Ad Code

Responsive Advertisement

উন্মাতাল

 

উন্মাতাল




অর্ণিশা আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।”


ভরা মজলিসে এমন কথা শুনে বিষ্ময়ে অভিভূত অঙ্গনা থমকে দাঁড়াল। উপস্থিত সকলে হা করে— গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলানো লোকটাকে দেখছে। এখানকার হাসপাতালে ভালো ডাক্তার খুব একটা নেই। থাকলেও টাকার পেছনে ছুটে গরীব অসহায়দের তাচ্ছিল্য করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাইতো শহর থেকে বড়ো ডাক্তার এসেছে তিনজন৷ ক্যাম্প বসেছে উত্তর পাড়ার মোড়ল বাড়িতে৷ মৃদু স্বরে কথাবার্তার আওয়াজ ভেসে আসছে। যেন এখানে কোনো নাটক বা সিনেমা চলছে৷ তার উপর এটা গ্রাম। এভাবে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়াটা অবশ্যই অনুচিত। সবাই এদিকটায় তাকিয়ে দেখছে আর ফিসফিসিয়ে অনেক কিছুই বলছে৷ সহকারী ডাক্তার ওরফে আবির এবার লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল‚


“রঙ্গন এসব কী বলছিস? সবাই দেখছে৷”


এক দেখায় কী করে এতটা পছন্দ হয়ে যেতে পারে? রঙ্গন উত্তর খুঁজে পায় না। মেয়েটাকে দেখা মাত্রই হৃদয়ে প্রণয়ের পুষ্প স্ফুটিত হয়েছে। উতলা মন ভেসে বেড়াচ্ছে প্রেমতরঙ্গে। মেয়েটা কী সম্মোহন করতে জানে নাকি? এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছে রঙ্গন। এভাবে হুট করে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়াটা নেহাৎই বোকামি। এই ভুলটা তার কল্পনাতীত ছিল। তবে সে তো কথাটা একান্তই নিচু স্বরে অর্ণিশাকে বলেছিল। সবাই শুনে ফেলেছে এতে তারও দোষ নেই। কথাটা পাঁচ কান হতে খুব বেশি সময় লাগবে না৷ আবির ব্যাপারটাকে সামাল দিতে সকলের উদ্দেশ্যে বলল‚


“আপনারা এখন যান। কাল আবার এখানে চেকআপ করা হবে৷”


ভীড় কমতে শুরু করল৷ আবির উঠে গিয়ে দাঁড়াল রঙ্গনের পাশে৷ ধীর কণ্ঠে শুধাল‚ 


“একটু আগে যে কথাটা বললি সেটা কী সজ্ঞানে বলেছিস?”


“হ্যাঁ। উনাকে আমি পছন্দ করি৷ বিয়ে করতে চাই।”


“কিন্তু আমি আপনাকে পছন্দ করি না৷ আর না বিয়ে করব৷ 


রঙ্গন একদৃষ্টে তাকাল অর্ণিশার মুখপানে। মেয়েটা যে তাকে এত সহজে মেনে নেবে না তা সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত সে। এদিকে মেয়ের কথায় থমথমে মুখে তাকালেন অঞ্জু বেগম। উত্তরটা হয়তো উনার পছন্দ হয়নি। এতক্ষণ তো হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো খুশি ছিলেন। চোখ মুখ খুশিতে চিকচিক করছিল উনার৷ ভালো ছেলে কেউই হাত ছাড়া করতে চাইবে না৷ তারওপর ছেলে ডাক্তার। তিনি গদগদ সুরে ফিসফিসিয়ে বললেন‚ 


“কেন করবি না? ছেলে দেখতে শুনতে ভালো। উপরন্তু ছেলে ডাক্তার। তাই বলছি এই নিয়ে সমস্যা বাধাস না। এই নিয়ে পরে কথা হবে।”


অর্ণিশা তার মাকে আরও কিছু বলতে নেবে কিন্তু মেয়েকে মুখ ফুটে কিছু বলার পূর্বেই থামিয়ে দিলেন অঞ্জু বেগম। তিনি আবারও ফিসফিসিয়ে বললেন‚ “চুপ একদম।”


মায়ের উপর চাপা রাগ অনুভূত হলো৷ দ্রুত পা ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল অর্ণিশা। অঞ্জু বেগম মেকি হেসে রঙ্গনকে বললেন‚


“তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা।”


“সমস্যা নেই আন্টি।”


“তোমরা গিয়ে বিশ্রাম নাও। আমি অনলকে দিয়ে নাস্তা পাঠাচ্ছি।”


অঞ্জু বেগম হাতে থাকা ব্যাগগুলো নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন৷ আবির প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো ব্যাগে ভরে নিল৷ মকবুলকে ডেকে টেবিল গুলো গুছিয়ে রাখতে বলল। আবির আর রঙ্গনের পেছন পেছন মিজানও অতিথিশালায় ছুটল।


বিকেলের হিমেল হাওয়া মনকে মোহিত করে তুলছে। সেই মৃদুমন্দ সমীরণে এক দুটো গাছের পাতা ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে। তবে কী পাতা ঝরার মরসুম চলে এসেছে? পড়ার টেবিলে বসে সমানে কলম কামড়াচ্ছে অনল৷ পড়াতে তার মনোযোগ নেই বললেই চলে৷ কীভাবে ফাঁকি দিয়ে খেলা দেখতে যাওয়া যায় সেই ফন্দি আঁটছে৷ কিন্তু সে জানে তার কোনো বুদ্ধিই এখন কাজে দেবে না কারণ সামনে থাকা মানুষটা তো সর্বজ্ঞানী। তাই তো সে পলকেই ধরা পড়ে যায়৷ রঙ্গনদের বিকেলের নাস্তা দিয়েই অঞ্জু বেগম এখানে এসে বসেছেন৷ ছেলে এবার রেজাল্ট খারাপ করেছে তাইতো পড়ার সময় চোখে চোখে রাখছেন৷ 


ঘন্টা খানেক ধরে জানালার গ্রিলে পা রেখে বিছানায় শুয়ে আছে অর্ণিশা। শুধু শুয়ে আছে বললে ভুল হবে সে উপন্যাস পড়ছে। অবসর সময় তার এভাবেই কাটে। বই পড়ার ফাঁকে একটু চা হলে মন্দ হয় না৷ ইচ্ছেও করছে ভীষণ। পশ্চিমাকাশ আরক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। সন্ধ্যার প্রহর নামতে খুব বেশি সময় নেই৷ পাখিরা তাদের নীড়ে যাবার তোড়জোড় শুরু করেছে।


“অর্ণি!”


মায়ের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে৷ এ অবেলায় কেন ডাকছে— কে জানে? বইটা বন্ধ করে বিছানার উপরই রেখে দিল অর্ণিশা৷ ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে৷ অঞ্জু বেগম ট্রেতে করে চা সাজাচ্ছেন৷ পাশে দাঁড়িয়ে অর্ণিশা বলল‚


“ডাকছিলে আম্মা?”


“চা টা দিয়ে আয়৷”


অর্ণিশা বোকাসোকা চাহনিতে তাকিয়ে বলল‚ “কাকে?”


“রঙ্গনকে দিয়ে আসবি।”


“আমি উনাদের ঘরে যেতে পারব না আম্মা।


“তোকে অতিথিশালা যেতে কে বলল?”


“তাহলে?”


“ও এসেছে।”


“উনি কখন এলেন?”


“এসেছে কিছুক্ষণ হবে হয়তো। ছেলেটার নাকি মাথা ব্যথা করছে৷”


“তোমাদের আদিখ্যেতা গেল না। আমি যেতে পারব না। তুমি গিয়ে দিয়ে এসো। নয়তো অনলকে বলো দিয়ে আসতে।”


“বেশি কথা আমার পছন্দ নয়৷ তুই গিয়ে দিয়ে আয়— ছেলেটা হয়তো তোর আব্বার সঙ্গে বসার ঘরে বসেছে।”


মায়ের প্রতি বিরক্ত হলো অর্ণিশা। চায়ের ট্রে নিয়ে চলল বসার ঘরের দিকে৷ সেখানে রঙ্গন শুধু একা নয়। হাশেম মোড়লও সেখানে রয়েছেন৷ আবির আর মিজান ছেলেটাও এসেছে৷ অজানা শঙ্কায় অর্ণিশার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করল৷ কম্পিত হস্তে চায়ের ট্রে টি টেবিলের উপরে রাখল৷ মেয়েকে দেখে ক্ষীণ হাসলেন হাশেম মোড়ল। অর্ণিশা চায়ের কাপ একে একে সবার হাতেই তুলে দিল। অর্ণিশা আড়চোখে একটিবার রঙ্গনকে দেখল৷ দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হতেই হকচকিয়ে গেল সে৷ লোকটা এভাবে তার দিকে কেন তাকায়? তার যে অস্বস্তি হয় এটা কী বোঝে না? 


গভীর আঁধারিয়া কাটিয়ে প্রত্যুষের দীপ্তি ছড়াচ্ছে চারিদিকে। কুয়াশা মিলিয়ে যাচ্ছে রোদ্দুরে। অঞ্জু বেগম ঘরে এসে দেখলেন উনার আদরের মেয়ে পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছে। মেয়েকে কয়েকবার ডেকেও সাড়াশব্দ না পেয়ে তিনি জানালা আর ফ্যান চালু করে দিলেন। খটখট শব্দ তুলে ভনভন করে ঘুরতে শুরু করল। নিমিষেই উষ্ণ ঘরটা শীতল থেকেও শীতল হয়ে উঠল৷ ঘুম অনেকটাই হালকা হয়ে এলো অর্ণিশার। লেপটা আরও ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিল সে। অঞ্জু বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন‚


“অর্ণি তুই উঠবি নাকি আমি তোর আব্বাকে ডাকব?”


বাবার কথা শুনতে পেয়েই লাফ দিয়ে উঠল অর্ণিশা৷ আধবোজা চোখে পিট পিট করল খানিকটা৷ মেয়ের ঘুম ভাঙাতে পেরে অঞ্জু বেগম চলে গেলেন। টিফিন বক্সেও খাবার দিতে হবে৷ অনল সকালেই উঠে পড়েছে। তার স্কুল আরও সকালে৷ অর্ণিশা তাড়াহুড়ো করে তৈরি হয়ে নিল। দেরি হয়ে গেলে নির্ঘাত মায়ের কাছে আবারও বকা শুনতে হবে। টেবিলের উপর থেকে রুটিন অনুযায়ী বই ব্যাগে গুছিয়ে নিল সে। ঘর থেকে বেরিয়ে সদর দরজার কাছে গেল জুতো পড়তে৷ জুতো পড়ার ফাঁকে চেঁচিয়ে বলল‚


“আম্মা আমার দেরি হচ্ছে৷ তুমি কী টিফিন দিবে?”


অঞ্জু বেগম রান্না ঘর থেকেই জবাব দিলেন‚ “এক পা বেরবি না। আমি আসছি।”


অর্ণিশা বসার ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল৷ বারবার হাত ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে৷ আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গিয়েছে অনেকটা৷ অঞ্জু বেগম যেদিন না জাগাবে সেদিনই ঘুম থেকে উঠতে দেরি হবে৷ আজও ঠিক তা-ই হলো। অঞ্জু বেগম টিফিন বক্স হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলেন৷ মেয়ের হাতে টিফিন বক্স ধরিয়ে দিয়ে বললেন‚


“খাবার ঘুরিয়ে নিয়ে এলে তোর একদিন কী আমার একদিন।”


“রেড এলার্ট পেয়ে গেছি আম্মা৷”


হেসে উঠলেন অঞ্জু বেগম। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অর্ণিশা তার মায়ের কাছ থেকে বিদায় দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল৷ অবশ্য বেরোনো পথে একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷ খুব একটা পাত্তা দেয়নি অর্নিশা৷ সময় নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না। ইতিমধ্যেই বিশাল অন্তরিক্ষে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। শীত শীত আবহে রোদের তপ্ততা খুব বেশি নয়। চুলে লম্বা দুটো বিনুনি গাঁথা। গায়ে সাদা জামা আর উপরে সাদা অ্যাপ্রন। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে একাগ্রচিত্তে হাঁটছে অর্ণিশা৷ 


“কী গো মাইয়া— তোমার নাকি বিয়া ঠিক হইছে বড়ো ডাক্তারের লগে?”


প্রতিবেশী মহিলার কথায় কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না অর্ণিশা। এরা তিল থেকে তাল বানিয়ে দিচ্ছে বিষয়টাকে৷ না জানি আর কী কী শুনতে হয়৷ কিছু বলার জন্য উদ্যত হতে গিয়েও থেমে গেল সে৷ কোনো উত্তর না দিয়ে চলে গেল। আচ্ছা কলেজে গিয়েও কী এমন কোন উদ্ভট কথা শুনতে হবে? হাশেম মোড়ল হচ্ছেন গ্রামের চেয়ারম্যান। সেক্ষেত্রে সকলে তো তাকে এক নামেই চেনার কথা। ইতিমধ্যেই হয়তো পুরো গ্রামে রটে গেছে৷ কথায় আছে না‚ ‘যা রটে তার একাংশিক হলেও ঘটে’। ঘটেছেই তো‚ ভরা মজলিসে লোকটা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। অর্ণিশা হাঁটতে হাঁটতে অনেক পথ চলে এসেছে। বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেতে আঁকাবাঁকা আল পেরিয়ে পিচ ঢালা রাস্তায় এসে পৌঁছেছে সে। এবার যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল৷ এতক্ষণ গাঁয়ের চেনা পরিচিত অনেকেই কেমন আড়চোখে দেখছিল৷ বড্ড অস্বস্তিতে ছিল অর্ণিশা। গার্লস স্কুল পেরিয়েই কলেজ। 


বন্ধুদের মাঝে অনেকই একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে৷ ক্লাস এখনো শুরু হয়নি। বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটালে হয়তো মেজাজ কিছুটা ঠিক হবে৷ ব্যাগ ক্লাসে রেখে অর্ণিশা তার বান্ধবীদের মাঝে গেল। তাকে দেখা মাত্রই সকলে চেঁচিয়ে বলল‚


“তা বিয়ে কবে অর্ণি?”


আবারও অস্বস্তিতে পড়তে হলো অর্ণিশাকে। ইতিমধ্যে অনেকের দৃষ্টি তার দিকে আবদ্ধ। অর্ণিশা এদিক সেদিক তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করল‚ বেশি মানুষ নেই তো? কপট রাগ দেখিয়ে মৃদুসরে চেঁচিয়ে বলল‚


“কী শুরু করলি তোরা? একটা দিনও পেরোল না— তোরা ঘটনাটাকে তিল থেকে তাল বানিয়ে ফেলেছিস৷ আমার জাস্ট অসহ্য লাগছে সবকিছু।”


অর্ণিশাকে এভাবে কথা বলতে দেখে অবাক হলো। সকাল থেকে এই একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে অধৈর্য হয়ে পড়েছে সে৷ বাকিরা সবাই চুপ করে গেলেও একজন রাগে ফেটে যাচ্ছিল। বাকিদের মাঝে বসে থাকা সেই মেয়েটা উঠে সামনে দাঁড়াল। অর্ণিশা নিজের ভাবনায় এতটাই মশগুল যে সবকিছুই দিশাহীন লাগছে৷ মেয়েটা কাছে এসে বলল‚


“ঘটনা তো ঘইটাই গ্যাছে। আমগো তেজ দেখাইয়া কী হইব?”


মাইশার কথা তাল দিয়ে রুমি বলল‚ “আমগো মুখ চুপ করাইতে পারলেও গ্রামের সকলের মুখ চুপ করাবি কেমনে?”


আচ্ছা ফাঁসা ফেঁসেছে অর্ণিশা। অনেকটা সময় চুপ করে রইল। কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছে করল না। তার মনে জমে থাকা সকল নালিশ গিয়ে পড়ছে রঙ্গনের উপর। সব দোষ এই লোকের। কেন এমন একটা কথা এতগুলো মানুষের সামনে বলতে গেল! সে এমন কিছু না বললে সবটা স্বাভাবিকই থাকত। অর্ণিশা সকলের কাছে স্যরি বলে ক্লাসে চলে গেল। তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থেকে ভেংচি কাটল মাইশা।


কলেজ থেকে যাওয়ার পথে একজনকে দেখে থমকে দাঁড়াল অর্ণিশা৷ লোকটাকে দেখলেই অন্যরকম কিছু অনুভূত হয়৷ আচ্ছা সে প্রেমে পড়ছে না তো? তার যে প্রেমে পড়া বারণ। বিয়ের পর বরের প্রেমে পড়বে বলে মনঃস্থির করেছিল সে৷ তবে তার বিয়ের তো এখনো অনেক বছর বাকি। তার আগে সমস্ত অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে হবে৷ তবুও অর্ণিশা বেহায়া চোরাচাহনিতে রঙ্গনকে দেখল। লোকটার মুখ থেকে যেন হাসি সরেই না। হাসলে ডান গালে আবছা টোল দৃষ্টিগোচর হয়। মেদহীন বলিষ্ঠ দীর্ঘ দেহ। গুটি কয়েক দাড়ি উঁকি দিচ্ছে শ্যাম কপোল জুড়ে। নিঃসন্দেহে লোকটি একজন সুপুরুষ। যে কেউই প্রেমিক পুরুষ হিসেবে চাইবে। রঙ্গনকে অপছন্দ হয়েছে এমনটাও না। কিন্তু তার যে বিয়ে নামক সম্পর্কে খুব এলার্জি। এরও একটা বড়ো সড়ো কারণ আছে। তাই তো বিয়ে নামক বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না। নিজের ভাবনার মাঝেই অর্ণিশা বুঝতে পারল রঙ্গন তাকেই দেখছে৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ় রমণী আমতা আমতা করে বলল‚


“প্লিজ আপনি এভাবে তাকাবেন না। আমার অস্বস্তি হয়।”


ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা প্রসারিত করে বলল‚ “কিন্তু আমি যে অন্যকিছুর আভাস পাই।”


অর্ণিশা ভ্রুকুঞ্চিত করে বলল‚ “মানে?”


“প্রেমে পড়েননি তো? যত যা-ই বলুন— প্রতিনিয়ত আমি আপনার প্রেমের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি।”


“এটা কী প্রেমের বয়স?”


“প্রেমের কোনো বয়স হয়?”


“হয় না বুঝি?”


রঙ্গন দুপাশে মাথা ঝাকিয়ে বলল‚ “উঁহু।”


চলবে?.....


#উন্মাতাল |১|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা

#উন্মাতাল |২|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


❝ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে‚ আমারে কার কথা সে যায় শুনিয়ে❞


নিজের কাজে বিভোর অর্ণিশা গুনগুন করে যাচ্ছে। আজ রোদের তপ্ততা প্রখর। আলমারি থেকে সবগুলো শাড়ি বের করেছেন অঞ্জু বেগম। হুট করেই আজ ইচ্ছে হলো শাড়িগুলো রোদে দেবেন। অর্ণিশাকে সেই কখন বলেছিলেন উঠোন থেকে শাড়িগুলো নিয়ে আসতে। কিন্তু এই মেয়ে ঘরে খিল দিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিনুনি গাঁথছে আর সমানে গুনগুন করছে। ভ্রমর কী আদতেও কারো কথা শোনাতে আসবে? ঘরের বাহির থেকে অঞ্জু বেগমের বাজখাঁই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। তিনি বলছেন‚


“আজ যদি তুই দরজা না খুলিস তাহলে তোর একদিন কী আমার একদিন।”


অর্ণিশা চটজলদি উঠে দাঁড়াল৷ কণ্ঠস্বর শুনে মনে হলো তার মা আজ বেশ ক্ষেপেছেন৷ মায়ের রাগ একবার মাথায় উঠে গেলে আর রক্ষে থাকে না৷ গুষ্টি শুদ্ধো উদ্ধার করে ফেলবেন৷ অর্ণিশা দরজার কাছটায় দাঁড়িয়ে বলল‚


“এতক্ষণে শাড়িগুলো তুমি ফুল খালাকে দিয়েও আনাতে পারতে আম্মা।”


“ফুলবানু তারকারি কুটছে। তোকে যেটা বলছি সেটা কর।”


অর্ণিশা খানিকটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বলল‚ “যাচ্ছি।”


দরজা খুলে বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘরে থেকে বেরিয়ে গেল সে। লম্বা বিনুনি হাঁটার সঙ্গে কোমড়ের নিচ অবধি দুলে উঠছে। অঞ্জু বেগম গিয়ে রান্নার কাজে মনোনিবেশ করলেন৷ এখন তাড়াহুড়ো না করলে রান্নাতে দেরি হয়ে যাবে। এরপর শুরু হবে হাশেম মোড়লের চেঁচামেচি। তার চেয়ে বরং আগ থাকতে কাজ এগিয়ে রাখা ভালো। 


“ফুল ছাড়া লম্বা বিনুনি শোভা পায় না।”


চেনা কণ্ঠস্বর শ্রবণ হলেও সেদিকটায় তাকাল না অর্ণিশা৷ নিজের মতো করে রশিতে ঝুলিয়ে রাখা শাড়িগুলো হাতে নিতে শুরু করল৷ গুনে গুনে পঁচিশটা শাড়ি হয়েছে৷ একপ্রকার হাঁপিয়ে উঠেছে৷ শাড়ির পাহাড়ে তাকে তো ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না৷ ঠিক করে হাঁটতেও পারছে না বেচারি৷ দেখে না চললে পড়ে যাবে এমন একটা অবস্থা। আড়াল থেকে একবার রঙ্গনকে দেখে নিল। লোকটা এখনো একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকটার কী কাজ টাজ নেই নাকি? ভেবে পায় না অর্ণিশা৷ আবারও সেই পুরুষালি গম্ভীর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে৷ 


“আমি হেল্প করি?”


“আপনার কী আর কোনো কাজ নেই? যখনই দেখি এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি।”


“আপনি বুঝি আমাকে দেখনও?”


হকচকিয়ে গেল অর্ণিশা৷ রঙ্গন আবারও বলল‚ “কাজ তো অনেক আছে৷”


“তাহলে নিজের কাজ করুন।”


“সেটাই তো করছি।”


রঙ্গনের আবছা কথা বোধগম্য হলো না অর্ণিশার। ভ্রুযুগল কুঁচকে এলো৷ কোনো কিছু না বলেই চলে যেতে নিল। রঙ্গন ক্ষিপ্র গতিতে সামনে এসে পথরোধ করে দাঁড়াল। হঠাৎ করে এমন হওয়ায় অর্ণিশা ধাক্কা খেল বটে। হাত থেকে কিছু শাড়ি পড়ে যেতে নিলে রঙ্গন সাহায্য করল৷ কোনো কথা বাড়াল না অর্ণিশা৷ রঙ্গনের হাতে থাকা গুটি কয়েক শাড়ি না নিয়েই বাড়ির ভেতরে চলে গেল৷ তার পেছন পেছন রঙ্গনও গেল। তাকে দেখা মাত্রই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অঞ্জু বেগম। এদিকে বিছানার উপর বসে হাফ ছেড়ে বাঁচল অর্ণিশা। এবার একটু আরাম করা যাবে। অনেকটা সময় রোদে রাখার কারণে শাড়ি থেকে তাপ উঠে আসছে। অর্ণিশা শুয়ে সেগুলো জাপ্টে ধরল। আরাম লাগছে— ঘুম চলে আসছে। বাহির রোদে থেকে এসেই ঈষৎ ঠান্ডা লাগতে শুরু করল। গোসল করেছে অনেক সময় আগে৷ জোহরের নামাজ আদায় করেই আয়নার সামনে বসেছিল। সর্দি লেগেছিল বিধায় আজ চুল ভেজানো হয়নি। ঘন কৃষ্ণগুচ্ছ একবার সিক্ত হলে সহজে শুকাতে চায় না৷ অর্ণিশার আঁখিদ্বয় স্থির হলো মেরুন রঙা বেনারসিতে৷ এই শাড়িটা তার মায়ের বিয়ের শাড়ি৷ অঞ্জু বেগম এত বছর ধরে খুব যত্নে আগলে রেখেছেন শাড়িটাকে৷ এক সুন্দর মুহুর্তের সাক্ষী এই শাড়ি৷ 


প্রত্যেকটা শাড়ি আলতোভাবে হাতড়ে যাচ্ছে অর্ণিশা। সবগুলো তার মায়ের শাড়ি। এ অবধি কখনো শাড়ি পড়া হয়নি অর্ণিশার। শাড়ি জিনিসটা তার কাছে একপ্রকার ভেজালেরই মনে হয়৷ কখনো সাধ করে পড়তেও চায়নি। কিছুক্ষণের মাঝেই অঞ্জু বেগম ঘরে এলেন। অর্ণিশা শাড়ি গুলো উঠোন থেকে এনেছে ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে৷ এখনো যেমন তেমন অবস্থাতেই বিছানায় পড়ে আছে। বিরক্ত হলেন অঞ্জু বেগম। তবে তা প্রকাশ করলেন না। অর্ণিশা মেরুন রঙা বেনারসিটা নিজের হাতে নিয়ে বলল‚


“আম্মা তোমার এই শাড়িটা খুব সুন্দর।”


“এই শাড়িটা তোর আব্বা নিজে পছন্দ করে আমার জন্য কিনেছিলেন। বিয়েতে আমি এই শাড়িটা পড়েছিলাম।”


“তোমাকে তো তাহলে খুব সুন্দর মানিয়েছিল— তাইনা?”


অঞ্জু বেগম সলজ্জে হেসে বললেন‚ “তোর আব্বা তো হা করে চেয়ে ছিল।”


“আম্মা আমার তো তোমাদের প্রেমোপন্যাস জানার আগ্রহ তড়তড় করে বাড়ছে৷”


“পড়ে শুনিস৷ এখন উঠে দাঁড়া তো।”


অঞ্জু বেগম মেয়ে দাঁড় করালেন। মেরুন রঙা বেনারসিটা অর্ণিশার গায়ে জড়ালেন। এরপর একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন কিয়ৎক্ষণ৷ বিশ বছর আগের নিজেকে অর্ণিশার মাঝে দেখতে পেলেন। চোখ টলমল করে উঠল অঞ্জু বেগমের। মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে বললেন‚


“মাশা আল্লাহ! খুব সুন্দর লাগছে আমার মেয়েকে।”


মায়ের কথায় অর্ণিশা খানিকটা লজ্জা পেল৷ আচ্ছা বউ সাজলে কী তাকেও অদ্ভুত সুন্দর লাগবে? জানতে হলেও তো বউ সাজা প্রয়োজন। নিজের ভাবনাতে নিজেই বিরক্ত হলো অর্ণিশা৷ অঞ্জু বেগম শাড়ি ভাজ করায় মনোযোগী হলেন। অর্ণিশাও সাহায্য করতে লাগল হাতে হাতে৷ এরই মাঝে অনল এসে উপস্থিত হলো তার মায়ের ঘরে। এসেই ডাকতে শুরু করল অর্ণিশাকে।


“আপা একটু চল আমার সঙ্গে।”


“দেখছিস তো কাজ করছি৷ এখন কোথাও যেতে পারব না।”


“আম্মা তুমি একটু আপাকে বল আমার সঙ্গে যেতে।”


কাজের মধ্যে ডাকলে বিরক্তবোধ করেন অঞ্জু বেগম। আজও তার অন্যথা হলো না। বাজখাঁই স্বরে শুধালেন‚


“কী এমন রাজ্যের কাজ জমিয়েছিস যে— অর্ণিকে ছাড়া হচ্ছে না?”


অনলের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল৷ আমতা আমতা করতে শুরু করল। অঞ্জু বেগম মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বললেন‚


“এই অকর্মণ্য কীসের জন্য ডাকছে গিয়ে দেখে আয়!”


অর্ণিশা প্রত্যুত্তর করল না তবে চোখ গরম করে তাকাল অনলের দিকে। ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে ওদের দিকেই তাকিয়ে৷ আবার মেকি হাসছে বৈকি। বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘর থেকে বের হলো অর্ণিশা। তার পিছু পিছু অনলও ছুটল।


বিছানায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন হাশেম মোড়ল। একাগ্রচিত্তে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছেন বেশ অনেকটা সময় ধরে। দুপুরে নামাজ পড়ে যখন মসজিদ থেকে বের হচ্ছিলেন তখনই গ্রামের কয়েকজন এসে দাঁড়াল উনার সামনে৷ বিগত দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা যে অনেকেই জেনে গেছে সেই সম্পর্কে অবগত হাশেম মোড়ন। সেই সাথে ছেলেটাকে আবার নিজ গৃহে থাকতে দিয়েছেন। বদনাম হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। 


“কী এত ভাবছ অর্ণির আব্বা?”


“বুঝলে অর্ণির আম্মা‚ ইতিমধ্যেই গ্রামের অনেকেই জেনে গেছে মেয়ের বিয়ে ঠিক হবার কথা। অথচ এখানে বিয়ের নামগন্ধও নেই।”


“গ্রামবাসী তো তিল থেকে তাল বানাতে ওস্তাদ। তবে তুমি যাই-ই বল— রঙ্গন ছেলেটাকে আমার ভারী পছন্দ হয়েছে৷ আজ কালকার সময়ে এরকম ভদ্র ছেলে পাওয়া দুষ্কর।”


“যার তার হাতে তো আমার মেয়েকে তুলে দিতে পারি না। আমি লোক লাগিয়েছি। কালকের মাঝেই সমস্ত খোঁজ খবর পেয়ে যাব।”


“তুমি যা ভালো মনে করো। ছেলে বড়ো ডাক্তার।”


“আমি ভাবছি অন্য কথা।”


অঞ্জু বেগম গিয়ে উনার স্বামীর পাশে বসে বললেন‚ “কী কথা গো?”


“আমি তো মেয়ের বাবা৷ আমাকে অনেক কিছু চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে৷ মেয়ের সুখটাই আমার কাছে বেশি প্রাধান্য পাবে। রঙ্গনকে যে আমার অপছন্দ এমনটা নয়। ছেলেটাকে আমিও পছন্দ করি। তবে...!”


“তবে কী?”


“বিয়ে কথা বাড়ানোর পর যদি থেমে যায় তাহলে তো আমাদের মেয়ের বদনাম। লোকে ভাববে মেয়ের কোনো ত্রুটি আছে।”


“এমন কথা তুমি কবে থেকে মানতে শুরু করলে?”


“মেয়ের বাবাদের অপারগতা বিশাল। তারা সন্তানের ভালোর জন্য সবকিছু করতে পারলেও সমাজের মুখ বন্ধ করতে পারে না।”


অঞ্জু বেগম এক ধ্যানে স্বামীর মুখশ্রী পানে চেয়ে রইলেন। হাশেম মোড়ল কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও বললেন‚


“আমাকে একটু সদরের দিকে যেতে হবে।”


“কেন— আর এই অবেলায় কোথায় বা যাবে তুমি?”


“একটা কাজ আছে।”


কথাটা বলেই সাদা পাঞ্জাবি আর টুপিটা পকেটে পুরে নিলেন হাশেম মোড়ল। আয়নায় একবার তাকিয়ে ‘আসছি’ বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অঞ্জু বেগম বিছানা ঝাড় দিয়ে নিজেও ঘর থেকে বের হলেন৷ হাতের কিছু কাজ এগিয়ে রাখা প্রয়োজন। 


মাত্রই এশারের নামাজ পড়ে বাড়িতে ফিরছেন হাশেম মোড়ল। সেই যে বিকেলের দিকে সদরে যাবেন বলে বেরিয়েছিলেন সবে ফিরলেন তিনি। উনাকে দেখা মাত্রই রঙ্গন ধীর পায়ে এগিয়ে সামনে দাঁড়াল৷ ক্ষীণ স্বরে সালাম জানাল সে। হাশেম মোড়ল সালামের জবাব দিলেন৷ ভালো মন্দ জিজ্ঞেসও করলেন। রঙ্গনের চোখের ভাষা এবং কিছু বলতে চাওয়ার আকুলতা বুঝতে পারলেন। তবুও প্রকাশ্য করলেন না৷ ছেলেটা নিজ থেকেই বলুক। ইতস্ততবোধ আর অজানা শঙ্কা নিয়েই রঙ্গন বলল‚


“আঙ্কেল আপনি যদি পারমিশন দেন তাহলে আমি আমার মাকে নিয়ে আসব।”


হাশেম মোড়ল স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললেন‚ “এ তো ভারী উত্তম কথা৷ তুমি নিয়ে এসো তোমার মাকে।”


মনে মনে হাফ ছেড়ে বাঁচল রঙ্গন৷ সেই সাথে বড্ড খুশিও হলো। চোখমুখ চিকচিক করছে। যেন অতি কাঙ্ক্ষিত কিছু পেয়েছে৷ আবছা আলোয় গভীর ভাবে পরখ করছেন হাশেম মোড়ল। অনেকেই বলে‚ উনার নাকি জহুরির চোখ— মানুষ চিনতে ভুল করেন না। 


“আঙ্কেল আমার আরেকটা কথা ছিল।”


হাশেম মোড়ল গম্ভীর স্বরে বললেন‚ “হ্যাঁ বল!”


মনের মাঝে থাকা কথাগুলোকে সাজিয়ে রঙ্গন বলল‚ “আমাকে নিয়ে বাবার খুব স্বপ্ন ছিল। আমি মস্ত বড়ো ডাক্তার হব। অনেক নাম হবে আমার। গরীব অসহায় মানুষদের সেবা করব।”


এই বলে থামল রঙ্গন। কণ্ঠনালিতে হরতাল নেমেছে৷ বলার মাঝেও কথাগুলো থেমে থেমে আসছে। হাশেম মোড়ল পরবর্তী কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে চেয়ে আছেন৷ নিজেকে ধাতস্থ করে রঙ্গন আবারও বলল‚ 


“আজ আমি ডাক্তার৷ গরীব অসহায় মানুষদের সেবা করার চেষ্টা করি অথচ আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা সেই বাবাটাই নেই। এখন দুনিয়া বলতে শুধুই আমার মা। নিজের জন্য অর্ধাঙ্গিনী আর মায়ের জন্য একজন বন্ধু হিসেবে আপনার মেয়েকে চাইছি।”


হাশেম মোড়ল রঙ্গনের চোখে চোখ রাখলেন। ছেলেটার চোখের পানি টলমল করছে। যেন যেকোনো মুহূর্তে কান্না করে দেবে। মায়া হলো হাশেম মোড়লের৷ কিছু একটা মনে করে রঙ্গনকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। আজ বহুদিন পর শ্রদ্ধা আর ভরসা হাত খুঁজে পেল রঙ্গন। হাশেম মোড়ল এবার রঙ্গনের বাহুতে আলতো হাত রেখে বললেন‚


“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি৷ তোমার হাতে আমার অমূল্য রত্ন তুলে দিতে কোনো আপত্তি নেই।”


এই বলে আর এক মুহূর্তে দাঁড়ালেন না৷ দ্রুত পায়ে প্রস্থান নিলেন। মিজান বারান্দা দাঁড়িয়ে মোবাইল এদিকসেদিক নিয়ে যাচ্ছে৷ বোধহয় নেটওয়ার্ক প্রবলেম করছে৷ উলের ট্রাউজার‚ গায়ে মোটা সোয়েটার‚ মাথায় উলের টুপি আর গলায় মাফলার জড়িয়ে একটা গোলুমোলু শিশু পাণ্ডা সেজেছে মিজান। দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দেখল রঙ্গন। সে এগিয়ে গেল অতিথিশালার দিকে৷ ভ্রুযুগল কুঁচকে মিজানকে শুধাল‚


“এভাবে প্যাকেট হয়ে আছিস কেন?”


“অ্যাই রঙ্গন তোর কী শীত টিত করে না রে?”


“যতটা তুই দেখাচ্ছিস ততটা শীত এখানে নেই৷ তবে শরীর শীতল করার মতো সমীরণ অবশ্যই রয়েছে৷”


“আচ্ছা দোস্ত আমাকে একটা কথা বল তো— কী চলছে তোর মাঝে? বিয়ের ফুল কী ফুটেছে?”


“তোর কী মনে হচ্ছে?”


“আমার মনে হওয়া দিয়ে কিছুই যায় আসে না৷ তুই বল! আমি তোর মুখ থেকে শুনতে চাই।”


এতক্ষণে আবিরও এসে পৌঁছেছে৷ “মিজানের সঙ্গে আমিও এক মত৷ কী চলছে তোর মাথায়? মেয়েটাকে কী সত্যিই পছন্দ হয়েছে তোর?”


ফোনটা পকেটে রেখে মিজান বলল‚ “তুই মজা করছিস তাই না?”


“বিয়ে নামক সিরিয়াস ইস্যু নিয়ে মজা করব— এই চিনলি আমাকে?”


“তার মানে তুই সিরিয়াস! শুনেও খুশি হলাম। আন্টিকে জানিয়েছিস?”


“না রে। আমি তো ভাবছি— সবটা শুনে মায়ের রিয়েকশন কেমন হবে!”


“আমার তো মনে হয়‚ তোর মুখে বিয়ের কথা শুনে আন্টি খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠবেন।”


আবিরের বলা কথা শুনে মিজান বলল‚ “যাক একটা বিয়ে অন্তত খেতে পারব। আর কতদিনই বা সিঙ্গেল তকমা নিয়ে ঘুরবি!”


“আমি তো তোর ভাবিকে সকালেই জানিয়ে দিয়েছি৷”


আবিরের কথায় মাথায় হাত পড়ল রঙ্গনের। এই ছেলে তো তার থেকে এক কাঠি উপরে। মাকে কথাটা এখনো জানাতে পারল না অথচ এই ছেলে জনে জনে বলে বেড়াচ্ছে।


“ব্রো কিছু মনে করিস না।”


মিজানের ক#উন্মাতাল |৩|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


অতিথিশালার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দার কাছে দাঁড়িয়েছে রঙ্গন। এই শীতের মাঝেও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি রুমঝুম ধ্বনি তুলছে৷ সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। শীত শীত আবহে অপ্রত্যাশিত মেঘ শীত যেন তড়তড় করে বাড়িয়ে তুলছে৷ মাত্রই ভরপেট খেয়েছে রঙ্গন৷ খাওয়ার পর একটু আধটু ঘুম পাচ্ছে বৈকি। তবে এখন ঘুমানো যাবে না। রঙ্গন খেয়াল করল— ছাতা হাতে নিয়ে অর্ণিশা বাড়ি ফিরছে। কোথাও কী গিয়েছিল? আজ তো শুক্রবার। কলেজও নেই। তাহলে কোথায় গিয়েছিল? রঙ্গন সেদিকেই চেয়ে রইল। যতক্ষণ না অর্ণিশা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। এরই মাঝে মুঠোফোন ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল “মা” লেখাটা৷ অধর প্রসারিত হলো রঙ্গনের৷ তাড়াতাড়ি করে কল ব্যাক করল৷ ওপাশ থেকে মায়ের মধুর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।


“কেমন আছিস বাবা?”


“আমি তো সবসময়ই ফিট এন্ড ফাইন। তুমি কেমন আছ মা?”


“আমিও ভালো আছি৷ তুই কবে আসছিস?”


“দিন দুয়েকের মাঝেই। মা তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”


“কোনো মেয়েকে পছন্দ হয়েছে?”


রঙ্গন খানিকটা লজ্জা পেল। হসপিটালে জয়েন করার পর থেকেই তার মায়ের সেই এক কথা— পুত্রবধূ চাই৷ কিন্তু এখনো পছন্দসই কাউকে দৃষ্টিতে পড়েনি। তাইতো এখনো মনের মানুষকে পায়নি। রঙ্গন এবার হয়তো পেয়েছে। বেশি সময় না নিয়ে আমতা আমতা করে বলল‚


“আসলে মা..!”


“মেয়েটা কে? কোথায় থাকে? দেখতে কেমন? তাড়াতাড়ি বল‚ আমার আর তড় সইছে না।”


“তুমি আমার মা নাকি বন্ধু?”


“আমি তোর মা আর বন্ধু দুটোই। ছেলে মেয়ে বড়ো হলে বাবা মাকে বন্ধু হতে হয়।”


রঙ্গন তার মায়ের কথায় ক্ষীণ হাসল। মনোয়ারা বেগম আবারও বললেন‚


“এবার তো বল মেয়েটা কে?”


“তার আগে বল— তুমি বুঝলে কী করে?”


“এমনিতেই ধারণা করলাম আরকি।”


“অর্ণিশাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে মা। এটা ভালোবাসা কি-না জানি না। তবে প্রথম দেখায় আমি ওর মোহে পড়েছি। ওকে আমার চাই মা— ভীষণ করে চাই।”


ছেলের কথায় আলতো হাসলেন মনোয়ারা বেগম। যাক ছেলের সুমতি হয়েছে। কাউকে তো মনে ধরেছে! এবার অন্তত ঘরে পুত্রবধূ আসবে। খুশি হলেন তিনি। ছেলেকে শুধালেন‚


“মেয়ের বাড়ি কোথায়?”


“আমরা ক্যাম্পিং এর জন্য যে বাড়িতে থাকছি— সেই বাড়ির মেয়ে।”


“আমাকে কবে আসতে হবে?”


“তুমি আমার এককথায় রাজি হয়ে গেলে?”


“আমার ছেলের উপর আমার শতভাগ আস্থা আছে।”


“লাভ ইউ মা।”


“এবার তো বল— আমাকে কবে আসতে হবে?”


“আমি মিজানকে ঢাকা পাঠিয়েছি।”


মনোয়ারা বেগম সশব্দে হেসে উঠলেন। ফোনের ওপাশ থেকে হাসির শব্দ পেয়ে বোকা বনে গেল রঙ্গন। মনোয়ারা বেগম ছেলেকে বললেন‚ “বাপ রে এত তাড়া!”


“এতদিন তো তুমি তাড়া দিতে! আজ আমি তাড়া দিলেই দোষ?”


“মায়ের সাথে দুষ্টুমি হচ্ছে? সামনে পেলে কান মলে দিতাম।”


আরও কিছু সময় কথা বলে রেখে দিল রঙ্গন৷ সবাইকে মানাতে পারলেও আসল মানুষটাকে মানাতে পারবে কি-না জানা নেই৷ রঙ্গন সবসময় স্রেট ফরওয়ার্ড। মুখের উপর কথা বলায় কখনো পিছুপা হয় না সে। তার উপর কিছুটা ত্যাড়াও বটে৷ যা তার চাই সেটা চাই-ই। কিন্তু এটা তো পুরো জীবনের বিষয়৷ এই নিয়ে কোনো ছেলেমানুষী নয়৷ আল্লাহ ভাগ্যে রাখলে হতেই হবে। 


স্যাঁতসেঁতে মাটিতে সববয়সী একসঙ্গে গোল্লাছুট খেলে যাচ্ছে। এখন সময়টা বিকেল৷ দুপুরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তখনই থেমে গিয়েছিল। এরপর বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষ জুড়ে এক চিলতে রোদ উঁকি দিয়েছিল মুচকি হেসে৷ সেই রোদের তপ্ততা ছিল খানিকটা। সিক্ত ভূমি টানটান রূপ ধারণ করেছে৷ আবির আর রঙ্গন হাঁটতে বের হয়েছে। হঠাৎই দেখতে পেল খেলা নিয়ে হইহট্টগোল লেগেছে মাঠে৷ সেখানে অনলও রয়েছে। ওদের টিমের সঙ্গে বিপরীত টিমের কথা কা’টাকাটি হচ্ছে। রঙ্গনকে দেখতে পেয়ে অনল জিজ্ঞেস করল‚


“আপনি এখানে?”


“তোমাদের সঙ্গে খেলতে এলাম।”


আবির এগিয়ে এসে বলল‚ “এখানে কী হচ্ছে?”


কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে রঙ্গন বলল‚ “এই সামান্য খেলা নিয়ে বন্ধুদের মাঝে কেউ ঝামেলা করে?”


“ওরাই ঝামেলা শুরু করেছে। আমাদের কোনো কথাই শুনছে না।”


রঙ্গন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল‚ “আমাদের দুজনকে খেলতে নেবে তোমাদের সঙ্গে?”


“আপনি পারবেন ভাইয়া?”


“তোমার কী মনে হয়— আমি শুধু ডাক্তারিটাই পারি?”


“তেমন কিছুই না৷”


“তাহলে শুরু করা যাক?”


আবির আমতা আমতা করে বলল‚ “এ ভাই তুই আমাকে ছাড়৷ আমি এসব খেলতে টেলতে পারি না৷ একবার ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আমার সানডে মানডে ক্লোজ হয়ে যাচ্ছিল৷ এখনো ভাবলে গা শিউরে ওঠে।”


“তুই খেলবি এটাই ফাইনাল৷”


“গোল্লাছুট খেলতে গিয়ে আমার ভবিষ্যৎ যদি ক্ষতি হয় তাহলে তোর নামে মা’মলা করব।”


“তোর ফালতু কথা বাদ দে।”


কোচিং থেকে ফিরছে অর্ণিশা৷ বাকি সব বিষয় স্যার বাড়িতে এসে পড়িয়ে গেলেও আইসিটি গিয়ে পড়তে হয়৷ কলেজের বিপরীত পাড়ে পাভেল স্যারের কোচিং সেন্টার। নীরদ অম্বর এখন পরিষ্কার। সাদা আবগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে দৈবাৎ সমীরণের তালে। দুপুরে একটু বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। এরপর বাড়ি ফিরে খাবার খেয়ে আবারও বের হয়েছিল কোচিং এর উদ্দেশ্যে। পড়া দীঘির পাশের মাঠ থেকে হৈহল্লার আওয়াজ ভেসে আসছে। বাড়ি ফিরতে হলে ঐ রাস্তা দিয়েই ফিরতে হবে। অর্ণিশা সেদিকে তোয়াক্কা না করে এগিয়ে গেল। ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করল। দূর হতেই অনলের কণ্ঠস্বর আবছা শুনতে পেল অর্ণিশা। মুখ তুলে তাকাল মাঠের দিকে৷ অনেক ছেলেপুলের ভীড় জমেছে। অনলের সমবয়সী সব বন্ধুরা খেলছে। বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে বসে রয়েছে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েরা৷ এরা মূলত খেলা দেখছে। অর্ণিশা দেখতে পেল— আবির আর রঙ্গনও এইটুকুন ছেলেপুলেদের সঙ্গে খেলছে৷ হাসি পেল অর্ণিশার। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেই দেখতে লাগল। 


রঙ্গনের পেছন পেছন কয়েকজন ছেলে আর আবির ছুটছে৷ হঠাৎই দৃষ্টি আটকে গেল অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর দিকে। সেই প্রণয়ীও কী তাকে দেখছে? খেলাতে আর মনোনিবেশ করতে পারল না রঙ্গন। ওমনি খেলা থেকে আউট হয়ে গেল সে৷ আর জিতে গেল বিপরীত পক্ষ৷ অনল এগিয়ে এসে বলল‚


“এটা কী করলেন ভাইয়া? আপনার জন্য তো আমরা হেরে গেলাম।”


“অ্যাই রঙ্গন তুই এটা কী করলি? ওদিকে কী দেখছিস তুই?”


ভাবনার ঘোর কাটল রঙ্গনের৷ এলোমেলো কণ্ঠস্বরে বলল‚ “এই না না— কিছু দেখছি না তো!”


আবির তারপরও এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল৷ আশানুরূপ কাউকে দেখতে পেল না সে৷ রঙ্গনের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হওয়ার সাথে সাথেই সেখান থেকে চলে গিয়েছিল অর্ণিশা। অনল আর রঙ্গনও সেদিকটা তাকাল। তারাও কাউকে দেখতে পেল না। 


মেদিনীর বুকে সাঁঝক প্রহর নামছে একটু একটু করে৷ নানান প্রজাতির পাখিরা তাদের ডানা দুটো ঝাপ্টে উড়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ অন্তরিক্ষ জুড়ে। নীড়ে ফেরার তাড়া বুঝি খুব? অর্ণিশা তার ঘরের জানালার দুয়ার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বাহিরের দিকটায় চেয়ে আছে৷ দেখে বোঝা যাচ্ছে কারো ফেরার অপেক্ষায় আছে সে। আচ্ছা পাখিরা তো তাদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে৷ তাহলে তার কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা কেন মিলছে না? আদতে কী আসবে সেই মানুষটা? অবশ্যই! সে যে আসবেই। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর যে শেষ হয় না। আর অর্ণিশাও সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না৷ হঠাৎ করেই ঘরের ভেতর অঞ্জু বেগমের আগমনে হকচকিয়ে গেল সে৷ আমতা আমতা করতে শুরু করল। এই অবেলায় জানালা খোলা রাখার জন্য মায়ের কাছে একটা ঝাড়ি খেল বৈকি! কিংকর্তব্যবিমূঢ় অঙ্গনা ক্ষিপ্র হস্তে জানালা আটকে দিল। এরই মাঝে গেইট পেড়িয়ে উঠোনের কাছটায় এলো রঙ্গন‚ আবির এবং অনল। তবে অপেক্ষাকারী চাতক পাখির দেখা আর মিলল না৷ সে যে জানালার দুয়ার আটকে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই হয়তো মাগরিবের আযান পড়বে।


“অর্ণি একটু দেখে যা তো মা।”


মায়ের ডাকে সাড়া দিয়ে‚ একাডেমিক বই টেবিলের উপর রেখেই অর্ণিশা রান্নাঘরের দিকে ছুটল। কীসের জন্য ডাকছেন সেটাও তো জানা প্রয়োজন! খুব বেশি দরকার না পড়লে তো তার মা ডাকেন না৷ সবটা একা হাতেই সামলান তিনি। এখনো ঠিক সেটাই করার চেষ্টা করছেন। চুলায় তরকারি বসিয়েছেন। বাড়িতে বাড়তি মানুষ থাকায় তিন বেলায় রান্না করতে হয় উনাকে। এমনিতে রান্নার ক্ষেত্রে কাটাকুটি কাজ ফুলবানুই করে দেন। এঁটো প্লেট ধুয়ে রাখা আরও কিছু কাজ ফুলবানু নিজেই করে রাখে৷ তবে আজ সে কাজে আসেনি। তার ছোটো ছেলেটা নাকি অসুস্থ। দুপুরে এসে টাকা নিয়ে গিয়েছে ঔষধ আনবে বলে। এদিকে রান্নাঘরের ভেতরে প্রবেশ করেই অর্ণিশা বলল‚


“আমাকে ডাকছিলে আম্মা?”


“আমাকে একটু সাহায্য কর। ফুলবানু আজ আসেনি৷ তোর আব্বা একটু পরেই হয়তো নামায পড়ে চলে আসবেন৷ রান্না এখনো হয়নি৷ আবার ওদেরও তো খাবার দিতে হবে৷”


উলের সোয়েটারের হাতা কনুই পর্যন্ত তুলে অর্ণিশা জিজ্ঞেস করল‚ “আমাকে কী করতে হবে?”


“প্লেট গুলো ধুয়ে দিবি আর ফুলকপি‚ বেগুন‚ আলু‚ শিম কে’টে রাখবি। তোর আব্বা সবজি দিয়ে রুই মাছ খেতে চেয়েছেন।”


“আচ্ছা আম্মা!”


অর্ণিশা তার কাজে লেগে পড়ল৷ প্রথমে সবজি গুলো কে’টে তারপর ধোয়াধুয়ির কাজ করবে। এই ঠান্ডায় বারবার ঠান্ডা পানি ছোঁয়া একদমই ভালো না। অতশত কাজের মাঝে মেয়ের সর্দি লাগার ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে গেলেন অঞ্জু বেগম। অর্ণিশা নিজের কাজে মনোনিবেশ করল৷ 


আলুর খোসা ছিলতে গিয়ে ডান হাতের তর্জনীর নখের কাছে বেশ অনেকটাই কে’টে গিয়েছে। মুহূর্তের মাঝেই হাত রঞ্জিত হয়ে উঠল। টু শব্দও করল না অর্ণিশা। তাতে যে মা জেনে যাবেন। এখন আবার হাত কে’টে যাওয়ার কথা শুনলে হয়তো কষ্ট পাবেন অঞ্জু বেগম। তাই আর অর্ণিশা তার মাকে ডাকল না বা কিছু বললও না৷ দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথা সহ্য করে নিল। কষ্ট করেও হলেও দুপুরের এঁটো প্লেট গুলো একটা একটা করে ধুয়ে রাখল। 


“আম্মা আর কিছু করতে হবে?”


“না রে মা। অনলটা কী করছে একটু দেখিস তো! ছেলেটাকে নিয়ে আমি আর পারি না। পড়াশোনায় মনোযোগ নেই তার— খেলাধুলার প্রতি ঝুকেছে৷”


“আচ্ছা!”


অর্ণিশা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে অনলের ঘরে একবার উঁকি দিল। স্টাডি টেবিলে বসে খাতায় আঁকিবুঁকি করছে৷ এই ছেলেটার খামখেয়ালিপনায় খুব বিরক্ত হলো অর্ণিশা। বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল৷ 


“পড়া বাদ দিয়ে কী করছিস?”


হকচকিয়ে উঠল অনল৷ ফ্যালফ্যাল করে বোনের মুখপানে তাকাল। এ কথা যদি তার আম্মা জানেন তাহলে আজ আর রক্ষে নেই৷ এমনিতেই রেজাল্ট খারাপ হওয়ার জন্য তিনি ক্ষেপে আছেন। অনল আমতা করে বলল‚


“আম্মাকে কিছু বলিস না আপা।”


“সব বলব আমি।”


“তাহলে আমিও আম্মাকে বলে দেব— তুই বিকেলে রঙ্গন ভাইয়াকে লুকিয়ে দেখছিলিস।”


“কীসব উল্টোপাল্টা বকবক করছিস? এইটুকুন বাচ্চা ছেলে আমাকে মিথ্যে বলে থ্রে’ট দিচ্ছিস?”


“আমি কোথায় মিথ্যে বললাম? আমি স্পষ্ট দেখেছি তোকে৷ দাঁড়িয়ে হাসছিলিস। আর আমাকে একদম বাচ্চা বলবি না। আমি বড়ো হয়েছি।”


সশব্দে হেসে উঠল অর্ণিশা। বোকা বনে গেল অনল। হাতে চিনচিনে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। তাই আর বেশি কথা না বাড়িয়ে অর্ণিশা বলল‚


“আজকের মতো মাফ করে দিলাম। এখন মনোযোগ দিয়ে পড়।”


কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল অর্ণিশা৷ কে’টে যাওয়া আঙুল খুব জ্বালা করছে৷ ক্ষ’তটাও অনেকটা গভীর। নখের দিক থেকে অনেকটা কে’টেছে৷ এতক্ষণ ওড়না দিয়ে চেপে রেখেছিল৷ র’ক্ত বের হচ্ছে। শরীর দূর্বল লাগতে শুরু করল। এমনিতে র’ক্ত দেখতে পারে না অর্ণিশা৷ গা ঝিমঝিম করতে থাকে৷ র’ক্তে ফোবিয়া আছে তার৷ দরজার কাছটায় এসে কম্পিত কণ্ঠে অনলকে ডাকল৷ অর্ণিশার গলার আওয়াজ অস্বাভাবিক লাগায় ছুটে এলো অনল৷ এসেই দেখল দরজার কাছে পড়ে আছে অর্নিশা৷ জোরে চেঁচিয়ে অঞ্জু বেগমকে ডাকল‚ “আম্মা তাড়াতাড়ি আপার ঘরে এসো।”


অনল ক্রমাগত ডেকে যাচ্ছে অর্ণিশাকে৷ কিন্তু চোখ খুলছে না। মনে হয় অচৈতন্য হয়ে পড়েছে। হাতটা র’ক্তে লাল হয়ে পড়েছে। অনলের গলার আওয়াজ পেয়েই অঞ্জু বেগম ছুটে এলেন৷ মেয়েকে এভাবে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গেলেন তিনি৷ হাশেম মোড়ল এখনো বাড়ি ফেরেননি। এই মুহূর্তে কী করা উচিত ভেবে পাচ্ছেন না অঞ্জু বেগম৷ দিকবিদিকশুন্য হয়ে পড়লেন মুহূর্তেই৷ অনলের দিকে তাকিয়ে এলোমেলো স্বরে বললেন ‚


“অতিথিশালায় গিয়ে রঙ্গন আর নয়তো আবিরকে ডেকে নিয়ে আয়।”


“আচ্ছা আম্মা।”


দৌঁড়ে বেরিয়ে পড়ল অনল৷ মিনিট দুয়েক পরে আবারও চলে এলো। এরই মাঝে রঙ্গনও চলে এসেছে৷ এসেই তাড়াহুড়ো করে পাঁজাকোলা তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। সন্তপর্ণে হাতের র’ক্ত পরিষ্কার করল এরপর ব্যান্ডেজও করে দিল। 


চলবে?.....থা বুঝতে পারল না রঙ্গন৷ ভ্রুকুঞ্চিত করে শুধাল‚ “কেন?”


“আমি তো ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাইকে জানিয়ে দিয়েছি।”


“মিজাইন্না রে— তুই তো হাঁটে হাড়ি ভেঙে দিলি রে।”


চলবে?.....#উন্মাতাল |৪|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


“তোর হাত কা’টল কী করে?”


এইতো সবেই জ্ঞান ফিরেছে অর্ণিশার৷ চোখ পিটপিট করে যখন তাকাল— দেখতে পেল‚ সবাই তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে৷ রঙ্গন আর আবিরও এখানেই রয়েছে। মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল অর্ণিশা৷ তার অবস্থা বুঝতে পেরে রঙ্গন বলল‚


“প্লিজ আপনি ঘাবড়ে যাবেন না৷ আপনার পালস একবার চেক করেই আমরা চলে যাব।”


রঙ্গন এসে অর্ণিশা সামনে বসল৷ পালস চেক করে বুঝতে পারল‚ মেয়েটার শরীর খানিকটা দূর্বল। মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে৷ হাতের আঙুলে ব্যান্ডেজ লাগানো৷ রঙ্গন অতি যত্নে সন্তপর্ণে ব্যান্ডেজ করেছিল। অঞ্জু বেগমের ধৈর্য কুলোচ্ছে না। এই মেয়ের মাঝে উনার প্রাণ ভোমর। অনেক সাধের মেয়ে উনার। কিছু হয়ে গেলে না জানি কী হত উনাদের৷ ভাবতে অন্তরা’ত্মা কেঁপে উঠছে উনার। অর্ণিশা এবার শান্ত মোলায়েম স্বরে বলল‚


“আলুর খোসা ছাড়াতে গিয়ে কে’টে গিয়েছিল। র’ক্ত রঞ্জিত হাত দেখে মাথা কেমন ঝিমঝিম করছিল।”


“সে কী রে! তোর হাত কাটল আর তুই আমাকে কিছুই জানাসনি? তখন আমাকে কেন জানাসনি? এই হাত নিয়ে এতগুলো এঁটো প্লেট গুলো ধুয়েছিস? কিছু বুঝতে দিসনি আমাকে। পড়ে গিয়ে যদি মাথায় ব্যথা পেতিস? তোর যদি কিছু হয়ে যেত?”


“তেমন ভয়ের কিছু নেই আন্টি৷ হয়তো উনার র’ক্তে ফোবিয়া আছে৷ তাই র’ক্ত দেখে ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছিলেন। একটু দূর্বল উনি। উনার জন্য এক গ্লাস গরম দুধ আর একটা ডিম সেদ্ধ করে দেবেন। আসছি আমরা৷”


কথাটা বলে ঘরের দরজার কাছটায় গেল রঙ্গন আর আবির৷ চলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল রঙ্গন৷ পেছন ফিরে একবার অর্ণিশাকে দেখল। এরপর অনলকে নিজের কাছে ডাকল৷ অনল কাছে গেলে রঙ্গন অঞ্জু বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল‚ 


“আন্টি আমি দুটো ঔষধ পাঠিয়ে দিচ্ছি— উনাকে খাবার খাইয়ে ঔষধ দুটো দেবেন।”


“আচ্ছা বাবা।”


অনলকে নিয়ে রঙ্গন আর আবির চলে গেল৷ অঞ্জু বেগম মেয়ের জন্য অল্পকিছু খাবার আর গরম দুধ‚ ডিম নিয়ে এলেন। খাবার খেতে ইচ্ছে না করলেও মায়ের জোরাজুরিতে অল্পকিছু খেয়ে নিল অর্ণিশা৷ 


রাতটা কোনো রকমে কেটে গেল। সকালে ঘুম থেকে উঠতে একপ্রকার দেরি হয়ে গিয়েছে অর্ণিশার৷ সেই জন্য ফজরের নামাযটা কাজা হয়ে গিয়েছে। উঠে হাতমুখ ধুয়েই খাবার খেয়ে নিয়েছে সে৷ ক্ষিধে পেয়েছিল খানিকটা৷ খাবারটা অঞ্জু বেগমই খাইয়ে দিয়েছেন৷ অর্ণিশা কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে বসেছে বিছানায়৷ এখন শুধু চুল বাধাটা বাকি৷ অর্ণিশা তার আম্মাকে ডাকতে শুরু করল। অঞ্জু বেগম মেয়ের ঘরে এসে দেখলেন মেয়ে উনার কলেজে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে৷ এই দূর্বল শরীরে কোথাও যেতে দেবেন না বলে মনঃস্থির করেছেন তিনি৷ কিন্তু মেয়ে যে উনার নাছোড়বান্দা। জোর করে বলেছে সে আজ কলেজে যাবে মানে যাবেই৷ কী আর করার? অঞ্জু বেগম রাজি না হয়ে পারলেন না৷ কলেজ ড্রেসের উপরে ডেনিম জড়িয়ে কাঁধে ব্যাগ ঝুলাল অর্ণিশা৷ অঞ্জু বেগম মেয়ের জন্য টিফিন বক্স নিয়ে এলেন। আস্তে করে ব্যাগে ভরে দিলেন টিফিন বক্স৷ বারবার বললেন সময় মতো খাবারটা খেয়ে নিতে৷ অর্ণিশা সায় জানিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিল। সোনালি রোদ উঁকি দিচ্ছে। তবুও শীত অনুভূত হচ্ছে৷ রোদের উষ্ণতা একেবারেই মোলায়েম। 


কলেজ ছুটির পর....


অর্ণিশার পথরোধ করে দাঁড়াল রঙ্গন। এভাবে পথরোধ করে দাঁড়ানোর মানে খুঁজে পেল না অর্ণিশা। চোরাচোখে এদিকসেদিক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল আশেপাশে কেউ আছে কী—না! যা রটার ইতিমধ্যেই খুব ভালো ভাবে রটে গিয়েছে। আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই তো সকালেও শুনতে হয়েছে ‘তোর নাকি শুক্রবারে বিয়ে?’ আরেকজন তো মুখের উপর বলে দিল ‘তোর আকদ কেমন ছিল?’ সহপাঠীরা বলছে ‘তোদের প্রেম কেমন চলছে।’ তখন কিছু বলতে নিয়েও থেমে যেতে হয় অর্ণিশাকে। পাছেই না কারো কটু কথা শুনতে হয়।


“এভাবে হুটহাট পথরোধ করে দাঁড়াবেন না।”


“আমরা কী কোথাও বসে কথা বলতে পারি?”


“এমনিতেই লোকে আপনাকে আর আমাকে ঠিক চোখে দেখছে না। এখন যদি আমাদের দুজনকে কোথাও একসঙ্গে দেখে তাহলে অন্যকিছু ভাবতে পারে।”


“অন্যের ভাবনায় আপনি এত প্রভাবিত হন?”


হকচকিয়ে গেল অর্ণিশা৷ কী বলতে চাইছে লোকটা৷ এই রাস্তা এখন জনমানবশূন্য— তাই বলে এই নয় কেউ এই রাস্তা দিয়ে যাবে আসবে না৷ অর্ণিশা কিছু একটা ভেবে বলল‚


“কোথাও বসে কথা বলি!”


“অফকোর্স!” থেমে গিয়ে রঙ্গন আবারও বলল‚ “থ্যাংক ইউ অর্ণিশা!”


অর্ণিশা একপলক তাকাল রঙ্গনের দিকে৷ লোকটার ঠোঁটের কোণে প্রসারিত হাসির রেখা দৃশ্যমান। ‘অর্ণি একটু তো হায়া কর। এভাবে নির্বোধের মতন তাকিয়ে থাকলে কী ভাববে? তোর বুদ্ধি কবে হবে?’ দুটো দৃষ্টি বিনিময় হবার আগেই অর্ণিশা অন্যদিকে তাকাল। নিজের কাজে লজ্জা পেল সে৷ তবে তা প্রকাশ করল না৷ ভাগ্যিস লোকটা কিছু বুঝতে পারেনি। রঙ্গন আগে আগে হাঁটছে— অর্ণিশা পেছনে৷ সামনেই একটা কফিশপ আছে। কলেজের বিপরীত পাড়ের গলিতে৷ এখান লোকসমাগম খুব বেশি নেই। একটা দুটো মানুষ। তবে অর্ণিশাকে হয়তো কেউ চিনবে না৷ লোকের কথার ভয়ে মেয়েটা মাস্ক পড়ে নিয়েছে৷ 


ছোট্টো সেই কফিশপে গিয়ে বসেছে রঙ্গন আর অর্ণিশা৷ আশেপাশে একটা দুটো মানুষ আছে বৈকি৷ যারা আছে তাদের দেখে কপোত কপোতীই মনে হচ্ছে। মুখ থেকে একবারের জন্যও মাস্ক খুলেনি অর্ণিশা৷ রঙ্গন দুজনের জন্য কফি অর্ডার দিয়েছে। তিনদিন আগে এই কফিশপে এসেছিল সে৷ এখানকার কফি সেদিনই প্রথম খেয়েছিল৷ টেস্ট মোটামুটি চলে। অর্ণিশা একবার এদিকসেদিক তাকিয়ে রঙ্গনকে বলল‚ 


“এখন তো দুপুর। নিশ্চয়ই আপনার ক্ষিধে পেয়েছে৷ ভারী খাবার অর্ডার করি?”


“আমি কিছু খাব না।”


নেমে এলো দুজনের মাঝে এক অবাক নীরবতা। রঙ্গন একদৃষ্টে অন্যমনষ্কা অঙ্গনাকে দেখে যাচ্ছে। রমণী গভীর ভাবে টেবিলের রেক্সিনের দিকে তাকিয়ে কী এত ভেবে যাচ্ছে—জানা নেই তার। অর্ণিশা মুখ তুলে রঙ্গনের দিকে তাকাতেই দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। স্তম্ভিত হলো সে। খানিকটা ইতস্তত ভাব নিয়ে বলল‚


“আসার পর থেকেই দেখছি চুপ করে আছেন। কীসের জন্য এখানে নিয়ে আসা হয়েছে— বলবেন কী?


প্রত্যুত্তরের আশায় প্রশ্নাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অর্ণিশা। এরই মাঝে দুজনের জন্য কফি নিয়ে এলেন ওয়েটার। রঙ্গন হাসিমুখে গ্রহণ করল। অর্ণিশার দিকে এগিয়ে‚ খাওয়ার জন্য ইশারা করল সে৷ কম্পিত হস্তে কফিমগ কাছে নিল৷ বোকাসোকা চোরাচাহনিতে এদিকসেদিক তাকিয়ে মাস্ক খুলল অর্ণিশা৷ রঙ্গন রিলেক্স হয়ে কফিতে সিপ নিচ্ছে৷ একবার ভাবল এবার অন্তত কিছু কথা বলা প্রয়োজন। তাই গম্ভীর স্বরে বলল‚


“একটা কথা বলি?”


অর্ণিশা কফিতে সিপ নিয়ে বলল‚ “জি।”


“আপনার কী আমাকে একটুও পছন্দ না? আমি কী সত্যিই অযোগ্য?”


কোনো উত্তর খুঁজে পেল না অর্ণিশা। রঙ্গনকে তার অপছন্দ এমনটাও না। কিন্তু বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না৷ আর তার আব্বা আম্মাই বা কী করে এই অচেনা অজানা লোকটাকে বিশ্বাস করছে? তাদের বাড়িতে থাকছে এ সপ্তাহ হতে চলল। এই ক’দিনেই এতটা বিশ্বস্ত হয়ে উঠল? আজ সকালেও আব্বা আম্মার কথা আবছা শুনতে পেয়েছিল সে। আব্বা মত দিয়েছে। তারমানে‚ সব কিছু ভালো হলে বিয়ে ঠিকঠাক হয়েই যাবে।


“আঙ্কেলের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমার মাকেও জানানো হয়েছে।”


অবাক হলো অর্ণিশা। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল অনেকটা সময়। শান্ত মোলায়েম স্বরে বলল‚ “খুব তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না?”


“স্বপ্নের পিছু ছুটে কখনো কাউকে ভালোবাসার সুযোগই হয়ে ওঠেনি৷ জীবনে প্রথম আপনার প্রতি একটা সফট কর্ণার ক্রিয়েট হয়েছে। আমি উপলব্ধি করেছি কারো মায়ায় ক্রমশ জড়িয়ে যাচ্ছি। আপনাকে আমি হারাতে চাই না অর্ণিশা।”


অর্ণিশার মনে পড়ল তার প্রিয় বান্ধবী ‘মাধবী’ এমনই কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে নিজের হাস্যজ্বল জীবনটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছে। তখন ওরা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যেত সদরের একটা স্কুলে। তখনই পরিচয় হয় রুহুলের সঙ্গে। ছেলেটা সবসময় কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত৷ একটু একটু করে অনুভূতি তৈরি হতে লাগল মাধবীর মনে৷ ছেলেটাকে কখনোই সুবিধের মনে হত না অর্ণিশার৷ বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু মাধবী তার একটা কথা শোনেনি। আবেগে পড়ে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। হুট করেই দুজনের প্রণয় হলো। এরপর পালিয়ে বিয়ে৷ পড়াশোনাও সেখানেই বন্ধ হয়ে গেল মাধবীর। পরিবার থেকে মেনে নেয়নি তাকে৷ চিরদিনের জন্য ত্যাগ করেছিল৷ রুহুলকেও তার পরিবার থেকে ত্যাজ্য করা হলো৷ প্রথম কয়েক মাস খুব ভালোই চলছিল কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যেতে লাগল রুহুল৷ অল্পতেই রেগে যেত। ছোটো ছোটো কারণ দিয়ে ঝগড়া অশান্তি হত। নিত্যনতুন সাংসারিক কলহ লেগেই থাকত। এমনকি হাতও তুলত মাধবীর গায়ে৷ তবুও মেয়েটা ভালোবাসার তাগিদে মুখ বুজে সবকিছু মানিয়ে নিত। মেয়েটা ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হয়ে যেতে লাগল৷ একদিন হঠাৎ খবর এলো মাধবী আ’ত্মহ’ত্যা করেছে কিন্তু আ’ত্মহ’ত্যা করার মেয়ে তো মাধবী নয়। মেয়েটা এত এত অ’ত্যা’চার সহ্য করার পরও কখনো আ’ত্মহ’ত্যার কথা মুখেও আনত না৷ মাধবীর মৃ’ত্যুর খবর শুনে খুব আফসোস করেছিল তার পরিবার। পুলিশ অনেক তদন্তও করে কিন্তু টাকার কাছে সত্যটা বিক্রি হয়ে যায়। রুহুল ফিরে গেল তার পরিবারে। প্রিয় বান্ধবীর ঝুলন্ত ম’রদেহ পুরোপুরি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছিল অর্ণিশাকে। সেই শোক কাটাতেও অনেকটা সময় লেগেছিল। বিয়ে আর ভালোবাসা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয় অর্ণিশার মনে৷ সেই ধারণা থেকে এখনো অবধি বেরতে পারেনি সে।


নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে অর্ণিশা রঙ্গনের দিকে তাকাল। প্রত্যুত্তরের আশায় লোকটা এখনো তাকে দেখছে৷ লোকটাকে খুব করে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে৷ অর্ণিশা বুঝতে পারল সে কারো মায়ার পড়ছে৷ খুব গভীর ভাবে৷ রঙ্গন যে অর্ণিশার ব্যাপারে কিছু জানে না এমনটাও না৷ 


“এই তো পাঁচদিন আগেই সিটি হসপিটাল থেকে ওদের তিনবন্ধুকে কৃষ্ণপুর (কাল্পনিক) গ্রামে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট গিয়েছিল— গ্রামের অনেক গরীব অসহায়রা নাকি চিকিৎসাহীনতায় ভুগছে৷ এরপর আবির‚ রঙ্গন আর মিজান এসে উঠেছিল উত্তর পাড়ার মোড়ল বাড়ি অর্থাৎ হাশেম মোড়লের বাড়িতে৷ অতিথিশালায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল ওদের৷ আতিথেয়তার অন্ত রাখেননি হাশেম মোড়ল। এমনিতে গ্রামের সবাই উনাকে এক ডাকে চেনে। এইতো সেদিন সকালে অর্ণিশা যখন মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলেজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলো তখনই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল রঙ্গন‚ আবির আর মিজান। তিনজনকে একসঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল বোকাসোকা মেয়েটা৷ তারপরও মনে সাহস জুগিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল‚


“কাকে চাই?”


রঙ্গন নিজে থেকে বলেছিল‚ “হাসেম মোড়ল কী বাড়িতে আছেন?”


“আব্বাকে দিয়ে আপনার কাজ কী? আর বলা নেই কওয়া নেই বাড়িতে ঢুকে এলেন কেন তা—ও আবার বাক্সপেটরা গুছিয়ে?”


এই মেয়ের ত্যাড়ামি দেখে রাগ হলো রঙ্গনের। তবুও নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। এদিকে রঙ্গনকে দেখে মজা লুটছে আবির আর মিজান। রঙ্গন যখন বড়ো বড়ো চোখের শাসানো দৃষ্টিতে তাকাল তখন দমে গেল দুটোতে। এদিকে রঙ্গন শান্ত গম্ভীর স্বরে অর্ণিশাকে বলল‚


“উনি বাড়িতে আছেন কী—না জানলে ভারী উপকার হত৷ আপনি কী বলবেন উনি বাড়িতে আছেন কী—না?”


চুপসে গেল অর্ণিশা। এদের তিনজনকে একপলক দেখে বলল‚ “আব্বা বাড়িতেই আছেন৷”


কথাটা বলেই চলে গেল। কলেজে যাওয়ায় দেরি হচ্ছে তার৷ এদিকে রঙ্গন ফ্যালফ্যাল করে সেদিকটায় চেয়ে রইল একদৃষ্টে। মেয়েটা বড্ড বোকা সহজসরল। প্রথম দেখাতেই অর্ণিশা নামক মেয়েটাকে তার পছন্দ হয়েছে। রঙ্গন বুঝতে পারল তার উনত্রিশ বছর জীবনে একটু একটু করে কারো মায়ায় পড়তে যাচ্ছে। পুরো তিনদিন অর্ণিশাকে ফলো করেছে সে। অথচ এ কথা ঘুনাক্ষরে টের পায়নি মেয়েটা৷ আড়ালে মাঝে মাঝে দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হত তবে অর্ণিশা সন্তপর্ণে এড়িয়ে যেত৷ কিছুটা ভালো লাগা আর খানিকটা কৌতূহলবসত কিছু তথ্য জানতে গিয়ে মাধবীর কথা জানতে পারে রঙ্গন। এক্ষেত্রে মাইশা আর রুমির সঙ্গেও তার কথা হয়েছে। যেহেতু ওরা দুজন অর্ণিশার সহপাঠী৷ নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে রঙ্গন অর্ণিশাকে জিজ্ঞেস করল‚


“কিছু বলছেন না যে?”


“আমার কিছু বলার নেই। যে যা পারছে সেটাই করছে। আমার কথার দাম আর কার কাছে আছে?”


“শুধু আপনি রাজি হয়ে যান। আমি প্রমাণ করে দেব— সবাই প্রতারণা করে না‚ কেউ কেউ কথা রাখে।”


অর্ণিশা কী বলবে ভেবে পায় না৷ জীবনে এই পর্যায়ে এসে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে৷ কলেজে পড়া মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু না৷ গ্রামে তো মেয়েদের স্কুলের গণ্ডি পেরনোর আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়৷ তবে সময় এখন অনেক এগিয়ে গিয়েছে। রঙ্গন আবারও বলল‚


“জোর করে হয়তো কারো প্রতি অনুভূতি তৈরি করা যায় না। তাই আমি আপনাকে জোর করব না৷ কিন্তু আপনাকে আমার চাই— ভীষণ করে চাই।”


চলবে?.....#উন্মাতাল |৫|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


“আম্মা আমার বিয়ে নিয়ে তোমরা খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলছ না?”


বিছানায় চাদর বিছানোর মনোনিবেশ করছেন অঞ্জু বেগম৷ আজ অর্ণিশাকে দেখতে আসছেন রঙ্গনের মা। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজই আংটি পড়িয়ে রাখা হবে অথবা কাবিন হয়ে যাবে। তিনি আজ সকালেই কৃষ্ণপুর এসেছেন। মিজান গিয়েছিল উনাকে নিয়ে আসতে। দুপুরের খাবার নিয়ে সখ্য করতে গিয়েছিলেন অঞ্জু বেগম। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন ফুলবানুকে। অর্ণিশাকে আজ কলেজ যেতে দেননি তিনি। আজ একটা বিশেষ দিন— মেয়ে যদি বাড়ি না থাকে বিষয়টা খারাপ দেখায়।বালিশের কভার বিছানার উপর রেখেই অঞ্জু বেগম বললেন‚ 


“আমাকে একটা কথা বল— রঙ্গন কী ছেলে হিসেবে খারাপ?”


অকপটে অর্ণিশা দুপাশে মাথা ঝাকিয়ে বলল‚ “উঁহু!”


“তাহলে এমন করছিস কেন? মেয়ে হয়েছিস‚ একদিন তো বিয়ে দিতেই হবে। আগে আর পরে কী? আল্লাহ যখন যার ভাগ্যে যেটা লিখে রেখেছেন সেটাই হবে। বাবা মায়ের সিদ্ধান্তের উপর কী তোর ভরসা নেই?”


অর্ণিশা তার মায়ের মায়াবী মুখশ্রী পানে চেয়ে জবাব দিল‚ “আছে।”


“তাহলে রাজি হয়ে যা।”


কোনো কথার জবাব দিতে পারল না অর্ণিশা৷ বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। নিজের ঘরে গিয়ে সন্তপর্ণে দরজা আটকে দিল৷ অর্ণিশার এহেন কাজে কোনো প্রভাব পড়ল না অঞ্জু বেগমের উপর৷ তিনি নিজের মতো কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।


বসার ঘরে রঙ্গন‚ তার মা মনোয়ারা বেগম‚ আবির‚ মিজান আর অনন্ত বসে আছে৷ আজ সকালে কৃষ্ণপুর গ্রামে এসেছেন মনোয়ারা বেগম। দুপুরে অঞ্জু বেগমের সঙ্গে খোশগল্প জুড়েছিলেন৷ অল্প সময়েই দুজনের ভাব জমেছে। এখন সময়টা বিকেল। অঞ্জু বেগম সকলের জন্য নাস্তার বন্দবস্ত করছেন। একা হাতে সবকিছু সামলে উঠতে পারছেন না। মেয়েকে দিয়েও কোনো কাজ করাতে দিতে চাইছেন না তিনি। ফুলবানু হাতে হাতে একটু আধটু সাহায্য করে দিচ্ছেন। কাজের ক্ষেত্রে এত তাড়াহুড়োর ব্যাপারটা বোধগম্য হচ্ছে না ফুলবানুর। বোকাসোকা স্বরে অঞ্জু বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন‚


“ভাবি আইজকা এত আয়োজন কীয়ের লাইগা?”


“রঙ্গনের মাকে তো দেখেছই— তিনি অর্ণিকে দেখতে এসেছেন।”


“অন্নি আম্মার বুঝি বিয়া দিয়া দিবেন?”


“ভাগ্যে থাকলে হবে। ফুলবানু তুমি এই দিকটা দেখ— আমি গিয়ে দেখি অর্ণি কী করছে!”


“আইচ্ছা ভাবি। আপনে নিশ্চিন্তে থাহেন।”


কাজের ফাঁকে ঘরে এসে অঞ্জু বেগম উনার আলমারি থেকে মেরুন রঙা বেনারসি শাড়িটা বের করলেন। শাড়ির উপরিভাগে কোমল ভাবে স্পর্শ করলেন। সুন্দর একটা সুবাস আসছে শাড়িটা থেকে। অনেকদিন ধরে উনার স্বপ্ন এই শাড়ি পরিহিত অর্ণিশাকে দেখে চোখ জুড়াবেন তিনি৷ আজ সেই দিন এলো যেন। 


“এই শাড়িটা পড়ে নে। পারলে একটু সাজিস আর চুল বিনুনি গেঁথে নিবি।”


“তুমি শাড়ি পড়িয়ে দাও আম্মা।”


“বোস আমি তোকে সাজিয়ে দিচ্ছি।”


মায়ের কথানুযায়ী আয়নার সামনে গিয়ে বসল অর্ণিশা। অঞ্জু বেগম মেয়ের মৃগনয়নায় গাঢ় কাজল লেপ্টে দিলেন। লম্বা কৃষ্ণগুচ্ছ কেশ বিনুনি গেঁথে দিলেন৷ বেশ কিছুটা সময় নিয়ে মেরুন রঙা বেনারসিটা পড়িয়ে দিলেন৷ কয়েকটা সেফটি পিনও লাগিয়ে দিলেন— যেন কোনো সমস্যা না হয়৷ মেয়েকে আয়নায় সামনে দাঁড় করালেন। আয়নায় অর্ণিশায় প্রতিবিম্ব স্পষ্ট দৃশ্যমান। মেয়ের চিবুক ছুঁয়ে মুখটা উঁচু করলেন অঞ্জু বেগম। 


“মাশাআল্লাহ! ভীষণ সুশ্রী দেখাচ্ছে আমার অর্ণিকে।”


অর্ণিশা কিছু বলল না। অঞ্জু বেগমের চোখ দুটো টলমল করছে৷ যেকোনো মুহূর্তে গড়িয়ে পড়তে পারে। বেশ কয়েকবার চোখের পলক ফেলে টলমল করতে থাকা অশ্রু শুষে নিলেন। পুরোটাই অর্ণিশার দৃষ্টির অন্তরালে। এরপর কিছু না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন অঞ্জু বেগম। মায়ের হাবভাব খানিকটা বুঝতে অসুবিধে হলো অর্ণিশার। 


টেবিলের উপর বিভিন্ন ধরনের নাস্তা দেওয়া হয়েছে৷ রান্নাঘর থেকে একটা একটা ট্রেতে করে নিয়ে আসছে ফুলবানু৷ কথাবার্তা হচ্ছে বড়োদের মাঝে। ভালোমন্দ অনেক কথার মাঝে মনোয়ার বেগম বললেন‚


“অনেক কথাই তো হলো ভাই সাহেব৷ এখন যদি আপনার মেয়ে নিয়ে আসতেন।”


স্ত্রী উদ্দেশ্য করে হাশেম মোড়ল বললেন‚ “অঞ্জু যাও অর্ণিকে নিয়ে এসো।”


অঞ্জু বেগম ছুটলেন মেয়ের ঘরের দিকে। কিছুক্ষণ পরে শাড়ির আঁচল দ্বারা ঘোমটা টেনে রাখা অর্ণিশাকে নিয়ে এলেন। অতিরিক্ত নার্ভাসনেস এর জন্য হাত পা রীতিমতো কাঁপছে অর্ণিশার৷ সেকেন্ড পাঁচেক সময় নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করল সে৷ শান্ত মোলায়েম স্বরে সকলের উদ্দেশ্যে সালাম জানাল। চিকন মেয়েলি কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই মনোয়ারা বেগম সেই দিকটায় তাকালেন। মেয়েটাকে দেখে এক পল থমকালেন তিনি। মনোয়ারা বেগম গভীর ভাবে পরখ করলেন অর্ণিশাকে। উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের দেহে মেরুন রং টা ফুটে উঠেছে। সেই সাথে ঢেউ খেলানো লম্বা বিনুনি৷ মেয়েটার গাল দুটো রসগোল্লার ন্যায় গোলুমোলু। মৃগনয়নায় গাঢ় কাজল লেপ্টে দেওয়া৷ অসম্ভব মায়াবী দেখেছে। যেকেউ মায়ায় পড়ে যাবে৷ অঙ্গনা এতটাই মায়াবী৷ তাইতো রঙ্গন এক দেখায় প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছে৷ যেখানে তাকে ধরে বেধেও মেয়ে পছন্দ করাতে পারেননি মনোয়ারা বেগম। নিজের হাত থেকে একটা আংটি খুলে অর্ণিশার অনামিকায় পড়িয়ে দিলেন তিনি। এই আংটিটা উনার শাশুড়ী উনাকে যখন একদেখায় পছন্দ করেছিলেন তখন পড়িয়েছিলেন। আজ তিনি অর্ণিশাকেও সেটা দিলেন। রঙ্গন বুঝতে পারল তার মায়েরও অর্ণিশাকে পছন্দ হয়েছে। অঞ্জু বেগম মেয়েকে নিয়ে গেলেন ঘর থেকে। এখন বড়োরা কথা বলবেন। তবে পরবর্তী কথা বাড়ানোর আগেই হাশেম মোড়লের উদ্দেশ্যে মনোয়ারা বেগম বললেন‚


“ভাই সাহেব আমি কী আপনার মেয়ের সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলতে পারি৷”


উপস্থিতি সকলে থমকাল। রঙ্গন‚ আবির আর মিজান একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। হঠাৎ করে রঙ্গনের অস্বাভাবিক লাগছে। কিন্তু তার মা কখনোই তার খারাপ চাইবেন না এটাই তার বিশ্বাস। মায়ের হয়তো আলাদা ভাবে কোনো কথা রয়েছে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক নেওয়াই উত্তম। হাশেম মোড়ল নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে আছেন। সব জায়গায় দেখে আসা হয়েছে ছেলে মেয়ে আলাদা কথা বলে তবে আজ হচ্ছে তার উল্টোটা। ছেলের মা মেয়ের সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলতে চাইছেন। বিষয়টা একদমই অন্যরকম লাগছে৷ তারপরও অকপটে হাশেম মোড়ল রাজি হয়ে গেলেন৷ মনোয়ারা বেগম গেলেন অর্ণিশার ঘরের সামনে৷ দরজা অনেকটা ভিড়িয়ে রাখা৷ তিনি দরজার কাছে এসে পরপর দুবার টোকা দিলেন। ঘরের ভেতরে থাকা অঙ্গনা একপলক নিজের অনামিকায় তাকাল। এরপর জড়োসড়ো হয়ে বিছানার কাছের দিকটায় গিয়ে দাঁড়াল৷ ঘরের ভেতর প্রবেশ করলেন মনোয়ারা বেগম৷ উনাকে দেখে অবাক হলো অর্ণিশা৷ তবে অবাকের লেশমাত্র নেই শ্যাম গৌর মুখপানে। মনোয়ারা বেগমকে সালাম জানাল সে। হাসিমুখে সালামের জবাব নিলেন মনোয়ারা বেগম। এগিয়ে গিয়ে বসলেন বিছানায়। ইশারায় অর্ণিশাকেও বসতে বললেন তিনি। ভদ্রমহিলাকে অবজ্ঞা করতে পারল না অর্ণিশা। কিছুটা দূরত্ব রেখে বসল। মনোয়ারা বেগম বলতে শুরু করলেম।


“রঙ্গন তখন মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট ছিল। হঠাৎ একদিন অফিস থেকে খবর আসে— রঙ্গনের বাবা হার্ট অ্যাটাক করেছেন৷ অফিস থেকে উনাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। উনি আমাদের দুজনকে একা ফেলে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। রঙ্গনকে নিয়ে উনার অনেক স্বপ্ন ছিল। কষ্ট করে হলেও উনার অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করেছি আমি। রঙ্গনকে মানুষের মতো মানুষ তৈরি করেছি। তার ছেলে আজ মস্ত বড়ো ডাক্তার। রঙ্গনের জন্য আমি অনেক মেয়ে দেখেছি কিন্তু কথা এগোনোর পূর্বেই বাতিল। আমিও হার মেনে নিয়েছি। ছেলের যখন কাউকে পছন্দ হবে তখন নিজে থেকেই বলবে৷ কাল আমার ছেলেটা বলল ওর কাউকে ভালো লেগেছে। শুধু ভালো লেগেছে তা না ও ভালোবাসতে শুরু করেছে৷ আমিও মেনে নিয়েছি৷ আমার কাছে ছেলের সুখটাই আসল। আজ এখানে এসে আমার ছেলেটাকে অন্যরকম উৎফুল্ল মনে হলো। রাজি হওয়া না হওয়া সবটাই তোমার উপর৷ তবে একটা কথা— রঙ্গনকে আমার ছেলে হিসেবে পেয়ে আমি গর্বিত। নিঃসন্দেহে আমি একজন রত্নগর্ভা।”


লম্বা বক্তৃতা দিয়ে থামলেন মনোয়ারা বেগম। অর্ণিশা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল ভদ্রমহিলার মুখপানে। এতক্ষণ শুধু অপলক দৃষ্টে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছিল সে। মনোয়ারা বেগম ক্ষীন হাসলেন আর বললেন‚


“তুমি খুব শান্তশিষ্ট। জানো তোমার বয়সে আমিও ঠিক এমনই ছিল। আজ তোমার মাঝে নিজের ছায়া দেখতে পেলাম।” 


কথা বলে অর্ণিশার মাথায় হাত বুলিয়ে— চিবুক ছুঁয়ে হাতে চুমু খেলেন। এরপর কিছু না বলে চলে গেলেন বসার ঘরে। ঘরে বসে থাকা বোকা রমণী এখনো আগের ভঙ্গিতে বসে আছে। ভদ্রমহিলা এই এলেন আবার এই চলে গেলেন। সবকিছুই যেন ঝড়ের বেগে ছুটছে। 


রঙ্গনের পাশে গিয়ে বসলেন মনোয়ারা বেগম। একবার ছেলের মুখ পানে তাকালেন৷ এরপর হাশেম মোড়লের উদ্দেশ্য করে বললেন‚ 


“ভাই সাহেব— সিদ্ধান্ত সবটা অর্ণিশার উপরই থাক৷ এই নিয়ে জোর করার কোনো দরকার নেই৷ আমিও তো একজন মা৷ আমি বুঝি সন্তানের মনের খবর।”


মনোয়ারা বেগম বেরিয়ে আসার পরপরই অঞ্জু বেগম ঘরের ভেতরে ঢুকেছিলেন। সবকিছু এখন মেয়ের সিদ্ধান্তের উপর। মেয়ের সিদ্ধান্ত নেতিবাচক হলে হাশেম মোড়লকে এতগুলো মানুষের কাছে ছোটো হতে হবে। দুঃশ্চিন্তায় মাথা ছিড়ে যাচ্ছে অঞ্জু বেগমের। তিনি দেখলেন অর্ণিশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে নিজেকে দেখে যাচ্ছে৷ পুতুল বউ লাগছে আজ তাকে৷ এমন সাজে তো কখনো দেখা হয়নি নিজেকে। কী হতে যাচ্ছে উনার ধারণা নেই। অর্ণিশার কাছে গিয়ে বললেন‚


“মেয়ের মনের কথা বুঝতে এতটা অসুবিধে হবে না বা হতে পারে না৷ দেখ মা হয়ে জিজ্ঞেস করতে খানিকটা অস্বস্তি হচ্ছে আমার। তারপরও জিজ্ঞেস করতে চাই— তুই রঙ্গনকে পছন্দ করিস তাইনা?”


বেশি কথা না বাড়িয়ে অর্ণিশা অকপটে সাদাসিধে জবাব দিল‚ “আমার কোনো আপত্তি নেই আম্মা। তোমরা যা ভালো বোঝ।”


মেয়ের কথায় সন্তুষ্ট হলেন অঞ্জু বেগম। মেয়ের ললাটে মমতাময় ওষ্ঠ ছোঁয়ালেন। এরপর বড়ো বড়ো পা ফেলে চলে গেলেন। 


গোধূলি আকাশ আজ লাজুক। আরক্তিম ময়ূখের ছটা ছড়াচ্ছে। পুরো ঘরময় মলয়পবন দোদুল্যমান। শরীর শীতল করা হাওয়া। সোয়েটার পড়ার মতো শীত করছে না যদিও। অর্ণিশা তার গায়ে একটা পাতলা শাল জড়িয়ে রেখেছে৷ সেই যে ঘরে এসে বসেছিল আর বের হয়নি। এই একটা সপ্তাহে তার জীবনটা একটু একটু করে বদলেছে। হুট করেই একটা মানুষের প্রতি আকস্মিকভাবে অনুভূতি তৈরি হলো। লোকটা হুট করে নিজের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ করল। একাকী বললেও ব্যাপারটা এত তাড়াতাড়ি বিয়ে অবধি গড়াত না। কিন্তু লোকটা তো লোকসমাগমে কথাটা বলেছিল৷ গ্রামেও কথাটা অল্পসময়ে ছড়িয়ে পড়েছিল৷ রঙ্গনকে যে তার অপছন্দ এমনটাও না। নিজের মনের কথা শুনেই এত বড়ো সিদ্ধান্তটা নিয়েছে অর্ণিশা। এতে খুব একটা আফসোস হচ্ছে না তার। হয়তো এটাই তার অদৃষ্টে ছিল৷ এক নতুন সম্পর্কে আজন্মকালের জন্য আবদ্ধ হয়ে গেল রঙ্গন অর্ণিশা৷ দুটো মানুষ মিলিত হলো জীবনসঙ্গী নামক সম্পর্কে। দুটো পরিবার মিলিত হলো কুটুম্বিতা নামক সম্পর্কে। 


“আমার বন্ধু হবে বউমা?”


অতিথিশালায় যাওয়ার পূর্বেই মনোয়ারা বেগম আবারও অর্ণিশার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এসেই এহেন কথাটা বললেন তিনি। সহসা চমকাল অর্ণিশা৷ জীবনে এই প্রথম শুনছে শাশুড়ী বন্ধুত্ব করতে এসেছে। কখনো এমন কথা শোনেনি বা শোনার ভাগ্য হয়নি তার৷ কম্পিত কণ্ঠে বলল‚


“বন্ধু!”


“কেন বন্ধু হতে পারি না? সারাদিন বাড়িতে আমি একাই পড়ে থাকি। একা সময় কাটেই না। এখন আমার একটা সাথী হয়েছে। খুব শীগ্রই তোমাকে আমি নিজের কাছে নিয়ে যাব। তোমাকে আমার ভারী পছন্দ হয়েছে বউমা।”


অর্ণিশা অবাকের থেকেও অবাক হলো। এমনও শাশুড়ী হয়? হবে হয়তো! এবার মনে হচ্ছে সে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি। মুচকি হাসল অর্ণিশা৷ শাশুড়ী হিসেবে মনোয়ারা বেগমকে খুব পছন্দ হয়েছে তার। 


রাতের জন্য ভারী খাবার রান্না করা হচ্ছে। অঞ্জু বেগম প্রথমেই এক চুলায় গরুর গোসত আর আরেক চুলায় পোলাও রান্না বসিয়ে দিয়েছেন। ফুলবানুকে দিয়েছেন মুরগী কাটতে। বেচারি সেই কখন থেকে মুরগী কেটে যাচ্ছেন। চারটে মুরগী আনা হয়েছিল। মানুষও তো কম না। তারপরও বাড়ির খাবার কিছুটা বাড়তি করে রাঁধা হয়। ফুলবানু উনার ছেলের জন্য বাটিতে করে খাবার নিয়ে যান৷ আজও তার অন্যথা হবে না। এখন শুধু মুরগীর রোস্টটা রান্না করা বাকি আছে। সবজি আর মাছ ভাজা আগেই হয়ে গিয়েছিল। দুপুরে বাড়ির পেছন দিকের পুষ্করিণী থেকে বড়ো বড়ো মাছ তোলা হয়েছে। বাড়িতে কুটুম এসেছে বলে কথা। আতিথেয়তার অন্ত রাখবেন না হাশেম মোড়ল। 


চলবে?.....


-


-


আসসালামু আলাইকুম। রঙ্গন অর্ণিশাকে পবিত্র প্রণয়ের ডোরে বেঁধে দিলাম। ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। [আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া মজার ঘটনা শেয়ার করতে পারেন পেইজের ইনবক্সে।]#উন্মাতাল |৬|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


বেশ অনেকগুলো বিকেল অতিবাহিত হয়েছে৷ কাবিন হবার পরের দিনই মনোয়ারা বেগম ঢাকা ফিরে গিয়েছেন। রঙ্গনসহ বাকিরাও ফিরে গিয়েছে। সামনে মাসের শেষের দিকে অর্ণিশার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এরপর দুজনের রিসেপশনের আয়োজন করা হবে৷ সেদিনই রেজিস্ট্রি ম্যারেজ হবে৷ মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে অনেক স্বপ্ন হাশেম মোড়লের। পুরো গ্রাম দাওয়াত করে খাওয়াবেন তিনি। উনার সিদ্ধান্তে কেউ দ্বিমত করেনি। বাড়িতে উনার কথাই শেষ কথা। কাবিনের পর থেকে একদিনও রঙ্গনের সঙ্গে অর্ণিশার যোগাযোগ হয়নি৷ তার তো ফোন নেই যোগাযোগ করবে কী করে? আর রঙ্গন তো নিজ থেকেও তার সঙ্গে কথা বলতে চায়নি— আগ বাড়িয়ে কেন কথা বলবে সে? পরক্ষণেই মনে হলো ‘অর্ণির বাচ্চা বেশি ভাব দেখাস না৷’ নিজের নিজেকে শাসাতে লাগল অর্ণিশা। আবার নিজেই আওড়াল‚ ‘অবশ্যই ভাব দেখাব! আমি অভিমান করেছি— তার উচিত আমার মান ভাঙানো।’ আরও কতশত ভাবনা উঁকি দেয় অর্ণিশার হৃদয় ও মস্তিষ্কে। একটু একটু করে সম্পর্কটাকে মেনে নিতে শুরু করেছে সে৷ পুরো কল্পনা জুড়ে এখন শুধুই রঙ্গন৷ লোকটা কী মায়ায় বাঁধল তাকে? মান অভিমানের মধ্যে দিন কে’টে যাচ্ছে অর্ণিশার৷ 


অন্যদিকে হসপিটালের ব্যস্ততায় অর্ণিশার সঙ্গে কথা বলার সময় হয়ে উঠছে না রঙ্গনের৷ সময় তো অজুহাত— রঙ্গন তো অর্ণিশাকে সময় দিচ্ছে সবকিছু মানিয়ে নেওয়ার৷ বিয়েটা যেভাবে হুট করে হয়ে গেল। এখন অর্ণিশার উচিত নিজেকে সময় দেওয়া। রঙ্গন পরক্ষণেই ভাবল একটা ছোটোখাটো সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ! ভাবনাটা পছন্দ হলো তার। হসপিটাল থেকে দুটো দিনের জন্য ছুটি নিতে হবে। ছুটি দিবে কী—না শিয়্যর ভাবে জানে না রঙ্গন। এইতো ঘণ্টা খানেক সময় হলো সে হসপিটালে এসেছে৷ রঙ্গন একবার ফোনটা বের করে সময় দেখল— সাড়ে নয়টা বাজছে। তাকে তো ইদানীং নয়টা বেজে যাওয়ার আগেই হসপিটালে আসতে হয়। 


সেই কখন থেকে অর্ণিশাকে ডেকে যাচ্ছেন অঞ্জু বেগম। মেয়েটা এত ঘুম কাতুরে— ছেলেটাও হয়েছে তেমন। পুরো গুষ্টিটাই তো এমন। এরা ঘুমতে পারলে বাঁচে৷ বাপের মতোই হয়েছে দুটোতে৷ মায়ের বাজখাঁই কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে ঘুম অনেকটাই হালকা হয়েছে অর্ণিশার৷ আর অলসতা নয়— ভেবেই চট করে উঠে বসল সে৷ ঘুমের রেশ এখনো কাটেনি। বিছানায় বসে বসে ঝিমচ্ছে অর্ণিশা৷ শেষ রাতের দিকে শুয়েছিল সে। আজ থেকে তার পরীক্ষা আরম্ভ৷ রাত জেগে পড়তে হচ্ছে৷ ইদানীং পড়ায় মনোনিবেশ করা কষ্টকর হয়ে উঠছে তার। যেহেতু উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তাই জোর করে হলেও পড়তে তো হবেই৷ অতশত ভাবনার মাঝে অঞ্জু বেগমের সেই বাজখাঁই কণ্ঠস্বর আবারও কর্ণগোচর হলো‚


“তুই নিজেকে ছাত্রী হিসেবে পরিচয় দিস?”


অর্ণিশা আধবোজা চোখ পিটপিট করে বলল‚ “কেন আম্মা?”


“দশটা বাজতে চলল আর তুই কুম্ভকর্ণের মতো পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছিস?”


ভারী কণ্ঠে অর্ণিশা বলল‚ “তুমি আমাকে আগে ডাকতে পারলে না?”


বেজায় বিরক্ত হলেন অঞ্জু বেগম। অর্ণিশার গায়ের উওর থেকে লেপটা সরিয়ে দিয়ে বললেন‚ “বেশি কথা নয়— উঠে তাড়াতাড়ি তৈরি হ৷ আমি নাস্তা বেড়ে রাখছি।”


অর্ণিশার প্রত্যুত্তরের আশা করলেন না অঞ্জু বেগম। দ্রুত পায়ে ঘর ত্যাগ করলেন। অর্ণিশা সময় নষ্ট করল না৷ তাড়াতাড়ি উঠে ফ্রেশ হয়ে এলো৷ সাদা কলেজ ড্রেস গায়ে জড়িয়ে নিল। লম্বা চুলে আলতো হাতে দুটো বিনুনি গেঁথে নিল। চোখের পলকে দশ মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নিয়েছে অর্ণিশা। 


“অর্ণি খাবার খেয়ে যা৷ না খেয়ে এক পা বের হতে পারবি না— বলে দিলাম।”


মায়ের গলার আওয়াজ পেয়ে অর্ণিশা ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে গেল। অঞ্জু বেগম তার জন্য প্লেটে রুটি আর সবজি বেড়ে রেখেছেন। 


“তাড়াতাড়ি এদিকে আয়— আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”


কথানুযায়ী অঞ্জু বেগম নিজের হাতে করে মেয়েকে খাইয়ে দিলেন। খাওয়া শেষ হতেই অর্ণিশা তার ঘরে গেল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে৷ এরই মাঝে হঠাৎ করে অঞ্জু বেগম কানে ফোন নিয়ে এলেন। অর্ণিশা তা খেয়াল করল না৷ সে তো কলম খোঁজায় ব্যস্ত। এইতো কালও সব গুছিয়ে রেখেছিল। নিজের উপরই বিরক্ত প্রকাশ করল অর্ণিশা৷ বের হতে এখনো কিছুটা সময় বাকি আছে। আজ প্রথম দিন তাই হাশেম মোড়ল তাকে কলেজে দিয়ে আসবেন। সিট পড়েছে সদরের দিকে। মেয়ের কোনো হেলদোল নেই দেখে অঞ্জু বেগম বললেন‚


“তোর নতুন বন্ধু কল দিয়েছে।”


“আমার কোন নতুন বন্ধু— আবার কল করল?”


“বোকা মেয়ে তোর শাশুড়ী।”


হকচকিয়ে গেল অর্ণিশা। চোখ ছোটো ছোটো করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল‚ “আগে বলবে তো!”


“এখন বললাম তো— নে কথা বল।”


ফোনটা অর্ণিশার হাতে দিয়ে অঞ্জু বেগম চললেন বাকি কাজ গুলো করতে৷ মেয়ে কিছুক্ষণ পরেই পরীক্ষা দিতে বের হবে৷ অর্ণিশা ফোনটা কানে নিয়ে সালাম জানাল। 


“কেমন আছ মা?”


“তোকে ছাড়া খুব বেশি ভালো নেই রে। কবে যে তোকে আমার কাছে নিয়ে আসব।?”


আড়ালে হাসল অর্ণিশা৷ মনোয়ারা বেগম আবারও বললেন‚


“শান্ত মস্তিষ্কে ভালো করে পরীক্ষা দিস। পরীক্ষা শেষ হলেই আমার ঘরের বউকে আমি আর দূরে রাখব না।”


খানিকটা লজ্জা পেল অর্ণিশা। কথা কাটানোর জন্য বলল‚ “আচ্ছা। খেয়েছ তুমি?”


“হ্যাঁ। আর শোন— আজ তোর জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”


“কী সারপ্রাইজ মা?”


“সেটা বললে কী আর সারপ্রাইজ থাকে? তোর দেরি করিয়ে দিচ্ছি। প্রথম দিন একটু তাড়াতাড়ি যেতে হয়। সিটও তো খুঁজতে হবে৷ আল্লাহর নাম দিয়ে বেরিয়ে পর।”


“আচ্ছা।”


“ফি আমানিল্লাহ বাচ্চা।”


কল কাট হয়ে গেল। অর্ণিশা ফোনটা বিছানার উপর রেখে দিল। ঈষৎ লজ্জার আভাস সর্বাঙ্গ জুড়ে বয়ে গেল। তার মানে অপেক্ষার অবসান ঘটবে৷ আচ্ছা লোকটার কী তাকে দেখতে ইচ্ছে করে না? সেই যে গেল আর তো কথা বলল না তার সঙ্গে। আজ পনেরো দিন পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ লোকটা তার খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না৷ তবে কী সমস্ত মোহ কেটে যাচ্ছে। একদিন কী হুট করেই সমস্ত মোহ মায়া কেটে যাবে? অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল অর্ণিশার। এসব কথা ভাবতেও ভেতরেটা শুকিয়ে যায়৷ ভয় লাগে যে— ভীষণ। 


সময় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। অর্ণিশার সিট পড়েছে সবার সামনে। এই নিয়ে রাগ হলো খুব। এখন এতগুলো পরীক্ষা স্যারদের মুখ দেখে দিতে হবে৷ একটু ঘাড়ও ঘুরানো যাবে না। তাহলেই খাতাটা অক্কা পাবে। অর্ণিশা যতটা পারছে লেখার চেষ্টা করছে৷ খাতা তো আর খালি দেওয়া যায় না৷ অর্ণিশার পাশের সিটে অন্য কলেজের একটা মেয়ে বসেছে৷ মেয়েটার নাম মরিয়ম। ওদের ডানপাশে বসে মেয়েগুলো সব অন্য কলেজের৷ মাইশা বসেছে অর্ণিশার পেছনের সিটে। আর তার পেছনে রুমি। দুজনে অতি সাবধানে একে অপরের খাতা দেখাদেখি করে লিখছে। পেছনের সিটে বসা আন্নি মেয়েটা বারবার মৃদুস্বরে ডাকছে মাইশাকে৷ আজ ইংরেজি পরীক্ষা। প্রশ্নও খানিকটা কঠিন এসেছে বৈকি। মাইশার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে সে সবই পারে৷ রুমি আহ্লাদে গদগদ সুরে বলল‚


“ময়না আমাকে চার নং প্রশ্নের উত্তরটা দেখা।”


এবার যেন একটু সাহস পেল আন্নি। সেও তাল মিলিয়ে বলল‚ “আমাকেও একটু দেখা না ময়না!”


একথা শুনে অর্ণিশা হালকা ঘাড় ঘুরিয়ে আন্নিকে দেখল৷ তার পাশ থেকে মরিয়ম খানিকটা ঘুরে পিছনদিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল‚


“তোমার নাম কী ময়না?”


মাইশা সহ বাকি দুজন সশব্দে হেসে উঠল। এদের হাসির চোটে বোকা বনে গেল মরিয়ম৷ অর্ণিশা বেজায় বিরক্ত হলো। হুট করেই এক্সাম হলে গার্ডে থাকা শিক্ষক রেগে গেলেন। চেঁচিয়ে বললেন‚ “সাইলেন্স!” কেঁপে উঠল সকলে। এরপর আর কেউ টু টা শব্দ পর্যন্ত করেনি৷ 


পরপর আরও দুঘণ্টা খুব তাড়াতাড়িই যেন পেরিয়ে গেল৷ আজকে পরীক্ষা খুব ভালোই হয়েছে৷ শেষ সময়ে এসে ওরা একে অপরকে সাহায্য করেছে৷ মাইশা আর রুমিও সাহায্য করেছে৷ এদের দুটোর সাথে খুব ভালো সখ্য কখনোই ছিল না আর না ওদের তরফ থেকে ছিল৷ তবে আজ অর্ণিশা এক অন্য রূপ দেখল ওদের৷ নতুন বন্ধুত্বের মানে খুঁজে পেল৷ 


অপর সারি থেকে অন্য কলেজের একটা মেয়ে টুকলি করছিল। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সেই মেয়েটা অর্ণিশার পায়ের কাছে কাগজটা ছুঁড়ে মা’রে। গার্ডে থাকা দুজন শিক্ষকের কাছে ব্যাপারটা দৃষ্টিগোচর হলো। দুজনেই এগিয়ে এলেন অর্ণিশার কাছে৷ একজন অর্ণিশার থেকে খাতাটা নিয়ে নিলেন আরেকজন কাগজটা অন্য পরিক্ষার্থীকে দিয়ে তুলিয়ে নিলেন। অর্ণিশা কিছুই বুঝতে পারল না। মাইশা পেছন থেকে দাঁড়িয়ে বলল‚


“স্যার আমাদের বান্ধবী কিছু করেনি। টুকলি করেছে ওই মেয়েটা।”


ডান হাতের তর্জনী টুকলি করা মেয়েটাকে ইঙ্গিত করল। সবাই সেই মেয়েটার দিকে তাকাল। রুমিও পেছন থেকে বলল‚


“স্যার আমরা দেখেছি ওই মেয়েটাকে— কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিতে। আপনি চাইলে ওই মেয়ের খাতা চেক করে দেখুন৷”


সব চুপ করে দেখছিল অর্ণিশা৷ কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিল সে। এই প্রথম মাইশা আর রুমির দ্বিতীয় কোনো রূপ দেখছে সে। ওদের সম্পর্ক তো তেল আর জল ছিল। মাধবীর পর আর কখনো কারো সাথে বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি তার৷ তবুও আজ তার বিপদে ওরাই এগিয়ে এসেছে৷ 


হলরুম থেকে বেরিয়ে গেইটের কাছে আসতেই অতি কাঙ্ক্ষিত একজনের দেখা পেল অর্ণিশা৷ ধীরে ধীরে নিজেকে অসাড় লাগতে শুরু করল তার৷ কতগুলো দিন পর দুজন দুজনকে দেখছে৷ পরমুহূর্তেই পুরোনো অভিমান জেঁকে বসল৷ অভিমানের পাল্লা তড়তড় করে অনেকটা বেড়েছে। অর্ণিশা দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতে নিলে— পেছন থেকে চিরচেনা উচ্ছ্বসিত স্নিগ্ধস্বর ভেসে এলো‚


“চলে যাচ্ছেন যে?”


পেছন দিকে না তাকিয়েই অর্ণিশা জবাব দিল‚ “রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বললে লোকে খারাপ বলবে!”


বক্ষদেশে দুহাত গুটিয়ে রঙ্গন বলল‚ “আপনি এখনো সেই পনেরো দিন আগের অর্ণিশাই রয়ে গেছেন।”


এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অর্ণিশা৷ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল ‚“বাড়িতে চলুন পড়ে কথা হবে৷”


“আপনি মানুষের কথায় এখনো প্রভাবিত হন অর্ণিশা? অথচ আমাদের সম্পর্কে একটা নাম যুক্ত হয়েছে।”


মোটেও অবাক হলো না অর্ণিশা। তাদের সম্পর্কটা যে ‘জীবনসঙ্গী’ নাম পেয়েছে। একটা সুন্দর পবিত্র নাম। বেশি কথা না বাড়িয়ে রঙ্গন শুধু বলল‚


“চলুন রিকশা করে যাওয়া যাক৷”


মাথা উপর নিচ ঝাকিয়ে বলল‚ “হুম!”


রঙ্গন একটা রিকশা ডেকে দাঁড় করাল। এখন সময়টা দুপুর আর বিকেলের মাঝামাঝি। সাড়ে দশটার দিকে ট্রেনে চড়েছিল। এরপর হাশেম মোড়লের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে— এখানে এসে অপেক্ষা করছে মিনিট দশেক ধরে। অর্ণিশার জন্য খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি তাকে। বরঞ্চ দেরি করে এলে অর্ণিশার দেখা পেত না। 


পিচঢালা রাস্তার দুপাশে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত পেরিয়ে হুড তোলা রিকশা ছুটে যাচ্ছে৷ দৈবাৎ শীতল হাওয়া আরও বেপরোয়া হচ্ছে। সাঁই সাঁই বেগে ছুটে যাচ্ছে যেন। শীত অনুভূত হচ্ছে অর্ণিশার৷ গায়ের অ্যাপ্রোনটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল। ভেতরটা কম্পন দিয়ে উঠছে৷ রঙ্গন খেয়াল করল ব্যাপারটা। বাম হাতটা অর্ণিশার কাঁধে রাখল। কেঁপে উঠল অর্ণিশা৷ এই প্রথম দুজনের কাছাকাছি আসা৷ শীতল করা প্রথম স্পর্শ। অর্ণিশা চকিত নেত্রে তাকাল রঙ্গনের দিকে৷ লোকটা তার দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত। অথচ কী অবলীলায় অধরোষ্ঠের কোণে হাসির রেখা প্রসারিত করে রেখেছে। বেশ অনেকটা সময় পর‚ রিকশা এসে থামল একটা রেস্টুরেন্টের কাছে। অর্ণিশা অবাক হলো। সে তো বাড়িতে যাবে— তাহলে এখানে কেন থেমেছে?


“এখানে কেন?”


“খুব ক্ষিধে পেয়েছে আমার। আপনারও নিশ্চয়ই ক্ষিধে পেয়েছে?”


আর কিছু বলল না অর্ণিশা। রঙ্গন ভাড়া মিটিয়ে অর্ণিশার কোমল হাতটাকে নিজের পুরুষালি হাতের মাঝে আটকে নিল। আর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল‚ “এখন এই হাত ধরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।” লোকটার চোখের দিকে তাকানো যায় না। এক অদ্ভুত মাদকাসক্তি কাজ করে। সম্মোহিতা অঙ্গনা পুতুলের ন্যায় হেঁটে গেল রঙ্গনের পেছন পেছন। দুজনে দুপুরের খাবার সেখানেই খেল৷ এরপর সদর থেকে অনেক ধরনের বাজার ফলমূল কিনল৷ এই প্রথম শ্বশুর বাড়িতে যাচ্ছে। খালি হাতে তো আর যাওয়া যায় না৷ রঙ্গনের এহেন কাজে অর্ণিশা অবাক হলো। কিনল তো কিনলই— তাই বলে এত কিছু?


রিকশা এসে থামল মোড়ল বাড়ির সামনে৷ অনল খেলতে বের হচ্ছিল তখনই রঙ্গন আর অর্ণিশার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল৷ রঙ্গন দুটো ফলের প্যাকেট অর্ণিশার হাতে তুলে দিল। অনলের হাতে দুটো প্যাকেট দিয়ে— বাকি সবগুলো নিজের হাতে তুলে নিল৷ রঙ্গনকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন অঞ্জু বেগম। সকালেও তো মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা হলো উনার। কই উনি তো কিছুই জানালেন না? জামাতা আসছে জানলে আগে থেকে রান্নার বন্দবস্ত শুরু করে দিতেন। 


“এতসব আনার কী প্রয়োজন ছিল বাবা?”


“কেন আম্মা আমি কী এগুলো আনতে পারি না?”


“সেই কথা না বাবা৷ তুমি হাত মুখ ধুয়ে এসো আমি রান্নার বন্দবস্ত করছি। অর্ণি যা।”


“আম্মা এত ব্যস্ত হবেন না। আমরা বাহির থেকে খেয়ে এসেছি।”


তবুও কোনো কথা শুনলেন না অঞ্জু বেগম। বিয়ের পর এই প্রথম জামাতা এসেছে। ভাবতেই খুশি খুশি লাগছে উনার৷ 


চলবে?.....#উন্মাতাল |৭|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


“বিয়ানকে তো সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারতে বাবা।”


“আসলে আব্বা...!”


রঙ্গন বলতে পারছে না যে সে তার বউকে দেখতে এসেছে৷ যদিও সে তার মাকে জানিয়েছিল। সঙ্গে করে নিয়েও আসতে চেয়েছিল কিন্তু মনোয়ারা বেগম রাজি হলেন না। তবে তিনি কড়া নির্দেশ দিয়েছেন— বিয়ের পর এই প্রথম শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছে। সঙ্গে করে যেন বাজার ফলমূল কিনে নিয়ে যায়৷ রঙ্গন তার মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। এমনিতেও সে নিতই। হাশেম মোড়লের পাতে আরেকটু গোশতের তরকারি দিয়ে অঞ্জু বেগম বললেন‚


“আহা তুমি এই খাওয়ার সময়ই কথা বলবে? ছেলেটাকে খেতে দাও।”


“জামাইকে আরও তরকারি দাও অঞ্জু।”


অঞ্জু বেগম আরও তরকারি তুলে দিলেন রঙ্গনের পাতে৷ রাতে ভরপেট খাওয়া হয়ে গিয়েছে৷ অল্প খেয়ে অর্ণিশা অন্যমনষ্কা হয়ে সবার কাণ্ডকারখানা দেখে যাচ্ছে৷ রঙ্গনকে খাইয়েই যাচ্ছে— খাইয়েই যাচ্ছে। বেচারা ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতেও পারছে না। অর্ণিশা তার মাকে দেখছে। জামাইকে পেয়ে মেয়েকেই ভুলে গেলেন। তাকাচ্ছেন না পর্যন্ত। অনল আর অর্ণিশা একবার চাওয়াচাওয়ি করল। ইশারায় দুজন দুজনকে কিছু ইঙ্গিত দিল। 


খাওয়ার পর্ব শেষ হলেই হাশেম মোড়ল হাঁটতে বের হলেন। সঙ্গে করে রঙ্গনকেও নিয়ে গিয়েছেন তিনি। এদিকে অর্ণিশা হাতে হাতে সাহায্য করে দিচ্ছে তার আম্মাকে৷ অনেকগুলো এঁটো প্লেট জমেছে৷ অর্ণিশা ধুয়ে দিতে চাইলেও অঞ্জু বেগম বারণ করে দিলেন। এই ঠান্ডার মাঝে পানি ধরতে হবে না‚ বলে দিলেন। মায়ের কথা শুনতে ইচ্ছে হলো না তার। জোর করে কয়েকটা বাসন ধুয়ে দিল৷ অঞ্জু বেগম টেবিলের উপরটা পরিষ্কার করে এসে দেখলেন— উনার নাছোড়বান্দা মেয়ে অর্ধেক বাসন ধুয়ে ফেলেছে।


“সর্দি লাগলে কী করবি?”


“ঔষধ খেয়ে নেওয়া যাবে আম্মা৷ তুমি গিয়ে বিশ্রাম কর।”


“মেয়েকে কাজ করতে দিয়ে আমি বিশ্রাম করব? বিয়ে দিয়েছি বলে— বড়ো হয়ে গিয়েছিস না?”


মায়ের এহেন কথা শুনে খানিকটা লজ্জা অনুভূত হলো অর্ণিশার। “ধ্যাৎ আম্মা কী যে বল না!”


কাজ শেষ করে ঘরে এসেছে অর্ণিশা৷ এখন ঘড়িতে নয়টা বাজছে৷ একটু পড়ে নেওয়া যাক৷ রঙ্গন এখনো আসেনি। হাশেম মোড়লের সঙ্গে বের হয়েছে আধঘণ্টা পেরিয়েছে। অর্ণিশা বাংলা বই নিয়ে বসল। পরশু বাংলা প্রথম পরীক্ষা। এখন শুধু রিভাইস দেবার পালা৷ বইয়ের পাতায় বেশ কয়েকবার চোখ বুলাল৷ সময় অনেকটা হয়েছে৷ রঙ্গন উঠোনে দাঁড়িয়ে মনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কথা বলছে৷ মাকে একা রেখে এসে তার এভাবে ভালো লাগছে না৷ এইতো কাল বিকেলের দিকে রওনা দেবে৷ 


আজ রঙ্গন আর অর্ণিশা একই ঘরে শোবে৷ হঠাৎ করে একজন পুরুষের সঙ্গে রুম শেয়ার করতে কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছে তার৷ মায়ের কাছে কথাটা বলতেও লজ্জা করছে তার। তাই তো মুখ বুজে সহ্য করে নিচ্ছে। 


“অর্ণিশা কিছু কী ভাবছেন?”


তবুও ভাবনার ঘোর কাটল না। অর্ণিশা অনিমেষ চেয়ে রইল জানালার বাহিরে। রাত অনেক হয়েছে কিন্তু তার চোখে ঘুম নেই। অদূরেই শেয়ালের হাঁক ভেসে আসছে। ওদেরও বুঝি শীত করছে৷ শীতকালে এদের হাঁকডাকের উৎপত্তি হয়৷ কই গরম কালে তো এদের অস্তিত্বই টের পাওয়া যায় না? রঙ্গন গিয়ে দাঁড়াল অর্ণিশার পাশে৷ কাঁধে হাত রেখে বলল‚


“ঘুমাবেন না?”


কেঁপে উঠল অর্ণিশা৷ ভাবনার ঘোর কাটতেই আমতা আমতা করে বলল‚ “হু!”


“আমি এই ঘরে আছি বলে কী আপনার অসুবিধে হচ্ছে?”


একটু থেমে রঙ্গন আবারও বলল‚ “তাহলে আমি অতিথিশালায় চলে যাই?”


অকপটে শান্ত মোলায়েম স্বরে জবাব এলো‚ “প্লিজ যাবেন না।”


রঙ্গন প্রত্যুত্তর করল না৷ চুপটি করে চেয়ে রইল রমণীর সুশ্রী পানে। জোছনাময় নীলচে আঁধারিয়ার কাঙ্ক্ষিত রমণীকে অভিলাষিণী ঠেকছে৷ অর্ণিশা তার গায়ে জড়িয়ে রাখা শালটাকে আরও সন্তপর্ণে আগলে নিল৷ দুজনে সেই একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ জানালার দুয়ার অতিক্রম করে হিমশীতল হাওয়া অতিবাহিত হচ্ছে৷ শীত যেন আরও তড়তড় করে বাড়ছে। অর্ণিশা এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে রঙ্গনকে দেখল। লোকটা কী শীত অনুভূত হচ্ছে না? ধূসর রঙা পাতলা একটা গেঞ্জি পড়ে রয়েছে৷ অর্ণিশা শশব্যস্ত কণ্ঠস্বরে বলল‚


“আপনার কী শীত করে না?”


“না! আপনার করছে বুঝি? আরেকটা শাল এনে দেব?”


অর্ণিশা বুঝল‚ লোকটা তার সঙ্গে মশকরা করার চেষ্টা করছে৷ তবুও কোনো ভাবাবেগ নেই তার মাঝে। সে এগিয়ে জানালা আটকে দিল। এরপর অপরপাশে ফিরতেই কোমল হাত জোড়া নিজের পুরুষালি রুক্ষ শীতল হাতের মাঝে আগলে নিল। অর্ণিশা অবাক হলো না তবে সর্বাঙ্গ কম্পিত হলো। মেরুদণ্ডে হিম প্রবাহ বয়ে গেল। হুটহাট এই কম্পনে খুব বিরক্ত সে। তার নিজে ব্যবহারই নিজের কাছে কেমন অসহ্য হয়ে উঠেছে। একটা স্বাভাবিক সম্পর্কে কেন সে সহজ হতে পারছে না? খুব ভাবাচ্ছে তাকে। 


“পনেরো দিন কী যথেষ্ট ছিল না অর্ণিশা?”


আবারও দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। রঙ্গন আবারও বলল‚


“এই পনেরোটা দিন আমার জন্য কষ্টকর ছিল৷ প্রতিটা মুহূর্ত আপনাকে মনে পড়েছে৷ আচ্ছা আপনার কী আমাকে একটুও মনে পড়েনি?”


অর্ণিশা জবাব দিতে পারল না। তারও তো মনে পড়েছিল। খুব করে মনে পড়েছিল৷ আচ্ছা হুট করে জুড়ে যাওয়া সম্পর্কে এত জোড়— এত অনুভূতি? কই লোকটা তো তার সাথে কোনো যোগাযোগ করেনি? কেন করেনি? যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে কী কথা না বলে থাকা যেত? লোকটা কী বোঝে না? 


“দেখেছেন আমি একাই বকবক করে যাচ্ছি৷ একটু কিছু তো আপনিও বলুন?”


“আমার ঘুম পাচ্ছে৷”


“আপনার মোটেও ঘুম পাচ্ছে না।”


এই লোকের দিকে আর বেশিক্ষণ চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকলে নির্ঘাত জ্ঞান হারাবে অর্ণিশা। খানিকটা অসহায় স্বরে বলল‚ “সত্যিই আমার ঘুম পাচ্ছে।”


অর্ণিশা চলে গেল বিছানার কাছে৷ রঙ্গনের জন্য ডান পাশে জায়গা রেখে সে শুয়ে পড়ল। লেপটাকে পুরো বিছানা জুড়ে এলিয়ে দিলে। নরম তুলতুলে লেপটা প্রচণ্ড ওম। খুব আরাম লাগছে। এখন ঘুম না পেলেও সে ঘুমবে৷ আঁখিদ্বয়ে ঘুম এসে ধরা দিতেই হবে৷ জোর করে চোখ বুঝল সে। কই ঘুম তো আসছে না। চোখ কেমন পিটপিট করছে! এই উষ্ণতার মাঝেও তার ঘুম আসছে না৷ রণংন তার ফোনের ফ্ল্যাশলাইট চালু করল। এখন কারেন্ট নেই৷ রঙ্গন খেয়াল করল অর্ণিশা এখনো ঘুময়নি— সমানে চোখ পিটপিট করছে। হাসি পেল তার৷ তবুও হাসি আটকে‚ অর্ণিশার ডান পাশের জায়গায় শুয়ে পড়ল৷ ফোনের ফ্ল্যাশলাইট বন্ধ করল না। ফোনটা রেখে দিল বিছানার পাশে থাকা স্টাডি টেবিলের উপর৷ কপালে 


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল অর্ণিশার৷ সজাগ হতেই নিজেকে রঙ্গনের বাহুডোরে আবদ্ধ পেল৷ ঘুমলে তার কিছুই মনে থাকে না৷ কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমনোর বদ অভ্যেস আছে তার৷ তাই তো কী অবলীলায় লোকটার শরীরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে রয়েছে। ওয়েট অ্যা মিনিট! অর্ণিশা কোথায় জড়িয়ে ধরল? জড়িয়ে রেখেছে তো রঙ্গন। লোকটারও কী তারই মতো এমন বদ অভ্যেস আছে নাকি? হবে হয়তো। কিন্তু অর্ণিশার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে৷ যেন‚ কোনো অজগর সাপ তাকে চেপে ধরেছে৷ যাহ্ বাবা— লোকটাকে সে অজগরের সঙ্গে তুলনা করে ফেলছে! নিজেকে উপরই হাসি পেল অর্ণিশার৷ অতি সন্তপর্ণে সরে গেল রঙ্গনের বাহুডোর হতে৷ সবে ভোর হতে শুরু করেছে৷ মৃদু আওয়াজে পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি কানে ভেসে আসছে। অন্ধিকা কাটতে শুরু করেছে। একটু একটু করে আলোর ছটা মুখরিত হচ্ছে। 


সকালে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছেন অঞ্জু বেগম। উঠেই নামাজ পড়ে কাজে লেগে গিয়েছেন। হাশেম মোড়ল মসজিদে গিয়েছিলেন এখনো আসেননি। উনার সঙ্গে রঙ্গনও গিয়েছে৷ হাশেম মোড়ল যেন নতুন সঙ্গী পেলেন। 


সকলে একসঙ্গে খাবার খেতে বসেছে৷ অঞ্জু বেগম হারেক রকমের নাস্তা বানিয়েছেন আজ। খাওয়ার মাঝেই রঙ্গনের ফোন ভাইব্রেট করে উঠল৷ খাবার সময় ফোন ধরতে ইচ্ছে না হলেও ধরল রঙ্গন। 


“আসসালামু আলাইকুম।”


“........”


অপর প্রান্তের কোনো কথা শুনতে পেল না এখানে উপস্থিত বাকিরা। রঙ্গন এবার বলল‚


“কিন্তু স্যার আমি তো শ্বশুর...”


“........”


“এখন রওনা দিলে— আমার ফিরতেও অনেকটা সময় লাগবে স্যার।”


“........”


“ওকে স্যার। আল্লাহ হাফেজ।”


ফোন কাট হয়ে গেল৷ একটা ইমারজেন্সি পড়ে গিয়েছে। এক্ষুনি চলে যেতে হবে রঙ্গনকে৷ এ ব্যাপারে ভারী বিরক্ত হলো সে৷ তার বিকেলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন তাড়াহুড়ো করতে হবে৷ ভাল্লাগে না৷ রঙ্গনকে চিন্তিত দেখে হাশেম মোড়ল শুধালেন‚


“কিছু হয়েছে বাবা?”


“জি আব্বা৷ আমাকে এক্ষুনি ঢাকা যেতে হবে৷ হসপিটালে একটা ইমারজেন্সি এসেছে। বিকেলের দিকে একটা অপারেশন আছে। আরেকজন ডক্টর ছিল— তিনি এই মুহূর্তে দেশের বাহিরে৷”


অঞ্জু বেগম বললেন‚ “আচ্ছা তুমি আগে শান্তিতে খাবারটা খেয়ে নাও।”


অর্ণিশা শুধু দেখেই যাচ্ছে। এই বিষয়ে কীইবা বলার আছে তার? আর খাবার সময় কথা বলতে বিরক্ত লাগে তার। রঙ্গন চলে যাবে ভাবতেই খানিকটা খারাপ লাগল অর্ণিশার৷ মুখটা ছোটো হয়ে গিয়েছে। অনল নিজের মতো করে খেয়েই যাচ্ছে। অঞ্জু বেগম আরও দুটো রুটি আর গরুর গোশতের তরকারি রঙ্গনের পাতে তুলে দিলেন। 


খাওয়া শেষে অর্ণিশা আগেই ঘরে চলে এসেছে। এসেই রঙ্গনের যাবতীয় সবকিছু বিছানার উপর ঘুছিয়ে রাখল৷ রঙ্গন ঘরে এসে তাড়াহুড়ো করতে শুরু করল। তার এভাবে তাড়াহুড়ো করতে দেখে অর্ণিশা বলল‚


“এত তাড়াহুড়ো করছেন কেন?”


“দেরি হলে ট্রেন পাব না। বাসে করে যেতে হলে সময় লাগবে খুব।”


“তবুও এত তাড়াহুড়ো করবেন না৷ আপনার কী প্রয়োজন বলুন আমি এনে দিচ্ছি।”


“আমার আপনাকে প্রয়োজন অর্ণিশা।”


কথাটা আবছা শুনেও বুঝতে পারল না অর্ণিশা৷ ভুরু যুগল কুঁচকে এলো তার। বোকাসোকা স্বরে শুধাল‚ “কিছু বললেন?” রঙ্গন ডান বামে মাথা ঝাকাল শুধু। এরই মাঝে তৈরি হয়ে নিল লোকটা। অর্ণিশা শুধু দেখেই যাচ্ছে। যাবার মুহূর্ত চলে এসেছে। রঙ্গন তার ফোন মানিব্যাগ পকেটে নিল। 


“অর্ণিশা একটু কাছে আসবেন?”


ধীর পায়ে রঙ্গনের কাছে গেল অর্ণিশা। কিছু বলার জন্য উদ্যত হতেই রঙ্গন তার কপালে অধরোষ্ঠ ছোঁয়াল। অবাকের থেকেও অবাক হলো অর্ণিশা। এই প্রথম স্বামীর থেকে সিক্ত ছোঁয়া পেয়েছে। আবেশে চোখ বন্ধ করল। অধর কোণে প্রসারিত হলো হাসির রেখা। অর্ণিশাকে লজ্জায় ফেলার আগেই রঙ্গন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।


“আসি আব্বা‚ আম্মা। এইযে শালাবাবু?”


“ভাইয়া আপনি আবার কবে আসবেন? আরেকবার এলে আমরা আবারও গোল্লাছুট খেলব কেমন?”


“ইনশাআল্লাহ।”


এবার রঙ্গন অর্ণিশার দিকে তাকিয়ে বলল‚ “আসছি।”


মৃদুস্বরে অর্ণিশা বলল‚ “ফি আমানিল্লাহ।”


সবার থেকে বিদায় নিয়ে রঙ্গন চলে গেল। অর্ণিশার মনটা হুট করেই খারাপ হয়ে গেল। কিছুই ভালো লাগছে না তার৷ গেইটের দিকে একবার তাকাল। রঙ্গন তারই দিকে তাকিয়ে আছে৷ লোকটা হাত উঁচু করে টাটা দিচ্ছে। সকলের দৃষ্টির অগোচরে ফ্লাইং কিসও ছুড়ে দিয়েছে রঙ্গন। অর্ণিশা অবাক হলো— যাকে বলে প্রচণ্ড অবাক। নির্বাক‚ নিস্তব্ধ‚ নিঃসাড়‚ হতভম্ব এক রমণীর দেখা পেল রঙ্গন। 


দেখতে দেখতে সবগুলো পরীক্ষা খুব ভালো ভাবেই কেটেছে। পরবর্তী পরীক্ষা গুলো দেওয়ার সময় খুব এনজয় করেছে অর্ণিশা৷ মাইশা‚ রুমি‚ আন্নি‚ মরিয়ম এদের সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে তার। মাঝে মাঝে আফসোস হয় এই বন্ধুত্ব কেন আগে হয়নি। আর তো কয়েকটা দিন তারপর তো শহরে চলে যেতে হবে তাকে। ইতিমধ্যেই সমস্ত আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে৷ গ্রামের বেশিরভাগ মানুষকেই আমন্ত্রণ করা হয়ে গিয়েছে৷ অর্ণিশার দাদু বাড়ির অবশিষ্ট কেউ নেই। নানু বাড়িতে আছে সেই একজন মামা আর উনার পরিবার। উনিও হয়তো রওনা দিয়ে দিয়েছেন। আদরের একমাত্র ভাগ্নীর বিয়ের শুভ অনুষ্ঠান বলে কথা৷ ডেকোরেশনের লোকদেরও বলা হয়ে গিয়েছে। একটা বড়ো গরু কেনা হয়েছে। এই তো সেদিন মনোয়ারা বেগম এসেছিলেন রিসেপশন নিয়ে কথা বলার জন্য৷ শুক্রবারে এখানে বিয়ের আয়োজন আর রবিবার রঙ্গনদের ফ্ল্যাটে ছোটোখাটো আয়োজন করা হবে। সবকিছু যেন খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে৷ এইতো সেদিন প্রথম দেখা হলো রঙ্গনের সঙ্গে। এরপর অপ্রত্যাশিত একটা ঘটনা। তারপর কাঙ্ক্ষিত সেই দিন। যেদিন দুজনের জীবন একই সুতোয় বাঁধা পড়েছিল৷ তারপর তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। এখন সবাই মেতেছে বিয়ের আমেজে। ভাবতেই অর্ণিশার মনটা বিষাদ মেঘমালায় ঢেকে যাচ্ছে৷ আব্বা‚ আম্মা আর আদরের ছোটো ভাইকে ছেড়ে বহুদূরে পাড়ি জমাতে হবে। এক নতুন ঠিকানা— নতুন সংসার। অঞ্জু বেগম সবসময় চাইতেন‚ উনার মেয়ের যেন কাছেপিঠে কোথাও বিয়ে হয় কিন্তু ভাগ্যে বুঝি অন্যকিছু ছিল৷ মেয়েকে চোখের আড়াল করতেই উনার বুক কেঁপে ওঠে৷ তবুও তিনি অপারগ। মেয়ে হয়েছে‚ শ্বশুর বাড়ি তো একদিন যেতেই হবে। এই সত্যিটা তো আর এড়িয়ে যাওয়া যায় না৷ সত্যিটা যতই তিক্ত হোক তা হজম করতেই হয়। এই সত্যিটা তো তিক্ত না। নতুন জীবন— নতুন কিছু আশা। 


চলবে?.....#উন্মাতাল |৮|

#ঊর্মি_আক্তার_ঊষা


[প্রাপ্তবয়স্ক এবং মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত]


নতুন দিনের সূচনা। মোড়ল বাড়িতে উৎসব মেতে উঠেছে৷ বাড়ির বড়ো মেয়ের বিয়ের আজ। সকাল থেকেই আয়োজনের শেষ নেই। বড়ো হাড়িতে করে গরুর গোশত দিয়ে ভুনা খিচুড়ি রান্না হয়েছে৷ সবকিছুই মেহমানদের জন্য৷ কাল থেকেই অতিথি আপ্যায়নের অন্ত রাখছেন না হাশেম মোড়ল। কত দিনের লালিত স্বপ্ন উনার৷ খুব ব্যস্ত সময় কাটছে হাশেম মোড়লের৷ পরিবারকে সময় দিতে পারছেন না খুব একটা। এদিকে রাতে দেরি করে ঘুমনোর ফলে এখনো পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছে অর্ণিশা। ব্যাপারটা এমন হয়েছে যে‚ ‘যার বিয়ে তার হুশ নাই— পাড়া পড়শির ঘুম নাই’। অনেক রাত অবধি দুজনের প্রণয়ালাপ হয়েছে৷ তাই বেশ রাত অবধি জেগে ছিল অর্ণিশা। এ কদিনে বেশ ভাব জমেছে দুজনের৷ দুজন দুজনকে এখনো ভালোবাসি কথাটা বলতে পারেনি৷ অর্ণিশা লজ্জায় বলতে পারছে না। অন্যদিকে রঙ্গনও খানিকটা লজ্জায় অভিভূত। অঞ্জু বেগম মেয়েকে ডাকতে এসে দেখলেন উনার মেয়ে এখনো পড়ে পড়ে ঘুমচ্ছে৷ গাল এলিয়ে খানিকটা হাসলেন তিনি৷ সন্তপর্ণে মেয়ের সমীপে গিয়ে বসলেন। আলতোভাবে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কোনো রকম ভাবাবেগ নেই অর্ণিশার মাঝে। সে আরামসে গায়ে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমচ্ছে৷ অঞ্জু বেগম আবছা স্বরে ডাকতে শুরু করলেন। কয়েক পল পরে ঘুম কিছুটা হালকা হলো অর্ণিশার। চোখ পিটপিট করে মায়াময়ী মানবীকে দেখে গাল এলিয়ে হেসে দিল৷ শুয়ে থেকে আড়মোড়া ভাঙল। হাই তুলতে তুলেই উঠে বসল। অঞ্জু বেগম বললেন‚


“ঘুম ভাঙল তাহলে?”


আরেকবার আড়মোড়া ভেঙে অর্ণিশা বলল‚ “হুম!”


অঞ্জু বেগম লেপ গুছাতে শুরু করলেন। আজ থেকে এই ঘরটা ফাঁকা হয়ে যাবে। মেয়েটা যে নিজের আপন ঠিকানায় চলে যাবে। অর্ণিশা কলঘরে যেতে যেতে বলল‚


“খুব ক্ষিধে পেয়েছে আম্মা৷ নাস্তা কী বানিয়েছ?”


“গোরুর গোশতের খিচুড়ি। তোকে এনে দিই?”


“তোমার হাতের ভর্তা মাখা নিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করছে।”


মেয়ের আবদারে চোখ টলমল করে উঠছে। কতদিন পর মেয়েটা আবদার করল। এই তো সন্ধ্যে হবার আগেই মেয়েটা চলে যাবে। বিদায়ের কথা মনে হতেই বুকটা হু হু করে উঠল৷ 


“আমি এক্ষুনি করে নিয়ে আসছি। গরম ভাত দিয়ে খাইয়ে দেব তোকে৷”


অর্ণিশা ঘাড় কাত করে সায় জানাল৷ অনুষ্ঠানের আমেজে মোড়ল বাড়ি আজ আলোকিত। গ্রামবাসী সাদরে আমন্ত্রিত। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি পরিহিত হাশেম মোড়ল অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত। লাল রঙা বেনারসিতে নববধূ রূপে অর্ণিশা বিছানার উপর চুপটি করে বসে আছে৷ তাকে মাইশা আর রুমি এসে সাজিয়ে দিয়েছে৷ উঠোনে রঙিন প্যাণ্ডেল টানানো হয়েছে। সবটাই করছে ডেকোরেশনের লোকেরা৷ 


আমন্ত্রিত সকলকে খেতে দেওয়া হয়েছে৷ খাওয়ার পর্ব সবেই শুরু হয়েছে। অর্ণিশার বান্ধবীরা খুব সেজেগুজে এসেছে। এসেই ফটাফট নববধূর সঙ্গে সেল্ফি তুলেছে৷ বরযাত্রী এখনো এসে পৌঁছায়নি। রওনা দিয়েছে অনেকটা সময় হয়েছে৷ হাশেম মোড়ল ফোন করে খবর নিয়েছিলেন। কাজের ফাঁকে অঞ্জু বেগম এসে মেয়ের সঙ্গে খানিকটা সময় কাটিয়ে গিয়েছেন। এরই মাঝে কান্নার এক পর্ব অতিবাহিত হয়েছে৷ হাশেম মোড়ল মেয়ে চোখে চোখ রাখতে পারছেন না৷ পাছেই না তিনি কান্না করে দেন৷ কিন্তু পুরুষ মানুষের যে কান্না করতে নেই। মেয়ের জন্য যে উনারও বুকটা ফেটে যাচ্ছে৷ 


বিদায়ের পালা এইতো শুরু৷ ইতিমধ্যেই গলা ঝেড়ে কান্না জুড়ে দিয়েছেন অঞ্জু বেগম। মেয়েটা উনার বড্ড আদরের— খুব শখের৷ বাপের বাড়ি ছেড়ে বহুদূর চলে যাচ্ছে। ভাবতেই বুকটা ফেটে যাচ্ছে উনার। হাশেম মোড়ল 


“ও আপারে— তুই আমাকে ছেড়ে যাস না রে আপা।”


অনল গলা ছেড়ে কাঁদছে। ও আবার নিঃশব্দে কান্না করতে পারে না। ছোটো বেলায় যখন আম্মা তাকে মারত তখনও এভাবেই কান্না জুড়ে দিত। আজও তার অন্যথা হলো না। সমস্ত বাড়ি জুড়ে মানুষ। সবাই অনলের দিকেই তাকিয়ে আছে৷ অর্ণিশার মামি এসে সামলে নিলেন অনলকে৷ হাশেম মোড়ল যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন। অথচ তিনি তো বাবা— কী করে সন্তানকে নিজের থেকে আলাদা করবেন? শত কষ্ট হলেও উনাকে তা পাড়তেই হবে৷ হাশেম মোড়ল অর্ণিশা হাতটা রঙ্গনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন‚


“যোগ্য একজনের হাতেই আমি আমার মেয়েকে তুলে দিচ্ছি। আমি জানি তুমি আমার থেকেও ভালো খেয়াল রাখবে আর অর্ণির।”


হাশেম মোড়লকে আশ্বাস দিয়ে রঙ্গন বলল‚ “আপনি চিন্তা করবেন না আব্বা। আমি কখনো উনাকে কষ্ট দেব না৷ নিজের সর্বস্ব দিয়ে উনার খেয়াল রাখব।”


“তুমি আমাকে চিন্তা মুক্ত করলে বাবা।”


অঞ্জু বেগম ক্রন্দন অবস্থায় মনোয়ারা বেগমের কাছে গিয়ে হাত ধরে বললেন‚ “


“আমার মেয়েটা এখনো ছোটো— কোনো ভুল করলে মা হয়ে ক্ষমা করে দিয়েন আপা।”


“আপনি চিন্তা করবেন না আপা৷ অর্ণিশা তো আমারও মেয়ে। তার ওপর ওকে আমি আমার বন্ধু বানিয়েছি। ওর অযত্ন হবে না কখনো। আপনাদের যখন মন চাইবে মেয়েকে গিয়ে দেখে আসবেন।” 


মাগরিবের নামায আদায় করে অর্ণিশাকে নিয়ে সবাই রওনা হলো৷ মেয়েটা নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে৷ পরিবার পরিজন ছড়ে এক নতুন পরিবেশে যাচ্ছে অর্ণিশা। হাশেম মোড়ল যোগ্য লোকের কাছে মেয়েকে দিতে পেরে নিশ্চিন্ত। মেয়ে যে সুখে থাকবে তা উনার অজানা নয়। কিন্তু মেয়েকে পরের ঘরে পাঠাতে গিয়ে বুক কেঁপে ওঠে একজন অসহায় বাবার৷ কিন্তু এটাই যে সমাজের নির্মম নিয়ম। এরপর ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে কিছুটা সময়৷ এখান থেকে বাসে করে গেলে জ্যামে পড়া মাস্ট। ট্রেন ছেড়েছে সাতটায়। পৌঁছাতে গিয়ে সময় লেগেছে তিনঘণ্টা। আবির আর মিজানের পরিবার সমেত এসেছে রঙ্গনদের ফ্ল্যাটে। এখনো কিছু রিচ্যুয়ালস বাকি আছে৷ সবাই মিলে হাতে হাতে করলে খুব তাড়াতাড়িই হয়ে যাবে। মনোয়ারা বেগম উচ্ছ্বসিত হয়ে পুত্রবধূকে ঘরে বরণ করে তুললেন। অর্ণিশাকে ফ্রেশ করিয়ে হাল্কা কিছু খাবার খাইয়ে দেওয়া হলো। 


অর্ণিশা অবাক চোখে ফ্ল্যাটটা দেখছে৷ খুব যে বড়োসড়ো এমনটাও না৷ তবে খুব সাজানো গোছানো। প্রত্যেকটা জিনিস অত্যন্ত যত্ন সহিতে সুনিপুণ ভাবে সাজিয়ে রাখা৷ রান্নাঘরটা বড্ড পছন্দ হয়েছে অর্ণিশার৷ চার রুমের ফ্ল্যাটটা। রঙ্গনের বাবা মা’রা যাওয়ার বছর দুয়েক আগে কেনা হয়েছিল। নিজের হাতে প্রত্যেকটা জিনিস গুছিয়েছিলেন মনোয়ারা বেগম৷ স্বামীর রোজকারের শেষ সম্বল এই বাসস্থান। মনোয়ারা বেগম দুজনের উদ্দেশ্য বললেন‚


“বউমা রা তোমরা একটু অপেক্ষা করো— আমার বউমাকে একটু প্রয়োজন।”


এই বলে মনোয়ারা বেগম অর্ণিশার হাত ধরে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন৷ অর্ণিশাকে বিছানার উপর বসিয়ে তিনি আলমারি খুললেন। আকারে ছোটো একটা গহনার বাক্স বের করলেন। অর্ণিশাকে উনার কিছু দেওয়ার আছে। একজোড়া কঙ্কণ আর চেইন বের করলেন। 


“এগুলো তোমার জন্য।”


মনোয়ারা বেগম অর্ণিশার হাতে কঙ্কণ আর গলায় লকেট সমেত চেইন পড়িয়ে দিলেন৷ অর্ণিশা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কঙ্কণ দুটো৷ দেখতে বেশ অনন্য। বহু আগের চিত্র কাঠামো হয়তো। 


“এগুলো আমার শাশুড়ী মায়ের৷ বহু আগের ডিজাইন এগুলো।”


“কিন্তু ভীষণ সুন্দর। এমন ডিজাইন আগে দেখিনি। আচ্ছা উনি কী খুব শৌখিন ছিলেন?”


“হ্যাঁ। উনার বাপের বাড়ির সকলে ছিলেন স্যাকরা। মায়ের মুখে শুনেছিলাম— গ্রামের বাড়িতে উনাদের খ্যাতি ছিল প্রচুর। বিয়ের পর একবার গিয়েছিলাম।”


কথাটা বলেই গাল এলিয়ে হাসলে মনোয়ারা বেগম। যাক অর্ণিশার এগুলো পছন্দ হয়েছে৷ উনারও ভীষণ পছন্দের এগুলো। বিয়ের পর যখন নতুন বউ ছিলেন তখন সবসময় এগুলো পড়ে থাকতেন৷ কতই না সুন্দর দেখাত হাত দুটো৷ অর্ণিশার হাতেও বেশ মানিয়েছে। গোলুমোলু গৌর হাতে ঝলমল করছে কঙ্কণ জোড়া। 


ঘণ্টা খানেক সময় নিয়ে রঙ্গনের ঘরটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিয়েছে মিজান আর আবির৷ ফুল আগেই অর্ডার দিয়েছিল৷ বলা বাহুল্য‚ কিছুক্ষণ আগেই ফুল এসেছে। সময় অনুমান করেই অর্ডার করা হিয়েছিল। নয়তো ফুলগুলো মূর্ছা যেত। আবিরের স্ত্রী আর মিজানের স্ত্রী মিলে অর্ণিশার সেই লাল বেনারসি পাল্টে লাল পাতলা জর্জেট শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে৷ এরকম পাতলা শাড়ি কখনো পড়েনি অর্ণিশা৷ কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছে বৈকি। তবুও কিচ্ছুটি বলল না। 


লাল ফুলের সাদা চাদর। তার উপর গোলাপ‚ ডালিয়া আর রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো। অর্ণিশাকে বিছানার মধ্যিখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ ঘড়ির কাটা গুনে গুনে সাড়ে এগারোটায় ঠকঠক করছে। সময় তড়তড় করে বাড়ছে৷ রঙ্গন এখনো আসেনি। আবির‚ মিজান আর ওদের পরিবার মাত্রই বেরিয়ে গেলো। মনোয়ারা বেগম ঘুমিয়ে পড়েছেন৷ উনার হাই পাওয়ারের কিছু ঔষধ রয়েছে৷ রঙ্গন বাকিদের এগিয়ে দিয়ে সদর দরজা ভালো করে আটকে এসেছে। এরপর ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে অগ্রসর হতে লাগল৷ বুকের ভেতরে দ্রিমদ্রিম তরঙ্গ বাজছে৷ ঘরে এসেই দুয়ার আটকে দিল রঙ্গন। আলমারি থেকে একটা খাম বের করে ড্রেসিং টেবিলের উপরে রাখল। 


“এটা আপনার অধিকার। আপনার যেভবে ইচ্ছে খরচ করবেন৷ এখন থেকে আপনার সমস্ত শখ আহ্লাদ পূরণের দায়িত্ব আমার।”


অর্ণিশা চেয়ে রইল রঙ্গনের দিকে। ধীর পায়ে রঙ্গন গেল অর্ণিশার কাছে। খানিকটা সমীপে গিয়ে বসল আর বলল‚


“আমি আপনার বন্ধু হতে চাই। যাকে আপনি আপনারা মনে প্রতিটি অনুভূতির কথা একটা খোলা বইয়ের মতো উপস্থাপন করতে পারবেন। মায়ের পর আপনার অগ্রাধিকার সবথেকে বেশি আমার জীবনে। শুধু আমাকে সেই অধিকারটা দেবেন৷”


মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে রইল অর্ণিশা৷ লোকটা কথার প্রত্যুত্তরে পুতুলের ন্যায় মাথা কাত করে জবাব দিল‚ “হুম!”


“আই লাভ ইউ অর্ণিশা।”


একটু থেকে রঙ্গন আবারও বলল‚ “আমি আপনাকে ভালোবাসি অর্ণিশা।”


অধর কোণে কিঞ্চিৎ হাসির রেখা উঁকি দিল। হৃৎপিণ্ডের দ্রিমদ্রিম আওয়াজ শোনা যাচ্ছে৷ বক্ষপিঞ্জরে আটকে থাকা পাখিটা ক্রমশ ছটফট করছে৷ সে কী মুক্তি পেতে চাচ্ছে নাকি অন্য কিছুর আভাস দিচ্ছে? আজ অর্ণিশাও কিছু বলতে চায়। ভালোবাসার কথা তো তারও বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু লজ্জা নামক বস্ত তাকে দাবিয়ে রাখে। মনের গহীনে লুকায়িত কথাটা কিছুতেই মুখে আনতে পারে না। তবুও খানিকটা সাহস জুগিয়ে কম্পিত নিম্ন স্বরে বলল‚ 


“ভালোবাসি।”


কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল রঙ্গন। চোখের পলক যেন পড়ছে না। আজ সে স্বার্থক। পছন্দের মানুষটার মনে ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করতে পেরেছে৷ অর্ণিশা লোকটার চোখে চোখ রাখল। রঙ্গন আবারও বলল‚


“আরেকবার বলবেন অর্ণিশা।”


“ভালোবাসি‚ ভালোবাসি‚ ভালোবাসি!”


❝পুরুষ তার শখের নারীর মুখে একটু ‘ভালোবাসি’ কথাটা শোনার জন্য সবকিছু করতে পারে।❞ অর্ণিশার মুখে ভালোবাসি শব্দটা শুনে‚ তীব্র আনন্দে আঁখিজোড়া সিক্ত হলো রঙ্গনের। কণ্ঠনালিতে তার হরতাল নেমেছে৷ শীতল পরিবেশেও তড়তড় করে ললাট বেয়ে ঘাম ঝরছে। দৈবাৎ জোড়া অধরোষ্ঠের সন্ধি ঘটল। তীব্র অনুভূতি জোয়ারে ভেসে গেল রঙ্গন অর্ণিশা৷ দুজন দুজনকে খুব করে অনুভব করতে পারছে। উষ্মা যুগ্ম দেহ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। ভালোবাসার এক নতুন উপন্যাস। এর ছোট্টো একটা নামকরণও হয়েছে ‘প্রেমোপন্যাস’। অনুভূতি গুলো আরও নিগূঢ় হচ্ছে৷ ড্রিম লাইটে আবছা নীলচে আলোয়— প্রেমীদের প্রসারিত হাসির রেখা দৃষ্টিগোচর হলো। সমস্ত লাজ হায়াকে অতল গহ্বরে তলিয়ে অর্ণিশা জড়িয়ে ধরল রঙ্গনকে৷ উত্তাল অনুভূতির খেলায় মত্ত দুটি হৃদয় সময়ের সাথে সাথে উন্মাতাল হয়ে পড়ছে৷ প্রণয়ীর অধরোষ্ঠ‚ ললাট‚ কপোল‚ গ্রীবাদেশে আদুরে স্পর্শ এঁকে দিল রঙ্গন৷ এমন আদুরে কামনীয় স্পর্শে আরও ছটফট করতে শুরু করল অর্ণিশা৷ রঙ্গনের স্পর্শ গুলো আরও গভীর এবং আদুরেব্যথায় পরিনত হলো। মিলিত হলো দুটি দেহ— দুটি হৃদয়। 


নিস্তব্ধ আঁধারিয়া কামরায় জোড়া কপোত কপোতি একে অপর গভীর আলিঙ্গনে লেপ্টে রয়েছে৷ ঘুম নেই কারোরই অক্ষিকোটরে। অর্ণিশার কপালে আর্দ্র অধরোষ্ঠ ছোঁয়াল রঙ্গন। এরপর দু পঙক্তির একটা শ্লোক বলল‚


❝চিত্ত জুড়ে অনুভূতির ঢেউ— প্রবহমান উত্তাল‚

যুগ্ম অনুরাগী মত্ত মাতোয়ারা উন্মাতাল!❞


[ঊর্মি আক্তার ঊষা]


সমাপ্ত!.....


-


-


আসসালামু আলাইকুম। গল্পটা লেখার সময় অনেকেই আমার পাশে ছিলেন— তাদেরকে নিরন্তর ভালোবাসা৷ পুরো গল্পটা পড়ে কেমন লেগেছে তার একটা ছোট্টো রিভিউ দেবেন আশাকরি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Ad Code

Responsive Advertisement