবাস বউকে?"
প্রান্তিক অকপটে জবাব দেয়,
"না।"
"তাহলে ছাড়ছ না কেন?"
"কারণ ও আমায় ছেড়ে যাবে না। ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছুই করবো না আমি। একবার ধোঁকা দিয়েছি। দ্বিতীয়বার পারব না।"
"যদি আদ্রিকা নিজে থেকে আমাকে চায়, তাহলে ছাড়বে ওকে?"
প্রান্তিক একনজরে তাকিয়ে থাকে অভির দিকে। ভেবে বলে,
"হ্যাঁ। ও তোমায় চাইলে আমি ওকে বেঁধে রাখব না।"
"কথাটা মনে রেখ, প্রান্তিক শেখ।"
বাসায় এসে প্রান্তিক দুটো গ্লাস ভাঙে। লামিয়া দৌড়ে আসে। বলেন,
"আমার ভাই বিদেশ থেকে এনেছিল। গ্লাসের দাম দিয়ে যাও।"
প্রান্তিক বলে,
"বেতন পেয়ে এর চেয়ে দামী একসেট গ্লাস কিনে দেব। এই মুহূর্তে আমার সামনে থেকে চলে যান।"
সেই মুহূর্তে জাহেদ শেখ এর আগমন হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন,
"এসব কি ধরনের ব্যবহার, প্রান্তিক। ওনি তোমার মা হয়।"
"বাবার বিয়ে করা বউ বাবার বউ হতে পারে। কিন্তু আমার মা হতে পারে না কখনোই। "
"প্রান্তিক। মুখ সামলে কথা বলো।"
"মুখ অনেক আগেই খোলার দরকার ছিল, আব্বু। তুমি একটাবার আমার বোনের মনের খবরটা যদি নেয়ার চেষ্টা করতে! তাহলে তোমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যেত। তুমি ভাবছ, আমি তোমার কাছে জিম্মি। তাহলে শুনে রাখো, আমি তোমার ধার ধারি না। লাগবে না তোমার দেয়া চাকরি। আমি এই বাড়ি ছেড়েও চলে যাব। আর সহ্য করব না। "
জাহেদ শেখ এগিয়ে এসে প্রথমবারের মতো ছেলের গালে কষে থাপ্পড় মারলেন। প্রান্তিক প্রতিত্তোর করল না। রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে বসে রইল। লামিয়া ওদিকে জাহেদ শেখ এর কান ভারী করতে লাগলেন।
আদ্রিকা ভার্সিটি থেকে ফিরে পরিস্থিতি বুঝতে পারে না। ফারিহার কাছে গেলে সে সবটা খুলে বলে। প্রান্তিককে থাপ্পড় মারার কথাটা শুনে আদ্রিকার বেশ খারাপ লাগে। এতোবড় ছেলের গায়ে হাত তোলা মানায়? সে দৌড়ে গিয়ে রুমের দরজা ধাক্কায়। দুমিনিট পরে প্রান্তিক দরজা খুলে দেয়। প্রান্তিক আদ্রিকাকে এক পলক দেখে বলে,
"রেডি হও আমরা এ বাসা থেকে চলে যাচ্ছি। তোমার অসুবিধা হলে তুমি তোমার বাবার বাড়িতেও যেতে পার।"
আদ্রিকা প্রান্তিকের হাত টেনে খাটের উপর বসায়। হাতটা শক্ত করে ধরে বলে,
"তাড়াহুড়োয় সিদ্ধান্ত নেবেন না। আমরা চলে যাওয়া মানে ওনার সুবিধা হওয়া। ওনি যদি বাবার কোনো ক্ষতি করে ফেলেন আপনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন?"
প্রান্তিক আদ্রিকার কোলে মাথা গুঁজে দেয়। অকস্মাৎ আক্রমণে আদ্রিকার ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়। এই প্রথম কোনো পুরুষের এতোটা কাছে আসা। মানুষটা তার স্বামী। তবুও নতুন জন্ম নেয়া কাঁচা অনুভূতিগুলো সামলাতে পারছে না আদ্রিকা। প্রান্তিক আদ্রিকাকে শক্ত করে চেপে ধরে। যেন পিষে ফেলবে। বলে,
"আম্মুর মতো হবে না তো তুমি?"
আদ্রিকা ভাবে অল্পবয়সে মায়ের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারেনি প্রান্তিক। হয়তো আদ্রিকাকেও এতো সহজে হারাতে চায় না। সে প্রান্তিকের চুলে হাত গলাতে গলাতে বলে,
"উহু।"
"তোমার মাঝে জাদু আছে, বলো তো? নাহয় আমার আগুনসম রাগ তোমার স্পর্শ পেয়ে পানি হয়ে গেল কেন?"
বলতে গিয়েও মুখ দিয়ে শব্দগুচ্ছ বেরোল না। প্রান্তিক চোরাচোখে তাকিয়ে বলল,
"স্যরি। আমি হুট করে কিভাবে! বুঝতেই পারিনি।"
আদ্রিকা নতমুখ আর তুলল না। ভীষণ লজ্জা লাগছে তার। যতোটা সময় প্রান্তিক তার কাছাকাছি ছিল কি নিদারুণ ভালো লাগা ছেয়ে ছিল তাকে। ইশ! সময়টা যদি আবার ফেরানো যেত।
আদ্রিকা এক বুক সাহস নিয়ে মুখ তুলল। নরম স্বরে বলল,
"বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। সন্তানের খারাপ লাগায় যায় আসে না। তবে বাবা অসন্তুষ্ট হলে আল্লাহ রাগ করবেন।"
প্রান্তিক রুম থেকে বেরিয়ে গেল। জাহেদ শেখ এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি লামিয়াকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন। প্রান্তিক বাবার পায়ের কাছে বসল। মুখ নিচে নামিয়ে বলল,
"স্যরি আব্বু। আমায় মাফ করে দাও।"
জাহেদ শেখ কেঁদে ফেললেন। ছেলেমেয়ে দুটো তার প্রাণ। ছেলেকে মারার পর তার মনটা ছোট হয়ে আছে। তিনি ছেলেকে কাছে ডাকলেন। ভেজা কন্ঠে বললেন,
"আর কখনো মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে না। আমি যেন এসব না শুনি।"
প্রান্তিক ভেতরে ভেতরে হাসল। বাবা যদি মহিলার সত্যটা একবার জানতেন। দিনদিন এই বাড়িতে থাকা প্রান্তিকের জন্য নরকসম মনে হচ্ছে। সে মুক্তি চায় সব থেকে। একটু সুখে থাকতে চায়।
সন্ধ্যা থেকে আকাশ গুড়গুড় করছে। মুহূর্তেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আদ্রিকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তার বৃষ্টি ভালো লাগে। বৃষ্টি হলে স্কুল কামাই করা যেত সহজেই। তার উপর মায়ের হাতের খিচুড়ি আর গরুর গোশত। আর দিনভর কাঁথা মুড়ি দিয়ে উপন্যাস পড়া। কি সুন্দর ছিল দিনগুলি। চাইলেও ফিরিয়ে আনা যাবে না।
রাতে আদ্রিকা জমপেশ খিচুড়ি রান্না করে ইউটিউব দেখে। দেখতে বেশ লোভনীয় লাগছে। খাওয়ার টেবিলে সবাই প্রশংসা করলেও প্রান্তিক নিশ্চুপ থাকে। সে নির্বিকার হয়ে খেয়েই যাচ্ছে। আদ্রিকাও সবার সাথে খেতে বসে। খাওয়া শেষে সব গুছিয়ে রুমে যায়। তাকে রুমে দেখেই প্রান্তিক হেসে বলে,
"এতো ভালো রান্না করে খাওয়ালে, তাও আমার পছন্দের খাবার। আজ যা চাইবে তাই দেব। বলো কি চাও?"
"সত্যি দেবেন?"
"চেয়েই দেখো না।"
"সময়মতো চাইব। আজ নয়। আপনি নিজেকে প্রস্তুত রাখবেন।"
প্রান্তিক ঠোঁট কামড়ে হাসে। অথচ গুণাক্ষরেও টের পায় না আদ্রিকার মনে কি চলছে।
রাতে শোয়ার সময় বাঁধে বিপত্তি। ওয়েদার ঠান্ডা হওয়ায় কাঁথা গায়ে নিতে হবে। অথচ রুমে একটাই কাঁথা। আলমারিতে লেপ আছে, তবে সেটা গায়ে দিলে গরম লাগবে। বাধ্য হয়ে প্রান্তিক বলে,
"তুমিই কাঁথাটা নাও। আমার শীত লাগে না। "
"আপনি নিন। আমার লাগবে না।"
"আচ্ছা, শেয়ার করব।"
আদ্রিকা বিষম খায়। প্রান্তিক পানি এগিয়ে দেয়। খানিকটা দূরত্ব রেখে দুজনেই শুয়ে পড়ে। আধা ঘন্টার মাঝে প্রান্তিকের নিশ্বাস ভারী হয়ে আসে। আদ্রিকার চোখে এখনো ঘুম নেই। ঘুমের ঘোরেই প্রান্তিক অনেকটা কাছে চলে আসে। ঘুমুঘুমু মায়া জড়ানো কন্ঠে বলে,
"আমায় ছেড়ে যাবে না তো?"
আদ্রিকা কেঁপে উঠে। সে কেন মায়ায় বেঁধে যাচ্ছে? তার সময়সীমা তো মাত্র এক বছর।
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১১
বাতাসে আদ্রিকার চুল উড়ছে। পিঠময় ছড়ানো ঈষৎ কোঁকড়ানো চুল দেখে প্রান্তিকের ভীষণ লোভ লাগল। যেন চুম্বকের ন্যায় আদ্রিকার স্নিগ্ধ অবয়ব তাকে টানছে। মেয়েটা ভর সন্ধ্যায় গোসল করে কেন? প্রান্তিক সম্মোহনের মতো কদম ফেলে আদ্রিকার দিকে এগোয়। ঘাড়ে থুতনি রাখে। বিয়ের এক মাসে এটাই প্রথম এতো কাছাকাছি আসা। প্রান্তিকের মস্তিষ্কের বোধ লোপ পেয়েছে। সে নিজেও জানে না সে কি করছে। ঝড়ের ন্যায় আদ্রিকার ভেতর তোলপাড় শুরু হয় প্রান্তিকের উষ্ণ স্পর্শে। প্রান্তিক আদ্রিকাকে সামনে ফেরায়। ফর্সা মুখায়বে ভয়ের ছাপ। লালচে হয়ে থাকা ঠোঁটের কাঁপন প্রান্তিকের ভেতরটাকে নাড়িয়ে দিল। সে মৃদুভাবে আদ্রিকার দু গাল আজলা ভরে নেয়। নিজের পুরুষালী পুরু ঠোঁট এগিয়ে আনে। আদ্রিকার দুচোখ বেয়ে নোনাজল গড়ায়। সে প্রান্তিককে ধাক্কা দিয়ে সরায়। গলার স্বর অস্বাভাবিক কাঁপিয়ে বলে,
"আমায় এভাবে ছোবেন না, প্লিজ।"
হঠাৎই সম্বিত ফিরে পায় প্রান্তিক। তবুও অনবদমিত ইচ্ছেগুলোকে কবরস্থ করতে পারে না। কিয়দংশ পূর্বে যা ঘটেনি তার জন্য আফসোস হয়। পুনরায় কর্ণগোচর হয় আদ্রিকার কন্ঠস্বর।
"শরীর ছুঁয়ে দেখলে তুমি, মন ছুঁতে আর পারলে কই?
পুরো লাইব্রেরি দিয়েছিলাম তোমায়, তুমি পড়লে একটি বই।
কথাটা শুনেছেন তো? নারীর মন ছোঁয়া দুঃসাধ্যের ন্যায়। শরীর তো ধর্ষকও ছুঁয়ে দেয়। আমি আপনার স্ত্রী। আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আমায় ছোঁয়ার। তবে আপনার প্রতিটা ছোঁয়া আগুনের ফুলকির ন্যায় আমার হৃদয়কে আঘাত করবে। সে ছোঁয়ায় কোনো ভালোবাসা থাকবে না। থাকবে শারীরিক প্রয়োজন। তবুও যদি আপনি আমায় ভোগের বস্তু মনে করেন, তবে আপনাকে বাঁধা দেয়ার শক্তি আমার নেই। উন্মুক্ত করলাম নিজেকে আপনার কাছে, নিজেকে সমর্পণ করলাম স্বামীর নিকট। তবে আমার মন ছোঁয়া আপনার সাধ্যতীত রয়ে যাবে চিরকাল। আপনি আজীবন শুধু আমার শরীরটাই পাবেন। মনের মিলন ঘটবে না কখনোই।"
কথার বাণে বিদগ্ধ হয় প্রান্তিক। সে এতোটা নিচে নামতে পারল? নিজের স্ত্রীকে ধর্ষকের মতো ছুঁতে চায় না সে। অনুভূতির জোয়ার সামলাতে না পেরে সে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিল। কস্মিনকালেও ভাবেনি এইভাবে সে আদ্রিকাকে কখনো কষ্ট দেবে। গুণীজনেরা তবে ঠিকই বলে। নারী-পুরুষ আগুন আর ঘিয়ের ন্যায়। সামান্য উসকানিতে তান্ডব ছেয়ে যায়। আদ্রিকার মুখের দিকে তাকিয়ে মনটা ভেঙে যায় প্রান্তিকের। সেখানে তার প্রতি একরাশ ঘৃণার স্তুপ রয়েছে।
পরের কয়েকদিন হু হা ছাড়া দুজনের মধ্যে কোনো কথা চালাচালি হলো না। প্রান্তিক রাত কাটায় আলাদা ঘরে। আদ্রিকার থেকে যথাসম্ভব দূরে থেকে নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় প্রান্তিক। তবে বেশ কিছুদিন ধরেই প্রান্তিক অস্বস্তি বোধ করছে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে কখনো পড়তে হয়নি। তাদের বিয়েটা স্বাভাবিক আর প্রান্তিকের প্রথমদিকের আচরণগুলো রুঢ় না হলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক ছিল। এর মাঝে আদ্রিকা জানাল সে বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে চায়। প্রান্তিক বুঝতে পারছে আদ্রিকা দূরত্ব চাইছে। সে দ্বিমত করেনি। সম্পর্কের বাঁধন যে জোড়া লাগতেই আলগা হয়ে যাবে তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি প্রান্তিক। কই, আদ্রিকা তো প্রায়শই এ বাড়িতে আসত। কখনো তো প্রান্তিক ওমন বেসামাল হয়ে যায় নি। স্থান, কাল, সময়ভেদে এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। এক ছাদের নিচে দু'টো মানুষ থাকলে কতকিছু হয়ে যায়। সেসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে প্রান্তিক। আশেপাশেই তো কত মিসম্যাচ স্বামী-স্ত্রী রয়েছে, যারা বহু বছর একসাথে থেকেও কেউ কারো মনের খবর রাখেনি। প্রান্তিকের আম্মু কি পেরেছিল তার বাবার মনের খবর রাখতে? আপাদমস্তক ভাবতে ভাবতে ফাগুনকে কল লাগায় প্রান্তিক। দুজনের মাঝে বোঝাপড়া ভালো থাকায় ঘটনার আদ্যোপান্ত খুলে বলে প্রান্তিক। ফাগুন সব শুনে হতভম্ব। দুষ্টু কন্ঠে বলে,
"তুই এতোদূর এগিয়ে গেলি। চাচা হওয়ার বোধহয় আর বেশিদিন নেই।"
"ফাজলামি করবি না একদম।"
"তুই-ই তো ভুলটা করলি। আগে ভাবীকে কনফেস করতি মনের কথাগুলো। বাই দ্য ওয়ে তুই ভালোবাসিস ওকে?"
"বুঝতে পারছি না। তবে ও কাছাকাছি থাকলে সব ভালো লাগে। কখন যে কি করতে যাচ্ছিলাম বুঝেই উঠতে পারিনি। তাছাড়া ওর মতো লক্ষী মেয়ে কয়টা আছে বল? অন্য যেকেউ হলে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে চাইত।"
"মাম্মাহ! প্রেম তবে জমে ক্ষীর। আমার কথা শোন। সময় বুঝে ওকে প্রপোজ কর। মেয়েরা এসব আগে চায়। দেখবি তোর ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারলে ও নিজেই তোকে ধরা দেবে।"
"বিশ্বাস করতে চাইছি না। সেই কলেজ লাইফে আবেগের বশে একটা প্রেম করেছিলাম। সেই মেয়েও তো তিন বছরের মাথায় চলে গেল। ও যে চলে যাবে না তা কি করে বলব?"
"এমনভাবে বেঁধে ফেল যেন মৃত্যুর আগ অব্দি তোকে ছাড়তে না পারে।"
"কিভাবে?"
"তুই তো বলছিস ও ভালো মেয়ে। যেহেতু তোর সাথে অনেকদিনের পরিচয় তুই ভালোই জানবি। ওকে সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত উপহার দে, তবে তোর দুর্বলতা দেখাবি না। স্ট্রংভাবে উপস্থাপন কর নিজেকে। ওকে নিজের অর্ধাংশ করে ফেল। ও কিছুতেই ছাড়তে পারবে না তোকে।"
"হারিয়ে ফেলার ভয় আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।"
"এতো ভাবিস না। পৃথিবীর সব মেয়ে এক হলে কোনো পুরুষই আর সংসার করতে পারত না। বিশ্বাস দিয়ে ভালোবাসার ভিতটা মজবুত কর।"
"আমি চেষ্টা করব। তুই এতো বোঝদার হলি বুঝি আমার বোনের প্রেমে পড়ে?"
জিভে কামড় দেয় ফাগুন। অনুনয় করে বলে,
"তুই আপত্তি করবি না তো?"
"ধুর, কিসের আপত্তি। তবে আমার বোনকে কখনো টোকাও দিতে পারবি না।"
ফাগুন হাসে। জবাব দেয়,
"দিব না। তোর বোনকে আমি সবসময় আগলে রাখব।"
ফোন রেখে প্রান্তিকের খানিকটা হালকা বোধ হয়। আদ্রিকা তবে বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসুক। ধীরে সুস্থে বলা যাবে। এরমধ্যে অনুভূতিগুলো আরও গাঢ় হবে।
নেভি ব্লু কুর্তি আর একটা লেডিস জিন্স পড়ে আদ্রিকা প্রান্তিকের সামনে আসে। প্রান্তিক পলক ফেলতে ভুলে যায়। মনে হচ্ছে সদ্য প্রস্ফুটিত কোনো ফুল তার ঘরে লুটোপুটি খাচ্ছে। আদ্রিকা জানিয়ে গেল,
"আসছি।"
"সাবধানে যাও। ফেরার দিন আমায় কল করবে। আমি নিয়ে আসব।"
"হুম।"
দুপা গিয়ে আবার পেছনে ফেরে আদ্রিকা। বলে,
"একটা কথা রাখবেন?"
কন্ঠে কাতরতা। একটু ভালো আচরণে প্রান্তিকের বুকে প্রশান্তি ছেয়ে যায়। সে উত্তর দেয়,
"বলো, রাখব।"
"আর সিগারেট খাবেন না।"
দুপাশে মাথা দুলায় প্রান্তিক।
নিজের বাড়িতে এসে প্রাণ জুড়ায় আদ্রিকার। লামিয়া বেগমের কটু কথা, আর প্রান্তিকের দেয়া অস্বস্তি থেকে মুক্তি মিলবে ক্ষণিকের জন্য। বিকেলের দিকে আদ্রিকা প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনতে বাইরে যায়। হুট করে দেখা মিলে অভির। আদ্রিকার কাছে ব্যাপারটা কাকতালীয় লাগলেও সে টের পায়নি অভি তাকে ফলো করছে। অভি আদ্রিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
"এক কাপ কফি খেতে পারবে আমার সাথে?"
আদ্রিকা কপালের ঘাম হাতের তালু দিয়ে মুছে নেয়। কর্কশ কন্ঠে বলে,
"এতো আজাইরা সময় আমার নেই।"
"ইশ! কি বলছ। তোমার স্বামীই তো আমায় অনুমতি দিল তোমার সাথে প্রেম করার।"
চলবে?
সবাই রেসপন্স করবেন। পর্যাপ্ত রেসপন্স না পেলে পরবর্তী পর্ব আর লিখব না। আমি পাঠকদের জন্য লিখি। তারাই যদি রেসপন্স না করে লিখে লাভ কি?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১২
অভির কথায় গা শিরশিরানি দিয়ে উঠল আদ্রিকার। চাপা অভিমানে ভেতরটা তিক্ত হয়ে রইল। বউ মানে না বলে সে কি আদ্রিকার বোঝা অন্যের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে? অথচ প্রান্তিকের আচরণে তো এমন মনে হয় না। অবশ্য অভি মিথ্যাও বলতে পারে। অভি হাসিহাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল। এই লোকের ঠোঁটের কোণে সর্বদা হাসি লেগে আছেই। তপ্ত শ্বাস ফেলে আদ্রিকা বলল,
"আমি এতোটা সস্তা নই যে, যে কারো সাথে কফি খেতে বসে যাব। তাছাড়া আপনি আমার পিছু ছেড়ে দিলেই মঙ্গল। প্রান্তিককে স্বয়ং আল্লাহ আমার জন্য পছন্দ করেছেন। আর সৃষ্টিকর্তার পছন্দে কখনো খুঁত থাকে না, ভুল থাকে না। আমি ওনার সাথে নিজের নাম জড়িয়ে রাখতে চাই অাজন্মকাল।"
অভি হাত মুষ্টিবদ্ধ করল। এই প্রথম তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল হাওয়ায়। সে পুনরায় তীর ছুঁড়ল,
"তোমাদের মাঝে আদৌও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আছে? না পুরোটাই নাটক?"
"কি বোঝাতে চাইছেন?"
অভি বাঁকা হাসল। সে বলল,
"মানে তোমার ফিজিক্যালি এটাচড তো?"
অভিকে চড় মারতে যেয়েও নিজেকে সামলে নিল আদ্রিকা। ঝাঁঝালো স্বরে উত্তর দিল,
"আপনার জঘন্য প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই৷ আপনি লিমিট ক্রস করছেন। আমি এখন মানুষ ডাকব।"
ভাবান্তর হলো না অভির। সে যেন প্রবল নেশায় ডুবে আছে। কিছুতেই ঘোর কাটছে না। আদ্রিকা আরও কিছু বলার আগেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে পা ফেলে প্রস্থান করল অভি।
রাতে আদ্রিকার চারজন মামাতো বোন, তিনজন ভাই আসে। আদ্রিকাই ফ্যামিলি মেসেঞ্জার গ্রুপে ওদের আসতে ইনভাইট করেছে। ভেবেছে ওদের সাথে আড্ডা দিয়ে সুন্দর সময় কাটাবে৷ নায়লাও ভীষণ খুশি। ভাইয়ের ছেলেমেয়েদের তিনি বেশ পছন্দ করেন। সবকটা ফুপু ফুপু করে জান দিয়ে দেয়। তিনি চুলায় রোস্ট রান্না করছেন। কাজের বুয়াকে বলেছেন গরুর মাংস ধুয়ে দিতে। আদ্রিকা রান্নাঘরে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। চামচ দিয়ে রোস্টের ফুটে উঠা ঝোল মুখে নিল। বলল,
"এক পিস তুলে দাও তো আম্মু। প্লেটে নিয়ে খাব। পোলাও করেছ না? একটু পোলাও দাও। কতোদিন তোমার রান্না খাই না। "
নায়লা আগ্রহ নিয়ে মেয়েকে প্রশ্ন করেন,
"তোর শ্বশুর বাড়িতে কে রান্না করে?"
"আমি আর ফারিহা। সকালের নাস্তা ওনি বানায়।"
"তুই সুখে আছিস তো, মা?"
আনমনা হয়ে যায় আদ্রিকা। সে মায়ের শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলে,
"এখন আর খাব না,আম্মু। রাতে একসাথে খাব সবাই। তুমি জমিয়ে মাংস রাঁধ তো। আস্ত রসুন দিবে, ঝালটা যেন একটু বেশি হয়। ও বাড়িতে ঝাল খাওয়া হয় না। তরকারি কেমন পানসে লাগে আমার।"
নায়লা সন্তপর্ণে চোখের জল আড়াল করলেন। তার চিন্তার পারদ ভারী হচ্ছে দিনদিন। ভালো চাকরি থাকলেই কি একটা ছেলে ভালো হয়ে যায়? বিয়ের আগে তো এসব চিন্তা আসেনি। এজন্যই গুরুজনেরা বলেন, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না। নায়লা আল্লাহর কাছে পাঁচশ রাকাত নফল নামাজ এর মানত করেন মেয়ের সুখের জন্য। তিনি কিছুদিন আগে এক পীর থেকে জেনেছেন একটা দোয়া পড়ে ফুঁ দিলে স্বামী বশ হয়ে যায়। তিনি অবশ্যই আদ্রিকাকে দোয়াটা শিখিয়ে দিবেন। পবিত্র অবস্থায় দোয়া পড়ে গোলাপ ফুলে ফুঁ দিতে হবে। সেই গোলাপ ঘুমন্ত স্বামীকে শুকাতে হবে। কাজটা কঠিন নয়। তবে আদ্রিকা রাজি হলে হয়।
এক ফাঁকে নায়লা মেয়েকে রান্নাঘরে ডেকে আনেন। বলেন,
"মা, এই দোয়াটা শিখে নিও। চল্লিশ বার পড়ে গোলাপ ফুলে ফুঁ দিবে। ইনশাআল্লাহ প্রান্তিক বশ হবে।"
আদ্রিকা সোজাসাপ্টা উত্তর দিল,
"দোয়া, ঝাড়ফুঁক দিয়ে আমি মানুষ আটকে রাখতে চাই না, আম্মু। যে সত্যিকার অর্থে আমার হবে, তাকে কেউ চাইলেও ফেরাতে পারবে না। "
নায়লা মেয়েকে অনেকরকম পরামর্শ দিলেন। আদ্রিকা তার সিদ্ধান্তে অনড়। মানুষকে এসব দিয়ে বেঁধে রাখা তার কাছে ঠুনকো মনে হয়। আসলেই কি এভাবে কাউকে পুরোপুরি পাওয়া যায়? উহু। পুরোপুরি পাওয়া বেশ কঠিন। যুগ যুগ সাথে থেকেও কেউ কাউকে পুরোপুরি পায় না। আবার কেউ কয়েক মুহুর্তেই অপর মানুষটাকে পুরোপুরি পেয়ে যায়। আদ্রিকা চায় প্রান্তিক তাকে বুঝুক। একটু সময় নাহয় লাগল। তাতে কি? যদি কখনোই প্রান্তিক আদ্রিকার মন পড়তে না পারে, তাহলেও আদ্রিকার আফসোস নেই। সে নিজের সবটুকু দিয়ে প্রান্তিককে জানবে, তার মন বুঝবে। হয়তো সারাটা জীবন সে প্রান্তিকের কাছে থাকতে পারবে না, তবুও আদ্রিকার জীবনে প্রান্তিক ছাড়া দ্বিতীয় কোনো পুরুষ আসবে না। কখনোই না। নায়লা একবার বলেছিলেন, মাগো! মেয়ে মানুষের বিয়ে একটাই, মনে রাখবি সবসময়। আদ্রিকা মনে রেখেছে। তবে এই নয় সে অন্যায় সহ্য করবে। তার আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলবে। প্রান্তিককে সে একটা সুযোগ অবশ্যই দিবে। তবে দ্বিতীয়বার প্রান্তিক তাকে অপমানিত করলে এই মুখ সে কখনোই প্রান্তিককে দেখাবে না।
আদ্রিকার চার বোন তিথি, মিষ্টি, অথৈ আর মৌ। এরমধ্যে মৌ এর বিয়ে হয়েছে। বাকি তিনজন পড়াশোনা করছে। মিষ্টি সবার ছোট। সে এবার এইচএসসি দিবে। আর তিন ভাইয়ের মাঝে সাদ সবার বড়। ওর ছোট রিশান আর রিজভী। দুজন পিঠাপিঠি। সাতজন মিলে দারুণ প্লেন সাজিয়েছে। নায়লা আর আফজাল হোসেন প্রান্তিককে রাতে আসতে বলেছেন। রাত আটটার পর থেকে তারা আদ্রিকাকে নিজের রুমে ঢুকতে দিচ্ছে না।
প্রান্তিক এলে সবাই মিলে খানিকক্ষণ ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলে। এক পর্যায়ে আদ্রিকাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে কখনো প্রেম করেছে কিনা। আদ্রিকা অকপটে না বলে। খেলা শেষে ওরা খেতে বসে। নায়লা খাওয়া শেষে প্রান্তিককে রুমে যেতে বলেন। রুমের দরজার সামনেই তার শালা শালিরা অপেক্ষা করছিল। ওরা দুজনকে সারপ্রাইজ দিতে রুমটা সাজিয়েছে ফুল আর মোমবাতি দিয়ে। আদ্রিকাকে বুঝিয়ে রুমে পাঠিয়েছে দুমিনিট আগেই। প্রান্তিক এগিয়ে আসতেই সাদ বলল,
"আমাদের তরফ থেকে আপনার জন্য ছোট একটা গিফট, ভাইয়া। আশা করি খুশি হয়েছেন। এখন আমাদের খুশি করার দায়িত্ব আপনার। "
প্রান্তিক রুমের কিছু অংশ পর্দার ফাঁক দিয়ে দেখে পুরোটা বুঝে যায়। অজানা আশংকায় তার বুক কাঁপতে থাকে। নিজেকে সামলে সে হাসিমুখে বলে,
"কি চাই আমার ভাই-বোনদের?"
"সবাই একসাথে বলে, কাল আমাদের নিয়ে ঘুরতে যেতে হবে।"
প্রান্তিক সায় দেয়। অতঃপর তাকে রুমে দিয়ে পেছন থেকে দরজা লক করে দেয় রিশান। রিজভী বলে উঠে,
"সকালের আগে আমরা আর ডিস্টার্ব করছি না, ভাইয়া।"
হাসির গুমড়ে আত্মা কেঁপে উঠে প্রান্তিকের। কি করবে সে! রুমের ভেতর ফুলের তীব্র গন্ধে মাথা ধরে যাচ্ছে। মোমের আলোয় আদ্রিকাকে মায়াবতী থেকে কম লাগছে না। নিজেকে পুনরায় সে সামলাবে কি করে? এতোদিন পর আবার সেই পুরোনো অনুভূতি। সর্বনাশা অনুভূতি। আদ্রিকা ঠায় বিছানায় বসে রইল। প্রান্তিক ধীর, শান্ত গলায় বলল,
"ভয় পেয় না। আমি তোমায় ছোঁব না।"
চলবে?#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
পর্ব:১২ ( বর্ধিতাংশ)
আদ্রিকা বেশ অপ্রস্তুত বোধ করে প্রান্তিকের কথায়। ইতিউতি করে বলে,
"সমস্যা নেই, আমি বিশ্বাস করছি আপনাকে। আপনি বিছানায় এসে বসুন।"
প্রান্তিক শান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় বসে। জিজ্ঞেস করে,
"সত্যিই তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিল না? "
"উহু।"
"কাউকে ভালো লাগেনি কখনো।"
"লেগেছে। তবে আম্মু খুব স্ট্রিক্ট আপনি তো জানেনই। সেজন্য সবটা ভালো লাগা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল।"
"আমায় বিয়ে করে আফসোস আছে তোমার?"
"ছিহ, এসব কোন ধরনের কথা। বিয়ে একটা পবিত্র বন্ধন। এটা নিয়ে আমার আফসোস নেই। তবে বিয়ের আগে সত্যিটা জানলে আমি কখনোই রাজি হতাম না।"
"আমি ভীষণ স্বার্থপরের মতো কাজ করেছি। এখন গিল্ট ফিল হচ্ছে। গিল্ট কমানোর জন্য তোমার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করতে চাই। সে সুযোগ আমায় দিবে?"
আদ্রিকা বিস্ময় নিয়ে স্বামীর দিকে তাকায়। এই পুরুষকে সে চেনে না। সে ভাবেইনি প্রথম কদমটা প্রান্তিক ফেলবে। আদ্রিকা নিজেকে স্থির করে। বলে,
"স্বামী হিসেবে একটা সুযোগ আপনি পাচ্ছেন। তবে এটাই আপনার প্রথম এবং শেষ সুযোগ।"
"আমি মাথায় রাখব।"
খানিক থেমে আদ্রিকা শুধায়,
"আপনার গার্লফ্রেন্ড ছিল?"
"হু।"
দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে আদ্রিকার। বুকের কোথাও অসহ্য চিনচিনে ব্যাথা অনুভূত হয়। রক্তিমাভ চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"সিরিয়াস প্রেম ছিল?"
"যখন ছিল তখন সিরিয়াস ছিলাম। এসব টানছ কেন? অতীত চলে গিয়েছে। বর্তমানে তুমি আছ।"
"অতীত ফিরে আসতে কতক্ষণ? তাছাড়া প্রথম ভালোবাসা ভোলা যায় না।"
"আমি একবারও বলেছি যে কাউকে ভালোবাসতাম?"
অসহ্য ব্যাথাটা এইবার হালকা হয়ে আসে আদ্রিকার। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে প্রান্তিক ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল কিনা। তবে সাহস হয় না। এসব কথা বলার মতো সম্পর্ক ওদের ভেতর নেই। মনের মাঝে খচখচ করতে থাকে আদ্রিকার। পরমুহূর্তেই মনে পড়ে প্রান্তিক তো মেয়েটাকে ভালোবাসেনি। তাহলে চিন্তার সুতোটা কাটছে না কেন? গলার আছে প্রশ্ন হয়ে বিঁধে আছে। কোনো মেয়েই স্বামীর গোপন প্রেমের কথা সহ্য করবে না। আদ্রিকার ধ্যান ভাঙে প্রান্তিকের প্রশ্নে।
"আমার বদলে যাওয়া মানতে পারবে তো?"
"বদলাবেন কেন?"
"এতোদিন তো বউ মানি নি। এখন যেহেতু মেনে নিয়েছি বউয়ের মতো ট্রিট করব না?"
ঈষৎ রক্তিম হয়ে উঠে আদ্রিকার গাল। আজকে লোকটা বউ বলেই ডাকছে বারবার। এই শব্দটাই এতো সুন্দর? নাকি মানুষটার গলায় শুনছে বলে ভালো লাগছে!
"উত্তর দিলে না যে!"
"ঘুমান তো। রাত কয়টা বাজে খেয়াল আছে?"
"সম্পর্কে বিশ্বাসের সাথে আরেকটা ব্যাপার লাগে। সেটা হচ্ছে বন্ধুত্ব। স্বামী মানতে কষ্ট হলে বন্ধু মানতে পার।"
আদ্রিকার বেশ অভিমান হয়। প্রান্তিক ওর নীরবতা দেখেও বুঝলো না সে কি চায়? পাষণ্ড পুরুষ একটা!
সে রাতে প্রান্তিকের ঘুম হলেও আদ্রিকার ছাড়াছাড়া ঘুম হলো। বারবার মাথায় প্রান্তিক ঘুরতে লাগল। তবে কি সে প্রেমে পড়লো? ভাবতেই শরীর ঘেমে যাচ্ছে। যে মেয়ে কিনা ফুপাতো ভাই বিয়ে করবে না বলে অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে ছিল সেই মেয়েই কিনা ফুপাতো ভাইয়ের প্রেমে? ইশ! ব্যাপারটা প্রান্তিক জানলে কি মনে করবে? ধুর, আদ্রিকা কখনোই জানাবে না। যথাসম্ভব লুকিয়ে রাখবে। বলার হলে প্রান্তিকই আগে বলবে। মেয়ে হয়ে সে কেন আগ বাড়িয়ে বলতে যাবে?
পরের দিন বিকেলে অফিস থেকে এসে প্রান্তিক সবাইকে নিয়ে ঘুরতে বের হলো। নায়লাকেও বারবার আসতে বলেছিল। তবে ছেলে ছোকরাদের মাঝে তিনি যেতে চান নি। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা কতো রকম মজা, তামাশা করে। রাস্তায় বের হয়েই মোড়ের মাথায় একটা ফুচকার গাড়ি নজরে পড়ল। মেয়েরা ফুচকা খাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। সবাই মিলে নয় প্লেট ফুচকা অর্ডার দিল। এইদিকে তিথি বলে যাচ্ছে,
"মামা, বেশি করে কাঁচামরিচ দিয়ে মাখেন। টকে আরো মরিচ দিন। ঝাল ছাড়া ফুচকা মজা নেই। "
মামা তিথির কথামতোই ফুচকা বানাল। তবে সেই বাটি ভুলে আদ্রিকাকে দিয়ে দিলেন। আদ্রিকা ঝাল খেয়ে অভ্যস্ত। তবে দুটো খাওয়ার পর কাঁচামরিচ কামড় পড়ল। মুখটা ঝালে জ্বলতে লাগল আদ্রিকার। চোখ থেকেও পানি বের হয়ে এলো। সে আড়চোখে প্রান্তিকের দিকে তাকাল। ইশারা বুঝে প্রান্তিক কাছে আসল। ফিসফিসিয়ে বলল,
"ভেব না নায়কদের মতো চুমু দিয়ে ঝাল কমিয়ে দিব। আপাতত পানিতে কাজ চালাও বউ!"
চলবে…
ভেবেছিলাম গল্প দিব না আজকে। তবে পাঠকদের খুশি করতে একটু লিখলাম। কেউ মন খারাপ করবেন না। ঈদ মোবারক সবাইকে। আল্লাহ আমাদের কোরবানি কবুল করুক।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৩
প্রান্তিকের হাত থেকে পানির বোতলটা নিয়ে কয়েক চুমুক খেয়ে ঝালটা আয়ত্তে আনল আদ্রিকা। হৃদযন্ত্রটা এখনো তড়িৎ গতিতে লাফাচ্ছে লাগামহীন কথাগুলোয়। ভেতরটা সংশয়ের অনলে পুড়ছে। আদৌও ওদের মাঝে এমন সম্পর্ক হবে?
সন্ধ্যা অব্দি ঘোরাঘুরি শেষে সবাই রেস্টুরেন্টে খেতে গেল। প্রান্তিক সবার জন্য সেট মেন্যু অর্ডার দিল। সাদ টিটকারি করে বলল,
"বাহ, ভাইয়া তো ইতোমধ্যেই আমার বোনের পছন্দ জেনে ফেলেছে। এই গাধাটা চিকেন ফ্রাই এর এমন পাগল।"
প্রান্তিক পারতপক্ষে কিছুই জানত না। আন্দাজে অর্ডার দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর খাবার আসল। ফ্রায়েড রাইস, চাইনিজ সবজি, একটা চিকেন ফ্রাই আর চিকেন মাসালা। সবাই খাওয়ার উপর হামলে পড়ল। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করায় সবারই বেশ খিদে লেগেছে। প্রান্তিক আঁড়চোখে সবাইকে দেখে নিল। তারপর নিজের প্লেট থেকে চিকেন ফ্রাইটা আদ্রিকার প্লেটে তুলে দিল। ভীষণ অদ্ভুত অনুভূত হচ্ছে আদ্রিকার। সে চিকেনটা ফেরতও দিতে পারছে না। কারণ প্রান্তিক ওর বাম হাত চেপে ধরে রিকুয়েস্ট করছে খাওয়ার জন্য। তবুও আদ্রিকা মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল। একসময় মৃদু কন্ঠে বলল,
"মিলেমিশে খাওয়া ভালো বুঝলে? মহব্বত বাড়ে।"
আদ্রিকা হতবিহ্বল হয়ে রইল। হুট করে লোকটা কি শুরু করেছে? সত্যিই কি প্রান্তিক স্বামী রুপে এমন ঠোঁটকাটা। হজম করতে বেগ পেতে হচ্ছে আদ্রিকাকে। তবে মনের এককোণে ভালো লাগাটাও বেড়ে চলছে চক্রবৃদ্ধি হারে।
রাতে প্রান্তিক শ্বশুরবাড়িতে থাকতে না চাইলেও আদ্রিকার কাজিনরা তাকে ছাড়ল না। তাদের সঙ্গ দিল নায়লা আর আজমল হোসেন। সবার অনুরোধের পর প্রান্তিক আদ্রিকার চোখের দিকে চাইল। সে চোখে দেখতে পেল আকুতি। শেষমেশ আর না করতে পারে না ছেলেটা। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলতে গোসলে যায়। আদ্রিকা প্রান্তিককে টাউজার আর টিশার্ট গুছিয়ে দেয়। প্রান্তিকের দৃষ্টির আড়ালে খানিকটা শুঁকেও নেয়। পরিচিত পুরুষালি মাতাল সুবাসে মনটা ফুরফুরে হয়। তারপর খাটের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আদ্রিকা। ভাবতে থাকে নিজের মনে থাকা অনুভূতিগুলো নিয়ে। এতো অল্পদিনের মাথায় ডিসিশন নেয়াটা ভুল মনে করল। তাছাড়া প্রান্তিক এর আগেও সম্পর্কে ছিল। কে জানে সে এখনো সেসব মনে করে কিনা। আদ্রিকা সম্পূর্ণরুপে স্বামীকে চায়। যার মনের সাম্রাজ্যে শুধু তার স্ত্রী থাকবে। আদ্রিকা তো কখনো অন্য কাউকে নিয়ে ভাবে না। তাহলে প্রান্তিক কেন ভাবতে যাবে! ভাবল আজ সেসব নিয়ে কথা তুলবে। একসময় প্রান্তিক গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। ভেজা চুল, ভেজা মুখ নিয়ে আদ্রিকার সামনে দাঁড়াল। এমন লাস্যময়ী রুপ দেখে আদ্রিকার অস্বস্তি তুমুল বেগে বেড়ে গেল। প্রান্তিক তোয়ালেটা নিয়ে চুল মুছতে লাগল। আর আদ্রিকার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আদ্রিকা প্রান্তিকের বুকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে মায়ের তোড়জোড় দেখতে লাগল। একসময় রুম থেকে প্রান্তিক হাঁক ছাড়ল,
"আদ্রিকা, আমার চিরুনি পাচ্ছি না।"
নায়লা হাসলেন। মেয়েকে তাড়া দিয়ে বললেন,
"জামাইর কি লাগবে দেখ গিয়ে। "
আদ্রিকা ভীষণ লজ্জা পেল। ইশ! আগে তো লোকটা এমন করেনি। এখন হুটহাট ডাকছে, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যবহার করছে। লজ্জায় আদ্রিকার গলায় কথা আটকে আসে। সে রুমে এসে দেখে প্রান্তিক চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে।
"চিরুনি নাকি পাচ্ছেন না?"
"চিরুনি তো কখন পেয়ে গিয়েছি। শুধু বউয়ের মন পাচ্ছি না।"
লজ্জায় গাঁট হয়ে আসল আদ্রিকা। সে দু'হাত কচলাতে লাগল আপনমনে।
রাতে শোয়ার সময় অন্যবারের চেয়ে বেশি অস্বস্তি লাগল আদ্রিকার। সে টের পেল প্রান্তিক পাশে এসে শুয়েছে। কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হওয়ার পর আদ্রিকা গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে,
"একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"
"করো না।"
"আগে বলুন রাগ করবেন না!"
"রাগার মতো হলে রাগ অবশ্যই করব।"
"উফ, তাহলে বলব না।"
"আচ্ছা, রাগ না করার চেষ্টা করব। এবার বলো।"
খানিক দ্বিধা নিয়ে আদ্রিকা প্রশ্ন করে,
"আপনি কখনো আপনার গার্লফ্রেন্ডকে চুমু খেয়েছিলেন বা এর চেয়েও গভীর কিছু?"
তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে বসে প্রান্তিক। বলে,
"আবেগের সম্পর্কই হোক আর ভালোবাসাই হোক সবার আগে শরীরটা সামনে আসে। এটা আমি অস্বীকার করব না। তখন বয়স অল্প ছিল। এতো ম্যাচুরিটি ছিল না। তোমার প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ। "
অভিমানে চোখের কোণায় পানি চিকচিক করতে লাগল আদ্রিকার। অন্ধকারে সে পানি প্রান্তিক দেখতে না পেলেও আন্দাজ করতে পারল। তার ভীষণ রাগ হলো আদ্রিকার বাচ্চামোতে। নিজের স্বামীকে এসব প্রশ্ন করে বিব্রত করতে ওর বিবেকে বাঁধলো না? অবশ্য মেয়েটার বয়স কম। এতোশত বোঝে না। তবে বহুদিনের পুরোনো ঘা নতুন করে দগদগে হলো প্রান্তিকের। বারান্দা না থাকায় বিরক্ত হয়ে রুমেই সিগারেট ধরাল সে। সাথে সাথেই আদ্রিকা উঠে বসল। এবং কড়া গলায় বলল,
"প্রাক্তনকে এতোই মনে পড়ছে যে তার শোকে সিগারেট ধরিয়ে নিলেন। আপনি তার কাছে ফিরে যাচ্ছেন না কেন? দরকার হলে আমায় ছেড়ে দিন।"
আগুন গরম চোখে চাইল প্রান্তিক। ছেড়ে যাওয়ার কথা শুনতেই কিছু বিভৎস স্মৃতি নাড়া দিয়ে উঠে। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে প্রান্তিক। রাগী গলায় বলে,
"কার কাছে যেতে চাও? অভির কাছে? যাবেই তো। আমার থেকে টাকা বেশি আছে তো। এখানে তো তুমি সুখী না।"
"আপনার মতো প্রেমলীলা করে আসিনি যে তার কাছে যেতে হবে।"
"মুখ সামলে কথা বলো, আদ্রিকা। আমার রাগ সম্পর্কে ধারণা নেই তোমার।"
"সেদিন কথা দিয়েছিলেন যা চাইব তাই দিবেন। আজ কথাটা রাখতে হবে। পারবেন তো?
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল প্রান্তিক। উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইল আদ্রিকার পানে। ইতোমধ্যে কান্নার বেগ বেড়েছে। শান্ত গলায় আদ্রিকা উত্তর দিল,
" আমার ডিভোর্স চাই।"
কথা শেষ হতেই প্রান্তিক হাতের কাছে থাকা ফুলদানি ফেলে দিল। সশব্দে ভেঙ্গে সেটা বাড়ির সবাইকে জাগ্রত করল। তবে কেউ তাদের নিজস্ব মান-অভিমানে সামিল হতে চাইল না। একসময় প্রান্তিক রাগের মাথায় নিজের হাত ঘুষি মারলো দেয়ালে। আদ্রিকা বসে বসে পাগলামি দেখতে লাগল। সারা রাতে দুজনের মাঝে আর কথা হলো না। প্রান্তিক ভাবল আদ্রিকা একসময় তার কাছে এসে ক্ষমা চাইবে। আর আদ্রিকা ভাবল প্রান্তিক তাকে বলবে প্লিজ আমায় ছেড়ে যেও না। দুজনের কারোর আশাই পূরণ হলো না। দুদিকে মুখ করে বসে রইল দুজনে।
চলবে….
এরচেয়ে বেশি লেখা সম্ভব হয়নি। কেউ রাগ করবেন না। নানান ব্যস্ততায় সময় পার করছি। বাসায় চাচা-জেঠা সবাই আছেন। তাদের সামনে মোবাইল নিয়ে বসতে পারি না।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৪
তিনদিন অতিবাহিত হলেও অদ্যাবধি প্রান্তিকের একটা ফোনকলও পায়নি আদ্রিকা। অথচ তার দিন কেটেছে ফোনের দিকে চেয়ে। রাত কেটেছে বিচ্ছেদের গান শুনে। শেষে লজ্জার মাথা খেয়ে আদ্রিকা হোয়াটসঅ্যাপ এ প্রান্তিককে লিখল,
"আমায় নিতে আসবেন না?"
প্রান্তিক সিন করে কয়েক মুহূর্ত ফেলে রাখল মেসেজটা। এরপর একটা গানের লিংক সেন্ড করল। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের "তারে বলে দিও"
গানটা শুনে আদ্রিকা প্রান্তিকের অভিব্যক্তি বুঝে ফেলেছে। কি সুন্দর গানের মধ্য দিয়ে লোকটা বুঝিয়ে দিল আদ্রিকা যেন তার দ্বারে না যায়। এতো অভিমান তার?
নায়লা সন্ধ্যা থেকে মেয়েকে একা পেতে চাইছেন। একসময় মেয়ে ছাদ থেকে নেমে আসল বিষন্ন মুখ নিয়ে। নায়লা খপ করে আদ্রিকার হাত ধরলেন। রুমে নিয়ে দরজা বন্ধ করলেন। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন,
"তোদের স্বামী-স্ত্রীর ঝামেলা আমি শুনতে চাই না। তবে আমি আমার একমাত্র মেয়েকে সুখী দেখতে চাই। মায়ের কথাগুলো মন দিয়ে শুনবি।"
আদ্রিকা এবার নড়েচড়ে বসে। মায়ের কথা শোনার জন্য মনোযোগী হয়। নায়লা একসময় বলেন,
"মা, সংসার কখনো একতালে চলে না। রাগ, অভিমান, অবিশ্বাস সংসার জ্বালিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। ঝামেলা যত বড়ই হোক না কেন সবার আগে নিজের দোষটা খুঁজে বের করবি। অনেক সময় আমাদের ভুল না থাকলেও ক্ষমা চাইতে হয়। শুধুমাত্র সুস্থ একটা সম্পর্কের জন্য। আর দোষ থাকলে তো অবশ্যই ক্ষমা চাইবি। ক্ষমা চাইলে কেউ ছোট হয় না, মা। তাছাড়া প্রান্তিককে আমি ছোট থেকে দেখে এসেছি। মা মরা ছেলেটা কত কষ্টে বড় হয়েছে বল তো। টেকনাফে এনজিওতে চাকরি করে ও নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছে। সেই থেকেই গায়ের রঙটা চাপা পড়ে গেল। এমন ছেলেদের জ্ঞান বেশি থাকে, সবকিছু তাড়াতাড়ি শিখে যায়। তুই ওকে আপন করে নে, মা।"
"আমি চেষ্টা করছি, আম্মু। কিন্তু ওনিই রাগ ভুলতে পারছেন না।"
"তুই কি এমন বলেছিস যে সে এতোদিনেও রাগ ভুলছে না?"
ডিভোর্সের কথাটা মায়ের কাছে এড়িয়ে গেল আদ্রিকা। এসব শুনিয়ে মাকে কষ্ট দিতে চাইল না। তবে ভেতরে ভেতরে গুমরে একাকার হলো নিজের ভুল বুঝতে পেরে। প্রান্তিক এই একটা ব্যাপারে ভীষণ সেনসেটিভ আদ্রিকা খেয়াল করেছে। অথচ আদ্রিকা এইটা নিয়েই তাকে খুঁচিয়েছে।
সারাটা রাত এসব ভেবেই পার করল আদ্রিকা। একসময় সিদ্ধান্ত নিল প্রান্তিক নিতে না আসলেও সে নিজেই কালকে ফিরে যাবে।
ফাগুনের পরনে অ্যাশ কালারের পোলো শার্ট। হাতে একটা কাঠগোলাপ। ফারিহা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে আসতেই সে কাঠগোলাপটা ফারিহার কানের পিঠে গুঁজে দিল। একসময় কথপোকথন এর মাঝে ফারিহা বলল,
"বাসায় আর ভালো লাগছে না। কবে বিয়ে করবেন আমায়?"
"তোমার পরীক্ষা শেষ না হলে আঙ্কেল হয়তো বিয়ে দিতে চাইবে না। আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা করো।"
"দুদিন ভাইয়া ছিল না, কতোটা অসহায় ছিলাম কাউকে বোঝাতে পারিনি। ভাইয়াকে একটু সমীহ করে, আম্মু। ভাইয়া না থাকলে আমি কবেই মরে যেতাম।"
"এইসব শুনতে ভালো লাগে না। যখন তোমায় নিজের কাছে রাখব, একটুও কষ্ট পেতে দিব না। "
"আমি আপনার মতো কাউকে ভালোবাসতে পারব না। কখনো আমার বিশ্বাসটা ভাঙবেন না।"
"সেটা সময় প্রমাণ দেবে। আপাতত এই মুহূর্তটা নষ্ট করো না, প্লিজ।"
এরপর দুজন কিছু ভালোবাসাময় মুহূর্ত কাটায়।
বাসায় আসতেই আদ্রিকা লামিয়া বেগমের মুখোমুখি হয়। তিনি আপনমনে গজগজ করতে থাকেন,
"সবাই নবাবের মতো বেড়িয়ে আসবে। আমি আজও বাপের বাড়ি যেতে পারলাম না।সবার ফরমায়েশ খাটার জন্য আমাকে নিয়ে আসছে।"
আদ্রিকা জবাব দিল না। জবাব দিলে কথা বাড়বে। সে হাত-মুখ ধুয়ে এসে রান্না বসায়। লামিয়া নানান খুঁত ধরতে থাকেন। কখনো লবণ বেশি দিয়ে ফেলেছে, মুরগি বেশি কড়া করে ভেজে ফেলেছে এমন নানান কথা বলতে থাকেন। আদ্রিকা নিশ্চুপ হয়ে রান্না শেষ করে। রান্নাঘরে সবকিছু গুছিয়ে রুমে যায়।
রুমের অবস্থা নাজেহাল। বোঝাই যাচ্ছে প্রান্তিক অনেক স্মোক করেছে। রুমে সিগারেটের ফিল্টার পড়ে আছে। কেউ পরিস্কার করার আবশ্যকতা মনে করেনি। কাপড়চোপড় ছড়ানো-ছিটানো। আদ্রিকা সময় নিয়ে রুমটা গোছায়। স্যাভলন দিয়ে রুম মুছে নেয়। জানালাগুলো খুলে দেয়। তারপর প্রান্তিকের কাপড়গুলো ধুয়ে একেবারে গোসল সেরে নেয়। দুপুরে খেয়ে বাকিটা সময় সে ফারিহার সাথে কাটায়। একসময় ফারিহা তাকে ফাগুনের কথাগুলো খুলে বলে। আদ্রিকা সবটা শোনে। তবে একসময় ফারিহা মুখ ফসকে বলে ফেলে,
"ভাবি, ওনি একবার আমায় এক বন্ধুর বাসায় নিয়ে গিয়েছিল। বলা যায়, ওনি আমাকে ওভাবে চাচ্ছিল। আমার সম্মতি না থাকায় আর হয়নি। তবে এখন সবটা আবার স্বাভাবিক। "
আদ্রিকা বিব্রত বোধ করতে থাকে। তার কাছে ফাগুনকে এমন ছেলে মনে হয়নি। তবে আজকাল মুখ দেখে কাকে চেনা যায়? সে ফারিহার হাত ধরে বলল,
"তুমি বিয়ের আগে এমন সিদ্ধান্ত নিও না। তোমার ভাইয়া জানলে ভীষণ কষ্ট পাবে। ওনি তোমায় ভীষণ ভালোবাসে। "
"তুমি চিন্তা করো না তো, ভাবি। আমি বিশ্বাস করি ওনাকে।"
"তবুও জীবন যেহেতু একটাই, ভেবে ডিসিশান নিও।"
ফারিহা আলতোভাবে মাথা নাড়ায়।
রাতে প্রান্তিক বাসায় ফিরে সাড়ে সাতটায়। রুমের অবস্থার পরিবর্তন দেখে সে আদ্রিকার উপস্থিতি ধরে ফেলে। কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে বসে থাকতে দেখে রাশভারী কন্ঠে বলে,
"চলেই যখন যাবে, অভ্যাস খারাপ করছ কেন? আমি আগেও একা ছিলাম, ভবিষ্যৎ-এ থাকতেও কষ্ট হবে না।"
আদ্রিকার বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠে কথাগুলোয়। গলার কাছে কষ্ট দলা পাকিয়ে যায়। সে কিছু বলতে পারে না। প্রান্তিক আবারও বলে,
"তুমি তো আবার আমায় নারী লোভী ভাব। তবে আমি আমার বাবার মতো নই। একবার বিয়ে করেই শখ মিটে গিয়েছে। "
কথার পিঠে কিছুই বলল না আদ্রিকা।
"মৌন ব্রত পালন করছ? ভালো, এভাবেই থাকো। তাহলে আর ঝগড়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই। "
প্রান্তিক থেমে বলে,
"উকিলের সাথে কথা বলেছি। বিয়ের এখনো ছয়মাস হয়নি, তাই ডিভোর্স ফাইল করতে চাচ্ছেন না। ছয়টা মাস একটু কষ্ট করো। আমি নিজে তোমায় সযত্নে মুক্ত করব।"
আদ্রিকা এইবার ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে প্রান্তিককে। অকস্মাৎ আক্রমণে চমকায় প্রান্তিক। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত শীতলতায় ছেয়ে যায়। সে আদ্রিকার পিঠে আলতোভাবে হাত ছোঁয়ায়। আদ্রিকা ফুপিয়ে বলে,
"আর কখনো এমন কথা বলবেন না। আপনি আমার স্বামী, আমার সারাজীবনের প্রশান্তি। আপনায় ছেড়ে আমি কোথায় যাব?"
প্রান্তিক হাত আলগা করে। মুখোমুখি দাঁড় করায় আদ্রিকাকে। বলে,
"ডিভোর্সের কথাটা শুনে কোথায় কষ্ট হয়েছিল জানো?"
আদ্রিকা ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকে। প্রান্তিক হাত দিয়ে বুকের বা'পাশে ইশারা করে। বলে,
"আম্মুর চলে যাওয়াটা আমায় ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। ছোটবেলায় ভীষণ একা ছিলাম। বাবা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। তখন প্রথম শরীরে পরিবর্তন আসে, সাথে মনেও। একাকীত্ব ঘোচাতে কখন যে হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম নিজেও জানি না। বোঝানোর মতো কেউ ছিল না। ফারিহাকে আমি আগলে রেখেছিলাম, আমায় আগলে রাখার কেউ ছিল না। কেউ বোঝায় নি। তারপর সেই মেয়েটাও চলে গেল। আমি ঠকে গিয়েছি বারবার। বিশ্বাস শব্দটার কাছে আঁটকে গিয়েছিলাম। তবুও সব বাঁধা পার করে তোমার দিকে এগিয়েছিলাম। অথচ তুমি আমার সেই ঘা পুনরায় তাজা করলে। আমি ভীষণ আনলাকি। সবাই ছেড়ে যেতে চায় আমাকে। দেখো না, নিজের বাবা থেকেও তিনি আমার কেউ না। আমার মনের খবর রাখার কেউ নেই। দিনশেষে আমি আগের মতোই একা। খুব একা।"
"আমি বুঝতে পারিনি, প্রান্তিক। সবসময় বাবা-মাকে পাশে পেয়েছি। প্রিয়জন হারানোর ব্যাথা আমায় ছুঁতে পারেনি। আপনার কষ্টটা কখনো আমি আপনার মতো উপলব্ধি করতে পারব না। তবে চেষ্টা করব আপনাকে বোঝার। আপনাকে কষ্ট না দেয়ার। কিভাবে আপনার কষ্টটা একটু কমবে বলুন না?"
"সত্যি পারবে?"
"হু।"
"সমগ্র জীবন শুধু প্রান্তিকের হয়ে থাকতে পারবে? আমি তোমায় বেঁধে রাখব না। একবার প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে আমি নিজেকে সামলে নিয়েছি। তবে দ্বিতীয়বার নিজেকে আর সামলাতে পারব না। আমার থেকে আমার দ্বিতীয় মানুষটাকে কেড়ে নিও না, প্লিজ।"
আদ্রিকা শক্ত হাতে মানুষটার হাত ধরে। আশ্বাস দেয় সে থেকে যাবে। একটুখানি অভিমান দুজনের ভেতরের কথাগুলো বের করে নিয়ে আসে। আরও মজবুত হয় তাদের সম্পর্ক।
চলবে….#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম : শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৫
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কাছে আসলেও সেই অনুভূতিগুলো ছিল ক্ষণিকের। সেই থেকে আদ্রিকা লজ্জায় রাঙা হয়ে আছে। বারবার মানসপটে কাছাকাছি আসার মুহূর্তটা ভাসছে। রাতের ব্যস্ততা গুছিয়ে আদ্রিকা শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পরেই প্রান্তিক আসে। হাত ঘড়িটা খুলে রাখে, পায়ের স্যান্ডেল খুলে বিছানায় পা মেলে বসে। জিজ্ঞেস করে,
"ঘুমিয়ে গিয়েছ?"
"উহু।"
"ঘুম পেয়েছে? "
"নাহ।"
"মুভি দেখবে?"
আদ্রিকা এবার ওঠে বসে। আনন্দে ঝলমল করতে থাকা চোখ নিয়ে বলে,
"আসুন, দেখবো।"
প্রান্তিক ল্যাপটপ অন করে 'টাইটানিক' মুভি চালু করে। আদ্রিকা মুভিটা আগেও দেখেছে। কিস সিনটা আসার আগেই আদ্রিকা বাথরুম পেয়েছে বলে ওঠে যায়। প্রান্তিক আফসোস জড়ানো গলায় মিনমিনিয়ে বলে,
"তোর কপালে এসব নেই রে, প্রান্তিক।"
পরদিন সকালে আদ্রিকার মৃদু পেট ব্যাথা শুরু হয়। ডেইটটা দেখে তার মাথায় হাত পড়ে। বাড়ি থেকে আসার সময় প্যাড নিয়ে আসেনি। তার কোনো ভাইও নেই যাকে দিয়ে মাকে পাঠিয়ে দিতে বলবে। হাতখরচের টাকাগুলো মাসের শেষ হওয়ায় ফুরিয়ে এসেছে। ফারিহা বাসায় আসবে বিকেলে। এই প্রথম নতুন বাড়িতে ভীষণ অসহায় বোধ করল আদ্রিকা। একসময় লজ্জার মাথা খেয়ে লামিয়া বেগমকে সমস্যার কথা বললেন। তিনি কিছু অকথ্য কথা শোনালেন। কেমন বউ, নিজের স্বামীকে প্রয়োজনের কথা না বলে শাশুড়িকে বলে। একসময় আদ্রিকার সহ্য শক্তির বাঁধ ভাঙে। সে নির্নিমেষ গলায় বলে,
"আর কখনো আপনার সাথে কথা বললে আমি মানুষ না।"
লামিয়াও গজগজ করতে থাকলেন। রুমে এসে আদ্রিকা জামা বদলে ফেলল। খুব সংকোচ নিয়ে প্রান্তিককে কল দিল। কল রিসিভ হতেই পরিচিত ভারী কন্ঠস্বর শুনতে পেল আদ্রিকা।
"হ্যালো।"
"আসসালামু আলাইকুম।"
"ওয়ালাইকুম সালাম। বাসায় কোনো সমস্যা হয়েছে আদ্রিকা? তুমি তো কখনো আমায় যেচে কল দেয়ার মানুষ না।"
"কিছু হয়নি।"
"তাহলে মিস করছিলে আমায়?"
মৃদু ঘামতে থাকে আদ্রিকা। কিভাবে প্রান্তিককে কথাটা বলবে বুঝে উঠতে পারে না। ভাবনার অন্তরালেই প্রান্তিক বলে,
"নীরবতা তবে সম্মতির লক্ষণ। বউ কি আমায় ছাড়া থাকতে পারছে না? "
"এমন কিছু না। আপনি সাবধানে আসুন।"
বলেই কল কেটে দেয় আদ্রিকা। মূল কথাটা বলতেই ব্যর্থ হয়। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পেটের ব্যাথাও বাড়তে থাকে। একসময় ক্লান্ত হয়ে আদ্রিকা ঘুমিয়ে যায়।
আদ্রিকার ঘুম ভাঙে প্রান্তিকের ডাকাডাকিতে। অফিস থেকে এসে লোকটা শার্টও খোলেনি। সোজা তার শিয়রে এসে বসেছে। লজ্জায় আরও খানিকটা কুঁচকে যায় আদ্রিকা। প্রান্তিক শুধায়,
"অসময় শুয়ে আছ যে? জ্বর তো নেই। শরীর খারাপ লাগছে?"
আদ্রিকা দু'দিকে মাথা দুলিয়ে না বোঝায়।
"আজ যে আমার কাপড়ও গুছিয়ে দিলে না? আবার অফিসে থাকতে কল করলে। খুলে না বললে বুঝবো কিভাবে? "
"কিছু হয়নি। আপনি ফ্রেশ হতে যান।"
অগত্যা প্রান্তিক বাথরুমে যায়। ফিরে এসেও দেখে আদ্রিকা ঠায় বসে আছে। সন্দেহের তোপ ভারী হয় প্রান্তিকের। প্রান্তিক এগিয়ে এসে আদ্রিকার হাত ধরে বলে,
"কি হয়েছে বলো না! "
"একটু ফারিহাকে ডেকে দিন। ওকে লাগবে।"
"আচ্ছা, দিচ্ছি। "
ফারিহাকে ডেকে দিয়ে প্রান্তিক খেয়ে আসে। রুমে এসে দেখে আদ্রিকা চাদর বদলাচ্ছে। প্রান্তিক উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কালকেই না নতুন চাদর বিছালে? তুলে ফেললে কেন?"
আদ্রিকা জবাব দেয় না। পাশ থেকে ফারিহা বলে,
"ভাবির থেকে জেনে নে, ভাইয়া। তোর তো খবর রাখার দরকার ছিল। আসি আমি।"
এইবার প্রান্তিকের রাগ হয়। কি এমন কথা যা স্বামীকে বলা যায় না। মুহূর্তেই ব্যাপারটা ধরে ফেলে প্রান্তিক। আদ্রিকার হাত থেকে চাদরটা নিয়ে বলে,
"পিরিয়ড হয়েছে এটা আমায় বলতে পারলে না? না বললে কিভাবে বুঝবো বলো তো।"
আদ্রিকা মাথা নত করে রাখে। প্রান্তিক আদুরে কন্ঠে বলে,
"সারাদিন নিশ্চয়ই খাওনি। আমি খাবার নিয়ে আসি। আর চাদরটা ধরবে না। আমি ধুয়ে দিব।"
"ছিহ, কি বলছেন! আমার নষ্ট করা চাদর আপনি ধরবেন?"
"এই সময় ঠান্ডা লাগানো ঠিক না। তাছাড়া বউয়ের নোংরা কাপড় ধুয়ে দিলে আমার জাত যাবে না। চুপচাপ বসে থাকো।"
সেই সময় আদ্রিকা আবিষ্কার করেছিল এক অন্যরকম প্রান্তিককে। সচরাচর এমন পুরুষের দেখা কোথায় মেলে? তবে কি আদ্রিকা বাঁধাই করা কপাল নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিল? নাহয় এতো ভালো মানুষটা কিভাবে তার হয়!
ইতোমধ্যে ছয়মাস অতিক্রান্ত হয়। এরমাঝে দুজনের বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়েছে। তবে সেটা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত কখনো গড়ায়নি। লামিয়া বেগমের কটু কথায় এখন আদ্রিকা জবাব দেয়। ফলস্বরূপ তিনি এখন ফারিহাকে ছেড়ে আদ্রিকার পেছনে লেগে আছেন। জাহেদ শেখ আদ্রিকাকে আগের মতো স্নেহ করেন না। ছেলেমেয়েদের প্রতি তার মনটা বিষিয়ে দেয়া হয়েছে। সবকিছুর টুকটাক উন্নতি হলেও আদ্রিকা আর প্রান্তিকের সম্পর্কটার উন্নতি হয়নি। সেটা ঠান্ডা হয়ে আছে। আদ্রিকা খেয়াল করেছে প্রান্তিক ভীষণ ঠোঁটকাটা। তবে কথার বেশি কিছুই তাদের মাঝে এখনো হয়নি। হয়তো সেদিনের আদ্রিকার প্রত্যাখ্যান দুজনের মাঝে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে। দুজনের কেউই সেই দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করছে না। দুজনের অনুভূতিগুলো এখনো সুপ্ত।
ফারিহা ইতোমধ্যে ভয়ংকর একটা কান্ড করে বসেছে। বাসা থেকে ফাগুনের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে ফাগুন সেসময় লুকিয়ে ফারিহাকে বিয়ে করে ফেলে। ব্যাপারটা ওর পরিবারের মাঝেই সীমাবদ্ধ আছে। প্রান্তিক কিংবা জাহেদ শেখ জানলে পরিণতি কি হবে সেটা ফারিহা ভাবতে পারে না। সে কোনো অবস্থাতেই ফাগুনকে হারাতে পারত না। এই জীবনে ভাইয়ের পর কেউ যদি তাকে আকাশস্পর্শী ভালোবাসা দিতে পারে সেই মানুষটা হলো ফাগুন। কিভাবে সেই ভালোবাসা উপেক্ষা করতো সে। তার এইচএসসি শেষ হয়েছে দু'দিন হলো। খুব শীঘ্রই সে পরিবারকে ফাগুনের কথা বলবে। শুরুতে বিয়ের কথাটা লুকিয়ে রাখাটাই শ্রেয় মনে করল ফারিহা। ফাগুন নিজে একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে। সেখানে অবাধে যাওয়া আসা করতো দুজনে। কাটিয়েছে অন্তরঙ্গ কিছু সময়। বাসায় থাকলে সেসব ভেবেই সময় কাটায় ফারিহা। ইদানীং ফাগুন ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারে না।
বেশ কয়েকদিন ধরে প্রান্তিক বাসায় আসার আগে ফুলের দোকান ঘুরে আসে। তবে সাহস করে কখনো নেয়া হয়না। আজ কি মনে করে একটা বেলির গাঁজরা হাতে তুলে নেয়। বাসায় গিয়ে সন্তপর্ণে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখে। আদ্রিকা ভ্রু কুঁচকে ফুলের দিকে তাকায়। গলা উঁচিয়ে শুধায়,
"ফুল কি আমার জন্য আনা হয়েছে? "
"ঘরে তো দুটো বউ নেই যে তাদের জন্য আনব।"
ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে আদ্রিকার। ওদিকে গোসল সেরে উন্মুক্ত শরীরে হাজির হয় প্রান্তিক। শার্টটা গায়ে দিয়ে কাছাকাছি চলে আসে। যতোটা কাছে আসলে নিশ্বাসের শব্দ অব্দি শোনা যায়। বুকের কাঁপন অনুভব করা যায়। আদ্রিকা থমকায়। হুটহাট লোকটার কাছে আসা তাকে বাজেভাবে ঘায়েল করে। আপাদমস্তক মানুষটাকে পেতে চায় সে। তবে বলার সাহস হয় না। প্রান্তিক নেশালো কন্ঠে বলে,
"শার্টের বোতাম লাগাও।"
"গরমের মধ্যে শার্ট পড়ছেন যে, কোথাও যাবেন?"
"তুমি চাইছ আমি খালি গায়ে থাকি! আমার উন্মুক্ত বুক, পিঠ দেখে নিজেকে সামলাতে পারবে? শেষে চুমুটুমু দিয়ে ফেলবে। আমার আবার লজ্জা বেশি, বুঝলে?"
লজ্জায় রক্তিমাভ গালদুটো বড় আদুরে দেখায় প্রান্তিকের কাছে। ইচ্ছে করে নিজের অধিকার ফলাতে। তবে জোর করে অধিকার আদায় সে কখনোই করবে না। আদ্রিকা যদি সামান্য কষ্ট পায়, তাহলেও প্রান্তিকের বুক ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। সে চায় আদ্রিকা নিজে এগিয়ে আসুক। সম্পূর্ণভাবে আসুক, তার হয়ে থাকুক আমরণ। যতোটা জুড়ে থাকলে দ্বিতীয় কারো কথা কস্মিনকালেও ভাবা যায় না।
চলবে......#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম:শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৬
নব্য প্রভাতের সূচনা হয় আজানের সুর আর পাখির কলরবে। আষাঢ় মাসের আনাগোনা চললেও আদ্রিকার মনের শহরে যেন বসন্ত এসেছে। শরীর, মন প্রান্তিককে ভেবে ক্ষণে ক্ষণে পুলকিত হয়। সদ্য জন্মানো কচি পাতার ন্যায় আদ্রিকার মন হেলেদুলে প্রান্তিকের পানে যেতে চায়। অথচ এতো গাঢ় অনুভূতি অপর মানুষটাকে জানানো যাচ্ছে না। সন্দেহ খচখচ করে মনে। সে কি সত্যিই আদ্রিকাকে ভালোবাসে? নাকি দায়িত্বের রোষানলে পিষে ফেলতে চাইছে তার কোমল মন। ছয় মাসে প্রান্তিককে অনেকটা চেনা হয়েছে। তবে মন পড়ার ক্ষমতা হয়নি। মনটা কি ক্ষণে ক্ষণে আদ্রিকার জন্য কেঁদে ওঠে? ভেবে পায় না আদ্রিকা। লুকোচুরি আর ভালো লাগে না তার। সে স্বাভাবিক উত্তর চায়। সম্পূর্ণ প্রান্তিককে চায়। এক সময় আদ্রিকা সিদ্ধান্ত নেয় প্রান্তিককে তার মনের খবর জানাবে। যদি উত্তর 'না' হয় তবে আদ্রিকা এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। আর কখনো কাউকে ভালোবাসার দুঃসাহস করবে না।
প্রান্তিক ঘুমাচ্ছে নিঃশব্দে। মাথার নিচে একটা হাত সর্বদাই দেয়া থাকে। ঘুমন্ত এই মানুষটার সবটাই ভালো লাগে আদ্রিকার। এই যে শ্বাসের সাথে বুকটা উঠানামা করছে এটাও দেখতে ভালো লাগছে। খোঁচা খোঁচা দাড়িগুলোও দেখতে ভালো লাগছে। সাহস করে আদ্রিকা সেগুলো ছুঁয়ে দেয়। আনন্দে মন নেচে ওঠে। ঘুমন্ত প্রান্তিকের গালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় আদ্রিকা। পরক্ষণেই লজ্জায় কিছুটা ছিটকে যায়। এই প্রথম সে তার স্বামী নামক মানুষটাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। সেই অনুভূতি এতো ভয়ানক হবে কে জানত? ঘুমের ভাণ করে থাকা প্রান্তিক ঠিকই সব অনুভব করল। মনের মধ্যে তার একশ প্রজাপতি উড়তে থাকল। মেয়েটার নরম ঠোঁটের একটুখানি ছোঁয়া তার সমগ্র জীবন সার্থক করেছে।
প্রান্তিককে নাস্তা দেয়ার সময় আদ্রিকা একবারও তার দিকে তাকাল না। শুধুই মনে হচ্ছে প্রান্তিক সকালের ঘটনা বুঝে ফেলেছে। সেজন্যই হয়তো লোকটা সকাল থেকে মিটমিটিয়ে হাসছে। কখনো সবার আড়ালে চোখ টিপে দিচ্ছে। লজ্জায় আদ্রিকা নাস্তা পাতে দিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। গ্লাসে পানি ঢেলে সেটা এক ঢোকে খেয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে।
ফারিহার দুটো পিরিয়ড ডেইট মিস গিয়েছে। খুব সাবধানে সে প্রেগনেন্সি কিট আনিয়েছে। টেস্ট করার পর সেখানে স্পষ্ট দুটো দাগ দেখা যাচ্ছে। অজানা আশঙ্কায় ফারিহার বুক কেঁপে উঠলো। তার ভেতর আরেকটা প্রাণ, একা নয় সে। ফাগুনকে জানাতে হবে সবার আগে। দুরুদুরু বুকে ফারিহা কল লাগিয়ে উত্তরের আশায় থাকে।
"হ্যালো।"
ফারিহার গলা কাঁপতে থাকে। সে সাহস জুগিয়ে বলে,
"আমি প্রেগন্যান্ট, ফাগুন।"
"সকাল সকাল কি মজা শুরু করলে? অফিসে হাজারটা কাজ থাকে। এগুলো বুঝবে কবে?"
ফারিহা কান্না আটকাতে পারে না। ফুপিয়ে বলে,
"আমি সত্যি বলছি। দুই মাস পিরিয়ড হয়নি। আজকে টেস্ট করলাম। রেজাল্ট পজিটিভ। আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। ভাইয়া জানলে….."
"কি করবে মানে? বাচ্চাটা এবোর্ট করবে। আমার ফ্যামিলি তোমায় মেনে নিলেও তোমার বাবা আমাদের মানবে না। তুমি কি চাও বাচ্চাটার জন্য আমায় হারাতে?"
"আমি দুজনকেই চাই।"
"ইমোশনাল ফুল হয়ে লাভ নেই। চুজ ওয়ান। উত্তর আমি হলে বিকেলে আমার সাথে দেখা করবে। আমি এভোর্শনের ব্যবস্থা করব। আর উত্তর তোমার বাচ্চা হলে আমার মুখ দেখবে না তুমি।"
লাইন কেটে যেতেই ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে ফারিহা। সে কেন নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে মেরে ফেলবে। সে তো ফাগুনকে শরিয়ত মোতাবেক বিয়ে করেছে৷ তাদের ভালোবাসার নিদর্শন বাচ্চাটা। অপরদিকে ফাগুনকে হারানোর ভয় তাকে তাড়া করছে। এই মানুষটাকে সে কখনোই ছাড়তে পারবে না। মরে গেলেও না।
ফারিহার কান্নার আওয়াজে প্রান্তিক রুমে আসে। বোনকে জিজ্ঞেস করে,
"কি হয়েছে তোর? ঐ মহিলা কিছু বলেছে আবার?"
"কিছু না, ভাইয়া। একটা কথা বলবো?"
"বল না।"
"যদি কখনো জানতে পারো আমি কোনো ভুল করেছি, আমায় ঠিক এইভাবেই ভালোবাসবে তো?"
"আমি জানি আমার বোন ভুল করবে না। কারণ আমার বোনকে আমি নিজে হাতে মানুষ করেছি।"
ফারিহা ভাইয়ের হাত আঁকড়ে ধরে। কান্নার বেগ বাড়তে থাকে। প্রান্তিক পুনরায় শুধায়,
"আম্মুর কথা মনে পড়ছে?"
ফারিহা মিথ্যে জবাব দেয়,
"হু।"
"মন খারাপ করিস না। আম্মু সবসময় আমাদের সাথেই আছে। কোথায় জানিস? আমাদের মনে। সবসময় তোকে দেখছে। তুই কাঁদলে আম্মু কত কষ্ট পায় ভেবেছিস। আর কাঁদিস না, বোন আমার।"
ফারিহা চোখের পানি মুছে নেয়। প্রান্তিক বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ভাই যেতেই ফারিহা ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকে।
দুপুরে সব কাজ শেষ করে আদ্রিকা প্রান্তিকের পছন্দের রান্নাগুলো এক এক করে করতে থাকে। ফারিহার কাছে শুনেছিল প্রান্তিক নাকি ইলিশ পোলাও খুব পছন্দ করে। ইউটিউব দেখে আদ্রিকা রান্নাটা বেশ আয়ত্তে এনে ফেলেছে। রান্না শেষ করে সে সব গুছিয়ে রাখে পরিপাটি করে। ডেজার্টের জন্য পুডিং বানিয়ে ফ্রিজে রাখে। একসময় লামিয়া বেগম এসে সব আয়োজন দেখতে পান। তিনি রুঢ় কন্ঠে বলেন,
"গ্যাস শেষ হলে কে আনবে? অবেলায় এতো রান্না করলে কেন?"
আদ্রিকাও ঝাঁঝালো স্বরে জবাব দেয়,
"এই বাড়িতে আমার স্বামীও টাকা দেয়। গ্যাস শেষ হলে নাহয় সেই টাকাতেই আবার আনা হবে। আর আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই রান্না করেছি। এইটুকু স্বাধীনতা এই বাড়িতে আমার আছে।"
"বেয়াদব মেয়ে কোথাকার। বাপের বাড়ি থেকে এনেছোটা কি এতো দেমাগ যে দেখাও।"
"আপনি কি এনেছেন?"
লামিয়া থমথমে মুখে জবাব দেয়,
"আজ তোর শ্বশুর আসুক। সব বলবো আমি। কথা শোনার জন্য আমি এই বাড়ি আসি নাই।"
"আমিও অত্যাচার সহ্য করতে এই বাড়িতে আসিনি। আপনি ওনার কান পড়া দিতে পারলে আমিও সবটা জানাতে পারব। আপনার চেয়ে কিন্তু আমার দল ভারী। মনে রাখবেন।"
এই পর্যায়ে লামিয়া কিছু অকথ্য কথা বলে চলে যায়। আদ্রিকার এখন আর খুব একটা মন খারাপ হয়না এসব নিয়ে। খানিকটা গা সয়ে গিয়েছে। সে অপেক্ষা করে প্রান্তিকের।
রাত আটটা বাজলেও প্রান্তিক বাসায় আসে না। আদ্রিকা একটা কালো সুতির শাড়ি পড়েছে। চুলগুলো খুলে রেখে হালকা সেজেছে। হাতে, গলায় সুগন্ধি লাগিয়েছে। গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সে প্রান্তিকের পথ চেয়ে থাকে।
প্রান্তিক বাসায় ফেরে নয়টায়। এসেই দেখে রুমের লাইট অফ। টেবিলে দুটো দামী মোমবাতি জ্বলছে। মৃদু লেডিস পারফিউমের ঘ্রাণ আসছে। সে রুমে পা রাখতেই আদ্রিকা এসে দ্বিধা ছাড়াই তাকে জড়িয়ে ধরে। বুকের ভেতর ঝড় ওঠে যেন প্রান্তিকের মেয়েলি ছোঁয়ায়। আদ্রিকা নরম গলায় বলে,
"আমি প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এসেছিলাম সেদিন ছিল আপনার প্রতি একরাশ ঘৃণা। আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি ভালোবাসার অভিনয় করছিলাম। একসময় আমি আপনাকে পুরোপুরি জানলাম, বুঝলাম। তখন মনে হলো এই মানুষটার চেয়ে বেস্ট কেউ আমার জীবনে আসতেই পারত না। সেই জন্যেই হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমাদের বিয়ে লিখেছেন। একসাথে থাকতে থাকতে কখন যে আপনাকে নিজের সবটা দিয়ে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও বুঝতে পারিনি। আপনি সত্যিই শুদ্ধ পুরুষ। এক ছাদের নিচে থেকেও কখনো আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমায় ছোঁয়ার চেষ্টা করেননি। আমার মতামতকে সম্মান দিয়েছেন। আপনাকে আমি কিভাবে ভালো না বেসে থাকি বলুন তো? আজ থেকে আমি মনে প্রাণে আমি আপনায় স্বীকার করলাম। আপনি আমার মন ছুঁয়ে ফেলেছেন। আই লাভ ইউ, প্রান্তিক।"
প্রান্তিক আদ্রিকাকে নিজের সম্মুখে দাঁড় করায়। আদ্রিকা চেয়ে আছে উত্তরের আশায়। প্রান্তিকের চোখে সে স্পষ্ট তার জন্য ভালোবাসা দেখে। শুধু মুখ থেকে শুনতে চায়। প্রান্তিক কাঁপাকাঁপা গলায় উত্তর দেয়,
"আমি তোমায় ভালোবাসি না। তোমার জন্য ভালো হবে আমার থেকে দূরে থাকা। নাটক শেষ হলে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল তোমায় তোমার বাড়িতে দিয়ে আসব। অবশ্য দুদিন পর সত্যিটা জানলে তুমি এমনিই আমায় ছেড়ে চলে যাবে।"
চলবে…..#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৭
আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা অনুভব করা যাচ্ছে গুরুম গুরুম শব্দে। তার চেয়েও বেশি তিক্ততা ছেয়ে আছে আদ্রিকার মনে। মন ও মস্তিষ্ক যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে উত্তর খুঁজতে। তবে কি সে মানুষটাকে ভুল চিনল? চোখ থেকে টুপটাপ পানি ঝরতে লাগল আকাশসম আত্মসম্মানবোধ থাকা মেয়েটার। ইশ! কাউকে ভালোবাসা বুঝি এতো কষ্টের, এতো বেদনার। জানলে সে কখনোই ফুল ভেবে কাঁটাকে আলিঙ্গন করতো না। বাকশূণ্য হয়ে ঠায় বসে পড়ল ফ্লোরে আদ্রিকা। প্রান্তিকের বুকটা যেন ছ্যাঁত করে উঠলো বসার সেই শব্দে। সে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো ঠিক আদ্রিকার মুখোমুখি। গালে হাত রাখতে গিয়েও নিজেকে আঁটকে ফেলল। নির্মল, শান্ত কন্ঠে বলল,
"তুমি ভুল মানুষের সাথে মন বিনিময় করেছো। আমার সাথে তুমি কখনো সুখী হবে না। আগুন থেকে সবসময় দূরে থাকতে হয় জানো তো? আগুনের আশেপাশে থাকলেও তার তেঁজ একসময় হৃদয় ঝলসে দেয়। আমি তোমার হৃদয় পোড়ার কারণ হতে চাই না।"
সম্পূর্ণ কথা শেষ করে প্রান্তিক টলমল পায়ে বিছানায় গিয়ে বসল। বৃষ্টির আয়োজন থাকলেও ভ্যাপসা গরম আছে। সে শার্টের হাতা গুটিয়ে টপ বোতাম দুটো খুলে দিল। ভেতর থেকে উঁকি দিল ফর্সা বুকের কিছু অংশ। অথচ সেদিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেও দ্বিধা হলো আদ্রিকার।
সেদিন আর প্রান্তিক অফিসের কাপড় ছাড়ল না। কপালের উপর হাত রেখে শুয়ে রইল এক ধ্যানে। ফ্লোর থেকে উঠে আদ্রিকা কখন গিয়েছে সে টেরও পেল না। সত্যিই মেয়েটা তাকে ছেড়ে একেবারে চলে গেল না তো? ভাবতেই প্রান্তিকের শরীর অবশ হয়ে আসে। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। খেয়াল করে বৃষ্টির পানিতে ঘর ভিজে গিয়েছে। জানালার কপাট খোলা। বারান্দা পানিতে থইথই করছে। সেসবের তোয়াক্কা না করেই প্রান্তিক সারাঘর তন্নতন্ন করে বউকে খুঁজল। কোথাও দেখা পেল না কাঙ্ক্ষিত নারীটির। শেষমেশ কঠিন হৃদয় গলে চোখ থেকে দুফোঁটা তপ্ত অশ্রু নিক্ষিপ্ত হলো। ফোন বের করে কল লাগাল আফজাল হোসেনের কাছে।
"আসসালামু আলাইকুম, বাবা। কেমন আছেন?"
"আলহামদুলিল্লাহ, তোমরা কেমন আছ? "
"ভালো আছি। মা'র শরীর ভালো?"
"সেও আছে ভালো। দুজনে এসে ঘুরে যাও একবার। কতদিন মেয়েকে দেখি না।"
"আসব, বাবা। আমি আবার একটু পরে কল দিচ্ছি। আপাতত রাখি?"
"আচ্ছা। "
ফোন পকেটে রেখেই হতাশার শ্বাস ফেলল প্রান্তিক। বাবার বাড়িতে না গেলে কোথায় যাবে মেয়েটা? নাকি রাগ করে রাস্তায় বেরিয়ে গেল। ওর কোনো বিপদ হলে প্রান্তিক নিজেকে শেষ করে ফেলবে। হুট করে মনে হলো ছাদে তো দেখা হয়নি। দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ির ছাদে উঠতেও যেন পা ভেঙে আসছিল প্রান্তিকের। মনে বারবার কুচিন্তা আসছে।
ছাদের এক কোণায় বসে বসে এতোক্ষণ একটানা বৃষ্টিতে ভিজেছে আদ্রিকা। কান্নার তোপে শরীরটা বারবার ছেড়ে আসছিল। বেশ কয়েক ঘন্টা বৃষ্টিতে ভেজার ফলে একসময় তীব্র মাথা যন্ত্রণায় জ্ঞান হারায় আদ্রিকা। প্রান্তিক এলোমেলো পায়ে দৌড়ে আসে আদ্রিকার কাছে। মাথাটা দু'হাতে তুলে অসংখ্য চুমু খায় ভেজা গালে। মেয়েটা যদি এই মুহূর্তে উষ্ণ স্পর্শগুলো একটু অনুভব করতে পারত? একসময় এক ঝটকায় কোলে তুলে নেয় মেয়েটাকে। সাবধানে রুমে নিয়ে আসে। ভেজা মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। তবুও আদ্রিকা চোখ মেলে চাইতে পারে না। গা বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। ধরলে মনে হচ্ছে বরফ হাতে নিয়েছে। উপায়ন্তর না দেখে ফারিহাকে বললে সে এসে ভাবীর জামা পাল্টে দিয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, বিয়ের এতোদিন পরেও ওরা স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রী হতে পারছে না। অথচ সে আর ফাগুন কত তাড়াহুড়ায় সব করল। যা খুব সহজে পাওয়া যায় তা বোধহয় নিমিষেই হারিয়ে যায়। তাই হয়তো তার প্রতি ফাগুনের ভালোবাসাটাও আগের মতো নেই।
প্রান্তিক রুমের পানি মুছে দরজা, জানালা বন্ধ করে। সরিষার তেলে রসুন ছেড়ে সেটা গরম করে নেয় ভালোভাবে। ছোটবেলায় মাকে এমন করতে দেখেছে সে। গরম তেলটা হাতে নিয়ে আদ্রিকার হাতের তালু, পায়ের তালুতে ঘষে দেয়। ঠান্ডা ভাবটা এখন খানিকটা কমেছে। তবে শরীর গরম হতে শুরু করেছে। যেভাবে বৃষ্টিতে ভিজেছে জ্বর তো আসবেই, ঠান্ডা লেগে খারাপ কিছু না হয়ে যায় এই চিন্তায় আছে প্রান্তিক। জ্বর আসলে মেয়েটা কেমন ঘোরে চলে যায়। প্রান্তিকের জন্য ভালোই হয়েছে। অনুভূতিসম্পন্ন এই চোখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারত না।
ফাগুন এর কল সেদিনের পর থেকে আর রিসিভ করেনি ফারিহা। সে কখনোই সতেজ, নিষ্পাপ একটা প্রাণ শেষ করতে পারবে না। তাই সে ঠিক করেছে সে ফাগুনকে বিয়ের কথা বাসায় জানাবে। সে খুব সুখী হতে চায় তার অনাগত সন্তান আর তার বাবাকে নিয়ে। জীবনের অর্ধাংশ তার দুঃখে কেটেছে। বাকিটায় কি সে সুখ পাবে না? আল্লাহ নিশ্চয়ই এতো নিষ্ঠুর হবেন না। হতে পারে কাজের চাপে ফাগুন এখন তাকে কম সময় দেয়। তাছাড়া সময়ের সাথে ভালোবাসা একটু ফিকে হয় এটা স্বাভাবিক। তাই বলে ফাগুন কখনোই ওকে ছেড়ে দিবে না। যাকে পাওয়ার জন্য মানুষটা এতো লড়াই করে গেল তাকে কোনোভাবেই নিশ্চয়ই হারাতে চাইবে না। ফারিহা একটা হাত নিজের পেটের উপর রাখে। তার ছোট দেহের মাঝে আরেকটা ছোট্ট প্রাণ। ভাবতেই শরীর জুড়ে শিহরণ জাগে। সে মিষ্টি গলায় বলে,
"বাবু, তুমি চিন্তা করো না। তুমি সুস্থভাবেই দুনিয়ায় আসবে। মা তোমাকে কোনো কষ্ট ছুঁতে দেব না। আই প্রমিজ।"
আদ্রিকা জ্বরের ঘোরে প্রান্তিককে জিজ্ঞেস করলো,
"আমায় ভালোবাসেন না কেন?"
চমকে উঠে প্রান্তিক। বুকটা এখনো ধরাস ধরাস করছে। নরম গলায় সে বলল,
"চুপ করে ঘুমাও। কথা বললে কষ্ট হবে।"
"মনের কষ্টটা কিভাবে কমবে?"
"আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। দেখবে খুব আরাম লাগবে।"
"একটু আদরও তো করতে পারেন।"
প্রান্তিক ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকালো। জ্বরের ঘোর কেটে গেলেই সবটা ভুলে যাবে এই মেয়ে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে চেনা আছে তার। মুখটা কাছে বাড়িয়ে বলল,
"তাই?"
"সেদিন যখন খালি গায়ে আপনাকে দেখলাম কি ইচ্ছে করছিল জানেন?"
"কি?"
"একদম খেয়ে ফেলি।"
"তুমি তো তাহলে ভীষণ নির্লজ্জ। ২৮ বছরের যুবকের দিকে বাজে নজরে তাকাও। ছিহ!"
"আপনিও তো তাকান।"
"ওমনি আমার দোষ হয়ে গেল। আমি তাকালে তুমি আস্ত থাকতে? মোমের মতো গলে যেতে।"
"তাহলে গলিয়ে দিন।"
"আচ্ছা, দেব। ঘুমাও।"
"সত্যিই ঘুমালে দিবেন?"
"হ্যাঁ, দিব। "
গায়ের উপর কাঁথা টেনে চোখ বুঁজে ফেলে আদ্রিকা। প্রান্তিক বারান্দায় গিয়ে সিগারেট ধরায়। এই সময় তার নিকোটিনের খুব প্রয়োজন নিজের গোপন ব্যথাগুলো সয়ে নেয়ার জন্য। শরীরের প্রতিটা কোষ সেই কষ্ট জানান দিচ্ছে।
অভি গায়ের জ্যাকেট ছুড়ে ফেলল বিছানায়। বিদেশি হোয়াইনের বোতলটা খুলতে তার বেগ পেতে হলো না। ছয়মাস ধরে বোতলটা ইনটেক আছে। আজকের সামান্য খুশিতে দু চুমুক হোয়াইন খেলে ক্ষতি হবে না। অনেকদিন পর সে প্রান্তিককে জব্দ করতে পেরেছে। একেবারে মোক্ষম চাল চালা হয়েছে। অভি যেটা চায়, সেটা সে হাসিল করে। যেকোনো মূল্যে করে।
চলবে….#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম : শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৮
মসজিদে আজান দেয়ার সুরে প্রান্তিকের ঘুম ভাঙে। একটা হাত আদ্রিকার কপালের উপর রাখে। জ্বরটা এখন নেই। আবার হয়তো আসবে। এই জ্বর সহজে কমবে না। হাতে ঠান্ডা স্পর্শ পেতেই আদ্রিকার ঘুম ছুটে যায়। পিটপিট করে সে প্রান্তিককে দেখে একনজর। এরপর গায়ের কাঁথাটা সরিয়ে উঠে পড়ে। আলমারি থেকে কয়েকটা জামা ভাঁজ ছাড়াই ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলে। এলোমেলো চুলগুলো সুন্দর করে বিনুনি পাকায়। বিছানায় বসে সবটাই দেখে প্রান্তিক। একসময় জিজ্ঞেস করে,
"চলে যাচ্ছ?"
"আপনি তো সেটাই চাইছেন। আপনার মনেই জায়গা হলো না আপনার বাড়িতে কিভাবে হবে?"
"ভালো থেকো।"
আদ্রিকার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এই মানুষটা ওকে একটু বুঝলে কি হতো! প্রান্তিক থেমে আবার বলে,
"জ্বরটা ভোগাবে। ওষুধ খাবে ঠিক করে। আমায় নিয়ে ভেবে কষ্ট পেও না।"
"আমার আরও একশটা ভাবার টপিক আছে। আপনি দূরত্ব চাইলেন, আমি দিলাম। দেখবেন, একসময় না মানুষটাই চলে যায়। "
"আদ্রিকা! "
"আসি। দয়া করে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করুন। সারাজীবন মানুষের কথাই ভেবে গেলেন, একটু নিজেকে নিয়েও ভাবুন।"
"আচ্ছা, ভাবব।"
সারাটা রাস্তা আদ্রিকা মনমরা হয়ে বসে রইল। সে জানে প্রান্তিক তাকে ভালোবাসে। কারণ ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। তবুও কেন বিচ্ছেদের রেখা টানতে হলো দুজনের মাঝে। এর মধ্যেই কল এলো আননোন নাম্বার থেকে। আদ্রিকা রিসিভ করলো। পুরুষালি গলায় কেউ হাসছে। হাসির দমক ফোনের এপারে পৌঁছে গিয়েছে। আদ্রিকা জিজ্ঞেস করল,
"কে আপনি?"
"গলাটাও চিনলে না? মাই ব্যাড লাক। আমি অভি। "
"কেন বিরক্ত করছেন?"
"বিরক্ত কোথায় করলাম? আমি তো তোমার সাহায্য করতে চাই।"
"আমার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।"
"তোমার সো কল্ড স্বামীর চাকরিটা আর নেই। সে জানিয়েছে তোমায়?"
বজ্রপাতের ন্যায় শোনাল অভির কথাগুলো। আদ্রিকা যেন সবটা জলের ন্যায় পরিস্কার বুঝতে পারল। খানিকটা চেঁচিয়ে বললো,
"আপনি এতো নোংরা! ছিহ! আপনার লজ্জা করল না? সামনে পেলে তোর মুখে থুতু দিতাম, জানোয়ার। তোর সাহস কি করে হয় আমার প্রান্তিককে কষ্ট দেয়ার?"
"কুল ডাউন। আমি চাকরি নিয়েছি কে বললো? প্রমাণ আছে তোমার? তার চেয়ে আমার কথা মন দিয়ে শোন। ওকে ডিভোর্স দাও, এর চেয়ে দশগুণ ভালো স্যালারির চাকরি ওকে আমি দেব।"
"প্রান্তিককে ছাড়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। তুই দিবাস্বপ্ন দেখতে থাক।"
খট করে ফোনটা রেখে ফুঁপিয়ে উঠল আদ্রিকা। এইজন্যই কি প্রান্তিকের চেহারাটা এমন ভাঙাচোরা লাগছিল। লোকটা কষ্ট পুষে রাখে কেন? তাকে কে বলল চাকরি আর টাকা পেলেই আদ্রিকা খুশি থাকবে? তার তো শুধু মানুষটা চাই। অভিমানের পারদ তরতরিয়ে বেড়ে গেল। আদ্রিকা সিদ্ধান্ত নিল প্রান্তিক না আসলে সে কখনোই তার কাছে যাবে না।
জাহেদ শেখ প্রান্তিকের মুখ থেকে সবটা শুনলেন। তিনি রাগ দমন করতে পারছে না। ছেলেকে শুধালেন,
"তোমায় অফিসিয়াল নোটিশ দিয়ে ফায়ার করেছে?"
"হ্যাঁ। "
"তুমি জানো না এই চাকরির জন্য আমি কত টাকা ঘুষ দিয়েছি? তবুও কি এমন ভুল করলে যার জন্য চাকরি চলে গেল?"
"আমি ভুল করিনি, আব্বু।"
"মুখে মুখে কথা বলবি না। তুই ধোয়া তুলসি পাতা। তুই কিছুই করিসনি। তোর পেছনে আমি আর একটা টাকাও নষ্ট করবো না। মনে রাখিস কথাটা।"
"আমি দোষ করিনি, আব্বু। তোমার টাকাও আমার লাগবে না।"
"তুই আমার সামনে থেকে যা।"
দূর থেকে লামিয়া কুটিল হাসলেন বাবা-ছেলের ঝগড়া দেখে।
সন্ধ্যা নামার বেশ কিছুক্ষণ পার হয়েছে। কালো আকাশ জুড়ে নাম না জানা পাখি উড়ে যাচ্ছে। তারা উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ডাক ছেড়ে। প্রান্তিক
দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিকাদের ফ্ল্যাটের নিচে। কয়েকটা মুহূর্ত না কাটতেই তার অবস্থা পাগলপ্রায়। চাকরি যাওয়াটা যে অভির চাল এটা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি প্রান্তিকের। অভি যদি এই সুযোগে আদ্রিকাকে লুটে নেয়! সেই চিন্তা করতেই বারবার গলা শুকিয়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছে তার। বুকটা খালি লাগছে। প্রান্তিক কাঁপা হাতে ফোনটা বের করে কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে কল দেয়। সাথে সাথেই পরিচিত মেয়েলি স্বরে বুকের কাঁপন দ্বিগুণ হয়।
"কেন কল দিয়েছেন?"
"নিচে এসো।"
"সত্যি করে বলুন তো, নেশা করেছেন?"
"এসব কি বলছ? সিগারেট খাই বলে ওসব খাব ভেবে ফেললে? আমি দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে আছি। মায়া হলে এসো। নাহয় সারারাত মশারা আমায় শেষ করুক।"
"সত্যিই এসেছেন?"
"দেখেই যাও না। "
নিমিষেই অভিমান মোমের ন্যায় গলতে শুরু করে আদ্রিকার। সবার নজর এড়িয়ে বেরিয়ে আসে গেইট খুলে। রাস্তার সোডিয়াম লাইটের আলোয় দাঁড়িয়ে আছে তার প্রথম ভালোবাসা। যার নাম হৃদয়ে খোদাই হয়ে আছে। কালো টি-শার্টটায় বেশ মানিয়েছে তো। কাছে গিয়ে একদম চোখে চোখ রাখল আদ্রিকা। নরম গলায় বলল,
"আপনি ভাবলেন কিভাবে চাকরি না থাকলেই আমি আপনাকে ছেড়ে চলে যাব?"
"তুমি জানো আমার চাকরি নেই?"
"হু।"
"নিশ্চয়ই আব্বু কল করেছে তোমায়।"
"সেসব বাদ দিন। আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।"
"চাকরিটাই তো আমার একমাত্র অবলম্বন ছিল। সেটা হারিয়ে তোমায় কিভাবে সুখী রাখতাম বলো তো!"
"আমার সুখ আপনার টাকায় না।"
"তাহলে কোথায়?"
"সেসব বোঝার ক্ষমতা আপনার হয়নি।"
"তুমি কি এই বেকার ছেলেটাকে একটু জড়িয়ে ধরবে?"
"যাকে তাকে আমি জড়িয়ে ধরি না। সে তো আমায় ভালোবাসে না।"
প্রান্তিক একহাতে আদ্রিকাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে। দুজনের নিশ্বাস উথাল-পাতাল হয়। আদ্রিকার চোখের ঘনপল্লব পর্যন্ত কাঁপে। প্রান্তিক আরেকটু শক্ত করে হাতের বাঁধন। নেশালো গলায় বলে,
"তুমি বোঝো না?"
"উহু।"
"এই খারাপ ছেলেটা তোমায় ছাড়া থাকতে পারবে না। তার নিশ্বাসের স্বস্তি তুমি। তুমি আমায় বাজেভাবে মায়ায় বেঁধে ফেলেছ। বুকের বা'পাশটা শুধুমাত্র এই মেয়েটার জন্য বরাদ্দ।"
সুখের অশ্রু নামে আদ্রিকার চোখ বেয়ে। নেতিয়ে থাকা শরীরটা সে ছেড়ে দেয়। প্রান্তিক দু'হাতে আগলে নেয় বউকে। চোখের জলরাশি নিজের গাল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা খায়েশ পূরণ করতে ঠোঁটজোড়া এগিয়ে আনলে আদ্রিকা খানিকটা ছিটকে আসে। বলে,
"এটা রাস্তা। আপনার রুম না।"
"সেই কথা ধরলে দেখা যাবে আরও ছয় মাসেও আমি বউয়ের ছোঁয়া পাব না। "
কথা শেষ হতেই দীর্ঘ চুম্বনে আবদ্ধ হয় দুজন। প্রেমের বর্ষণে শীতলতা নেমে আসে দুটি হৃদয়ে।
চলবে.....
পর্ব ছোট হওয়া আর দেরীতে দেয়ার জন্য দুঃখিত। বাসায় সারাদিন মেহমান ছিল। উপরন্তু ভ্যাকসিন নিয়ে ডান হাত ভীষণ ব্যাথা করছে।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম:শ্যামকন্যা
#পর্ব_১৯
দুজনের কাছাকাছি আসার মুহূর্ত ছিল বর্ণনাতীত। আদ্রিকা শক্ত করে প্রান্তিকের হাত ধরল। বলল,
"আমি সবসময় আপনার সাথে আছি। আপনাকে দুচোখ ভরে দেখার জন্য হলেও আমি আরও বেশিদিন বাঁচতে চাই।"
প্রান্তিক পূর্ণ দৃষ্টি মেলে বউকে দেখল। চুমু খাওয়ার ফলস্বরূপ ঠোঁট কিঞ্চিত লালচে। কথাও বলছে মুখ নামিয়ে। এতো সুখ তার কখনো অনুভূত হয়নি, যতোটা এখন এই মেয়েটাকে দেখে হচ্ছে।
জামাইকে দেখে নায়লা হতভম্ব হয়ে রইলেন। তিনি মেয়েকে বললেন,
"ও আসবে আমায় জানালি না কেন? তুই তো বললি একাই কয়দিন বেড়াবি। এখন এত রাতে আমি ছেলেটাকে শুধু মাছ দিয়ে ভাত খাওয়াবো?"
প্রান্তিক হাসে। বিনীত স্বরে বলে,
"আমার কিন্তু নরমাল খাবারই বেশি ভালো লাগে, মা। তাছাড়া আপনার মেয়ে জানতো না আমি আসব।"
নায়লা মনে মনে বিস্তর হাসলেন। জামাই তাহলে মেয়েকে চোখে হারায়। এরচেয়ে বেশি একজন মা আর কি চাইবে?
রাতে প্রান্তিক কচুমুখির সাথে মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খায়। নায়লা তরকারিতে কয়েক কোয়া তেঁতুল দিয়েছেন। খেতে অমৃতের মতো লাগছে। খাওয়া শেষে আফজাল হোসেন প্রান্তিকের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেন। একসময় প্রান্তিক তার চাকরি চলে যাওয়ার কথাটা বলে। মেয়ের বাবা হিসেবে আফজাল হোসেন চরম ভাবনায় জর্জরিত হয়। তবে প্রান্তিক আশ্বস্ত করে সে কখনোই আদ্রিকাকে অসুখী করবে না। সর্বাত্নক চেষ্টা করবে তার সকল চাহিদা পূরণ করার। আফজাল হোসেন খানিকটা স্বস্তি পান। তাছাড়া তিনি ছোটকাল থেকেই ছেলেটাকে চেনেন। তবে নায়লা জানতে পারলে অঘটন হবে। তাই তিনি চুপ রইলেন। পরে ঠান্ডা মাথায় জানানো যাবে।
অভির মা শায়লা আফরোজ ছেলেকে চৌকস দৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। বাবা ছাড়া বড় হওয়া ছেলেটাকে তিনি ঠিকমতো মানুষ করতে পারেননি। স্বামীর ব্যবসা সামলাতে গিয়ে কখন যে ছেলেকে টাকার গন্ধ চিনিয়ে ফেলেছেন নিজেও জানে না। ক্লাস সেভেনে তিনি অভিকে টাচ স্ক্রিনের বেশ ভালো একটা ফোন কিনে দেন। ছেলে বিদেশি কোম্পানির সাথে কিসব আদান-প্রদান করে। দেশেও নিজের নামে প্রতিষ্ঠান খুলেছে। নাম 'নেক্সাস'। ইন্টার পড়া অবস্থায় তার উপর কোরবানি ফরজ হয়ে গেল। শহরে বেশ কয়েকটা ফ্ল্যাট আছে তাদের। ছোট থেকেই অভি একরোখা। দুজনের ভালোবাসা একা দিতে গিয়ে শায়লা ছেলের চোখের সামনে সব হাজির করতেন। অথচ ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না সব চাইলেই দিতে নেই। তিনি ক্লান্ত গলায় ছেলেকে শুধালেন,
"এতোই যখন পছন্দ করতে ওর বিয়েটা আটকালে না কেন? অন্তত মেয়েটার বাবাকে আমি প্রস্তাব দিতে পারতাম!"
অভির হাসি মিলিয়ে যায়। ফর্সা মুখশ্রী কুঁচকে সে জবাব দেয়,
"পনেরো দিনের জন্য যখন থাইল্যান্ড গেলাম, তখন ওর বিয়ে হয়েছে। তাছাড়া আমি ওকে ভার্সিটিতে দেখে পছন্দ করেছি। মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে, ওকে বিয়ে দিয়ে দিবে বুঝেছিলাম নাকি? তাহলে ওর গুষ্টিশুদ্ধ তুলে আনতাম না?"
"বিয়ে যেহেতু হয়ে গিয়েছে মেয়েটাকে তুমি ভুলে যাও, আব্বু।"
"এই কথা আর কখনো বলবে না, আম্মা। এমনিতেই আমার বুকটা ছারখার হয়ে আছে। ওর শরীরে অন্য কারো ছোঁয়া ভাবতেই আমি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলি।"
"অভি! মায়ের সামনে কিসব বকছ?"
"আই ডোন্ট কেয়ার, আম্মা। তুমি ওকে আমায় এনে দেবে এট এনি কস্ট। নাহয় আমি সব ছেড়ে চলে যাব। আমার মৃত্যুর খবরটাও পাবে না কেউ।"
শায়লার বুক ধ্বক করে উঠে। স্বামী হারানোর পর ছেলেটা তার আঁধার রাতের সলতে। ছেলে দূরে যাবে ভাবলেই তার ঘুম হারাম হয়ে যায়।
বেশ কয়েকদিন পর ফাগুনের সাথে দেখা করে ফারিহা। এই কয়েকদিন ফারিহার ঘুম হয়নি। মলিন হয়ে আছে মুখ। চোখের তলায় ডার্ক সার্কেল। চেহারাটাও শুকনো লাগছে। দুজন খানিকটা নির্জন জায়গায় বসে। ফাগুন আলগোছে ফারিহার হাতটা নিজের মুঠোয় নেয়। হাতের উল্টোদিকে চুমু খেয়ে বলে,
"আমায় বিশ্বাস করো?"
"নিজের থেকেও বেশি।"
"তাহলে আমার কথা মেনে নাও। বাচ্চাটা ঠিক সময় আসছে না। পৃথিবীতে এখন আসলে বাবুটা কষ্ট পাবে। তুমি চাও এটা? তার থেকে ধৈর্য ধরে থাকো। যখন সবাই আমাদের মেনে নিবে তখন আমরা আবার ইস্যু করব। ঠিক আছে?"
"এটা পাপ। আপনি নিজের সন্তানকে মেরে ফেলতে চাইছেন? "
"এমনতো নয় তুমি কখনো কোনো পাপ করোনি। আজ প্রথম করবে। আমার কথা না মানলে আজই হবে আমাদের শেষ দেখা।"
"একটু অপেক্ষা করা যায় না? আমি আব্বুর সাথে কথা বলে….
" যদি তোমায় অন্য কোথাও বিয়ে দেয়? যদি সত্যটা জেনে তোমার বাবা, ভাই তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কোথায় যাবে তুমি?"
ফারিহা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকে অচেনা মানুষটার দিকে। মুখে রা কাটে না। শরীর বিবশ হয়ে আসে। পাথরের মূর্তির ন্যায় শক্ত হয়ে থাকে সে। ফাগুন তাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। ঠান্ডা রুমের মাঝে সুন্দরী এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। ঠোঁটে কড়া লিপস্টিক। গালে হালকা ব্লাস। ডাক্তার হয়েও মনে হচ্ছে সাজগোজের জন্য বেশ সময় পাওয়া যাচ্ছে। তিনি দুজনকে বসতে বলেন। মিহি গলায় বলেন,
"আপনার হাসবেন্ড আমায় সবটা বলেছেন। আমি শুরুতে ডিএনসি করব। আপনি বেডটায় শুয়ে পড়ুন।"
ফারিহা নড়ল না। চোখের জলের দাগ বসে গিয়েছে গালে। ফাগুন শক্ত হাতে তাকে তুলে বেডে শুয়িয়ে দিল। কয়েক ঘন্টা অমানুষিক কষ্ট সহ্য করে শেষ করা হলো তাজা প্রাণটাকে। সে বোধহয় ভুল জায়গায় এসে পড়েছিল। নিশ্বাস নেয়ার অধিকারটা ছিনিয়ে নিল তার জন্মদাতা বাবা। সুন্দর এই পৃথিবীর আলো আর দেখা হলো না। আধো বুলিতে 'মা' ডাকা হলো না। ছোট্ট প্রাণটার নিকট এই দুনিয়াকে বড় নিষ্ঠুর ঠেকল।
বিছানার দু'প্রান্তে শুয়েছে প্রান্তিক আর আদ্রিকা। এতোদিন একসাথে ঘুমালেও আজকের অনুভূতি তীব্র। দুজনের মাঝে অল্প কিছুটা দূরত্ব। পাঁচ মিনিট অতিক্রান্ত হলে প্রান্তিক ঘুরে শোয়। আদ্রিকার পিঠে হাত রাখে। নরম গলায় বলে,
"তুমি আমায় চাও না?"
কন্ঠনালী রোধ হয়ে আসে আদ্রিকার। প্রান্তিক আরও খানিকটা এগিয়ে আসে। ছয় মাসের জমে থাকা দূরত্ব ঘুচতে থাকে। আদ্রিকা সহ্যশক্তি হারিয়ে এলোমেলো হয়ে যায়। জবাব দেয়,
"আমি আপনাকে চাই, প্রান্তিক।"
হাসি বিস্তৃত হয় প্রান্তিকের। সে গায়ের কালো টি-শার্ট খুলে ফেলে। অবাধ্য হাতে ছুঁয়ে দেয় স্বীয় স্ত্রীর শরীরের প্রতিটি কোণা। অজস্র চুমু দিতে থাকে মুখে, গলায়, বুকে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছেয়ে যায় পূর্ণতা।
আদ্রিকার তুলনায় প্রান্তিকের হাইট, ওয়েট দুটোই আকাশচুম্বী। বেসামাল মানুষটার স্পর্শ অজানা আনন্দ দিয়েছে আদ্রিকাকে। তবুও প্রথমবার কাছাকাছি আসায় আদ্রিকার অবস্থা নাজুক। সে বিছানায় শুয়ে রইল নিস্তেজ হয়ে। রাত বাজে তিনটার কিছু বেশি। প্রান্তিকের অভিমান হলো খানিকটা। তার ছোঁয়ায় মেয়েটা বারবার মূর্ছা যাবে নাকি! তাহলে তো বউয়ের কাছেই ঘেষা যাবে না। প্রান্তিক টিশার্ট গায়ে দিয়ে চুপিসারে পানি গরম করে আনে। আদ্রিকা জিজ্ঞেস করে,
"কেউ দেখেনি তো?"
"সবাই মরা ঘুম ঘুমাচ্ছে। কে দেখবে?"
"রেগে রেগে কথা বলছেন কেন?"
"বললেই পারতে কষ্ট হচ্ছে। আমি তো আর অমানুষ না।"
"অসভ্যের মতো কথা বলবেন না। পানি বালতিতে রাখুন, আমি গোসল করব। "
দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করার পর আদ্রিকার শরীর ঝরঝরে হয়ে যায়। গলার একপাশে লাল হয়ে যাওয়া জায়গাটা দেখে সে আনমনে হাসে। চুলগুলো মুছে সে প্রান্তিকের পাশে শুয়ে পড়ে। আধঘুমন্ত প্রান্তিক তার মাথাটা বুকে চেপে রাখে।
চলবে…..#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম : শ্যামকন্যা
#পর্ব_২০
প্রায় দুদিন হয়েছে প্রান্তিক বউকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। জাহেদ শেখ ছেলের সাথে কথা বলছেন না। লামিয়ার কথার বাণ বেড়েছে। প্রতিবাদ করছে না কেউই। এসব ঘটনার রেশ পোহাতে পোহাতে আদ্রিকা ক্লান্ত। বক্ষজুড়ে তার হতাশা। প্রান্তিক ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে। কিভাবে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। জায়গায় জায়গায় সিভি জমা দিচ্ছে। কেউ কেউ সিভি নেয়ার আগেই বলছে পাঁচ লাখ দিলে চাকরি নিশ্চিত। একবার অসৎ উপায় অবলম্বন করে চাকরি নেয়ার ফল প্রান্তিক হারে হারে টের পাচ্ছে। দ্বিতীয়বার এই ভুল সে করবে না। কিছু সেভিংস তার কাছে আছে। সেটা পোস্ট অফিসে ফিক্সড করে রাখলে মাসে দশ থেকে বারো হাজার টাকা পাওয়া যাবে। আবার সম্পূর্ণ টাকাটা দিয়ে ব্যবসাও শুরু করা যায়। তবে ব্যবসা নিয়ে তার জ্ঞান শূন্য। সে পড়েছে সিএসই নিয়ে।
আদ্রিকা স্বামীর পাশে বসে কাঁধে হাত রাখল। আদরমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
"চিন্তা করবেন না। একটা ব্যবস্থা অবশ্যই হবে।"
"যদি না হয়? তুমি আমায় ছেড়ে যাবে তাই না! একসময় অভাবের বোঝা টানতে টানতে, কথা শুনতে শুনতে তুমি ক্লান্ত হয়ে যাবে।"
"আপনার এমন মনে হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে আপনায় ছেড়ে যাওয়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। "
"তুমি চলে গেলে আমি মরেই যাব।"
"এ কথা সবাই বলে। পারতপক্ষে মৃত মানুষটাকে কেউ সারাজীবন মনে রাখে না, চলে যাওয়া মানুষকেও না।"
"কেউ কেউ রাখে।"
"আচ্ছা, আমি একটা কথা ভাবছিলাম। আপনি তো সিএসই নিয়ে পড়েছেন, তাই কোডিং, সি প্রোগ্রামিং খুব ভালো পারেন। আপনি ইন্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের কোডিং শিখাতে পারেন না?"
"হ্যাঁ, তাই তো। এটা একদম মাথায় আসেনি। তবে মানুষ আমার কাছে শিখতে আসবে তো?"
"এতো না ভেবে আগে শুরু করুন। ভাবতে গেলে একশোটা বাঁধা আসবে, সেই সাথে সময়টাও চলে যাবে।"
"আমার বউ এতো বোঝদার হয়ে ভালোই হয়েছে। আমার বাচ্চাগুলোও এমন হবে।"
লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠে আদ্রিকা। ব্যগ্র পায়ে উঠতে গেলেই প্রান্তিক খপ করে হাতটা ধরে। ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে দেয় কপালে সুনিপুণভাবে।
ফারিহা গুমোট হয়ে আছে। সেদিনের রাতটা ছিল কাল রাত। প্রচন্ড আক্ষেপ নিয়ে তার ইচ্ছে করছিল ফ্যানটায় ঝুলে পড়তে। পারেনি নিজের ভালোবাসার জন্য। একমাত্র বড় ভাইটার জন্য। কখনো মন বুঝতে না পারা বাবার জন্য। অনাকাঙ্ক্ষিত ভুলের মাশুল দিতে হলো ছোট্ট প্রাণটাকে। এই ভুলটার জন্য অনেকাংশেই ফারিহা দায়ী। ফাগুন তাকে বারবার পিল খেতে বললেও ফারিহা কখনো খায়নি। সে ভেবেছিল বাচ্চা চলে আসলে তাদের বিয়েটা সবাই মেনে নিবে। অথচ সে কাউকে জানাতেই পারল না? ভাইয়াকে তো অবশ্যই জানানো যেত! সে নিশ্চয়ই একটা ব্যবস্থা করত। বাবা হয়তো তাদের মেনে নিত না কিন্তু তার ভাই তো তাকে ভীষণ বোঝে। একবার কেন সে ভাইকে সব খুলে বলল না। ফারিহার ইচ্ছে করল ভাইকে সব জানাতে৷ এই মুহূর্তে ভাইয়ের চাকরি নেই। ফারিহা আর উটকো ঝামেলা বাড়াতে চাইল না। হয়তো বাচ্চাটারই ভাগ্য খারাপ। সে অতোটুকু আয়ু নিয়েই এসেছিল। তার শুধু ফাগুন থাকলেই হবে। আর কাউকে লাগবে না।
জাহেদ শেখ সপরিবারে খেতে বসেছেন। তরকারির আয়োজন সামান্য। পটল দিয়ে কই মাছ আর ডাল। আদ্রিকা কই মাছ খায় না। তার মনে হয় কই মাছের চামড়া খুবই ময়লা। চামড়া ফেলে দিলেও ঘৃণায় সে মাছটা খেতে পারে না। অন্যদিকে পটল রান্না করলে সে খেতে পারে না। শক্ত করে ভাজা করলে খায়। আজ রান্না করেছে সে নিজেই, তবে বলে দিয়েছেন লামিয়া। তাই নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেয়নি আদ্রিকা। প্লেটে এক মুঠোরও কম ভাত নিয়ে ডাল দিয়ে খেয়ে উঠতে গেলেই প্রান্তিক বউকে পুনরায় বসিয়ে দেয়। আদুরে গলায় বলে,
"এই কয়টা ভাত খেলে হয়? আমি ডিম ভেজে নিয়ে আসছি।"
লামিয়া মুখ বাঁকিয়ে বললেন,
"কোন রাজবাড়ী থেকে এসেছে তোমার বউ যে ডিম ভেজে ভাত খেতে হবে। আর কেউ খাচ্ছে না নাকি? এতো আদিখ্যেতা দেখাতে হলে নিজে রোজগার করে বউকে ডিম, মাংস খাওয়াও।"
জাহেদ শেখের জমে থাকা রাগে যেন ঘি পড়ল। তিনি চেঁচিয়ে বললেন,
"সত্তর বছর বয়সে আমায় ছেলেকে খাওয়াতে হচ্ছে। ছেলের বউ কি খাবে না খাবে সেটা জানতে হচ্ছে। আরে এই বয়সের ছেলেরা বাপকে আরাম দেয়। আমার জমানো টাকায় কয়দিন চলবে তুমি?"
আধখাওয়া ভাতটা রেখে ওঠে গেল প্রান্তিক। হাত ধুয়ে রুমে চলে গেল নিমিষেই। ফারিহাও উঠে গেল। নিজের অশান্তির মাঝে এইসব আর সহ্য হয় না তার। লামিয়া চেঁচালেও সে বেশিরভাগ সময় রুমেই দরজা লাগিয়ে কাটায়। সবার খাওয়া শেষ হলে লামিয়া আদ্রিকাকে বলেন,
"থালা-বাসন মেজে রুমে যাবে। আমার জন্য জমিয়ে রাখবে না।"
অপমানে গলার কাছে কান্নাটা দলা পাকিয়ে আঁটকে রইল আদ্রিকার।
রুমের অবস্থা এলোমেলো। প্রান্তিক অর্ধেক জামাকাপড় ব্যাগে ভরে ফেলেছে। তবে আলাদাভাবে। আদ্রিকা রুমে আসতেই বলে,
"তুমি কয়টা দিন বাপের বাড়ি থাকো। আমি ছোটখাটো একটা বাসা পেলেই তোমায় নিয়ে যাব।"
"কোথায় যাচ্ছেন আপনি? দেখুন, মাথা গরম করবেন না। একটু আধটু কথা আমি শুনতে পারব।"
"আমি পারব না। অনেক সহ্য করেছি। আমার বউ- বোনকে আমি এখানে রাখব না। "
"প্রান্তিক, একবার মাথাটা ঠান্ডা করুন।"
"আমি ভেবে ফেলেছি।"
"তাহলে আমি বাপের বাড়ি যাব না। আপনি যেখানে থাকবেন আমিও সেখানে থাকব।"
"ছেলেমানুষ গাছতলায়ও থাকতে পারে। তুমি পারবে না। একটু বোঝার চেষ্টা করো। তাছাড়া তোমায় নিয়ে গেলে সেইফ জায়গা হচ্ছে হোটেল। এতো টাকা এখনই খরচ করলে পরে কিভাবে সামলাবো বলো? তুমি না আমার লক্ষী বউ! একটু বুঝবে না?"
"আচ্ছা। তবে খুব তাড়াতাড়ি আমায় নিয়ে যাবেন।"
বসার ঘরে বাবা-ছেলের তুমুল ঝগড়া হচ্ছে। জাহেদ শেখ কিছুতেই মেয়েকে যেতে দিবেন না। এক পর্যায়ে ফারিহাকে জিজ্ঞেস করা হয় সে কি চায়। ফারিহা অকপট জবাব দিল,
"আমি এখানেই থাকব, ভাইয়া। আমায় নিয়ে চিন্তা করিস না। "
হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকাল প্রান্তিক। ক্লান্ত গলায় বলল,
"ভালো থাকিস। তোর ভাই সবসময় তোর সাথে আছে।"
লামিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। এইবার মেয়েটাকে বিদায় করতে পারলে তার শান্তি। এর জন্য তিনি মোক্ষম চাল তৈরি রেখেছেন। আপাতত ফারিহার চোখে তিনি ভালো মা হওয়ার চেষ্টায় আছেন। জাহেদ শেখ যদি একবার ফারিহার নামে সম্পত্তি দলিল করে ফেলেন, তাহলে নিজের ভাইয়ের ছেলের সাথেই ফারিহার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন তিনি।
আদ্রিকাকে তার বাসার নিচে নামিয়ে দিতে গিয়ে কন্ঠ রোধ হয়ে এলো প্রান্তিকের। এতোটা অসহায় তার কখনো বোধ হয়নি। আদ্রিকা ভাঙা গলায় বলে,
"আপনি কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি আসবেন।"
"অবশ্যই আসব।"
"আমি আপনাকে খুব মিস করবো।"
"আই উইল মিস ইউ মোর, বউ।"
শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয় দুজন। আদ্রিকার চোখের পানিতে সিক্ত হয়ে ওঠে প্রান্তিকের বুকের বা'পাশ।
চলবে…..#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
ছদ্মনাম: শ্যামকন্যা
#পর্ব_২১
দুটো দিনের সম্পূর্ণাংশ কাটাতে গিয়ে প্রান্তিক হাঁপিয়ে উঠেছে। রোজ সকালে একটা সেদ্ধ ডিম আর পাউরুটি খেয়েছে। দুপুরের ভাত খেয়েছে ছাপড়া হোটেলে। সেসব খাবার যেন তার পেট উগ্রে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। তন্নতন্ন করে খুঁজেও ঢাকা শহরে নিজের সাধ্য অনুযায়ী বাসা খুঁজে পায়নি। যেগুলোর ভাড়া তিন হাজারের মতো সেসব বাসা টিনের তৈরি। বৃষ্টি হলে মগ, বালতি হাতে পানি সেঁচতে হবে। অপরিচিত জায়গায় প্রান্তিক স্বস্তি পায় না। মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সবসময় কারো সাহায্য দরকার হয়। এই শহরে তার দশটা পরিচিত মানুষ আছে, বিপদে একজন হলেও এগিয়ে আসবে। অথচ অচেনা শহরে সাহায্য পাওয়া হবে দুষ্কর। প্রান্তিক এই দুইদিন কাটিয়েছে ফাগুনের ফ্ল্যাটে। ফাগুন অবশ্য বলেছে বউ নিয়ে আপাতত এখানে থাকতে। তবে নিজের আত্মসম্মানে বাঁধা পড়ায় প্রান্তিক রাজি হয়নি। ফ্ল্যাটে থাকাকালীন সে ফোনে বোনের সাথে ফাগুনের ঝগড়া আঁচ করতে পেরেছে। একসময় অসহায়ের মতো বন্ধুর হাত ধরে বলেছে, আমার এতিম বোনটাকে কষ্ট দিস না কখনো। ফাগুন ছিল নির্বিকার। সারাদিন ফাগুন অফিস করতো, রাতের খাওয়াটা ভালোই হতো প্রান্তিকের। তিনদিনের দিন প্রান্তিক একটা বাসা খুঁজে পেয়েছে। ছোট একটা রুমে বড়জোর একটা খাটই আঁটবে, সাথে আরও ছোট একটা বাথরুম। খানিকটা বারান্দা আর রান্নাঘর। দুজন মানুষের জন্য ঠিকঠাক। ভাড়া চাচ্ছিল সাত হাজার৷ প্রান্তিক বাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে পাঁচ হাজারে রাজি করিয়ে ফেলল। এডভান্স ভাড়া দিয়ে সে জমানো টাকা তুলে আনল। বাসায় গিয়ে নিজের রুমের খাট, ফ্যান খুলে নিয়ে আসল। সাথে আনল ল্যাপটপটাও। স্বল্প সময়ে একবারও বোনের সাথে কথা বলল না। ফারিহা ভাইকে দেখে কান্না আঁটকে রাখতে পারল না। দুদিনে চেহারা ভেঙে গিয়েছে। গায়ের রঙ আগের তুলনায় চাপা পড়েছে। নিশ্চয়ই রোদে রোদে ঘুরেছে। প্রান্তিক জানতেই পারল না বোনটা ভাইয়ের কাঁধের বোঝা ভারী করতে চায়নি।
নায়লা মেয়ের কাছ থেকে সবটা শুনেছেন। চিন্তায় তার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে। মায়ের মন আগে থেকেই কু ডাকছিল। একমাত্র মেয়ে তার। চাকরি দেখেই তিনি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। টাকা জীবনের সব না হলেও টাকা ছাড়া কি সুখী হওয়া যায়? একটা মানুষের নানারকম চাহিদা থাকে, শখ থাকে। টাকা ছাড়া তো সেসব অপূর্ণ থেকে যাবে। নড়বড়ে শরীর নিয়ে নায়লা বলেন,
"আমার মেয়ের কপালেই কেন এমন লিখতে হলো?"
আদ্রিকা মা'কে সামলে নিয়ে বলল,
"আমি ভীষণ সুখী, আম্মু। প্রান্তিকের মতো একটা ছেলেকেই সব মেয়ে চায়। আমি ওনার টাকাকে ভালোবাসিনি। মানুষটাকে বেসেছি। সে যখন আমার দিকে তাকায় তখন কি মনে হয় জানো? মনে হয় ওনি আমায় এই পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। তার চোখের দিকে তাকালেই আমি তার ভালোবাসার প্রগাঢ়তা মাপতে পারি। এমন মানুষের সাথে থাকার কপাল সবার হয় না। তোমার মেয়ের হয়েছে। "
নায়লা কিছুটা শান্ত হলেন। তিনি মেয়েকে বললেন,
"যতদিন ওর কিছু ব্যবস্থা না হয়,তুই এখানেই থাকবি।"
"আমি প্রান্তিকের সাথেই থাকবো। এই সময়টায় ওনার আমার সান্নিধ্য সবচেয়ে বেশি দরকার।"
"এতো বড় কবে হয়ে গেলি, মা?"
"আমিও জানি না, আম্মু। বিয়ের পর মনে হয় হুট করে অনেক দায়িত্ব কাঁধে চলে আসলে মেয়েরা বেশি ম্যাচুরড হয়ে যায়।"
সন্ধ্যার মধ্যে বাসা গুছিয়ে প্রান্তিক আদ্রিকাকে নিয়ে আসে। ছোট বাসাটার মাঝেই মেয়েটা সুখ খুঁজে নেয়। আঁচল কোমড়ে গুজে বাসাটাকে আরও খানিকটা সাজিয়ে ফেলে। রান্নাঘরে থাকা আলু সেদ্ধ করে পেঁয়াজ, মরিচ আর সরিষার তেল মিশিয়ে ভর্তা বানায়। বাসায় ডিম একটাই ছিল। সেটা ভেজে নেয়। ডাল রান্না করলে খেতে সুবিধা হতো। তবে বাসায় ডাল নেই। সামান্য আয়োজনে দুজন ফ্লোরে খবরের কাগজ বিছিয়ে খেতে বসে। ডিমটা সমান দুভাগে ভাগ করে নেয় আদ্রিকা। দু'একটা কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ করে দুজনেই। আদ্রিকা প্লেট ধুয়ে একেবারে গোসলে চলে যায়। সারা গায়ে তার ধুলো লেগে আছে। প্রান্তিক কোডিং শেখাতে চায় বলে একটা পোস্ট দিয়েছিল৷ সেখানে তিনজন ইন্টারেস্টেড লিখেছে। প্রি পেমেন্টের কথা বলায় দুজন রাজি হয়। প্রান্তিক তাদেরকে বিকাশ নাম্বারটা দেয়। মুহূর্তেই পাঁচ হাজার টাকা চলে আসে। ব্যাপারটা এতো সহজ হবে সে ভাবেও নি। ছেলে দুটো যথেষ্ট ভদ্র। এরমধ্যে একটা ছেলে প্রান্তিকের ভার্সিটির। ছেলেটার নাম দীপ্র। ছেলেটা আশ্বাস দেয় সে আরও কয়েকজনকে জানাবে। দুজনকে কোডিং এর ব্যাসিক আইডিয়া দিয়ে প্রান্তিক নিজের কাজ শেষ করে। ততোক্ষণে আদ্রিকা বের হয়ে এসেছে। ঘরময় ছড়িয়ে গিয়েছে টুপটাপ পানির ঝাপটা। প্রান্তিক এগিয়ে গিয়ে বউকে চুল মুছতে সাহায্য করে। একসময় জিজ্ঞেস করে,
"আমার সাথে থাকতে তোমার খুব কষ্ট হয় তাইনা?"
"আপনি কি আমায় মারেন যে কষ্ট হবে? বরং ঐ বাড়িতে থাকতেই বেশি কষ্ট হতো।"
"একটা কথা দেবে?"
ভ্রু কুঁচকে যায় আদ্রিকার। ভাবনায় মশগুল হয় খানিকটা।
"আচ্ছা, বলুন।"
"আমায় কখনো ছেড়ে চলে যেও না। "
গলা কেঁপে উঠে প্রান্তিকের। দুচোখে প্রিয় মানুষ হারানোর ভয়। নিগুঢ় চাহনি বুকটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে আদ্রিকার।
"আমি কখনো যাব না।"
সেই রাতটা কাটল প্রিয় মানুষের উষ্ণতায়। ভয়ংকর অভাবের মাঝেও যেন ভয়ংকর আনন্দ ঝাপটে রেখেছিল দুজনকে।
চলবে…..
এর বেশি লিখতে পারিনি। হঠাৎ গ্যাপ হয়ে যাওয়ায় লিখতে কষ্ট হচ্ছে। ক্ষমা করবেন এবং কোথাও ভুল দেখলে জানাবেন।#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
#পর্ব_২২
সদ্য পাওয়া পাঁচ হাজার টাকা থেকে হাজার টাকার কড়কড়ে নোট দেখে প্রান্তিক বউয়ের জন্য শাড়ি কিনে ফেলল। বাকি চার হাজার টাকা থেকে ভালো দেখে মাছ, মাংস, ডিম কিনল। তবে বিপত্তি বাঁধলো কেনার পর। বাসায় তো ফ্রিজ নেই।ভাবনাকে সরিয়ে আরও খানিকটা মুদি বাজার করার পর প্রান্তিকের কাছে আর ছয়শ টাকাই অবশিষ্ট ছিল। সেটা মানিব্যাগে যত্নে রেখে একটা রিকশা ঠিক করে সে বাসায় রওনা দিল।
নতুন কেনা শাড়ি দেখে আদ্রিকা তেঁতে উঠলো।
"এটা এক্ষুণি ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে আসুন।"
"এমন করে না, বউ। আমি তো কখনো তোমায় তেমন কিছুই দিলাম না। শাড়ির কালারটা এতো সুন্দর লাগল!"
মানুষটার ঘর্মাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আদ্রিকা আর কিছু বলতে পারে না। তরিতরকারি খুলে আদ্রিকা বেশ বিরক্ত হয়। রুষ্ট কন্ঠে বলে,
"এতো বাজার একসাথে কেন আনলেন?"
"মনেই ছিল না ফ্রিজ নেই। ম্যানেজ করতে পারবে?"
"অভিজ্ঞতা নেই। তবে মাছ,মাংস কড়া করে ভেজে রেখে দিব। দেখি কতোদিন ভালো থাকে। ডিম সাত-আটদিন ভালো থাকবে।"
"এবার থেকে ভেবে বাজার করবো। টাকা জমিয়ে দেখি একটা ফ্রিজ কিনতে পারি কিনা।"
বাজার গুছিয়ে আদ্রিকা স্বামীর ঘর্মাক্ত শার্টটা ধুতে যায়। প্রান্তিক এখন পারফিউম ব্যবহার করে না। তবুও তার শার্ট থেকে মেয়েলি পারফিউমের গন্ধ আসছে। না চাইতেও মন কতকিছু ভেবে ফেলছে। আদ্রিকা সরাসরি প্রান্তিককে জিজ্ঞেস করল,
"এই গন্ধ কিসের?"
প্রান্তিক উৎসুক হয়ে শুঁকে দেখল। এরপর বলল,
"বাজারে কতো মহিলাই তো ছিল। ধাক্কাধাক্কিতে হয়তো কেউ কাছে এসে গিয়েছিল।"
"এমন হলে আমি আপনাকে বাজারেই যেতে দিব না।"
প্রান্তিক মনেমনে একচোট হাসল। এই মেয়ে তাকে এমন পাগলের মতো ভালোবাসবে কে জানতো? ঠোঁট উল্টে আদ্রিকা শুধাল,
"কখনো আমার বিশ্বাস ভাঙবেন না। আমি সহ্য করবো না। যেদিন বিশ্বাসটা ফিকে হবে সেদিন থেকে আপনি আমার মুখ দেখবেন না।"
"এসব কি কথা! আমি তোমার হাতের ভাঁজে হাত রেখে বুড়ো হবো।"
অনেকদিন ধরে ফারিহা খেয়াল করেছে ফাগুনের সাথে তার সম্পর্ক ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাটা চলে গেলেও স্বামীকে ক্ষমা করে দিয়েছিল ফারিহা। ভেবেছিল ফাগুনের কথা মেনে নিলে সবটা ঠিক হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে বাবাকে বিয়ের করতে চায় এই কথা নিজে জানিয়েছে ফারিহা। জাহেদ শেখ ফাগুনের কথা শুনে সম্মতি দেননি। ছেলেটাকে তার বিশেষ পছন্দ নয়। বন্ধুর বোনের দিকে নজর যাবে কেন? তাছাড়া তাদের স্ট্যাটাস এর সাথেও ওর পরিবার যায় না। শুধু ভালো চাকরি থাকলেই হয় না। ফারিহা সম্মুখে বাবার কথা মেনে নিলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফাগুনকে বলে ভাইকে সব জানাবে। বাবা না মানলেও সে ফাগুনের সাথেই সংসার করবে।
সকাল থেকে আদ্রিকা খেয়াল করছে প্রান্তিক একটু থম মেরে আছে। মাঝে মাঝে চোখ মুছছে। জিজ্ঞেস করলেই বলছে, চোখে ধুলা গিয়েছে। একসময় আদ্রিকা তাকে টেনে বসাল। হাতটা ধরে নরম গলায় বলল,
"আমায় বলুন না!"
"এই দিনটায় আমি আমার আম্মুকে হারিয়েছি। আমার বোনটা তখন অনেক ছোট। বাসায় আম্মু আর ফারিহা একা ছিল। আব্বু ব্যাংকে আর আমি স্কুলে। হঠাৎ আম্মুর নাকি বুকে ব্যাথা হওয়ায় আব্বুকে কল দেয়। গাড়ি নিয়ে এসেই আব্বু দেখে আমার বোনটা মায়ের লাশটার বুকে শুয়ে আছে। ওকে কে বোঝায় ওর মা আর নেই। অনেক সময় ভীষণ কষ্ট হতো যখন বন্ধুদের দেখতাম মোবাইলে মায়ের সাথে কথা বলে। আমার তো কথা বলার মানুষটা নেই। কেউ জিজ্ঞেস করে না, বাবা খেয়েছিস? সেই থেকেই সিগারেট ধরেছিলাম। আমার বোনটা সারাক্ষণ মাকে চাইতো। সম্ভব হলে নিজের জীবনটা দিয়ে মাকে ফিরিয়ে আনতাম। কলেজে উঠার পর হোস্টেলে চলে গেলাম। অন্য ছেলেদের মা'রা সপ্তাহে দেখা করতে আসত। শার্ট খুলে বুকে, পিঠে হাত বুলিয়ে দিত। আমি চোখের পানি ফেলতাম। আমার মা কই? সে তো আসে না আমার কাছে। আমি তো সব ছেড়ে ছুঁড়ে আমার মায়ের বুকে যেতে পারি না! মোবাইলে মায়ের ছবি দেখলে বুকটা ঝলসে যেত, গলার কাছে ব্যথা করতো। বোনটা তো আমায় সব বলতে পারত। আমি কাকে বলতাম? এর মধ্যে আব্বু বিয়ে করল। নিজের মায়ের জায়গায় অন্য মহিলাকে দেখা যে কি কষ্টের! ইচ্ছে করতো ঐ মহিলাকে গলা টিপে মেরে ফেলি। তবুও সময়ের সাথে মানিয়ে নিতে চেয়েছি। অথচ যে আমার বোনটাকে আপন করতে পারল না তাকে আমি কিভাবে মা ডাকি? জানো, ফারিহা তখন থ্রি তে পড়ে। আমায় কল দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া আব্বু - আম্মু দরজা বন্ধ করে কি করে? আমি একা ঘুমুতে ভয় পাই তো। আমার বুকটায় ওর কথাগুলো তীরের মতো বিঁধতো। মানুষটা তো আমাদের জন্মদাতা বাবা। সে কি করে নিজের সন্তানদের ভুলে গেল। মাঝে মাঝে তো আমার সামনেই দিনে-দুপুরে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত। সেই দুঃসহ দিনগুলো আমি এখনো ভুলতে পারি না। আমায় আশ্রয় দেয়ার জন্য একটা কোল নেই। আমায় আগলে নেয়ার জন্য মায়ের বুক নেই। আল্লাহ এতো নিষ্ঠুর কেন হয় বলতে পারো? আমি কেন এখনো আম্মুকে ভুলতে পারি না? "
কান্নার দমকে গলার স্বর কাঁপতে থাকে প্রান্তিকের। নাকের ডগা, চোখের সাদা অংশ লাল হয়ে যায়। আদ্রিকা নিজেও কখনো উপলব্ধি করেনি ছেলেটার এতো কষ্ট। এতো বছর নিজের ভেতর চেপে কিভাবে বেঁচে ছিল প্রান্তিক! সন্তপর্ণে প্রান্তিকের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে চুলে বিলি কাটতে থাকে সে। একসময় ক্লান্ত হয়ে মানুষটা চোখ বন্ধ করে।
ফারিহা ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে ফাগুনের ফ্ল্যাটে ঢুকেছে। এর আগেও অনেকবার সে এখানে এসেছে। পার্থক্য একটাই আজকে ফাগুনকে জানিয়ে আসেনি। আজ ছুটির দিন, ফাগুন বাসায় আছে বলেই তার আসা। সবকিছু খোলাখুলি আলোচনা করতে চায় সে। ধীর পায়ে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায় ফারিহা। দৃষ্টি থমকে যায় তার। বিছানায় ফাগুন বসে আছে। তার সামনেই বাথরুম থেকে বেরিয়েছে সদ্য গোসল করা রমনী। দুজনেই চমকে উঠে ফারিহাকে দেখে। একটাও বাক্য বিনিময় না করে যেভাবে এসেছিল ঠিক সেভাবেই বেরিয়ে যায় ফারিহা। নিঃশব্দে প্রস্থান।
চলবে…..#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
#পর্ব:২৩
ফারিহা ক্লান্ত শরীর ফ্লোরে ছেড়ে দেয়। এতোদিনে উপলব্ধি হয় নিজের করা ভুলের। মায়ের কথা খুব বেশি মনে পড়তে থাকে। মা থাকলে অবশ্যই তাকে এমন কাজ করতে দিত না। যে পুরুষ সম্মুখে বিয়ে করতে পারে না সে ঠক, প্রতারক হয় অধিকাংশ সময়। ফারিহা জীবনে প্রথমবারের মতো একজনকে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছে। সেই মানুষটাই তাকে খুব যত্ন নিয়ে ঠকিয়েছে। একজন বিবাহিত যুবকের বেডরুমের বাথরুম নিশ্চয়ই সাধারণ কেউ ব্যবহার করবে না। তাদের মাঝে সম্পর্ক বুঝি এতোটাই ঘনিষ্ঠ? ফাগুন কিভাবে পারল এতোবড় দুঃসাহস দেখাতে। চোখ ফেঁটে জল আসছে না তার। বুকটা যেন পাথর হয়ে গিয়েছে।
ভাইয়ের কাছে এসেছে ফারিহা। দরজাটা খুলতেই একমাত্র আশ্রয় হিসেবে ভাইয়ের বুকে লুটিয়ে পড়ে। বোনের চোখের পানিতে ভিজে যায় প্রান্তিকের শার্ট। সে হতভম্ব। মাথায় একটাই চিন্তা আসছে, ঐ মহিলা কিছু করেনি তো? বোনের পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে শান্ত করতে থাকে প্রান্তিক। উৎকন্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
"কি হয়েছে ভাইয়াকে বল!"
আদ্রিকা কিছুটা আঁচ করতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে সে চুপ থাকাটাই শ্রেয় মনে করে। একসময় ফারিহা কিছুটা শান্ত হয়। লজ্জিত মুখে তাকায় ভাইয়ের দিকে। ধাতস্থ হয়ে সবটা বলে ঠিক শুরু থেকে। বাচ্চা নষ্ট করার কথাটা বলার সময় ফারিহার পুনরায় গলা কেঁপে উঠে। ওদিকে প্রান্তিক ততোক্ষণে বোনকে ঠেলে দিয়েছে। ফারিহা হতভম্ব হয়ে ভাইয়ের দিকে চায়। চোখের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়। প্রান্তিক শক্ত গলায় বলে,
"আদ্রিকা, ওকে চলে যেতে বলো আমার ঘর থেকে। আমার কোনো বোন নেই। যে নিজেই নিজের সন্তানের খুনী, সে কখনো আমার বোন হতে পারে না। একটাবার আমায় জানিয়ে করল না! ছিহ।"
ফারিহার গলা কেঁপে উঠে। সে দৌড়ে ভাইয়ের দুই পা জড়িয়ে ধরে। আকুতি করে বলে,
"এমন বলিস না, ভাইয়া। তুই আমায় দূরে ঠেলে দিলে আমি কোথায় যাব? আমি অন্যায় করেছি ঐ লম্পটটাকে বিশ্বাস করে। তুই আমায় শাস্তি দে। কিন্তু কখনো এটা বলবি না আমি তোর বোন না। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে, ভাইয়া?"
"আদ্রিকা তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওকে বের করো বাসা থেকে। আমি ওর মুখ দেখব না।"
আদ্রিকা এগিয়ে যায় ফারিহার কাছে। প্রশ্ন করে,
"তোমায় বোঝানোর পরেও এই ভুলটা করলে? একবার অন্তত আলোচনা করতে পারতে!"
ততোক্ষণে প্রান্তিকের মাথায় যেন আগুন ধরেছে। গলা উঁচিয়ে বলে,
"তুমিও জানতে? অথচ আমার থেকেই আড়াল করলে? আমি বোধহয় ভীষণ খারাপ স্বামী এবং ভাই।"
দুজন মুখ ফুৃটে কিছু বলার আগেই প্রান্তিক ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ফারিহা থপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। আদ্রিকা তার কাঁধে হাত রেখে বলে,
"তোমার ভাইয়ের রাগ হওয়াটা স্বাভাবিক। ছোট থেকেই সব বিপদ থেকে তোমায় আগলে রাখতে চেয়েছে। লুকিয়ে বিয়ে করার বিষয়টা মানা যেত যদি মানুষটা ঠিক হতো। এতেও তোমার হাত নেই। তবে বাচ্চা নষ্ট করাটা অযৌক্তিক হয়েছে। তুমি বাচ্চাটা নষ্ট করার আগে বিয়ের কথাটা তোমার ভাইকে জানাতে পারতে। সবাই মিলে একটা ব্যবস্থা করা যেত। নিষ্পাপ প্রাণটাকে শেষ করার মাশুল তোমায় দিতে হবে।"
"আমার মাথায় তখন শুধু ওকে ধরে রাখার চিন্তাটা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আমি ন্যায় - অন্যায় বোধ হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভাবি। ভাইয়া তো তোমায় ভীষণ ভালোবাসে। তুমি একবার ওকে বুঝিয়ে বলো না! "
"আমি বলবো। তুমি একটু শান্ত হও তো। ভুলটা বুঝতে পেরেছ এই অনেক। যত দ্রুত সম্ভব ফাগুনকে ডিভোর্স দাও। নিজের জীবনকে সুন্দর করার চেষ্টা করো। পড়াশোনাটা মন দিয়ে করো। একদিন তোমায় দেখে যেন ছেলেটার আফসোস হয়।"
"আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, ভাবি। নিজের স্বামী যখন অন্য মেয়েতে মত্ত থাকে, একটা মেয়ের তখন নিজেকে কতোটা অসহায় লাগে আমি তোমায় বোঝাতে পারব না। "
"চিন্তা করো না। রিভেঞ্জ অব নেচার বলে একটা কথা আছে। তুমি যতোটুকু করবে ঠিক ততোটুকুই ফেরত পাবে।"
"আমি আসি, ভাবি। তুমি ভাইয়াকে বুঝিয়ে বোলো।"
"ঐ বাড়িতে যাওয়াটা কি খুব প্রয়োজন। তোমার ভাই তোমার দায়িত্ব নিতে পারবে।"
"আমি জানি সেটা। তবে আমি নিজের অধিকার কেন ছেড়ে দেব? তুমি বুঝবে না, ওখানে থাকাটাই আমাদের সবার জন্য ভালো।"
"আচ্ছা, এতো বছরেও তোমার ভাই কেন ঐ বাড়ি ছাড়তে পারল না? "
"আমাদের মায়ের সব স্মৃতি তো ওখানেই। তাছাড়া ভাইয়ার ভরণপোষণ, পড়াশোনা, এমনকি চাকরিটাও আব্বুর দেয়া। ও কিভাবে চলে আসতো?"
"বুঝেছি। তুমি সাবধানে থেকো। সবসময় সবকিছু তোমার ভাইয়াকে জানাবে। মানুষটা তোমায় ভীষণ ভালোবাসে। "
"আমি জানি, ভাবি। ও না থাকলে আমি হয়তো এতোদিনে মরেই যেতাম। তোমার চেহারার সাথে আম্মুর খুব মিল। আমি কি একটু তোমার কোলে মাথা রাখবো, ভাবি?"
উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফারিহা একটু আশ্রয় খুঁজে নিল। আদ্রিকা পরম যত্নে মেয়েটার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
সন্ধ্যা পার হয়ে গেলেও প্রান্তিক ঘরে ফিরল না। বুকটা সেই থেকেই ধুকপুকিয়ে উঠছে আদ্রিকার। মানুষটা খুব সহজে রাগে না। তবে একবার রেগে গেলে মানাতে খুব কষ্ট হয়। বারকয়েক কল লাগিয়ে ফোনটা সুইচড অফ পেয়েছে। ক্রমশ রাত বাড়ছে। সাথে সাথে ভারী হচ্ছে চিন্তার পারদ। ওরা এই এলাকায় এসেছে খুব বেশিদিন হয়নি। আশেপাশে চেনা মানুষও নেই। কার কাছে এতো রাতে সাহায্য চাইবে মেয়েটা? একসময় বাসার কলিং বেল বাজে সশব্দে। চমকে উঠে আদ্রিকা। অগোছালো শাড়ি ঠিক না করেই দরজা খুলতে যায়। ডোরবেল- এ চোখ লাগিয়ে দেখে প্রান্তিক এসেছে। বুকের উপর থাকা পাথরটা নেমে যায়। দরজা খুলে ঘর্মাক্ত মানুষটার বুকে ঝাপিয়ে পড়ে আদ্রিকা। অনুনয়ের সুরে বলে,
"এভাবে আমাকে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগে আপনার? একদিন চলেই যাব।"
রক্তিম চোখে যেন আদ্রিকাকে ভস্ম করে দিতে চাইছে প্রান্তিক। আদ্রিকা আরেকটু মিশে যায় স্বামীর সাথে। বলে,
"ও ফাগুনকে পছন্দ করে এটুকুই জানতাম আমি। বাকি কথার একটাও আমি শুনিনি, বিশ্বাস করুন।"
"এসব শুনতে ভালো লাগছে না। ছাড়ো, ভেতরে যাব।"
"এই, একদম রাগ দেখাবেন না। বউয়ের সাথে সুন্দর করে কথা বলতে হয়।"
"সরো তো।"
হতাশ হয়ে আদ্রিকা মানুষটাকে জায়গা করে দেয়। প্রান্তিক সোজা গিয়ে শার্ট পাল্টে শুয়ে পড়ে। আদ্রিকা রুমের লাইট নিভিয়ে নরম গলায় বলে,
"খাবেন না?"
"খেয়ে এসেছি। "
"খুব ভালো। বাসায় কেউ না খেয়ে বসে আছে সেই খবর নেয়ার সময় আছে? "
"আমি তোমায় খেতে বারণ করেছি?"
"ঘুমান।"
অস্ফুট স্বরে কিছু একটা বলে প্রান্তিক উঠে বসে। রান্নাঘরে গিয়ে দেখে পাতিলে সামান্য ভাত আর একটা ডিমের ঝোল তরকারি। সে মোটেই খেয়ে আসেনি। খাবার দেখেই ক্ষুদাটা চাড়া দিয়ে উঠে। একটা ছড়ানো প্লেট বের করে সেখানে ভাতগুলো সাজিয়ে নেয় প্রান্তিক। মাঝখানে রাখে ডিমের তরকারি। রুমে গিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,
"উঠে এসো। খাবার এনেছি। "
"আপনি না খেলে আমি খাব না। "
"আমিও খাব। এসো।"
ঝোল মেখে দুজনেরই খাওয়া শেষ। অথচ ডিমের দিকে কেউ হাত বাড়াচ্ছে না। প্রান্তিক ডিমটা হাতে তুলে বউয়ের মুখের দিকে এগিয়ে দেয়। আদ্রিকা হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে,
"অর্ধেক করুন তো।"
দুটো অর্ধাংশ পেটে চালান করে আংশিক খিদে মিটে দুজনের। অথচ মনে হচ্ছে ভীষণ তৃপ্তি নিয়ে পেট ভরেছে। বউকে টুকটাক সাহায্য করে পুনরায় শুয়ে পড়ে প্রান্তিক। মাথায় তার একশটা চিন্তা। যার অধিকাংশ বোনকে ঘিরেই। ফাগুনের কথা ভাবতেই কপালের রগ, নাকের ডগা ফুলে উঠেছে। জানোয়ারটার এতো বড় সাহস। ওর লাশ কুত্তা দিয়ে খাওয়াবে প্রান্তিক। বাসা থেকে বের হয়ে ফাগুনের সাথেই লেগে এসেছে সে। অথচ ফাগুন ভীষণ স্বাভাবিক উত্তর দিল,
"একসময় তোর বোনকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগত না। তাই ওকে নিজের করতেই বিয়ে করেছি। এখন আর ওকে আগের মতো ভালোবাসতে পারি না। মানুষের মন তো। মেঘের মতো রুপ বদলায়। তুই আমাকে মেরেও ফেলতে পারিস। তবুও আমি ওর সাথে সংসার করবো না। "
আদ্রিকা বিছানায় উঠে প্রান্তিকের কাছে এগিয়ে গেল। পিঠে হাত রেখে বলল,
"কথা বলছেন না কেন?"
"আমার ভালো লাগছে না।"
"ছোট মানুষ একটা ভুল করে ফেলেছে। রাগ ঝেরে ফেলুন তো। আপনি ওকে না দেখলে কে দেখবে?"
"বিরক্ত করো না তো।"
"ওহ। আমি এখন বিরক্তের কারণ? আমি কালকেই চলে যাব। বিরক্তের সাথে সংসার করতে হবে না আপনার।"
"কথা ঘোরাচ্ছ কেন? তুমি চলে যাবে কারণ এই অভাবের ঘরে তুমি থাকতে পারছ না।"
"এই কথা আপনি বলতে পারলেন প্রান্তিক? আমি কখনো আমার আচরণে বুঝিয়েছি এই সংসারে আমি অসুখী? আপনি আমায় বুঝলেনই না।"
হুট করেই প্রান্তিক জড়িয়ে ধরে বউকে। ধরা গলায় বলে,
"স্যরি, বউ। আমার মাথা ঠিক নেই। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছি না। আচ্ছা, আমার বোনটার সাথে এমন কেন হলো বলোতো? আমি কিভাবে ওর কষ্ট কমাব?"
"আপনি ওকে কাছে টেনে নিন, দেখবেন সে সব ভুলে যাবে।"
"তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা কখনো বলবে না। পাগল পাগল লাগে আমার।"
আদ্রিকা নরম স্পর্শ দেয় স্বামীর কপালে। চুলে বিলি কেটে ঘুম ধরাতে সাহায্য করে। একসময় ভারী নিশ্বাসের আওয়াজে সে স্বস্তি পায়। কয়েকদিন ধরেই আদ্রিকা অন্যরকম কথা ভাবছে। তাদের একটা বাবু থাকলে কেমন হতো? ছোট ছোট নরম হাতে সে মাকে ছুঁয়ে দিত। অবশ্য প্রান্তিক নিশ্চয়ই এই অভাবের সংসারে নতুন একটা প্রাণকে নিয়ে এসে কষ্ট দিতে চাইবে না। সেই ভেবেই দ্বিধা নিয়ে কথাটা বলতে পারছে না।
চলবে…..#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
#পর্ব_ ২৪
মধ্যরাত থেকে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। প্রান্তিকের অবস্থা খুবই খারাপ। একদিন ওরা এক আত্মীয়ের বাসায় বিয়ের দাওয়াত-এ গেল। প্রান্তিকের খালাতো বোনের বিয়ে। খালা সবার সাথে মেয়ে জামাইয়ের পরিচয় করিয়ে দিলেন। অথচ প্রান্তিককে বলা হলো সে যেন বউ নিয়ে নতুন জামাইয়ের সামনে না যায়। ওনার মেয়ে জামাইয়ের দুইটা আড়ত, একটা গার্মেন্টস। বিশাল সম্পত্তি খাওয়ার লোক নেই। এখন যদি দেখে বউয়ের ভাইয়ের অবস্থা এতো শোচনীয় তাহলে নিশ্চয়ই বউকে অপমান করবে। সেই বিয়ে বাড়ির দামী খাবার প্রান্তিক, আদ্রিকা কারোর গলা দিয়েই নামল না। নিশ্চুপ হয়ে বাসায় ফিরে এলো দুজনেই। তবে মানুষটা ভীষণ চেষ্টা করছে। সারাদিন ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে। যেখানেই চাকরির সার্কুলার পায় এপ্লাই করে রাখে। এর মাঝে ফারিহার সাথে ভাইয়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে। মেয়েটা সুযোগ পেলেই চলে আসে। কলেজে ভর্তি হওয়ায় চাপ বেড়েছে দ্বিগুণ। আদ্রিকা নিজেও টুকটাক টাকা জোগাড়ের চেষ্টায় আছে। একটা ফ্রিজ ওদের খুব দরকার। সবজি, তরকারি রোজ নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া বাসায় ফ্যানের ক্যাপাসিটার নষ্ট। ঘড়ঘড় করে ফ্যান ঘোরে। তবে বাতাস লাগে না। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে আদ্রিকার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। সারারাত আর ঘুম আসবে না। হাঁসফাঁস করতে থাকবে চিন্তায়।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর শায়লা আদ্রিকার দেখা পেয়েছেন। ঘরে প্রান্তিক নেই। তিনি চোখ কুঁচকে বাসার আয়োজন দেখলেন। তাদের বাড়ির কাজের লোকও এর চেয়ে ভালো ঘরে ঘুমায়। তিনি সরাসরি বিছানায় বসলেন। আদ্রিকাকে বললেন,
"আমার ফোনে বলা কথাগুলো ভেবে দেখেছ?"
"জি।"
"কবে আসছ তাহলে?"
"আপনি কাগজ দিলেই আমি সই করে চলে যাব।"
"তুমি ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে। সবারই অধিকার আছে সুখী হওয়ার। তুমি কেন এই বয়সে এতো স্ট্রাগল করবে!"
"সেটা আপনার না ভাবলেও চলবে। আপনি আপনার দেয়া কথা রাখুন।"
"আমি ওয়াদা ভঙ্গ করি না। এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খাওয়াও তো মা।"
"এই বাসায় ফ্রিজ নেই। "
"আচ্ছা, আমি উঠলাম। ভালো থেকো।"
ফারিহা আজ বেশ তাড়াতাড়ি কলেজে চলে এসেছে। চার তলায় তার ক্লাস রুম। সামনে বোটানি ডিপার্টমেন্ট এর রওনক স্যারকে দেখা যাচ্ছে। লোকটার বয়স অন্য প্রফেসরদের তুলনায় কম। এই বছরেই বিসিএস দিয়ে সরকারি কলেজে জয়েন করেছে। লোকটা এদিকেই আসছে। কাছাকাছি আসতেই ফারিহা সালাম দিল। রওনক ভারী গলায় প্রশ্ন ছুড়লো,
"বায়োলজিতে তোমার পারফরম্যান্স হতাশাজনক। তুমি বাসায় পড়ো তো?"
লজ্জায় খানিকটা গুটিয়ে গেল ফারিহা। বাসায় তো তার সারাদিন কাজ করেই সময় কাটে। পড়ার সময়টা হয় রাতে। তাও এখন বেশিরভাগ রাত সে পুরনো স্মৃতি হাতড়ে কাটায়। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সে জবাব দেয়,
"আমি বায়োলজি কম বুঝি, স্যার। "
"শোন, ইন্টার লাইফটা ইম্পরট্যান্ট। সমস্যা ফেলে রাখলে হবে না। আমি তোমার গাইড টিচার, আমার গ্রুপের প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট আমার দায়িত্ব। তুমি কাল থেকে আমার ব্যাচে পড়তে আসবে। শার্প এইট এ.ম. "
বলেই হনহনিয়ে প্রস্থান করলো রওনক। ফারিহা দম ফেলল। দূর থেকে তাকিয়ে থাকা নাফিসা ছুটে এলো ফারিহার কাছে। দুজনের বেশ জমে উঠেছে কয়েকদিনে। নাফিসা খানিকটা উদাসীন হয়ে গেল। নীরস গলায় বলল,
"স্যার সবসময় তোকে এতো খোঁজে কেন বল তো? ক্লাসেও তোর দিকে তাকায় অন্যদের তুলনায় বেশি। তুই কি স্যারের পরিচিত? "
"ধুর, তুই ওনাকে পছন্দ করিস বলে এমন মনে হচ্ছে। তাছাড়া ওনি আমার গাইড টিচার, তাই একটু খোঁজ খবর রাখে। আমি খারাপ রেজাল্ট করলে তো ওনাকে অথোরিটির কাছে জবাব দিতে হবে।"
"কই আমার গাইড টিচার শিউলি ম্যাম তো এমন নয়।"
"সবাই কি আর এক হয়? তুই এসব ছাড়। দরকার হলে আমি স্যারের সাথে তোকে নিয়ে কথা বলব।"
"সত্যি বলবি?"
"হ্যাঁ, তবে নির্দিষ্ট সময়ে।"
টিচার্স রুমে এসে রওনক ঢকঢক করে পানি খেয়ে শান্ত হলো। মেয়েটাকে দেখলেই যত অযাচিত চিন্তা মাথায় আসে। শিক্ষক হয়ে এসব মানা যায়? তার উপর বাসা থেকে ওর জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। শরীর, মন দুটোই কব্জায় নেই রওনক এর। স্বল্প সময়ের মোহকে পাকাপোক্ত কোনো নাম দিতে পারছে না সে। তবে অস্থিরতা ক্রমাগত বাড়ছে। শক্ত গলায় সে কিছু বলতে পারছে না। এই অনুভূতি ভয়ংকর। রূপবতী কতো মেয়েই তো আশপাশে ঘুরঘুর করে। কারো জন্য তো এমন মাতাল মাতাল লাগে না! তাছাড়া বয়সে ছোট মেয়েদের দিকে তাকাতেও লজ্জা লাগত ওর। সেই কিনা নিজের ছাত্রীকে দেখে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বাড়িয়ে দিচ্ছে। দূর থেকেও রওনক বুঝতে পারে মেয়েটার জীবন স্বাভাবিক নয়। চোখে-মুখে কিছু হারানোর হতাশা। মন সবসময় যেন কোথায় পড়ে থাকে। পড়াশোনাতেও মনোযোগ ভীষণ কম। রওনক হতবিহ্বল। সামান্য ছাত্রীর জন্য তার এ ধরনের চিন্তা খানিকটা নিকৃষ্ট নয় কি?
প্রান্তিক বাসায় ফিরবে রাত নয়টার পর। এখন সবে সন্ধ্যা। আদ্রিকা চিঠি লিখছে,
শ্রদ্ধেয় প্রান্তিক,
একটা সময় আমি আপনাকে ভালোবাসার দাবি করতাম। একটা সময় বলছি কারণ এই মুহূর্তে এসে মনে হচ্ছে আমি আপনাকে আগের মতো ভালোবাসতে পারছি না। তিনবেলার খাবার গলা দিয়ে নামতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়। আপনি আপ্রাণ চেষ্টা করছেন আমি জানি। তবে আমি এই অভাবের বোঝা আর টানতে পারছি না। আমি হাঁপিয়ে উঠেছি এই সস্তা জীবন থেকে। আমার জীবনে অনেক স্বপ্ন আছে। যেগুলো পূরণ করার সাধ্য আপনার নেই। কোনদিন হবে কিনা সন্দেহ। আমি আপনার সাথে থাকতে পারছি না, প্রান্তিক। আমায় ক্ষমা করবেন। আমি স্বইচ্ছায় তালাকনামায় সই করে গেলাম। আপনি চাইলেই আমাকে ফিরিয়ে আনতে পারবেন। তবে ফিরে পাবেন শুধু আমার শারীরিক উপস্থিতি। আমার মন আর আপনার জন্য ভাবে না। আপনিও অতি শীঘ্রই তালাকনামায় সই করার চেষ্টা করবেন। আমার পরবর্তী জীবন সুখকর করতে আপনার সম্মতি প্রয়োজন। আমাদের পথচলা এতোটুকুই ছিল।
ইতি
আদ্রিকা
চিঠিটা ভাঁজ করে খাটের কোণায় রেখে ডিভোর্স পেপার নিয়ে বসলো আদ্রিকা। বুক কাঁপছে তার। হাত শিথিল হয়ে এসেছে। নড়াচড়া করা দায় হয়ে পড়েছে। মানসপটে শুধু মানুষটার চেহারা ভাসছে। গলা শুকিয়ে আসছে বারংবার। দুফোঁটা অশ্রু টুপ করে তালাকনামায় পড়ে। সেই সাথে আদ্রিকা সিগনেচার বসায়। আশেপাশে কোথাও গান বাজছে।
"তারে বলে দিও
সে যেন আসে না
আমার দ্বারে
তারে বলে দিও "
চলবে……#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
#পর্ব_২৫
জীবন প্রবাহমান নদীর মতো। কখনো থেমে থাকে না। আমরা প্রায়শই বলি নির্দিষ্ট একজন মানুষকে ছেড়ে আমরা থাকতে পারব না। অথচ আমাদের থাকতে হয়। সময়ের সাথে কষ্টে প্রলেপ পড়তে থাকে। মানুষ এক সময় কষ্ট নিয়েই বেঁচে থাকতে শিখে যায়। প্রান্তিক চলে গিয়েছে এক মাস হলো। অথচ সময়ের আপেক্ষিকতায় আদ্রিকার কাছে এক মাস এক যুগের মতো লাগছে। তার সময় কিছুতেই কাটছে না। সে এখন আছে শ্বশুরবাড়িতে। জাহেদ শেখ নিজে গিয়ে ছেলেকে নিয়ে এসেছেন। লামিয়া আগের মতোই আছেন। কিছু মানুষের কখনো পরিবর্তন হয় না। ফারিহা বড্ড স্বল্পভাষী হয়ে গিয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া মুখে রা কাটে না। ওর বিয়ের কথা চললেও সে জানিয়েছে বিয়ের চেষ্টা করলে সে বাড়ি ছাড়বে। সব মিলিয়ে বাড়ির পরিবেশ ঠান্ডা। আদ্রিকার দম বন্ধ হয়ে আসে। কারও সাথে কথা বলতে পারে না, কোথাও যেতেও ইচ্ছে করে না। মা বারবার কল দিলেও আদ্রিকা এড়িয়ে যায়। প্রান্তিক ছাড়া ওর কিছুই ভালো লাগে না। প্রান্তিকের কাছাকাছি যাওয়ার রাস্তাটাও সহজ নয়। ওর সিজিপিএ বেশ খারাপ। ভালো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ পেতে গেলে আইইএলটিএস-এ ভালো নাম্বার প্রয়োজন। এই সেমিস্টারটা গেলেই আদ্রিকা কোচিংয়ে ভর্তি হবে। ওর মুহূর্ত যেন কাটতেই চায় না। বিয়ের পর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহটা আগের মতো নেই। তবে প্রান্তিক খুব বুঝিয়েছে ওকে। শুধু স্বামীর আছে বলেই বসে থাকলে তো হবে না। চাকরি না করুক অন্তত গ্রাজুয়েট হতে হবে। হুট করে কেমন পরিস্থিতি আসে বলা যায় না। ফোনের টুংটাং শব্দে আদ্রিকা কেঁপে উঠে। হড়বড়িয়ে হাত বাড়ায়, একহাতে নিজেকে গুছিয়ে আরেক হাতে কল রিসিভ করে। স্ক্রিনে প্রান্তিককে দেখা যাচ্ছে। বলা বাহুল্য লোকটার স্বাস্থ্য আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। তবে গায়ের উজ্জ্বলতা এক শেড বেড়েছে। আদ্রিকা মোবাইল বালিশের উপর ভর দিয়ে সোজা করে জিজ্ঞেস করে,
"এক শার্ট আর কতোদিন পড়বেন?"
প্রান্তিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে। সহসা জবাব দেয়,
"লাস্ট এই শার্টটা পড়ে তোমায় জড়িয়ে ধরেছিলাম। এখনো মনে হয় তুমি আমার সাথে আছো। তাই এটা ধুতেও ইচ্ছে করে না। তুমি তুমি গন্ধটা চলে যাবে।"
"আপনি ভীষণ পাগল হয়েছেন। আমেরিকার লোকরা আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।"
"ওদের এতোদিকে খেয়াল নেই বুঝলে। হাফ প্যান্ট পড়েই অনেকে ক্লাস নিতে আসে। তাছাড়া আমি কি পড়বো এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। "
"আপনি যখন দেশে আসবেন, আমি সবগুলো শার্ট একবার করে জড়িয়ে ধরবো। তবুও আপনি এই শার্ট ধুতে দিন, প্লিজ।"
"আচ্ছা, দিব।"
"আচ্ছা, আপনার আশেপাশে খুব সুন্দর সুন্দর মেয়েরা হেঁটে যায় তাই না?"
"হ্যাঁ, তা তো যায়। আমারও দেখতে খুব ভালো লাগে বুঝলে? ওরা খোলামেলা থাকে তো তাই!
নাকের পাটা ফুলে উঠে আদ্রিকার। একেই তো মানুষটা এতো দূরে। তার উপর সত্যিই যদি কোনো বিদেশীনি ওর প্রান্তিককে নিয়ে যায়? এখন তো প্রায় খবরে শোনা যায় বাঙালি ছেলে পছন্দ করে বিদেশী মেয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছে। তাছাড়া পুরুষ মানুষের মন। কিছুতেই বিশ্বাস করা যায় না। আদ্রিকা আর ভাবতে পারে না। কল কেটে দেয়। ফোনের ওয়াইফাই অফ করে দেয়। দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। দুপুরে খায় না পর্যন্ত। বারবার ওর মাথায় উদ্ভট চিন্তা আসছে। প্রান্তিকের বাবাও তো ওনার স্ত্রীকে ভীষণ ভালোবাসতো। আদ্রিকার মনে পড়ে ওর ফুপি মারা যাওয়ার পর ফুআব্বা নাকি প্রায়ই কবরের কাছে গিয়ে বসে থাকতেন। সেই মানুষ দ্বিতীয় বিয়ে করে ফেলল। দ্বিতীয় বিয়ে অবশ্যই খারাপ কিছু নয়। তবে সে বউয়ের জন্য তিনি নিজের ছেলেমেয়েদের পর্যন্ত ভুলে গেলেন। প্রান্তিক যদি ওর বাবার মতো হয়? প্রান্তিক অন্য কারও হবে এটা ভাবতেই পারে না আদ্রিকা।
ইদানীং ফারিহা পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী হয়েছে। কলেজে আসছে নিয়মিত। ক্লাসে বসে নোট তুলছে। আসন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি বেশ আগে থেকেই শুরু করেছে। লোকমুখে জানতে পারে রওনক স্যার নাকি কলেজ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। শুনেই বারবার অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে ওর। একটা মেয়ে ভালো করেই একজন পুরুষের অনুভূতি বুঝতে পারে। তবুও জেনেশুনে সবটা এড়িয়ে যেতে চায় ফারিহা। তার জীবনে ভালোবাসা বলতে একজনই৷ সেটা ফাগুন। যতোই সে তাকে ধোঁকা দিক, ভালোবাসাটা মিথ্যা হয়ে যাবে না। বেঈমান বলে মানুষটাকে সে হয়তো ঘৃণা করে, তবে প্রথম অনুভূতি সে কখনোই ভুলতে পারবে না। কলেজের ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতেই গেইটের কাছে রওনক স্যারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ফারিহা। রওনক পথ রোধ করে। আকুতি ভরা কন্ঠে বলে,
"পাঁচ মিনিট কথা বলবো, প্লিজ।"
ফারিহা শ্বাস ফেলে বলে,
"এখানে না। ছাদে অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।"
বিকেলের নরম রোদ এখনো গাছগাছালি ছুঁয়ে যাচ্ছে। টবে বেলি গাছ লাগানো হয়েছে। সেখান থেকে ফুলের কড়া গন্ধ আসছে। সেই গন্ধ সোজা ফারিহার মস্তিষ্কে প্রবেশ করছে। ভালো লাগছে না তার। সে জিজ্ঞেস করল,
"কেন ডেকেছেন, স্যার? "
"আমি চাকরিটা ছেড়ে দিচ্ছি। তুমি কি একবার ভেবে দেখবে?"
ফারিহা খানিকটা অপ্রস্তুত হয়। শিক্ষকের কাছে এমন কথা ইহজন্মে আশা করেনি সে। তবুও গলায় জোর নিয়ে বলে,
"আমার একটা অতীত আছে।"
"আমি সবটা জানি। তোমাদের ডিভোর্স হয়েছে এটাও জানি।"
"না, আপনি সবটা জানেন না। আমি….
" এর বাইরে আমার আর কিছু জানার নেই, ফারিহা। সবাই বিশ্বাসঘাতক হয় না। তুমি একজন অকৃতজ্ঞের জন্য সঠিক মানুষকে দূরে ঠেলে দিতে পারো না।"
"আমার আপনার প্রতি কোনো অনুভূতি নেই। তাহলে দূরে ঠেলে দেওয়ার কথা আসছে কেন?"
"তুমি একবার আমাকে বোঝার চেষ্টা করো।"
"জীবনে প্রেম একবারই আসে।"
"কে বলেছে? প্রেম বারবার আসে। তুমি এখনো বাস্তব জ্ঞান নিয়ে কাঁচা। তাই এসব কথা বলছো।"
"আমি কখনো অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারব না। পুরো দুনিয়া চাইলেও আমি কখনো অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারব না। তার আগে আমার মরণ হোক।"
ব্যগ্র পা ফেলে ছাদ থেকে নেমে আসে ফারিহা। দৌড়ে গিয়ে ওয়াশরুমে উদ্ভ্রান্তের মতো চিৎকার করতে থাকে। একসময় চোখে, মুখে পানি দিয়ে বের হয়। খাটের উপর কফির মগ নিয়ে বসে আছে ভাবি। ফারিহা জোর করে ঠোঁটে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে। আদ্রিকা কফির মগটা টেবিলে রেখে বলে,
"কফিটা খাও। ক্লান্তি দূর হবে।"
ফারিহা টলমল পায়ে এগিয়ে খাটে বসে। জিজ্ঞেস করে,
"ভাবী বলতে পারো, ভালোবাসায় এতো কষ্ট কেন?"
আদ্রিকা জবাব দিতে পারে না। সে চিন্তা করে দেখল ভালোবাসা মানুষকে যতোটা না আনন্দ দেয় তার চেয়ে বেশি কাঁদায়। সে শক্ত করে ফারিহার হাত ধরলো। ভরসার সুরে বলল,
"সব ঠিক হয়ে যাবে। এতো কষ্ট পুষে রেখো না।"
রাতে ঘুমুতে এসে আদ্রিকা ফোনে নেট কানেক্ট করে। হোয়াটসঅ্যাপে একশ আটচল্লিশটা মিসড কল। ভয়ে হাত-পা কাঁপতে থাকে মেয়েটার। আধা ঘন্টা আগে একটা ভয়েস এসেছে। আদ্রিকা উদগ্রীব হয়ে সেটা চালু করতেই ভেসে ওঠে কর্কশ শব্দ,
"তোমায় আমি মেরে ফেলবো।"
শেষে আদ্রিকা নিজেই কল দিল। সাথে সাথেই রিসিভ করল প্রান্তিক। পাগলের মতো চেহারা হয়ে গিয়েছে কয়েক ঘন্টায়। মাথার চুল হয়তো টেনেছে। চোখের অবস্থা লাল। প্রান্তিক ঝাঁঝালো গলায় বলল,
"এতো সাহস কোথা থেকে আসে? ফারিহাকে আর আব্বুকে কয়টা কল দিয়েছি খেয়াল আছে ওদের? কেউ কল ধরে না। আর তুমি কার সাথে রাগ দেখাও? সামনে থাকলে থাপ্পড় দিয়ে দাঁত ফেলে দিতাম। আর এক ঘন্টা দেরি করলে আমি টিকেট কিনে ফেলতাম বাংলাদেশের। "
"এখন আমায় ধমকাচ্ছেন কেন? বিদেশি ললনাদের দেখুন গিয়ে। "
"তোমার এসব ফাজলামো আমার ভালো লাগে না।"
"সত্যি কথা তো ভালো লাগবে না। ঠিক করে বলুন তো নতুন কাউকে পেয়েছেন? "
"মুখ সামলে কথা বলো!"
"সমস্যা নেই। ক্যারি অন। আমিও কালকে ভার্সিটি গিয়ে সুন্দরমতো একটা ছেলে খুঁজে বের করবো।"
"খুন করে ফেলব।"
"হ্যাঁ, আমি করলেই ক্যারেক্টার ঢিলা, আপনি করলে রামলীলা।"
"ঝগড়া করতে ভালো লাগছে না, বউ। আমাকে এভাবে টেনশন দিও না। একেই তো সারাক্ষণ তোমায় নিয়ে চিন্তায় থাকি। তুমি এমন করলে আমি চলে আসব দেশে।"
"স্যরি। আপনি শান্ত হোন।"
"আমার এখানে একটুও ভালো লাগে না। এরচেয়ে ঐ কষ্টের জীবন ঢের ভালো ছিল।"
"আমি আর এমন করব না তো। আপনি মন দিয়ে নিজেরটা ভাবুন। দূরত্ব ভালোবাসা বাড়ায়, বুঝলেন? "
"তুমি ঘুমাও। রাখছি। আই লাভ ইউ, বউ।"
কল কেটে তপ্ত শ্বাস ফেলে প্রান্তিক। আজ ওর রুমমেট পিগ রান্না করেছে। তাই রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়নি সে। আজ বোধহয় না খেয়েই থাকতে হবে। গত পরশু ও একটা দোকানে বার্গার অর্ডার করেছিল। এখানে চিকেন বার্গার ছাড়া সব বার্গারই শুয়োরের মাংস দিয়ে করা। এক বাইট খেয়ে বুঝে উঠতেই হড়বড় করে বমি করে দেয় প্রান্তিক। বিদেশে শুধু আরাম-আয়েশই থাকে না। তার চেয়ে বেশি থাকে মানিয়ে নেয়ার কষ্ট।
চলবে……#তারে_বলে_দিও
#লেখনীতে_জেরিন_সায়মা
#পর্ব_২৬
মাসটা তখন নভেম্বরের মাঝামাঝি। ঝিরঝিরে বৃষ্টি শীত নামিয়ে আনছে। জাহেদ শেখ শেষ রাত থেকে অস্বস্তি বোধ করছেন। বুকে বেশ জোরেই চাপ অনুভব হচ্ছে। মনে হচ্ছে বুকের উপর কিছু একটা বসে আছে। তার গা ঘামতে শুরু করলো। পাশেই স্ত্রী শুয়ে আছে। অথচ তিনি তাকে ডাকতে পারলেন না। হঠাৎ করে তার ছেলেমেয়েদের ছোটবেলার চেহারা মনে পড়ে গেল। কি আদরের সন্তান ছিল তার! অথচ তিনি বাপ হয়েও ভীষণ অন্যায় করেছেন। এই মুহূর্তে এসে মনে হচ্ছে তিনি পারতেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে একা জীবন কাটাতে। তবে তিনি সেই সাহস দেখাতে পারেননি। জীবনের এই পর্যায়ে এসে ওনার পাশে কেউ নেই। সন্তানদের মনে বাবা নিয়ে কোনো ভালো ধারণা থাকবে না। তারা সারাজীবন বাবাকে মনে করবে ঘৃণা নিয়ে। ইশ!
লামিয়া বেগমের ঘুম ভাঙল সকাল আটটায়। তার স্বামী সবসময় ফজরের ওয়াক্তে সজাগ হোন। অথচ আজ মানুষটা ঘুমোচ্ছে। তিনি স্বামীর গায়ে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলেন। বরফের মতো ঠান্ডা শরীর। ঠোঁট শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। মুখে তীব্র বেদনার ছাপ। লামিয়ার চিৎকারে বাড়ির সবাই জেগে উঠলো।
জাহেদ শেখ এর খাঁটিয়া তার ছেলে বহন করতে পারল না। লাশ বেশিক্ষণ রাখার ব্যাপারে কেউ মত দিল না। জাহেদ শেখ এর দ্বিতীয় বিয়ের পর প্রান্তিকের নানা বাড়ির সাথে তাদের সম্পর্ক চুকে গিয়েছে। তবে জাহেদ শেখ এর মা পুত্র শোকে বিভোর হয়ে রইলেন। নিজের শরীর থেকে বের হওয়া অংশ সন্তান। সে মা'কে ফেলেই পরপারে চলে যাচ্ছে। কি ভয়ানক কথা। মরা বাড়িতে মানুষ বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে লাগল। ফারিহার সবকিছু বিষাক্ত লাগছে। দীর্ঘদিন পূর্বে সে মা হারিয়েছে। বাবা যেমনই হোক, বাবা বেঁচে থাকাটাই ওর কাছে বিশাল কিছু। এতো বছর মেয়ের সকল দায়িত্ব পালন করেছেন। কই, মা মারা যাওয়ার পর মামারা তো কখনো ওদের খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করল না। মৃত মানুষটাকে নিয়ে কোনো খারাপ স্মৃতি মনে করতে চাইল না ফারিহা।
জাহেদ শেখ তার সম্পত্তি ছেলেমেয়েদের অর্ধেক করে দিয়ে গিয়েছেন লিখিতভাবে। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য রেখে গিয়েছেন কিছু ক্যাশ টাকা। লামিয়া ভীষণ অবাক হলেন। সেই সাথে তার মনে হলো ছেলেমেয়েগুলোকে নিজের সন্তান ভাবলে আজ ওনার এমন একা লাগত না। আচ্ছা, এরা কি তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে? কোথায় থাকবেন লামিয়া? তার ভাই নেই, বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের বাড়ি চাচারা দখল করেছে। মা সেখানেই এক কোণে পরে থাকে। চাচারা কি আদৌ তাকে জায়গা দেবে? তাছাড়া বসে খেলে রাজার ভান্ডারও ফুরিয়ে যায়। শেষ বয়সে কি উপায় হবে তার!
ইতোমধ্যে একমাস পার হয়েছে। প্রান্তিক ভ্যাকেশন কাটাতে দেশে এসেছে। আজ শুক্রবার। মেরুন কালার পাঞ্জাবি পড়ে প্রান্তিক আয়নার সামনে দাঁড়াল। হুট করে জীবনটা এতো সুন্দর হয়ে যাবে সে কখনো ভাবেনি। ওর অন্ধকারের জীবন ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে। তবে প্রান্তিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে বাইরে স্যাটেল্ড হবে না। পিএইচডি শেষ করে এখানেই কোনো একটা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করবে। বিদেশ হয়তো সবাইকে টানে না। তাছাড়া বোনকে নিয়ে ওর ভীষণ দুশ্চিন্তা হয়। মেয়েটার এমন একটা কালো অতীত। নতুন কারও সাথে জড়াতে পারছে না মেয়েটা। বোনের কথা ভাবলে ওর বুক ভার হয়ে আসে। তবুও সে সবটা সৃষ্টিকর্তার হাতে ছেড়ে দেয়। একটু পর আদ্রিকা এসে স্বামীর কব্জিতে, কানের লতিতে আতর লাগিয়ে দেয়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
"আপনি এতো সুন্দর কেন বলুন তো?"
প্রান্তিক অগোচরে হাসে। আহামরি চেহারা নয় ওর। হয়তো লম্বাটাই একটু বেশি। অথচ বউ এমনভাবে বলে যেন ওই পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় লামিয়া দোয়া পড়ে প্রান্তিকের মাথায় ফুঁ দিল। বলল,
"সাবধানে যেও, বাবা।"
প্রান্তিক বিরক্তি লুকিয়ে রাখতে পারল না। খানিকটা জোরেই বলল,
"আপনাকে লোক দেখানো স্নেহ দেখাতে হবে না। সমস্যা নেই, আমরা আপনাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিব না। আপনি নিশ্চিন্তে আপনার মতো থাকুন।"
"এভাবে কেন বলছো, বাবা? আমি কি তোমাদের মা না?"
"আপনি আমার বাবার বউ, এইটুকু পরিচয়ে সন্তুষ্ট থাকুন। আমার বোনের গায়ে এখনো আপনার মারের দাগ। আপনাকে আমি মা ডাকব?"
"আমাকে মা ডাকতে হবে না, বাবা। আমাকে ক্ষমা করে দিও। খুব বেশি অসহ্য লাগলে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এসো।"
প্রান্তিক কথা বাড়ালো না। মসজিদে খোতবা শুরু হয়ে গিয়েছে। নামাজ শেষে বাবার কবর জিয়ারত করে বাসায় ফিরবে সে।
নির্বিঘ্নে কেটে গিয়েছে কতগুলো বছর। ফারিহা এখন স্বাবলম্বী। নিজের কষ্টগুলোকে শক্তিতে পরিণত করতে পেরেছে মেয়েটা। ছোটখাটো ওয়েডিং প্ল্যানারের বিজনেস শুরু করেছিল অনেকটা সবার বিরুদ্ধে গিয়েই। পাশে পেয়েছে শুধু বন্ধুর মতো ভাবীকে। ভাইটাও এই কাজে সায় দিতে চায়নি। তবে বছর ঘুরতেই নামডাক হয়ে গেল। বড় বড় মানুষদের বিয়েতে সব দায়িত্ব ওর কাঁধেই পড়তো। ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গিয়েছে। ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটায় ফারিহা। তবে নতুন করে কারও কথা ভাবতে পারে না। রওনক স্যার এখনো বিয়ে করেননি। চাতক পাখির ন্যায় বসে আছে ফারিহার উত্তরের অপেক্ষায়। ফারিহার কষ্ট হয় খুব। মায়া হয়। তবে ভালোবাসা আসে না। সে একজনকেই ভালোবাসতে পেরেছিল, সেটা ফাগুন। হোক না লোকটা লম্পট। তবে ওর অনুভূতিগুলো তো মিথ্যা ছিল না। ইহজন্মে অন্য কাউকে মন দেয়ার কথা ভাবতে পারে না ফারিহা। আর ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমরা যতোই নাক সিঁটকাই, এক সময় শরীরের ব্যাপারটা চলে আসে। শরীর ঘিরেই তো ভালোবাসা বেড়ে উঠে, গাঢ় হয়। ফারিহার মনে হয়, যেই মানুষটাকে সে মন দিতে পারবে না তার দেয়া ছোঁয়া সে কিভাবে সহ্য করবে। তবে এখন আর আফসোস হয় না। পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারবে সে। খারাপ লাগে শুধু ওর না হওয়া বাবুটার কথা ভেবে। নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করার ফলস্বরূপ হয়তো সৃষ্টিকর্তা ওকে এই শাস্তিটা দিল।
প্রান্তিক আহসানউল্লাহ তে জয়েন করেছে। পিএইচডি করা প্রফেসরদের চেহারায় এক ধরনের গাম্ভীর্যতা থাকে। তার চেহারায় সেটা আসছে না। জীবন তাকে অনেক বেশি ফিরিয়ে দিয়েছে। আদ্রিকার মাস্টার্স শেষ হয়েছে। প্রেগ্ন্যাসি নিয়ে খুব কষ্টে পরীক্ষা দিয়েছে মেয়েটা। আগের তুলনায় অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছে। হিমোগ্লোবিন কম শরীরে। মাসে দুটো করে স্যালাইন দিতে হচ্ছে। পেটের আকারও ছোট। কিছুই খেতে পারে না মেয়েটা। প্রান্তিকের ভীষণ কষ্ট হয়। শুধুমাত্র একটা বাচ্চাকে পৃথিবী দেখাতে একজন মাকে কতো কষ্ট করতে হয়। ও যদি একটু সেই কষ্টের ভাগ নিতে পারত! প্রান্তিক এগিয়ে গিয়ে বউয়ের পাশে বসে। আদ্রিকার গা গুলিয়ে উঠে। রুঢ় স্বরে বলে,
"আবার ঐ সাবানটা দিয়ে গোসল করেছেন? প্লিজ আরেকবার গোসল করে আসুন। এই গন্ধ আমি নিতে পারছি না।"
অগত্যা রাতের বেলায় প্রান্তিক আবার গোসল করে। এসেই দেখে আদ্রিকা করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। সে কাছে আসতেই চোখ ভিজে উঠলো মেয়েটার। প্রান্তিক উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"কাঁদো কেন বোকা মেয়ে? "
"বাবু হতে গিয়ে আমি মারা গেলে আপনি আবার বিয়ে করবেন?"
প্রান্তিকের অস্থির লাগে। এই ধরনের কথা ভাবতে ভালো লাগে না ওর। তবুও টেনে জবাব দেয়,
"ধরো, বাবু আসার পর আমি হুট করে মারা গেলাম। তখন তুমি কি করবে?"
"আমি ওকে নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দেব।"
"তুমি যদি আমাদের সন্তান নিয়ে একা বেঁচে থাকতে পারো তবে আমিও পারব।"
আদ্রিকা বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। সময় ঘনিয়ে আসছে ওর। বেশিক্ষণ কথা বলা বা বসে থাকতে পারে না। খুব ক্লান্ত লাগে। প্রান্তিক লাইট নিভিয়ে শুতে আসে। একসময় চোখের পানিতে বালিশ ভিজে উঠে। বউকে নিয়ে চিন্তায় ঘুম আসে না ওর। হাত-পা অসাড় করে পড়ে থাকে। আদ্রিকা লোকটাকে আপাদমস্তক বুঝতে পারে। অসুস্থ শরীরটা টেনে মেয়েটা স্বামীর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বুকে মাথা রাখে।
ফারিহাকে বেশ কিছুদিন ধরেই ফাগুন বিরক্ত করছে একটাবার দেখা করার জন্য। ফারিহা রাজি হয়না। শেষমেশ ফাগুন বাড়িতে চলে আসার হুমকি দেয়। ফারিহা চায় না ওকে নিয়ে ভাইয়ের সাথে ফাগুনের আবার ঝামেলা লাগুক। তাই সে রাজি হয়ে লোকেশন টেক্সট করতে বলে।
একদিন যেই ব্রিজটার উপরে ফাগুন তার ভালোবাসার কথা বলেছিল সেখানেই পুনরায় আবার ফারিহার কাছে ক্ষমা চায় সে। ফারিহা চোখ মেলে তাকায়। অমানুষটা ওকে আর কতো কষ্ট দেবে? সব ভুলে অনেকটাই তো এগিয়েছে সে। তবে কেন তাকে বারবার কষ্টগুলো মনে করাতে হবে? ফারিহা তাচ্ছিল্য হেসে বলে,
"আমি কখনো ভুলতে পারব না আমার স্বামী আমার সাজানো বাসায় অন্য মেয়েকে নিয়ে রাত কাটিয়েছিল।"
ফাগুন অসহায়ের ন্যায় চারপাশে তাকায়। এক পর্যায়ে সে ফারিহার পা আঁকড়ে ধরে। আকুতি করতে থাকে ক্ষমার। পুরুষ মানুষের কান্নার মতো বিভৎস দৃশ্য বোধহয় দ্বিতীয়টি নেই। ফাগুন অনুনয় করে বলে,
"একবার আমায় বিশ্বাস করে দেখো, ঠকালে মৃত্যুদন্ড দিও। আমি মাথা পেতে নেব। আমি তোমায় ভুলতে পারছি না, ফারিহা। আমি মোহে পড়ে নিজের সত্যিকারের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছি। প্লিজ আমাকে বাঁচাও।"
ফারিহা নির্বিকার ভঙ্গিতে পা সরিয়ে আনে। শান্ত কন্ঠে আওড়ায়,
"তারে বলে দিও
আমি বিশ্বাসঘাতককে সুযোগ দেওয়ার দুঃসাহস দেখাই না।"
সমাপ্ত
দীর্ঘদিন অপেক্ষা করানোর পর সমাপ্তি টানলাম। পাঠকরা আমায় ক্ষমা করবেন।

0 মন্তব্যসমূহ